জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

বিএনপি সরকারের প্রথম ৩০ দিন কেমন গেল?

প্রকাশ : ১৯ মার্চ ২০২৬, ০৮: ৫৮
তারেক রহমানকে শপথ পড়ান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। বিএনপির ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া ছবি

গত ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সরকার গঠন করে। জুলাই পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল, তা থেকে পরিত্রাণের একটি পথ সবার কাছে উন্মোচিত হয়েছিল। অনেকেই মনে করেছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের একটি নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হতে পারে। তবে নতুন কোনো সরকারের প্রথম এক মাস রূপান্তরমূলক পরিবর্তন আনার জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু এই সময়টুকুই অনেক ক্ষেত্রে সরকারের অগ্রাধিকার, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং শাসন শৈলীর একটি পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয়। সেই বিবেচনায়, বিএনপি সরকারের প্রথম ৩০ দিন একটি মিশ্র হলেও আশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরে—যেখানে একদিকে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দৃশ্যমান ও দ্রুত উদ্যোগ রয়েছে, অন্যদিকে কিছু মৌলিক প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে।

জনগণের প্রত্যাশা যখন তুঙ্গে এবং রাজনৈতিক আস্থা যখন অনেকটাই ভঙ্গুর, তখন বিএনপির এই প্রাথমিক পারফরম্যান্সকে একদিকে যেমন বাস্তববাদীভাবে মূল্যায়ন করতে হবে, অন্যদিকে তেমনি ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও বিবেচনায় নিতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে বিতর্ক এবং সাংবিধানিক সংস্কারের রূপরেখায় অস্পষ্টতা—এসব সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও একটি বিষয় স্পষ্ট—মাত্র ৩০ দিনের মধ্যেই সরকারের কার্যক্রম একটি দৃঢ় ও গতিশীল সূচনা তৈরি করেছে। এই সূচনা টিকিয়ে রাখা গেলে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় একটি গুণগত পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এক উল্লেখযোগ্য সূচনা: প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়ন

বিএনপি সরকারের প্রথম মাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য শতভাগ নিখুঁত হওয়া নয়; বরং এর গতি, ব্যাপ্তি এবং উদ্দেশ্যের স্বচ্ছতা। মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি, প্রশাসন, অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে একযোগে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এই মাত্রার কর্মতৎপরতা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় খুবই বিরল।

সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের মাধ্যমে দশ হাজার পরিবারকে একটি কাঠামোবদ্ধ সহায়তা ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। প্রতিটি কার্ডের মাধ্যমে মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদান শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তাই নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোর সূচনা। এটি প্রশাসনিক সক্ষমতার পাশাপাশি দরিদ্রবান্ধব নীতির সুস্পষ্ট প্রতিফলন।

একই সঙ্গে সরকার ধর্মীয় ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির দিকে গুরুত্ব দিয়ে ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিত, ভিক্ষু ও যাজকদের জন্য মাসিক সম্মানী চালু করেছে। এটি কেবল আর্থিক সহায়তা নয়; বরং সমাজের বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ।

ঈদ উপলক্ষে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের জন্য সহায়তা প্রদান সরকারের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো প্রাতিষ্ঠানিক জাকাত ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ। যদি এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে ধর্মীয় অনুদান ও সম্পদ বণ্টনকে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং কার্যকর সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থায় রূপান্তর করা সম্ভব হবে—যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে।

কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে সরকার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। কৃষক কার্ড চালুকরণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং প্রায় ১২ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের ঋণ মওকুফ একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বস্তি এনে দিতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ঋণের বোঝা বহন করা কৃষকদের জন্য এটি নতুন করে উৎপাদনে ফিরতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি, যা ইতিমধ্যে বহু জেলায় শুরু হয়েছে, তা শুধু সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নই নয়, বরং জলাবদ্ধতা হ্রাস, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং গ্রামীণ কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রশাসনিক সংস্কারের ক্ষেত্রেও সরকার একটি নতুন বার্তা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর শনিবারসহ নিয়মিত অফিস করা এবং কর্মকর্তাদের জন্য কঠোর সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা প্রশাসনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী সংকেত। ভিভিআইপি প্রটোকল কমানো, বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা সীমিত করা এবং সংসদ সদস্যদের বিশেষ সুবিধা—যেমন শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট—গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত জনগণের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থনৈতিক খাতে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে রমজান ও ঈদের সময় বাজার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখা এবং বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। বন্ধ ও রুগ্‌ণ শিল্প প্রতিষ্ঠান পুনরায় চালুর উদ্যোগ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল, ইপিজেড ও হাইটেক পার্কগুলোকে সক্রিয় করার পরিকল্পনা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে।

স্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে সংযোগ তৈরি করে একটি শিল্প-শিক্ষা ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার চিন্তাভাবনা দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ সব বিষয়ে সরকার ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। বাস্তবায়ন করতে পারলে খুবই প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে গৃহীত হবে।

শিক্ষা খাতে পুনর্ভর্তি ফি বাতিল এবং লটারিভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি থেকে সরে আসা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য আর্থিক সহায়তা এবং ধর্মীয় ও ক্রীড়া শিক্ষকদের নিয়োগ শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুমাত্রিক করে তুলতে পারে।

স্বাস্থ্য খাতে ই-হেলথ কার্ড চালু, বিপুলসংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ (যাদের বড় অংশ নারী) এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান—এসব উদ্যোগ জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দেয়।

নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নারী পরিচালিত পরিবহন ও সাইবার বুলিং প্রতিরোধ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয় হ্রাস, বিদ্যুৎ সাশ্রয়, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং জাতীয় দিবসগুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো পদক্ষেপ রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক ভিত্তিকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যায়।

সব মিলিয়ে, মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে নতুন সরকারের এই বহুমাত্রিক উদ্যোগগুলো একটি বিষয় পরিষ্কার করে—সরকার শুধু প্রতিশ্রুতি দেয়নি, বরং তা বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে গেছে। আর এই কারণেই তাদের সূচনা নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য এবং অনেকাংশে অভূতপূর্ব।

গতি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ: সংস্কারের ধারাবাহিকতা

প্রথম মাসের এই অর্জন ধরে রাখাই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। প্রাথমিক উদ্যোগগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারলে এই গতি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। বিশেষ করে জুলাই সনদের চেতনা বাস্তবায়ন এখন সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড। ইতিমধ্যে সরকার এই বিষয়ে তাদের নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো অনুযায়ী ধারাবাহিক জুলাই সনদের বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা ইতিবাচক। তবে এই আলোচনার ভিত্তিতে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ ও সময়সূচি ঘোষণা করা জরুরি, যাতে জনগণ বুঝতে পারে কোন সংস্কার কখন বাস্তবায়িত হবে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যে, দল-মত নির্বিশেষে সাংবিধানিক বিধিমালা যেন সুরক্ষিত থাকে।

স্থায়ী চ্যালেঞ্জ: আইনশৃঙ্খলা ও প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা

নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা ছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে শহীদ মিনারের সামনে কনটেন্ট ক্রিয়েটারকে গুলি, উত্তরায় মার্কেট ভাঙচুর করার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। এরকম আরও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা বার্তা দেয় যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

কার্যকর শাসনের জন্য নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা অপরিহার্য। তাই এই খাতে দ্রুত, দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ এবং কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।

একইভাবে, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন তুলেছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা না গেলে সরকারের সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই এই দুটো ক্ষেত্রেই পারফর্ম করাটা খুবই জরুরি। কেননা সরকার যদি অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে না পারে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে তবে তাদের টিকে থাকা অনেক কঠিন হতে পারে।

দুর্নীতিবিরোধী সুস্পষ্ট রোডম্যাপ

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর লড়াই ছাড়া কোনো উন্নয়নই টেকসই হয় না। জনগণের প্রত্যাশা—সরকার একটি সুস্পষ্ট, কার্যকর এবং সময়োপযোগী দুর্নীতিবিরোধী রোডম্যাপ উপস্থাপন করবে। এই রোডম্যাপে থাকতে হবে—প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, আইনি সংস্কার, ডিজিটাল স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ খাতভিত্তিক কৌশল। শুধু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার, যেখানে দুর্নীতির সুযোগই কমে যায়।

যুদ্ধ ও পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতি

নতুন সরকারের জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধ। এই যুদ্ধের প্রভাব ইতিমধ্যে বাংলাদেশের জ্বালানি খাত, রপ্তানি খাত এবং রেমিট্যান্সে দেখা দিয়েছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে সরকারের জন্য তীব্র অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। যুদ্ধের সময় ও পরে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রবেশ এবং যুদ্ধের কারণে তাঁদের ফিরে আসা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তীব্র সংকট তৈরি করছে এবং করবে। সুতরাং এই সব বিষয়কে মাথায় রেখে সামনের নীতিসমূহ নির্ধারণ করাটা খুবই জরুরি।

সম্ভাবনার জানালা নাকি সুযোগ হাতছাড়া

বিএনপি সরকারের প্রথম ৩০ দিন একই সঙ্গে আশাব্যঞ্জক ও শিক্ষণীয়। এই সময়ে নেওয়া পদক্ষেপগুলো একটি ইতিবাচক গতি তৈরি করেছে এবং জনগণের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই গতি ধরে রাখা, দুর্বলতাগুলো সমাধান করা এবং বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের দিকে এগিয়ে যাওয়া। বিশেষ করে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এবং একটি কার্যকর দুর্নীতিবিরোধী কৌশল গ্রহণ—এই দুই ক্ষেত্রেই সরকারের সফলতা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এই ৩০ দিন এক সম্ভাবনার জানালা খুলে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন একটাই—সরকার কি সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারবে? নাকি সুযোগ হাতছাড়া করে আবার আগের ধারায় ফিরে যাবে?

সম্পর্কিত