গঙ্গাচুক্তি নবায়ন: বাংলাদেশের কৌশলগত অগ্রাধিকারগুলো

২০২৬ সালের গঙ্গাচুক্তি নবায়নের প্রেক্ষাপটে তিন পর্বের একটি ধারাবাহিক প্রকাশনা। আজ প্রকাশিত হলো শেষ পর্ব।

সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ
সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

স্ট্রিম গ্রাফিক

এ পর্বে আগের দুই পর্বের বক্তব্যের একটি বিস্তারিত আলোচনার পরিসমাপ্তি টানা হয়েছে। সম্মিলিতভাবে এই তিনটি পর্ব গঙ্গা ইস্যুটিকে তিনটি পরস্পর-সংযুক্ত দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করেছে।

  • প্রথম পর্বে গঙ্গাকে ক্ষমতার অসমতা, ঐতিহাসিক অবিচার এবং নিম্ন অববাহিকাভুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ন্যায়সংগত প্রবেশাধিকারের দাবির আলোকে উপস্থাপন করা হয়েছে।
  • দ্বিতীয় পর্বে দেখানো হয়েছে কীভাবে এই অসমতা একতরফা ও বেআইনি কর্মকাণ্ডে রূপ নিয়েছে, যেখানে ফারাক্কা বাঁধ আন্তর্জাতিক পানি আইনের প্রথাগত ও বিধিবদ্ধ উভয় নীতির পরিপন্থী উজান হস্তক্ষেপের একটি স্পষ্ট দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে এসেছে।
  • তৃতীয় পর্বে সেই নৈতিক ও আইনগত সিদ্ধান্তসমূহকে ভবিষ্যৎমুখী নীতিগত নির্দেশনায় রূপান্তর করা হয়েছে, যার লক্ষ্য ২০২৬ সালে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের আলোচক ও নীতিনির্ধারকদের প্রস্তুত করার লক্ষ্যে দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

অতএব, এই পর্বটি কেবল নির্দেশনামূলক নয়; বরং এটি প্রথম পর্বে প্রতিষ্ঠিত নৈতিক দাবি এবং দ্বিতীয় পর্বে উত্থাপিত আইনগত সমালোচনারই ধারাবাহিক সম্প্রসারণ।

কেন ২০২৬ সালের নবায়ন একটি কৌশলগত সন্ধিক্ষণ

১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মাইলফলক ছিল, যা বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে শুষ্ক মৌসুমে পানি বণ্টনের জন্য একটি ৩০ বছর মেয়াদি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করে। তবে প্রথম পর্বে যেমনটি আলোচিত হয়েছে, এই চুক্তিটি এমন এক গভীরভাবে অসম কাঠামোর মধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছিল, যা উজানে অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণ ও প্রবাহ ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা দ্বারা প্রভাবিত ছিল।

দ্বিতীয় পর্বে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, এই অসমতা কীভাবে ফারাক্কা বাঁধের একতরফা নির্মাণ ও পরিচালনার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে—যা ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসংগত ব্যবহারের নীতি এবং সহ-নদীতীরবর্তী রাষ্ট্রের প্রতি উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করার বাধ্যবাধকতার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।

চুক্তিটির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬-এ শেষ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ আজ এক বিরল কৌশলগত সুযোগের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এই চুক্তি নবায়নের মাধ্যমে হয় হাইড্রোলজিকভাবে অচল ও আইনগতভাবে দুর্বল একটি কাঠামোর পুনরাবৃত্তি করা হবে, নয়তো আন্তর্জাতিক আইন, জলবায়ু বাস্তবতা এবং ভাটির টিকে থাকার অপরিহার্য প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নদী শাসনব্যবস্থাকে নতুন করে বিন্যস্ত করা হবে।

বিদ্যমান চুক্তির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে বিকশিত আইনগত ও হাইড্রোলজিক সমালোচনার আলোকে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির তিনটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—

হাইড্রোলজিক অনমনীয়তা

অতীতের গড় প্রবাহের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান পানি বণ্টনের সময়সূচি নির্ধারিত, যা বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অস্থিরতাকে বিবেচনায় রাখে না। নির্দিষ্ট পরিমাণভিত্তিক পানি বণ্টনের বিষয়টি শুষ্ক মৌসুমে ক্রমবর্ধমান পানিসংকটের বাস্তবতার সঙ্গে ক্রমেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়েছে।

পরিবেশগত সুরক্ষার অনুপস্থিতি

পরিবেশগত সুরক্ষাকে বিবেচনায় রেখে ন্যূনতম প্রবাহের বিষয়টি চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, যার ফলে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার, নদীভিত্তিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার অবক্ষয় এবং কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।

অসম পর্যবেক্ষণ ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থা

ভাটি অঞ্চলের দুর্বল যাচাই ও তদারকি কাঠামোর কারণে উজান থেকে প্রদত্ত তথ্যের ওপর নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে, যা প্রথম পর্বে চিহ্নিত কাঠামোগত অসমতাকেই পুনরুৎপাদন করে।

এই সীমাবদ্ধতাগুলো কোনো নিছক কারিগরি ত্রুটি নয়; বরং এগুলো ফারাক্কা বাঁধের একতরফা যুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিধ্বনি—যা দ্বিতীয় পর্বে বিশ্লেষিত হয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত অগ্রাধিকারসমূহ

শুষ্ক মৌসুমে ন্যূনতম নিশ্চিত পানি প্রবাহ

শুষ্ক মৌসুমে অধিকতর ও আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক ন্যূনতম পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা বাংলাদেশের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বর্তমানে নির্ধারিত ৩৫ হাজার কিউসেক পরিমাণ প্রবাহের মানদণ্ড ভিন্ন হাইড্রোলজিক বাস্তবতায় নির্ধারিত করা হয়েছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে লবণাক্ততা ও পরিবেশগত চাপ মোকাবিলায় তা অপর্যাপ্ত প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়াও ভাটির নির্ভরতা ও ঝুঁকি যেখানে তীব্র, সেখানে আন্তর্জাতিক পানি আইন পুনঃসমন্বয়কে সমর্থন করে।

অভিযোজনযোগ্য চুক্তি কাঠামো

দ্বিতীয় পর্বে যেমনটি দেখানো হয়েছে, একতরফা স্বার্থে ব্যবহৃত অবকাঠামো জলবায়ুজনিত চাপের ফলে ভাটি অঞ্চলের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়ায়। তাই নবায়িত চুক্তিতে অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে—

  • নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রবাহজনিত বিষয়ে পর্যালোচনার ধারা (যেমন প্রতি পাঁচ বছর),
  • জলবায়ু-সমন্বিত প্রবাহ মানদণ্ড,
  • খরা ও বন্যা মোকাবিলায় জরুরি বিধান।

অপরিবর্তনশীল ও অনমনীয় চুক্তি জলবায়ু অনিশ্চয়তার যুগে ক্রমেই অকার্যকর বলে স্বীকৃত হচ্ছে। যার দরুন অভিযোজনযোগ্য চুক্তি কাঠামোর কোনো বিকল্প নেই।

যৌথ পর্যবেক্ষণ ও তথ্যের স্বচ্ছতা

বাংলাদেশের উচিত ফারাক্কায় সমান প্রতিনিধিত্বসহ একটি যৌথ হাইড্রোলজিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি তোলা, যেখানে সময়োপযোগী (রিয়েল-টাইম) তথ্য বিনিময় নিশ্চিত থাকবে। স্বচ্ছতা কেবল পারস্পরিক আস্থার জন্য নয়, উজানের নিয়ন্ত্রণ ও ভাটির অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যও অপরিহার্য। প্রয়োজনে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থার কারিগরি সহায়তা এই ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা আরও জোরদার করতে পারে।

পরিবেশগত প্রবাহের স্বীকৃতি

আধুনিক নদী শাসনব্যবস্থায় পরিবেশগত সুরক্ষাব্যবস্থা বণ্টন সিদ্ধান্তের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বার্লিন বিধিমালা এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ন্যূনতম পরিবেশগত প্রবাহকে বাধ্যতামূলক চুক্তি-দায়বদ্ধতা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

একক নদীর গণ্ডি অতিক্রম

প্রথম পর্বের বিস্তৃত যুক্তির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশকে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, মনু ও মুহুরীর মতো অন্যান্য অভিন্ন নদীতেও সমান্তরাল আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। অববাহিকাভিত্তিক এই সম্পৃক্ততা একক ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমাবে এবং বাংলাদেশের কৌশলগত প্রভাবকে বৃদ্ধি করবে।

আলোচনাকৌশল: দৃঢ়, আইনভিত্তিক ও সহযোগিতামূলক

পানি বণ্টন চুক্তির নবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশল তিনটি পরস্পর-সংযুক্ত স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত—

  • নীতিগত ভিত্তি: আন্তর্জাতিক বিচার আদালত স্বীকৃত ন্যায়সঙ্গত ব্যবহার ও উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না করার নীতির ধারাবাহিক আহ্বান।
  • জলবায়ুগত কাঠামো: সহযোগিতাকে শূন্য-সমষ্টির প্রতিযোগিতা নয়, বরং পারস্পরিক অভিযোজনের প্রয়োজন হিসেবে উপস্থাপন করা।
  • বহুপাক্ষিক সম্পৃক্ততা: আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক মঞ্চ ব্যবহার করে সহযোগিতামূলক নদী শাসনের মানদণ্ড সুসংহত করা।

নিষ্ক্রিয়তার ঝুঁকি

অর্থবহ নবায়ন নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে একটি আইনগত ও রাজনৈতিক শূন্যতা (ব্যর্থতা) সৃষ্টি হতে পারে, যা নতুন করে একতরফা পানি প্রত্যাহারের পথ খুলে দিতে পারে—আন্তর্জাতিক চুক্তি আইনে যাকে একটি অস্থিতিশীল পরিণতি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর পরিণতি হবে পরিবেশগত অবক্ষয়, জীবিকা নির্বাহের অক্ষমতা এবং জাতীয় স্থিতিস্থাপকতার কেন্দ্রীয় ইস্যুতে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হওয়া।

কৌশলগত সারসংক্ষেপ

প্রথম পর্বে গঙ্গার ওপর বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় পর্ব দেখানো হয়েছে কীভাবে ফারাক্কা বাঁধের উপর উজানের একতরফা হস্তক্ষেপে সেই অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। পরিশেষে, তৃতীয় পর্বে এই অধিকার ও তদসংশ্লিষ্ট আইনকে কার্যকর কৌশলে রূপান্তরের আহ্বান করা হয়েছে।

২০২৬ সালের চুক্তি নবায়ন কেবল পানি বণ্টনের বিষয়ে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ঐতিহাসিক চলমান অসমতা সংশোধন, পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করে টিকে থাকা এবং সহ-নদীতীরবর্তী রাষ্ট্র হিসেবে আইনসম্মত সমতার দাবি প্রতিষ্ঠার বিষয়। এই নবায়িত চুক্তিতে অভিযোজন করা না হলে তা পুনরায় ভঙ্গুরতাই বহন করবে। কিন্তু আইন, বিজ্ঞান ও কৌশলগত দূরদর্শিতার সমন্বয়ে নবায়িত চুক্তি বাংলাদেশের নদী নিরাপত্তার ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারবে।

  • কমোডর সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ (অবসরপ্রাপ্ত): মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মেরিটাইম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (বিআইএমআরএডি)

সম্পর্কিত