leadT1ad

ন্যারেটিভ

বয়ানের বিবর্তন: বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক কুরুক্ষেত্র

স্ট্রিম গ্রাফিক

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল সরকারের পতন বা শেখ হাসিনার পলায়নের দিন হিসেবে চিহ্নিত নয়। দিনটি দীর্ঘস্থায়ী ‘একক বয়ান’ বা ‘মনোলিথিক ন্যারেটিভ’-এর ফাটল ও পতনের দিন। গত দেড় দশক ধরে বাংলাদেশে রাষ্ট্র, রাজনীতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে নির্দিষ্ট ফ্রেমে বা ছাঁচে ফেলে দেখার যে চর্চা গড়ে তোলা হয়েছিল, ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান সেই ছাঁচ ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে টকশো, চায়ের আড্ডা, পত্রিকার কলাম থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ার সর্বত্র বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—‘ন্যারেটিভ’ শব্দটি। বাংলায় যাকে আমরা ‘বয়ান’ বা ‘আখ্যান’ বলতে পারি। মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশি জাতিসত্তা, রাষ্ট্র সংস্কার, ৪৭-এর দেশভাগ কিংবা আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন—সবকিছুকে এখন নতুন করে ব্যাখ্যার চেষ্টা চলছে। পুরনো লেন্স বা চশমা ছুড়ে ফেলে নতুন লেন্সে বাংলাদেশকে দেখার এই প্রবণতাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক সংঘাত।

ন্যারেটিভ আসলে কী, কেন গত এক বছরে এই আলাপ এত প্রবল হয়ে উঠল এবং আদতে সমাজ ও রাষ্ট্রে এর কতটুকু প্রতিফলন ঘটেছে।

ন্যারেটিভ: তত্ত্বের ক্যানভাসে ক্ষমতার খেলা?

সহজ কথায়, ‘ন্যারেটিভ’ বা বয়ান হলো কোনো ঘটনা বা ইতিহাসকে নির্দিষ্ট দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করা। সমাজবিজ্ঞান ও রাজনীতির ভাষায়, ন্যারেটিভ নিছক গল্প নয়, এটি হলো ‘ক্ষমতা’। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর মতে, ‘ক্ষমতা ও জ্ঞান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। যারা ক্ষমতায় থাকে, তারা একটি নির্দিষ্ট ‘‘সত্য’’ বা ‘‘ডিসকোর্স’’ তৈরি করে, যা সমাজের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।’ অর্থাৎ, কোনটি সত্য আর কোনটি মিথ্যা, তা নির্ধারণ করে ক্ষমতাসীনদের তৈরি করা ন্যারেটিভ।

অন্যদিকে, ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’ বা পাল্টা বয়ান হলো সেই শক্তি, যা প্রতিষ্ঠিত সত্যকে চ্যালেঞ্জ করে। ফরাসি দার্শনিক জঁ-ফ্রাঁসোয়া লিওতার উত্তর-আধুনিকতাবাদের সংজ্ঞায় বলেছিলেন, ‘পোস্ট-মডার্নিজম হলো মহা-বয়ান বা গ্র্যান্ড ন্যারেটিভের প্রতি অবিশ্বাস।’ অর্থাৎ, রাষ্ট্র যখন একক সত্য গেলাতে চায়, তখন তার বিপরীতে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যে সত্যগুলো উঠে আসে, তাই কাউন্টার ন্যারেটিভ।

বাংলাদেশে গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকার শক্তিশালী ‘মাস্টার ন্যারেটিভ’ বা একক বয়ান প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই বয়ান ছিল, ‘১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধই ইতিহাসের একমাত্র ভিত্তি, শেখ মুজিবুর রহমানই একমাত্র স্থপতি ও উন্নয়নের বিকল্প নেই।’ এই ন্যারেটিভের মাধ্যমে দুর্নীতি, ভোটাধিকার হরণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন—সবকিছুকে ‘চেতনা’র মোড়কে বৈধতা দেওয়া হতো।

আন্তোনিও গ্রামশি, মিশেল ফুকো ও এডওয়ার্ড সাঈদ। স্ট্রিম কোলাজ
আন্তোনিও গ্রামশি, মিশেল ফুকো ও এডওয়ার্ড সাঈদ। স্ট্রিম কোলাজ

৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল মূলত এই মাস্টার ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’-এর বিস্ফোরণ। নতুন বয়ানে বলা হচ্ছে, ‘মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নয়, এটি জনগণের যুদ্ধ।’ কাউন্টার ন্যারেটিভ এখানে প্রশ্ন তুলছে, কেবল উন্নয়ন দিয়ে স্বাধীনতা বিচার করা যায় না, বরং ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারই মুখ্য। বর্তমানে বাংলাদেশে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর বিপরীতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ বা ‘মুসলিম আইডেন্টিটি’র যে আলাপ উঠছে, তা মূলত পুরনো সেক্যুলার ন্যারেটিভকে ভেঙে ফেলারই রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রক্রিয়া। ৫ আগস্টের পর ‘ন্যারেটিভ শিফট’ বা বয়ান পরিবর্তনের যে আলাপ উঠছে, তা মূলত এই প্রতিষ্ঠিত ‘সত্য’কে চ্যালেঞ্জ করা।

ইতালীয় তাত্ত্বিক আন্তোনিও গ্রামশির ভাষায় একে বলা যায় ‘সাংস্কৃতিক হেজিমনি’ বা আধিপত্যের বিরুদ্ধে ‘কাউন্টার-হেজিমনি’ বা পাল্টা আধিপত্য তৈরির প্রচেষ্টা। অর্থাৎ, ন্যারেটিভ বদল মানে কেবল ইতিহাসের পাতা ওলটানো নয়, বরং আগামী দিনের ক্ষমতার চাবি কার হাতে থাকবে, তা নির্ধারণ করা।

ন্যারেটিভের আলাপ অরিজিনাল নাকি আমদানিকৃত

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে ‘ন্যারেটিভ’, ‘ডিসকোর্স’ বা ‘বয়ান’ শব্দগুলো যেভাবে চায়ের কাপ থেকে রাজপথের স্লোগানে উঠে এসেছে, তার উৎস নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্ক রয়েছে। গভীর বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই চিন্তাকাঠামো আদতে ‘মৌলিক’ নয়, বরং এটি পশ্চিমা উত্তর-আধুনিক ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্ব থেকে ‘আমদানিকৃত’। তবে এর প্রয়োগ বা অ্যাপ্লিকেশন সম্পূর্ণ দেশীয় বাস্তবতায় করা হয়েছে।

ন্যারেটিভ ভাঙার এই তাত্ত্বিক ভিত্তি মূলত দাঁড়িয়ে আছে গ্রামশি, মিশেল ফুকো ও এডওয়ার্ড সাঈদের চিন্তার ওপর। পশ্চিমা একাডেমিয়ায় ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করা বা ‘ডিকন্সট্রাকশন’ (বিনির্মাণ) করার যে চর্চা, সেটিই বাংলাদেশের বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক আলাপের মূল উৎস। এই কঠিন একাডেমিক ধারণাগুলো বাংলাদেশে জনপ্রিয় করার পেছনে মূল ভূমিকা পালন করেছেন একদল বুদ্ধিজীবী, অ্যাক্টিভিস্ট, একাডেমিশিয়ান ও ইউটিউবার। এদের মধ্যে পিনাকী ভট্টাচার্য, ফরহাদ মজহার বা সলিমুল্লাহ খানের নাম উল্লেখযোগ্য।

ইতিহাসের একপাক্ষিক পাঠ বন্ধ হয়েছে ও মানুষ প্রশ্ন করতে শিখছে। ‘চেতনা’র নামে কাউকে ব্ল্যাকমেইল করার দিন শেষ হয়েছে। কিন্তু এর নেতিবাচক দিক ও ঝুঁকিও কম নয়। ইতিহাস সংশোধন করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাস বিকৃতির নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

পিনাকী ভট্টাচার্য গত কয়েক বছর ধরে তাঁর ভিডিওগুলোতে সচেতনভাবে ‘আওয়ামী বয়ান’ বা ‘ভারতের বয়ান’ শব্দটি ব্যবহার করে আসছেন। তিনি ফুকো বা সাঈদের তত্ত্বের জটিলতা বাদ দিয়ে সাধারণ মানুষকে বুঝিয়েছেন, ‘আপনাকে যা ইতিহাস হিসেবে পড়ানো হচ্ছে, তা আসলে পলিটিক্যাল প্রোপাগান্ডা।’

সলিমুল্লাহ খান ও ফরহাদ মজহাররা দীর্ঘকাল ধরে তাদের বিভিন্ন লেখা ও বক্তৃতায় ‘চেতনার ব্যবসা’ বা ‘সেক্যুলারিজমের ফ্যাসিজম’ নিয়ে কথা বলেছেন। ৫ আগস্টের পর তাঁদের সেই তাত্ত্বিক আলাপগুলোই ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক ভাষায় পরিণত হয়েছে। সলিমুল্লাহ খানের বিভিন্ন আলোচনা ও লেখায় উঠে এসেছে, কীভাবে ‘ইতিহাসের একক বয়ান’ বা প্রোপাগান্ডাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে হয় ও রাষ্ট্রের অন্যায্য আচরণের মুখোশ খুলতে হয়। তিনি ফ্রয়েড ও লাঁকার মনস্তত্ত্ববিষয়ক ধারণাকে ব্যবহার করে দরকারি ব্যাখ্যা করেছেন, ফ্যাসিবাদ কেবল বন্দুকের নলে টিকে থাকে না, বরং জনগণের মনের ভেতর ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে টিকে থাকে।

ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খান ও পিনাকী ভট্টাচার্য। স্ট্রিম কোলাজ
ফরহাদ মজহার, সলিমুল্লাহ খান ও পিনাকী ভট্টাচার্য। স্ট্রিম কোলাজ

অন্যদিকে, ফরহাদ মজহার দেখিয়েছেন ‘রাষ্ট্রের কাঠামো’ বা সংবিধান যদি ত্রুটিপূর্ণ হয়, তবে কেবল সরকার বদল করে মুক্তি মিলবে না; প্রয়োজন রাষ্ট্রের পুনর্গঠন। ‘সেক্যুলারিজম’-এর নামে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে অপমান করা হয়েছে এবং তাদের কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। তিনি এমন এক রাষ্ট্রের কথা বলেন যা ধর্মীয় পরিচয়কে অস্বীকার করবে না, আবার অন্য ধর্মের ওপর নিপীড়নও চালাবে না।

এই ‘আমদানিকৃত’ চিন্তা এখন আর কেবল তাত্ত্বিক পর্যায়ে নেই। এখন বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠে ‘অরিজিনাল’ রূপ পেয়েছে। ৪৭-এর দেশভাগকে নতুন করে ইতিবাচকভাবে দেখার প্রবণতা, তা এই কাউন্টার ন্যারেটিভেরই ফসল।

গত এক বছরে কেন এই আলাপ উঠল

৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ছিল মূলত ‘জেন-জি’ বা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে। এই প্রজন্ম আওয়ামী লীগের তৈরি করা প্রথাগত ‘বাইনারি’ বা দ্বিমেরুকরণের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। তাদের কাছে দুর্নীতি, ভোটাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্রগঠন ছিল মুখ্য। সরকার পতনের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। কেবল প্রশাসনিক শূন্যতা নয়, আদর্শিক শূন্যতাও। এই শূন্যস্থান পূরণ করতেই ন্যারেটিভের আলাপ সামনে আসে।

তরুণরা দেখেছে, ‘উন্নয়ন’ ও ‘চেতনা’র বয়ান ব্যবহার করে কীভাবে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা কায়েম রাখা হয়েছিল। তাই তারা পুরনো বয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে। পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াত বা অন্যান্য ডানপন্থী দল ও নতুন ছাত্র নেতৃত্ব—সবারই রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য নতুন ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রয়োজন হয়ে পড়ে। পুরনো আওয়ামী বয়ানে এদের অনেকেরই জায়গা ছিল ‘ভিলেন’ হিসেবে। তাই টিকে থাকার স্বার্থেই তাদের ন্যারেটিভ বদলাতে হয়েছে।

এছাড়া বাঙালি নাকি বাংলাদেশি অথবা ধর্মনিরপেক্ষ নাকি মুসলিম আইডেন্টিটি—এই পুরনো বিতর্কগুলো নতুন মোড়কে ফিরে এসেছে, কারণ রাষ্ট্রকে নতুন করে ‘রিফর্ম’ বা সংস্কার করার কথা বলা হচ্ছে। আর সংস্কার করতে হলে রাষ্ট্রের ভিত্তি কী হবে, তা ঠিক করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিববিষয়ক বয়ানের পরিবর্তন

গত এক বছরে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে সবচেয়ে বেশি আঘাত এসেছে ১৯৭১ সালের বয়ানে। গত ১৫ বছর মুক্তিযুদ্ধকে কেবল একটি দলের বা একজন ব্যক্তির অবদান হিসেবে দেখানো হতো। নতুন ন্যারেটিভে বলা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধ ছিল ‘জনগণের যুদ্ধ’। এখানে মওলানা ভাসানী, জিয়াউর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ ও সাধারণ মানুষের অবদানকে সামনে আনা হচ্ছে।

শেখ মুজিবকে ‘জাতির পিতা’র আসন থেকে নামিয়ে একজন রাজনৈতিক নেতা হিসেবে মূল্যায়ন ও ক্ষেত্রবিশেষে তীব্র সমালোচনা করার প্রবণতা দেখা গেছে। ৫ আগস্টের পরপরই ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা হয়েছে ‘ডি-আইডোনাইজেশন’ বা বিগ্রহ-ভাঙার শামিল। একইভাবে, দেশের বিভিন্ন স্থানে শেখ মুজিবের ভাস্কর্য ভাঙচুর বা অপসারণের ঘটনাগুলো তাঁকে ‘দেবতুল্য’ অবস্থানের বিরুদ্ধে পাল্টা বয়ান তৈরির প্রয়াস হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সেই সঙ্গে এইক্ষেত্রে খোদ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে একইভাবে অন্যপক্ষের নিজের বয়ানে হাজির করার চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে। এই সব চেষ্টা সমাজের একটি অংশে গভীর ঝাঁকুনি দিয়েছে।

৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান ছিল মূলত এই মাস্টার ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে ‘কাউন্টার ন্যারেটিভ’-এর বিস্ফোরণ। নতুন বয়ানে বলা হচ্ছে, ‘মুক্তিযুদ্ধ কোনো একক ব্যক্তি বা দলের নয়, এটি জনগণের যুদ্ধ।’ কাউন্টার ন্যারেটিভ এখানে প্রশ্ন তুলছে, কেবল উন্নয়ন দিয়ে স্বাধীনতা বিচার করা যায় না, বরং ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারই মুখ্য।

৫ আগস্টের পর ৪৭-এর দেশভাগকে ‘অনিবার্য’ ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’ হিসেবে দেখছে অনেকেই। সোশ্যাল মিডিয়ায় ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায় বলা হচ্ছে, ৪৭-এ আলাদা না হলে আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ সম্ভব হতো না, বরং আমরা ভারতের অঙ্গরাজ্য হয়ে থাকতাম। এই বয়ান মূলত বাংলাদেশে ‘মুসলিম আইডেন্টিটি’ বা ইসলামি জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দেয়। সমালোচকরা বলছেন, এর মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যবোধের জায়গা তৈরি করার চেষ্টা চলছে।

ডানপন্থী রাজনীতির উত্থান

পলাতক আওয়ামী সরকারের আমলে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামপন্থী দলগুলোকে ‘জঙ্গি’ বা ‘দেশের শত্রু’ হিসেবে ট্যাগ দেওয়া হয়েছিল। নতুন ন্যারেটিভে তাদের ‘ভিকটিম’ বা স্বৈরাচারের শিকার হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তাদের গণতান্ত্রিক স্পেস বা পরিসর দেওয়ার পক্ষে যুক্তি তৈরি করা হচ্ছে।

‘শিবির’ বা ইসলামি ছাত্ররাজনীতিকে আর আগের মতো ‘ট্যাবু’ বা নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে না। ডানপন্থী রাজনীতিকে মূলধারায় নিয়ে আসার এই চেষ্টা বাংলাদেশের রাজনীতির ভারসাম্য বা ইকো-সিস্টেমকে নতুন করে সাজাচ্ছে। যারা একসময় কোণঠাসা ছিল, তারা এখন নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বৈধতা আদায়ের জন্য নতুন বয়ান তৈরি করছে।

ন্যারেটিভ বদলের তাত্ত্বিক লক্ষ্য

তাত্ত্বিকভাবে ও রাজনৈতিকভাবে এই বয়ান বদলের পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য কাজ করেছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো ‘ডি-আওয়ামীফিকেশন’ বা রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে আওয়ামী লীগের মতাদর্শিক প্রভাব মুছে ফেলা। পাঠ্যপুস্তক, রাস্তার নাম, ভাস্কর্য ও ইতিহাস থেকে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য সরানোর চেষ্টা চলছে। এছাড়া অন্তর্ভুক্তিমূলক ইতিহাস তৈরির কথাও বলা হচ্ছে, যেখানে ডান, বাম, মধ্যপন্থী—সবাই নিজেদের খুঁজে পাবে। রাষ্ট্র সংস্কারের যৌক্তিকতা তৈরির জন্যও পুরনো সিস্টেমকে ‘পচা’ বা ‘নষ্ট’ প্রমাণ করা জরুরি ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করতে হলে পুরনো ‘সেক্যুলার’ বয়ানকে চ্যালেঞ্জ করা তাদের অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আদতে কতটুকু পাল্টাল

তাত্ত্বিকভাবে ন্যারেটিভ বদলের যে ঝড় উঠেছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন সবসময় ইতিবাচক হয়নি। এখানে একটি মিশ্র চিত্র বা ‘প্যারাডক্স’ দেখা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের বয়ান ভাঙার ক্ষেত্রে আন্দোলনকারীরা সফল হয়েছে। শেখ হাসিনার পলায়ন ও তার দলের নেতাদের আত্মগোপন প্রমাণ করে, তাদের ‘উন্নয়ন ও চেতনার বয়ান’ ধসে পড়েছে। মানুষ এখন আর অন্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দোহাই দিয়ে দুর্নীতি মেনে নিচ্ছে না। কিন্তু এর বিপরীতে ‘নতুন বয়ান’ কী হবে, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। কেউ চাইছেন পূর্ণাঙ্গ ইসলামি রাষ্ট্র, কেউ চাইছেন পশ্চিমা ধাঁচের লিবারেল ডেমোক্রেসি। আবার কেউ চাইছেন সমাজতান্ত্রিক সংস্কার। ফলে ‘জাতীয় ঐকমত্যের ন্যারেটিভ’ এখনো তৈরি হয়নি। ডা. জাহিদুর রহমানের মতো অনেক বিশ্লেষক দাবি করছেন, এমন ঐকমত আদতে সম্ভবও নয়। রাজনীতিতে বিভিন্ন ধরনের ন্যারেটিভ টিকে থাকলেই বরং গণতন্ত্রের জন্য ভালো।

মব জাস্টিস ও অসহিষ্ণুতার বাস্তবতা

তাত্ত্বিকভাবে বলা হয়েছিল, নতুন বাংলাদেশে বাকস্বাধীনতা থাকবে ও ভিন্নমতকে সম্মান জানানো হবে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখেছি ‘মব জাস্টিস’, মাজার ভাঙা ও ভিন্নমতের লোকদের ওপর সামাজিক চাপ তৈরির সংস্কৃতি। নারীদের সমাজে অপরায়ন করবার প্রবণতা এখন খুবই চোখে পড়ে। নারীর জীবন ও চলাচল কেমন হওয়া উচিত তা নিয়ে শুধু মত নয়, সেই মতের সঙ্গে না মিললে আক্রমণ, সোশাল মিডিয়ায় ভিন্ন মতের নারীদের প্রবল স্লাট শেমিং তো এখন বহুল চর্চিত বিষয়। যা প্রমাণ করে, মুখে ‘বৈষম্যবিরোধী’ ন্যারেটিভ থাকলেও, বাস্তবে সমাজ এখনো অসহিষ্ণু। এক ধরনের ফ্যাসিবাদকে সরিয়ে আরেক ধরনের ‘মবোক্রেসি’ বা জনতার একনায়কত্ব তৈরির ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। তাত্ত্বিক বয়ান ও মাঠপর্যায়ের আচরণের এই ফারাক নতুন বাংলাদেশের যাত্রাপথকে কণ্টকাকীর্ণ করে তুলছে।

ত্রয়োদশ নির্বাচন বনাম সংস্কারের দ্বন্দ্ব

ন্যারেটিভের সংঘাত সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট নির্বাচন ইস্যুতে। বিএনপির ন্যারেটিভ হলো, ‘দ্রুত নির্বাচনই গণতন্ত্রের সমাধান’। অন্যদিকে ছাত্র-জনতা এবং সিভিল সোসাইটির একটি অংশের ন্যারেটিভ হলো, ‘আগে সংস্কার, পরে নির্বাচন’। এই দুই ন্যারেটিভের দ্বন্দ্বে অন্তর্বর্তী সরকার চাপে রয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে সবাই একমত যে হাসিনা খারাপ ছিলেন, কিন্তু প্র্যাকটিক্যালি ক্ষমতা কার হাতে যাবে—তা নিয়ে পুরনো রাজনৈতিক দল ও নতুন শক্তির মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ছে।

তরুণরা দেখেছে, ‘উন্নয়ন’ ও ‘চেতনা’র বয়ান ব্যবহার করে কীভাবে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা কায়েম রাখা হয়েছিল। তাই তারা পুরনো বয়ানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করে। পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াত বা অন্যান্য ডানপন্থী দল ও নতুন ছাত্র নেতৃত্ব—সবারই রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার জন্য নতুন ঐতিহাসিক ভিত্তি প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

যদিও অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষিত হয়েছে। তবুও প্রায়শই শোনা যাচ্ছে, নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র হচ্ছে কিংবা সামনের নির্বাচন হবে চ্যালেঞ্জিং। এই অবিশ্বাস প্রমাণ করে, পুরনো বয়ান ভাঙলেও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত এখনো নড়বড়ে।

সাংস্কৃতিক যুদ্ধ ও ৪৭-এর পুনর্জাগরণ

৪৭-এর দেশভাগকে পজিটিভলি দেখার যে ন্যারেটিভ তৈরি হয়েছে, তা সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হলেও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে এখনো বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রভাব প্রবল। পয়লা বৈশাখ, রবীন্দ্রসংগীত বা আবহমান বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে এই নতুন ‘মুসলিম আইডেন্টিটি’র বয়ান সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। হঠাৎ করে মানুষকে ‘পুরোপুরি ধর্মীয় পরিচিতি’তে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে সমাজে ‘কালচারাল ওয়ার’ বা সাংস্কৃতিক যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ভার্চুয়াল জগতে যে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে বা গ্রামের সাধারণ মানুষের মধ্যে তার গভীরতা কতটুকু, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে

৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের ন্যারেটিভ বদলের প্রক্রিয়া এখনো চলমান ও কিছুটা অস্থিতিশীল। একে ‘গ্রামশিয়ান ইন্টাররেগনাম’ বা অরাজক মধ্যবর্তী সময়ের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। গ্রামশি বলেছিলেন, ‘পুরনো পৃথিবী মারা যাচ্ছে, কিন্তু নতুন পৃথিবী এখনো জন্ম নিতে পারেনি; এই মধ্যবর্তী সময়েই যত অদ্ভুত উপসর্গের দেখা মেলে।’

ইতিবাচক দিক হলো, ইতিহাসের একপাক্ষিক পাঠ বন্ধ হয়েছে ও মানুষ প্রশ্ন করতে শিখছে। ‘চেতনা’র নামে কাউকে ব্ল্যাকমেইল করার দিন শেষ হয়েছে। কিন্তু এর নেতিবাচক দিক ও ঝুঁকিও কম নয়। ইতিহাস সংশোধন করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে ইতিহাস বিকৃতির নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধার অবদানকে খাটো করা বা জাতীয় সংগীত নিয়ে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করা এর উদাহরণ।

আগে বিভাজন ছিল ‘স্বাধীনতার পক্ষ বনাম বিপক্ষ’। এখন বিভাজন তৈরি হচ্ছে ‘সেক্যুলার বনাম ইসলামিস্ট’ বা ‘রিফর্মিস্ট বনাম ট্র্যাডিশনাল পলিটিশিয়ান’-এর মধ্যে। এই নতুন মেরুকরণ সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। এছাড়া সোশ্যাল মিডিয়াভিত্তিক ‘ভাইরাল ন্যারেটিভ’ বা হুজুগ অনেক সময় গভীর চিন্তাকে গ্রাস করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ফ্যাক্ট বা তথ্যের চেয়ে ইমোশন বা আবেগ বেশি গুরুত্ব পাওয়া সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য শুভলক্ষণ নয়।

৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের মানুষের সামনে সাদা কাগজ বা ‘ক্লিন স্লেট’ এনে দিয়েছে। এই কাগজে নতুন গল্প বা ন্যারেটিভ লেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, কলম কার হাতে থাকবে—তা নিয়ে কাড়াকাড়ি চলছে। বিএনপি চাইছে তাদের হারানো ক্ষমতা ফিরে পেতে, জামায়াত চাইছে তাদের আদর্শিক রাষ্ট্র গড়তে, আর জেন-জি বা তরুণরা চাইছে এমন এক বাংলাদেশ যা তারা আগে দেখেনি। এই ত্রিমুখী স্রোতে ‘ন্যারেটিভ’ শব্দটি কেবল তাত্ত্বিক আলাপ নয়, বরং বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও ভবিষ্যতের রূপরেখা নির্ধারণের হাতিয়ার। শেষ পর্যন্ত কোন ন্যারেটিভটি টিকবে—৪৭-এর ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, ৭১-এর উদার মানবিকতাবাদ, নাকি ২৪-এর সংস্কারবাদী তারুণ্য? নাকি এই তিনের সংমিশ্রণে তৈরি হবে নতুন কোনো ‘বাংলাদেশি বয়ান’? উত্তর পেতে আমাদের সম্ভবত আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। তবে এটুকু নিশ্চিত, বাংলাদেশের রাজনীতি আর কখনোই পুরনো ছকে ফিরে যাবে না; ন্যারেটিভের এই যুদ্ধই ঠিক করে দেবে আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে।

  • লেখক: গবেষক ও সাংবাদিক
Ad 300x250

সম্পর্কিত