জি এইচ হাবীবের ধারাবাহিক অনুবাদ
মোহাম্মদ রশিদুজ্জামান যুক্তরাষ্ট্রের রোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক। তিনি ব্রিটিশ শাসনামলের ভারত, পকিস্তান ও বাংলাদেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসিত গ্রন্থের লেখক। এক দশকেরও বেশি সময় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন। এই নিবন্ধটি ২০২১ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত বই ‘আইডেন্টিটি অব আ মুসলিম ফ্যামিলি ইন কলোনিয়াল বেঙ্গল: বিটুইন মেমোরিজ অ্যান্ড হিস্ট্রি’-এর একটি অধ্যায়ের অনুবাদ। বইটির বিভিন্ন অংশ থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলা স্ট্রিমের জন্য অনুবাদ করবেন জি এইচ হাবীব। এবার প্রকাশিত হলো প্রথম কিস্তি।
জি এইচ হাবীব

এক শেষ বিকেলের কথা মনে পড়ে আমার। খুব সম্ভবত ডিসেম্বর মাস তখন; ফসল কাটার মরশুম কার্যত শেষ। কেটে নেয়া ধানগাছের অবশিষ্টাংশে মুখ লাগিয়ে বেড়ানো একপাল ছাগল আর বেশ কিছু গরু ছাড়া ধূসর ফসলের মাঠগুলো খালিই একরকম। এক ঝাঁক সাদা বক ফসল কাটার মরশুম শেষ হতে না হতেই ধানখেতের ভেজা ফাটলে আশ্রয় নেয়া ব্যাঙগুলো দিয়ে উদরপূর্তি করছে।
বিকেল আর সন্ধ্যার মাঝের সময়টা চমৎকার ঠান্ডা। গ্রামবাংলায় শীত এসে পড়েছে, আর নিঃসঙ্গ পথচারীরা—তাঁদের দু’একজনের গলায় গরম কাপড় জড়ানো—ধানখেতের আঁকাবাঁকা আলপথ ধরে ধীর পায়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। খোলা প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে সেই নদীর বাতাসে ভেসে আসা গন্ধটির কথা খুব করে মনে পড়ল, যে গন্ধ বা ঘ্রাণ ফসল কাটার বিরতির আগে সোনালী ধানগাছগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যায়। বরষার শেষে খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘ ঘন নীল আকাশের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে, যদিও বাতাসের খানিকটা ঠান্ডাভাব ছাড়া প্রকৃতির দিকে আমি ততটা খেয়াল করছিলাম না। সেই ঋতুকে ঘিরে ফসল কাটা পরবর্তী চমৎকার সময়টা গ্রাম-বাংলার লোকজন বেশ উপভোগ করছিল। ভয়ানক গরম ও আর্দ্রতা তখন বিদায় নেয়াতে—যদিও বেশিদিনের জন্য নয়—পরিবারের লোকজন, বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনেরা মিলে নতুন ধানের চাল দিয়ে বানানো মজার মজার খাবার খাচ্ছিল।
এরই মধ্যে হঠাৎ করে যেন একেবারে শূন্য থেকে, আমার সামনে এক মধ্যবয়েসী মানুষ উদয় হয়ে আমার বাবার কথা জানতে চাইলেন। তিনি আমার নিঃসঙ্গতার আবেশটা ভেঙে দিলেন।
নিজের সঙ্গে আমি আমার বাবা-মা, আমার ছোট ভাই-বোনসংক্রান্ত হতাশার যেসব একঘেয়ে বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম, তিনি তাতেও বাগড়া দিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন তিনি বাবার খোঁজ করছেন? মনে হলো, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক বালকের প্রচ্ছন্ন ঔদ্ধত্যে তিনি খানিকটা আহত বোধ করলেন। তারপরেও ভদ্রতা বজায় রেখে বললেন, ‘বাবা, তুমি বুঝবে না। আমি তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাই; এটা একটা ব্যক্তিগত বিষয়, আর বড়দের ব্যাপার।’
বেড়াতে আসা আত্মীয়-স্বজন, ও গুটিকতেক প্রতিবেশী যারা পরনিন্দা-পরচর্চা করে, অলস গুলতানি মেরে, আর চলতি ঘটনাবলি, ধর্ম ও ইতিহাসের টুকরো-টাকরা নিয়ে কাছারি ঘরে আড্ডা জমাতে আসতেন—তারা ছাড়া আরো দু’ধরনের মানুষ আমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন: হয় তাঁর ছাত্ররা, আর নয়তো তাঁর ছাত্রদের বাবা-মায়েরা, এবং আরেক ধরনের অতিথি, যাঁরা আমার মায়ের খুব একটা পছন্দের ছিলেন না—এক রাত বা আরো বেশি সময়ের জন্য থাকতে আসা কোনো মুসাফির বা আশ্রয়প্রার্থী পথিক। অবশ্যই, তাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন অনামন্ত্রিত।
এ ধরনের মুসাফিরদের মধ্যে ছিলেন দরবেশ ও সাধু বা বাউল। আমি তাঁদের দেখলেই চিনতে পারতাম। বেশিরভাগেরই লম্বা চুল-দাড়ি আর রুদ্রাক্ষের মালা থাকত। একবার এক সুফি ফকির গভীর রাতে বিরাট একটা লন্ঠন হাতে এসে হাজির হলে আমাদেরকে বিছানা ছেড়ে উঠে তাঁর থাকার বন্দোবস্ত করে দিতে হয়েছিল। তাঁর গলায় ছিল লাল টকটকে একটা মাফলার আর হাতে বড় একটা বাঁশের লাঠি। মাঝে মাঝে কপালে তিলকচিহ্নিত দু’একজন সন্ন্যাসী রাতে থাকার জন্য আসতেন; সেসব আগন্তুকের কারো কারো সঙ্গে লোকসংগীত গাওয়ার বাদ্যযন্ত্র থাকত। কিন্তু এই ভদ্রলোকের কাছে সেগুলোর কিছু্ই ছিল না। আমার কৌতূহল হলো: কে ইনি? আমি ভাবলাম, ইনি নিশ্চয়ই আমার বাবার ফেল করা ছাত্রের বাবা হবেন।
অনীহা সত্ত্বেও আমি তাঁকে বারান্দার কাঠের বেঞ্চে বসাই, এবং তারপর বাড়ির ভেতর চলে যাই। বাবা তখনো নামাজ পড়ছিলেন, লম্বা সময় নিয়ে নামাজ পড়তেন তিনি। তাই আমি মাকে বললাম, ‘একজন লোক এসেছেন বাবার সঙ্গে দেখা করতে।’ আমি কথাটা শেষ করতে না করতেই মার ত্বরিত প্রশ্ন, ‘কেমন লোক?’ উত্তরের অপেক্ষা না করেই তিনি ফের জানতে চাইলেন, ‘আরেক মুসাফির নাকি?’ খানিকটা বিরক্ত হয়ে আমি বললাম, ‘আমি কী করে জানব? তিনি ফকির না, সাধু না, বাউলও না। সাধারণ একজন লোক বলেই মনে হলো, মা।’ আমি তাঁকে আশ্বস্ত করার জন্য বললাম। মা বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা!’ আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না আমার কথায় তিনি এটা ভেবে স্বস্তি পেলেন যে তাঁকে বাড়তি একজন বা দু’জনের জন্যে রাঁধতে হচ্ছে না। বাবার নামাজ শেষ হলে মা তাঁকে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে একজন লোক এসেছেন। আশা করি তিনি আপনার ওইসব ফকির বা দরবেশদের কেউ না।’ মাকে তেমন কিছু না বলে বাবা কাছারি ঘরের দিকে এগোলেন।
মা কিন্তু তখনো পুরাপুরি আশ্বস্ত হননি। তিনি আমাকে বললেন, আমি গিয়ে যেন দেখে আসি আগন্তুক দু-এক রাত থাকতে চান কিনা। আমি মায়ের আশঙ্কার কারণটা জানতাম। আমাদের কাছারিঘরটাকে লোকজন গাঁয়ের পান্থনিবাস বলত। সে সময় বাংলাদেশের গ্রামে কোনো হোটেল বা মোটেল ছিল না: সফরকারীরা মানুষজনের বাড়িতে থাকত। তারপরেও, রাতে বিনে পয়সায় থাকতে দিত এমন মানুষজন কমই ছিল। তবে আমার বাবা আমাদের কাছারি ঘরে লোকজনকে আশ্রয় দিতে পছন্দ করতেন এবং গ্রামের লোকেরা সেকথা জানত। কাজেই যখনই কোনো আগন্তুক রাতে থাকার জায়গা খুঁজত, তাঁরা স্বভাববশতই বলত, ‘মাস্টার সাহেবের বাড়ি যাও।’ আর তাঁরা সেখানেই আসত। আর তখন আমার মায়ের কাজ হতো বাড়ির খেয়ালি গৃহপরিচারিকা মকবুলের মাকে সেই অতিথির জন্য রাঁধতে ঠেলাঠেলি করা।
মাঝে মাঝে আগন্তুকেরা সঙ্গী-সাথী নিয়ে আসতেন—গায়ক, আর মারফতি গানের লোকজন। আর, এর অর্থ একগাদা লোকের জন্য রান্না করা! আমি এগুলো সবই জানতাম, আর তাই আমার মায়ের জন্য আমার সহানুভূতি ছিল, এবং আমার ভালো লাগত না এই আগন্তুকদের উৎপাত। কারণ, এগুলো ছিল মায়ের জন্য বাড়তি কাজ। কিন্তু আমার মায়ের প্রতি আমার এই পক্ষপাত আমি প্রকাশ্যে দেখাতাম না; নিজের মধ্যেই রাখতাম। মায়ের জন্যে না হলেও দু’একবার আমি বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলাম। বলেছিলাম, ‘আপনার মেহমানদের কারণে আমার পড়ার ব্যাঘাত ঘটে।’ কারণ, কাছারিটা আমার পড়ার ঘরও ছিল কিনা। সম্প্রতি, আমার এক জ্ঞাতি ভাই আমাদের সঙ্গে থাকার আর স্কুলে পড়াশোনার জন্যে; সে আমার সহপাঠীও ছিল। প্রায় চার বছর সে আমাদের সঙ্গে ছিল।
ধীরে ধীরে দরবেশ ও সাধুদের ব্যাপারে বাবার উদার আমন্ত্রণ কমে এল। তবে একবার এক অতিথি আসাতে আমাকে আমার ক্রন্দনশীল অনুজ বোন ও ভাইয়ের কাছ থেকে নিষ্কৃতি লাভের একমাত্র আশ্রয়স্থল থেকে বিতাড়িত হয়েছিলাম। আসলে একজন দরবেশ আমার ঘরে বসে নামাজ-কালাম করতে পছন্দ করতেন; কিন্তু সবচাইতে যেটা খারাপ বিষয়, তিনি আমাকে একবার ধূমপান করতে বললেন, শুধু সিগারেট নয়, গাঁজাও (মারিজুয়ানা)।
বাউলরা এলে খোলা একটা ঘরে গান-বাদ্য করতেন। এক সাধু ছিলেন, তিনি শুধু তাঁর কল্কিতে দম দিতেন, কথাবার্তা তেমন বলতেন না; তাঁকে দেখতে অনেকটা হিন্দু সন্ন্যাসী আর মুসলিম দরবেশের একটি সংমিশ্রণ বলে মনে হতো। আমার জ্যেষ্ঠ জ্ঞাতি ভাইয়েরা এই বলে কানাকানি করতে যে তিনি আসলে একজন তান্ত্রিক পূজারি, এবং আমাদের বাড়ির অনতিদূরে নদীর ধারে হিন্দুদের শ্মশানে তাঁর যাতায়াত আছে। আমার ধারণা, ১৯৪৭-এর পর তিনি আমাদের বাড়িতে তেমন একটা আসতেন না আর। আরেক গাঁজাসেবী সন্ন্যাসীকেও বেশ রহস্যময় বলে মনে হতো। তিনি মুসলিম। তিনি হঠাৎ হঠাৎ উদয় হতেন, কয়েকদিন থাকতেন। আমার বাবা ধূমপান করতেন না; ধূমপানরত কারো সঙ্গ তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি জানতেন যে সাধুরা গাঁজা সেবন করতেন, তবে তাঁদের তিনি নিবৃত্ত করার তেমন একটা চেষ্টা করতেন না। দুয়েকটা রাত্রি যাপন করার জন্য আসতেন তাঁরা; সম্ভবত সেটাই ভাবতেন তিনি। সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারে আমার আগ্রহ ছিল না, যদিও নিয়ামত আলী ভাইয়ের সঙ্গে আমি গোপনে দুয়েকবার খেয়েছিলাম। আমার এই জ্যেষ্ঠ জ্ঞাতি ভাই আমাদের বাড়ির কাছেই থাকতেন।
আমার আগ্রহ ছিল সাধু লোকটি যে গাঁজা খেতেন সেই জিনিসটা নিয়ে। একবার তিনি আমাকে একটা টান দেবার জন্য আমাকে কল্কিটা সাধলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা আমি কখনো ভুলিনি। একবার টান দেবার পরেই আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল এবং আমি ভীষণভাবে কাশতে শুরু করলাম। আমি কল্কিটা তাঁকে ফিরিয়ে দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কেন তিনি এই ভয়ংকর জিনিসটা সেবন করেন? তাঁর ব্যাখ্যাটা সেদিন আমি বুঝতে পারিনি। তবে বেশ কিছুদিন পরে সেটার একটা ধারণা পেয়েছিলাম: আসলে তিনি গাঁজা খেতেন আধ্যাত্মিক তুরীয় ভাব অর্জন করার জন্য। মাঝে মাঝে আমার বাবা সেই সন্ন্যাসীকে বলতেন, ‘কল্কির ওপর ভর করে আপনি আপনার আধ্যাত্মিক গন্তব্যে যেতে পারবেন না!’
এটা অনুমান করতে আমার দেরি হয়নি যে, পরিচিত ক্যানাবিস-আসক্তরা ছাড়াও ধর্মীয় কৃত্যমূলক কাজকর্মের পরিসরের মধ্যে গাঁজাসেবন একটা সহনীয় অভ্যাসের মধ্যেই পড়ে, কিন্তু বাস্তবে যাই ঘটুক না কেন, ইসলামে তা অনুমোদিত নয়।
এগুলো সবই আমাদের বাড়িতে সেই রহস্যময় মানুষটির আবির্ভাবের অনেক আগের কথা। আমি মানুষটির কথা জানতে কৌতূহলী হয়ে উঠলাম: তিনি কি আরেক দরবেশ? আমার মনে হয়েছিল কোনো দরবেশ দেখলে আমি চিনতে পারব, কিন্তু এই অতিথি সম্পর্কে আমি জানবো কী করে? আমি তখন এত ছোটো যে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের কথা আমি কাউকে বলতে পারিনি। তাই নিজের মনেই সেকথা নাড়াচাড়া করতাম, যদিও অস্বস্তিটা মন থেকে যেত না। আর তাই, আমার বাবা আর লোকটি যখন বারান্দায় বসে কথা বলতেন তখন আমি আশে পাশে ঘুরঘুর করতাম। তবে আমি যে আমার মায়ের হয়ে গুপ্তচরগিরি করছি একথা কখনো বুঝতে দিতাম না। আলাপে মশগুল থাকা অবস্থাতেই বাবা দুয়েকবার আমাকে খেয়াল করেন—একবার তিনি কথা থামিয়ে বলে ওঠেন, ‘এঁকে চাচা বলো। সালাম দাও।’
বাবার কথামতো কাজ করলাম বটে, তবে ঘুরঘুর করাও বন্ধ করলাম না। তাঁরা কী নিয়ে কথা বলছেন তা যে আমি খুব একটা বুঝতে পেরেছেলাম তা নয়। তবে সেসব কথাবার্তার কয়েকটা অনুরণন আমার মনে দীর্ঘদিন থেকে গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘মাস্টার সাহেব, আমি আপনার মতো শিক্ষিত মানুষ না, তারপরেও, আমি আমি এলেম অর্জন করতে চাই। আমি আমার স্রষ্টা আল্লাহকে জানতে চাই।’ আমার বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিন্তু আমি কেন? আমি তো কেবল সুফিদের লেখাপত্র, আর তাঁদের জীবন ও কাজকর্ম সম্পর্কে পড়ে অনুপ্রাণিত একজন মানুষ ছাড়া বেশি কিছু নই। আমি সন্ন্যাসী না। আমি একজন সাধারণ মানুষ। শিক্ষকতা করে খাই এবং পরিবারের ভরণপোষণ করি। আমি কোনো পীর না, কোনো পীরের কাছে যাই-ও না। কোনো মুরিদও গ্রহণ করি না। আপনি বরং কোনো মৌলভীর কাছে গিয়ে কোরান-হাদিস শিক্ষা করুন। সেটাই ভালো হবে।’
এরপর বাবা আরো বললেন, ‘ধর্মীয় হেদায়েতের জন্য আমার মনে হয় আপনার কোনো পীরের কাছে যাওয়া দরকার।’ উত্তরে সেই চাচা বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি নামাজ পড়ি, মাঝে মাঝে কোরান তেলওয়াত করি, কিন্তু তারপরেও আমি আরো অনেক কিছু চাই। আধ্যাত্মিক বিষয়ে আমার একটা প্রবল আকুতি আছে, সেটা কেবল দৈনন্দিন নামাজ-কালামে মেটে না।‘ এই কথার সঙ্গে আমার সেই নবলব্ধ চাচা আরো কিছু কথা বাবাকে বললেন। চাচা বললেন, ‘আমি প্রায় নিরক্ষর। কিন্তু আমি মওলানা রুমি, খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি, নিজামউদ্দীন আউলিয়া এবং সাবেক কালের আরো অসংখ্য বড় বড় আধ্যাত্মিক নেতার কথা শুনেছি। আমার স্রষ্টা আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর জন্য তাঁরা কী কী বলেছেন আমি তা জানতে চাই। দয়া করে আপনি আমাকে আপনার বুকে টেনে নিন এবং নিজের আরেকজন ছাত্র হিসেবে বিবেচনা করুন, যে কিনা আপনার নিয়মিত ছাত্রদের চাইতে বয়সে অনেক বড়্।’
আমার বাবা চুপ করে তাঁর কথা শুনলেন। বহু বছর পর, আমি যখন সুফিবাদ নিয়ে কিছু পড়াশোনা করি এবং বাংলাদেশ, ভারত ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি বিখ্যাত সুফি মাজার দেখতে যাই, তখন মরমীবাদ সম্পর্কে আমার বাবার আগ্রহের কথা আমার মনে পড়েছিল। তবে তিনি কিন্তু কখনোই নিজেকে একজন বিজ্ঞ সুফি, দরবেশ বা পীর বলে দাবি করেননি। এবং আমি আমার সেই চাচাকে চার বছর ধরে জানার সময় তাঁর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের যতটা কদর করতে পেরেছিলাম, স্মৃতির গভীরে গিয়ে বরং তার চাইতে বেশি করতে পেরেছিলাম। আমার মনে হয় সেই ঐশী আকুতির পেছনে কোনো বস্তুগত উদ্দেশ্য বা অনুপ্রেরণা ছিল না।
রাজু চাচার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাটি এখনো আমার স্মৃতির সরণিতে বিচরণ করে বেড়ায়। সেই সন্ধিক্ষণে আমার মনে এই প্রশ্ন এসেছিল যে তিনি কী চান? টাকা-কড়ি? আমি জানতাম আমার বাবার দান করার মতো তেমন সংগতি নেই। যদিও আমার মা বলেছিলেন, মাঝে মাঝে বাবা তাঁর উলের শালটিও দান করে দিয়ে শীতকালটা পার করে দিতেন।
সন্তানরা জন্ম নেবার পর দান-দক্ষিণা করার মতো সামর্থ্য তাঁর তেমন একটা ছিল না। তবে, মুসাফির অতিথিদের খাওয়ানোকে তাঁর সেই পরোপকারপ্রবণতার অবশেষ বলা যেতে পারে। সুফিবাদে বিশ্বাসীরা পার্থিব ধনসম্পদ ও আরাম আয়েশের ততটা পরোয়া করতেন না। নিজেদের সংস্থান, তা সে যতই সামান্য হোক—অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েই তাঁরা স্বর্গীয় আনন্দ লাভ করতেন। আমার মা যদিও দয়ালু ছিলেন এবং কখনোই কারো প্রতি ঈর্ষান্বিত হতেন না। তারপরেও তিনি চিন্তায় থাকতেন, পরিবারের ভবিষ্যতের ব্যাপারে বাবার আরো বেশি মনোযোগ দেয়া উচিৎ। বেশিরভাগ সময়েই তিনি সনাতন স্ত্রীদের মতো স্বামীর আধ্যাত্মিক প্রবণতাটিকে প্রসন্ন চিত্তে সমর্থন দিয়ে গেছেন। তারপরেও, সংসারের জন্য তাঁর উদ্বেগ ছিল যৌক্তিক।
জেমস ফাডিম্যান ও রবার্ট ফ্রেজার সম্পাদিত এবং ১৯৯৮ সালে নিউ জার্সির ক্যাসল বুক থেকে প্রকাশিত এসেনশ্যল সুফিজম নামের একটি বইয়ের ডাস্ট কাভারে আবু সাঈদ ইবনে আবি খায়ের-এর একটি কথা উ-দ্ধৃত ছিল যেটা বহু বছর আগেই আমার নজর কেড়েছিল: ‘তোমার মনে যা কিছুই থাক, সেসব ভুলে যাও। তোমার হাতে যা কিছুই থাক, দিয়ে দাও। তোমার নিয়তিতে যা কিছু আছে তার মুখোমুখি হও।’ জানি না আমার বাবা এই উক্তিটির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন কিনা, কিন্তু তাঁর সামান্য সঙ্গতি থেকে করা দান উদ্ধৃত কথাটার মধ্যেকার আকুতি বহন করে।
বাবা আমাদেরকে বলেছিলেন, ভবঘুরে যোগী বা তপস্বীদের ঐতিহ্যটি খুব সম্ভবত বাংলার প্রাক বৌদ্ধ যুগের ভ্রাম্যমাণ সন্ন্যাসীদের সময় থেকে শুরু হয়েছিল। তিনি আরো বলেছিলেন, স্থানান্তরে সফররত দরবেশদের ঐতিহ্যটিও উত্তর ভারতের কালান্দারি সুফিদের একটি ঐতিহ্য। আমিও পড়েছিলাম যে তথাকথিত মাদারি সুফিরা এই ভ্রাম্যমাণ সুফি-দরবেশদের অন্তর্ভুক্ত। স্কুলে পড়ার সময় আমি তাঁদের কয়েকজনকে দেখেছিলাম। তারপরেও, তখন আমি তাঁদেরকে অন্য চোখে দেখতাম: সংসারের দায়ভার বহনে অনিচ্ছুক পলায়নবাদী ছাড়া তেমন কিছু মনে হতো না। ভাবতাম, তাঁরা কি আসলেই ঐশী পথের সন্ধানী? তাঁরা কি পরিবার থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন? ছোটবেলায় আমি হাট-বাজার, রেলস্টেশন আর স্টিমার ঘাটে সাধু-সন্নাসী ও মরমী-গায়কদের ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। পরিবারের লোকজনের মুখে শুনেছি যে আমার দাদা নদীকূলে জড়ো হওয়া এ ধরনের ভ্রাম্যমাণ চরিত্রদের লক্ষ করতেন, কখনো কখনো তাঁদের সঙ্গে কথাও বলতেন। তবে তিনি তাঁদের বাড়িতে ডেকে আনতেন না।
এসব ভবঘুরে সাধু ও দরবেশ এবং তাঁদের আচার-আচরণ সবসময়ই যে কঠোরভাবে বিশেষ একটি ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকত এমন নয়। এই যেমন, তাঁরা হিন্দু, মুসলমান, বৈষ্ণব, বাউল—এরকম আরো নানা ধরনের হতেন। তাঁদের বেশিরভাগই এমন কিছু সমন্বয়পন্থী কৃত্যের কথা প্রচার করতেন যা শুনে কেউ কেউ ভ্রুকুটি করতেন বটে, কিন্তু সে সময়ে তাঁরা সহিংস আক্রমণের শিকার হতেন না। তাঁদেরকে বেশির ভাগ আচারনিষ্ঠ মুসলমান্ হীন চোখে দেখতেন এবং সনাতনি হিন্দুদেরও তাঁদের ব্যাপারে সন্দেহ ছিল। তবে এই ধরনের ভ্রাম্যমাণ ব্যক্তিরা মুসলমান ও হিন্দু দুই সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই সংস্কৃতিবান এবং সম্মানিত বলে গণ্য হতেন। আমার বাবা সম্ভবত মানবিকতার খাতিরে তাঁদের অল্প কিছুদিনের জন্য থাকতে দিতেন, আমার ধারণা সেটা ছিল এক ধরনের আধ্যাত্মিক সেবা।
একটি ছোট গ্রামে বাবা তাঁদের যা দিতেন তা ছিল আধুনিক যুগের আগ পর্যন্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বব্যাপী সুফি আতিথেয়তার ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন। তিনি মনে করতেন, খোদ জীবনের মধ্যেই মুসাফিরসুলভ একটা ব্যাপার আছে, তা যেন এক ভ্রাম্যমাণ পর্যটক। এবং এ ধরনের ভ্রামণিকদের অস্থায়ী আশ্রয় ও খাবার দাবারের বন্দোবস্ত করে সাহায্য করা মানুষের একটা নৈতিক কর্তব্য। মাঝেমধ্যে তিনি নিজেকে মরজগতে অস্থায়ীভাবে বাস করা একজন মুসাফির হিসেবে দেখতেন। পরবর্তী জীবনে, কাজাকাস্থান ও উজবেকিস্থানের কিছু সুফি মাজার ভ্রমণ করার পর আমার মনে হয়েছিল, বাবা হয়তো আমাদের কাছারিঘরকে তাঁর খানকা হিসেবে মনে করতেন। (খানকা হচ্ছে আধ্যাত্মিক সমাবেশ করার একটা স্থান যেখানে ধর্মীয় গানবাদ্য আর জিকির–অর্থাৎ এক ধরনের ভক্তি নিবেদন করা হয়, আল্লাহর নাম ও তাঁর গুণাবলির কথা ছন্দের তালে তালে উচ্চারণ করার মাধ্যমে।) মাঝে মধ্যে সেই ঘরে এ ধরনের চর্চা হতো।
আমার এক জ্ঞাতি ভাই এবং আমি সেই ঘরটাকে আমাদের নিয়মিত থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতাম। সপ্তাহান্তে সেখানে আরো কয়েকজন ছাত্র এসে জড়ো হতো। আবার বাবা তাঁর আয় খানিকটা বাড়াবার জন্য তাঁদের পড়াতেন। সেই ঘরে আমাদের তেমন একটা ব্যক্তিগত পরিসর ছিল না। তখনও সেটা মাঝে মধ্যে বেড়াতে আসা বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনদের অতিথিশালা ছিল। আমার জ্ঞাতি ভাই একটা পৃথক বিছানা করত, সেটা সে অতিথিদের ব্যবহার করতে দিত না। প্রাইভেট টিউশনের জন্যে আসা এসব ছাত্রের বেশিরভাগের কাছেই টাকা-কড়ি তেমন থাকত না। জেলে পরিবারের ছেলেরা মাঝে মধ্যে বড়সড় কোনো মাছ নিয়ে আসত। গরীব চাষীর ছেলেরা কখনো-সখনো টাটকা শাক-সবজি আর ফলমূল আনত। শুধু দুয়েকজন হিন্দু ছেলে মাসের শেষে নগদ টাকা দিত। বাজারে তাঁদের বাবাদের দোকান ছিল।
যাই হোক, এসব ছাত্রের বেশিরভাগই ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর ‘নাই’ হয়ে গেল। আর তাছাড়া, কাছারি ঘরটাতে পালকবিশিষ্ট এক ঝাঁক বাসিন্দা এসে ভরে গেল। তাঁরা সেখানে স্থায়ীভাবে রয়ে গেল্—সেগুলো ছিল একদল জালালি কবুতর। বিশ্বাস করা হতো, বাংলা ও আসামে ইসলামের বাণী নিয়ে আসা ১৪শ শতকের এক বুজুর্গ মুসলমান ধর্মপ্রচারক হযরত শাহজালাল সেগুলো সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। সিলেটে তাঁর মাজারকে বাংলাদেশে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয়। সেই পাখিগুলো ছিল আমার বাবার বিশেষ মেহমান: তাদের পুরীষ সারা অঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত, কিন্তু তারপরেও আমাদের বাড়িতে কেউ তাদেরকে তাদের বাসা থেকে তাড়িয়ে দিতে পারত না।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কেউ সেসব কবুতর বা তাদের বাচ্চা খাওয়ার জন্য জবাই করতে পারত না। আমার বাবা এবং গ্রামবাসীর অনেকেই একথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে পাখিগুলোকে কেউ মারলে তার বিরাট ক্ষতি হবে। ফের রাজু চাচার কথায় আসা যাক।

এক শেষ বিকেলের কথা মনে পড়ে আমার। খুব সম্ভবত ডিসেম্বর মাস তখন; ফসল কাটার মরশুম কার্যত শেষ। কেটে নেয়া ধানগাছের অবশিষ্টাংশে মুখ লাগিয়ে বেড়ানো একপাল ছাগল আর বেশ কিছু গরু ছাড়া ধূসর ফসলের মাঠগুলো খালিই একরকম। এক ঝাঁক সাদা বক ফসল কাটার মরশুম শেষ হতে না হতেই ধানখেতের ভেজা ফাটলে আশ্রয় নেয়া ব্যাঙগুলো দিয়ে উদরপূর্তি করছে।
বিকেল আর সন্ধ্যার মাঝের সময়টা চমৎকার ঠান্ডা। গ্রামবাংলায় শীত এসে পড়েছে, আর নিঃসঙ্গ পথচারীরা—তাঁদের দু’একজনের গলায় গরম কাপড় জড়ানো—ধানখেতের আঁকাবাঁকা আলপথ ধরে ধীর পায়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। খোলা প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে সেই নদীর বাতাসে ভেসে আসা গন্ধটির কথা খুব করে মনে পড়ল, যে গন্ধ বা ঘ্রাণ ফসল কাটার বিরতির আগে সোনালী ধানগাছগুলোর ওপর দিয়ে বয়ে যায়। বরষার শেষে খণ্ড খণ্ড সাদা মেঘ ঘন নীল আকাশের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে, যদিও বাতাসের খানিকটা ঠান্ডাভাব ছাড়া প্রকৃতির দিকে আমি ততটা খেয়াল করছিলাম না। সেই ঋতুকে ঘিরে ফসল কাটা পরবর্তী চমৎকার সময়টা গ্রাম-বাংলার লোকজন বেশ উপভোগ করছিল। ভয়ানক গরম ও আর্দ্রতা তখন বিদায় নেয়াতে—যদিও বেশিদিনের জন্য নয়—পরিবারের লোকজন, বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনেরা মিলে নতুন ধানের চাল দিয়ে বানানো মজার মজার খাবার খাচ্ছিল।
এরই মধ্যে হঠাৎ করে যেন একেবারে শূন্য থেকে, আমার সামনে এক মধ্যবয়েসী মানুষ উদয় হয়ে আমার বাবার কথা জানতে চাইলেন। তিনি আমার নিঃসঙ্গতার আবেশটা ভেঙে দিলেন।
নিজের সঙ্গে আমি আমার বাবা-মা, আমার ছোট ভাই-বোনসংক্রান্ত হতাশার যেসব একঘেয়ে বিষয় নিয়ে কথা বলছিলাম, তিনি তাতেও বাগড়া দিলেন। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন তিনি বাবার খোঁজ করছেন? মনে হলো, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক বালকের প্রচ্ছন্ন ঔদ্ধত্যে তিনি খানিকটা আহত বোধ করলেন। তারপরেও ভদ্রতা বজায় রেখে বললেন, ‘বাবা, তুমি বুঝবে না। আমি তোমার বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাই; এটা একটা ব্যক্তিগত বিষয়, আর বড়দের ব্যাপার।’
বেড়াতে আসা আত্মীয়-স্বজন, ও গুটিকতেক প্রতিবেশী যারা পরনিন্দা-পরচর্চা করে, অলস গুলতানি মেরে, আর চলতি ঘটনাবলি, ধর্ম ও ইতিহাসের টুকরো-টাকরা নিয়ে কাছারি ঘরে আড্ডা জমাতে আসতেন—তারা ছাড়া আরো দু’ধরনের মানুষ আমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে আসতেন: হয় তাঁর ছাত্ররা, আর নয়তো তাঁর ছাত্রদের বাবা-মায়েরা, এবং আরেক ধরনের অতিথি, যাঁরা আমার মায়ের খুব একটা পছন্দের ছিলেন না—এক রাত বা আরো বেশি সময়ের জন্য থাকতে আসা কোনো মুসাফির বা আশ্রয়প্রার্থী পথিক। অবশ্যই, তাঁদের বেশিরভাগই ছিলেন অনামন্ত্রিত।
এ ধরনের মুসাফিরদের মধ্যে ছিলেন দরবেশ ও সাধু বা বাউল। আমি তাঁদের দেখলেই চিনতে পারতাম। বেশিরভাগেরই লম্বা চুল-দাড়ি আর রুদ্রাক্ষের মালা থাকত। একবার এক সুফি ফকির গভীর রাতে বিরাট একটা লন্ঠন হাতে এসে হাজির হলে আমাদেরকে বিছানা ছেড়ে উঠে তাঁর থাকার বন্দোবস্ত করে দিতে হয়েছিল। তাঁর গলায় ছিল লাল টকটকে একটা মাফলার আর হাতে বড় একটা বাঁশের লাঠি। মাঝে মাঝে কপালে তিলকচিহ্নিত দু’একজন সন্ন্যাসী রাতে থাকার জন্য আসতেন; সেসব আগন্তুকের কারো কারো সঙ্গে লোকসংগীত গাওয়ার বাদ্যযন্ত্র থাকত। কিন্তু এই ভদ্রলোকের কাছে সেগুলোর কিছু্ই ছিল না। আমার কৌতূহল হলো: কে ইনি? আমি ভাবলাম, ইনি নিশ্চয়ই আমার বাবার ফেল করা ছাত্রের বাবা হবেন।
অনীহা সত্ত্বেও আমি তাঁকে বারান্দার কাঠের বেঞ্চে বসাই, এবং তারপর বাড়ির ভেতর চলে যাই। বাবা তখনো নামাজ পড়ছিলেন, লম্বা সময় নিয়ে নামাজ পড়তেন তিনি। তাই আমি মাকে বললাম, ‘একজন লোক এসেছেন বাবার সঙ্গে দেখা করতে।’ আমি কথাটা শেষ করতে না করতেই মার ত্বরিত প্রশ্ন, ‘কেমন লোক?’ উত্তরের অপেক্ষা না করেই তিনি ফের জানতে চাইলেন, ‘আরেক মুসাফির নাকি?’ খানিকটা বিরক্ত হয়ে আমি বললাম, ‘আমি কী করে জানব? তিনি ফকির না, সাধু না, বাউলও না। সাধারণ একজন লোক বলেই মনে হলো, মা।’ আমি তাঁকে আশ্বস্ত করার জন্য বললাম। মা বলে উঠলেন, ‘আচ্ছা!’ আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না আমার কথায় তিনি এটা ভেবে স্বস্তি পেলেন যে তাঁকে বাড়তি একজন বা দু’জনের জন্যে রাঁধতে হচ্ছে না। বাবার নামাজ শেষ হলে মা তাঁকে বললেন, ‘আপনার সঙ্গে দেখা করতে একজন লোক এসেছেন। আশা করি তিনি আপনার ওইসব ফকির বা দরবেশদের কেউ না।’ মাকে তেমন কিছু না বলে বাবা কাছারি ঘরের দিকে এগোলেন।
মা কিন্তু তখনো পুরাপুরি আশ্বস্ত হননি। তিনি আমাকে বললেন, আমি গিয়ে যেন দেখে আসি আগন্তুক দু-এক রাত থাকতে চান কিনা। আমি মায়ের আশঙ্কার কারণটা জানতাম। আমাদের কাছারিঘরটাকে লোকজন গাঁয়ের পান্থনিবাস বলত। সে সময় বাংলাদেশের গ্রামে কোনো হোটেল বা মোটেল ছিল না: সফরকারীরা মানুষজনের বাড়িতে থাকত। তারপরেও, রাতে বিনে পয়সায় থাকতে দিত এমন মানুষজন কমই ছিল। তবে আমার বাবা আমাদের কাছারি ঘরে লোকজনকে আশ্রয় দিতে পছন্দ করতেন এবং গ্রামের লোকেরা সেকথা জানত। কাজেই যখনই কোনো আগন্তুক রাতে থাকার জায়গা খুঁজত, তাঁরা স্বভাববশতই বলত, ‘মাস্টার সাহেবের বাড়ি যাও।’ আর তাঁরা সেখানেই আসত। আর তখন আমার মায়ের কাজ হতো বাড়ির খেয়ালি গৃহপরিচারিকা মকবুলের মাকে সেই অতিথির জন্য রাঁধতে ঠেলাঠেলি করা।
মাঝে মাঝে আগন্তুকেরা সঙ্গী-সাথী নিয়ে আসতেন—গায়ক, আর মারফতি গানের লোকজন। আর, এর অর্থ একগাদা লোকের জন্য রান্না করা! আমি এগুলো সবই জানতাম, আর তাই আমার মায়ের জন্য আমার সহানুভূতি ছিল, এবং আমার ভালো লাগত না এই আগন্তুকদের উৎপাত। কারণ, এগুলো ছিল মায়ের জন্য বাড়তি কাজ। কিন্তু আমার মায়ের প্রতি আমার এই পক্ষপাত আমি প্রকাশ্যে দেখাতাম না; নিজের মধ্যেই রাখতাম। মায়ের জন্যে না হলেও দু’একবার আমি বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলাম। বলেছিলাম, ‘আপনার মেহমানদের কারণে আমার পড়ার ব্যাঘাত ঘটে।’ কারণ, কাছারিটা আমার পড়ার ঘরও ছিল কিনা। সম্প্রতি, আমার এক জ্ঞাতি ভাই আমাদের সঙ্গে থাকার আর স্কুলে পড়াশোনার জন্যে; সে আমার সহপাঠীও ছিল। প্রায় চার বছর সে আমাদের সঙ্গে ছিল।
ধীরে ধীরে দরবেশ ও সাধুদের ব্যাপারে বাবার উদার আমন্ত্রণ কমে এল। তবে একবার এক অতিথি আসাতে আমাকে আমার ক্রন্দনশীল অনুজ বোন ও ভাইয়ের কাছ থেকে নিষ্কৃতি লাভের একমাত্র আশ্রয়স্থল থেকে বিতাড়িত হয়েছিলাম। আসলে একজন দরবেশ আমার ঘরে বসে নামাজ-কালাম করতে পছন্দ করতেন; কিন্তু সবচাইতে যেটা খারাপ বিষয়, তিনি আমাকে একবার ধূমপান করতে বললেন, শুধু সিগারেট নয়, গাঁজাও (মারিজুয়ানা)।
বাউলরা এলে খোলা একটা ঘরে গান-বাদ্য করতেন। এক সাধু ছিলেন, তিনি শুধু তাঁর কল্কিতে দম দিতেন, কথাবার্তা তেমন বলতেন না; তাঁকে দেখতে অনেকটা হিন্দু সন্ন্যাসী আর মুসলিম দরবেশের একটি সংমিশ্রণ বলে মনে হতো। আমার জ্যেষ্ঠ জ্ঞাতি ভাইয়েরা এই বলে কানাকানি করতে যে তিনি আসলে একজন তান্ত্রিক পূজারি, এবং আমাদের বাড়ির অনতিদূরে নদীর ধারে হিন্দুদের শ্মশানে তাঁর যাতায়াত আছে। আমার ধারণা, ১৯৪৭-এর পর তিনি আমাদের বাড়িতে তেমন একটা আসতেন না আর। আরেক গাঁজাসেবী সন্ন্যাসীকেও বেশ রহস্যময় বলে মনে হতো। তিনি মুসলিম। তিনি হঠাৎ হঠাৎ উদয় হতেন, কয়েকদিন থাকতেন। আমার বাবা ধূমপান করতেন না; ধূমপানরত কারো সঙ্গ তিনি পছন্দ করতেন না। তিনি জানতেন যে সাধুরা গাঁজা সেবন করতেন, তবে তাঁদের তিনি নিবৃত্ত করার তেমন একটা চেষ্টা করতেন না। দুয়েকটা রাত্রি যাপন করার জন্য আসতেন তাঁরা; সম্ভবত সেটাই ভাবতেন তিনি। সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারে আমার আগ্রহ ছিল না, যদিও নিয়ামত আলী ভাইয়ের সঙ্গে আমি গোপনে দুয়েকবার খেয়েছিলাম। আমার এই জ্যেষ্ঠ জ্ঞাতি ভাই আমাদের বাড়ির কাছেই থাকতেন।
আমার আগ্রহ ছিল সাধু লোকটি যে গাঁজা খেতেন সেই জিনিসটা নিয়ে। একবার তিনি আমাকে একটা টান দেবার জন্য আমাকে কল্কিটা সাধলেন। সেই অভিজ্ঞতার কথা আমি কখনো ভুলিনি। একবার টান দেবার পরেই আমার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল এবং আমি ভীষণভাবে কাশতে শুরু করলাম। আমি কল্কিটা তাঁকে ফিরিয়ে দিলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কেন তিনি এই ভয়ংকর জিনিসটা সেবন করেন? তাঁর ব্যাখ্যাটা সেদিন আমি বুঝতে পারিনি। তবে বেশ কিছুদিন পরে সেটার একটা ধারণা পেয়েছিলাম: আসলে তিনি গাঁজা খেতেন আধ্যাত্মিক তুরীয় ভাব অর্জন করার জন্য। মাঝে মাঝে আমার বাবা সেই সন্ন্যাসীকে বলতেন, ‘কল্কির ওপর ভর করে আপনি আপনার আধ্যাত্মিক গন্তব্যে যেতে পারবেন না!’
এটা অনুমান করতে আমার দেরি হয়নি যে, পরিচিত ক্যানাবিস-আসক্তরা ছাড়াও ধর্মীয় কৃত্যমূলক কাজকর্মের পরিসরের মধ্যে গাঁজাসেবন একটা সহনীয় অভ্যাসের মধ্যেই পড়ে, কিন্তু বাস্তবে যাই ঘটুক না কেন, ইসলামে তা অনুমোদিত নয়।
এগুলো সবই আমাদের বাড়িতে সেই রহস্যময় মানুষটির আবির্ভাবের অনেক আগের কথা। আমি মানুষটির কথা জানতে কৌতূহলী হয়ে উঠলাম: তিনি কি আরেক দরবেশ? আমার মনে হয়েছিল কোনো দরবেশ দেখলে আমি চিনতে পারব, কিন্তু এই অতিথি সম্পর্কে আমি জানবো কী করে? আমি তখন এত ছোটো যে এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহের কথা আমি কাউকে বলতে পারিনি। তাই নিজের মনেই সেকথা নাড়াচাড়া করতাম, যদিও অস্বস্তিটা মন থেকে যেত না। আর তাই, আমার বাবা আর লোকটি যখন বারান্দায় বসে কথা বলতেন তখন আমি আশে পাশে ঘুরঘুর করতাম। তবে আমি যে আমার মায়ের হয়ে গুপ্তচরগিরি করছি একথা কখনো বুঝতে দিতাম না। আলাপে মশগুল থাকা অবস্থাতেই বাবা দুয়েকবার আমাকে খেয়াল করেন—একবার তিনি কথা থামিয়ে বলে ওঠেন, ‘এঁকে চাচা বলো। সালাম দাও।’
বাবার কথামতো কাজ করলাম বটে, তবে ঘুরঘুর করাও বন্ধ করলাম না। তাঁরা কী নিয়ে কথা বলছেন তা যে আমি খুব একটা বুঝতে পেরেছেলাম তা নয়। তবে সেসব কথাবার্তার কয়েকটা অনুরণন আমার মনে দীর্ঘদিন থেকে গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘মাস্টার সাহেব, আমি আপনার মতো শিক্ষিত মানুষ না, তারপরেও, আমি আমি এলেম অর্জন করতে চাই। আমি আমার স্রষ্টা আল্লাহকে জানতে চাই।’ আমার বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিন্তু আমি কেন? আমি তো কেবল সুফিদের লেখাপত্র, আর তাঁদের জীবন ও কাজকর্ম সম্পর্কে পড়ে অনুপ্রাণিত একজন মানুষ ছাড়া বেশি কিছু নই। আমি সন্ন্যাসী না। আমি একজন সাধারণ মানুষ। শিক্ষকতা করে খাই এবং পরিবারের ভরণপোষণ করি। আমি কোনো পীর না, কোনো পীরের কাছে যাই-ও না। কোনো মুরিদও গ্রহণ করি না। আপনি বরং কোনো মৌলভীর কাছে গিয়ে কোরান-হাদিস শিক্ষা করুন। সেটাই ভালো হবে।’
এরপর বাবা আরো বললেন, ‘ধর্মীয় হেদায়েতের জন্য আমার মনে হয় আপনার কোনো পীরের কাছে যাওয়া দরকার।’ উত্তরে সেই চাচা বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি নামাজ পড়ি, মাঝে মাঝে কোরান তেলওয়াত করি, কিন্তু তারপরেও আমি আরো অনেক কিছু চাই। আধ্যাত্মিক বিষয়ে আমার একটা প্রবল আকুতি আছে, সেটা কেবল দৈনন্দিন নামাজ-কালামে মেটে না।‘ এই কথার সঙ্গে আমার সেই নবলব্ধ চাচা আরো কিছু কথা বাবাকে বললেন। চাচা বললেন, ‘আমি প্রায় নিরক্ষর। কিন্তু আমি মওলানা রুমি, খাজা মঈনুদ্দীন চিশতি, নিজামউদ্দীন আউলিয়া এবং সাবেক কালের আরো অসংখ্য বড় বড় আধ্যাত্মিক নেতার কথা শুনেছি। আমার স্রষ্টা আল্লাহর কাছে পৌঁছানোর জন্য তাঁরা কী কী বলেছেন আমি তা জানতে চাই। দয়া করে আপনি আমাকে আপনার বুকে টেনে নিন এবং নিজের আরেকজন ছাত্র হিসেবে বিবেচনা করুন, যে কিনা আপনার নিয়মিত ছাত্রদের চাইতে বয়সে অনেক বড়্।’
আমার বাবা চুপ করে তাঁর কথা শুনলেন। বহু বছর পর, আমি যখন সুফিবাদ নিয়ে কিছু পড়াশোনা করি এবং বাংলাদেশ, ভারত ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি বিখ্যাত সুফি মাজার দেখতে যাই, তখন মরমীবাদ সম্পর্কে আমার বাবার আগ্রহের কথা আমার মনে পড়েছিল। তবে তিনি কিন্তু কখনোই নিজেকে একজন বিজ্ঞ সুফি, দরবেশ বা পীর বলে দাবি করেননি। এবং আমি আমার সেই চাচাকে চার বছর ধরে জানার সময় তাঁর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের যতটা কদর করতে পেরেছিলাম, স্মৃতির গভীরে গিয়ে বরং তার চাইতে বেশি করতে পেরেছিলাম। আমার মনে হয় সেই ঐশী আকুতির পেছনে কোনো বস্তুগত উদ্দেশ্য বা অনুপ্রেরণা ছিল না।
রাজু চাচার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতের ঘটনাটি এখনো আমার স্মৃতির সরণিতে বিচরণ করে বেড়ায়। সেই সন্ধিক্ষণে আমার মনে এই প্রশ্ন এসেছিল যে তিনি কী চান? টাকা-কড়ি? আমি জানতাম আমার বাবার দান করার মতো তেমন সংগতি নেই। যদিও আমার মা বলেছিলেন, মাঝে মাঝে বাবা তাঁর উলের শালটিও দান করে দিয়ে শীতকালটা পার করে দিতেন।
সন্তানরা জন্ম নেবার পর দান-দক্ষিণা করার মতো সামর্থ্য তাঁর তেমন একটা ছিল না। তবে, মুসাফির অতিথিদের খাওয়ানোকে তাঁর সেই পরোপকারপ্রবণতার অবশেষ বলা যেতে পারে। সুফিবাদে বিশ্বাসীরা পার্থিব ধনসম্পদ ও আরাম আয়েশের ততটা পরোয়া করতেন না। নিজেদের সংস্থান, তা সে যতই সামান্য হোক—অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েই তাঁরা স্বর্গীয় আনন্দ লাভ করতেন। আমার মা যদিও দয়ালু ছিলেন এবং কখনোই কারো প্রতি ঈর্ষান্বিত হতেন না। তারপরেও তিনি চিন্তায় থাকতেন, পরিবারের ভবিষ্যতের ব্যাপারে বাবার আরো বেশি মনোযোগ দেয়া উচিৎ। বেশিরভাগ সময়েই তিনি সনাতন স্ত্রীদের মতো স্বামীর আধ্যাত্মিক প্রবণতাটিকে প্রসন্ন চিত্তে সমর্থন দিয়ে গেছেন। তারপরেও, সংসারের জন্য তাঁর উদ্বেগ ছিল যৌক্তিক।
জেমস ফাডিম্যান ও রবার্ট ফ্রেজার সম্পাদিত এবং ১৯৯৮ সালে নিউ জার্সির ক্যাসল বুক থেকে প্রকাশিত এসেনশ্যল সুফিজম নামের একটি বইয়ের ডাস্ট কাভারে আবু সাঈদ ইবনে আবি খায়ের-এর একটি কথা উ-দ্ধৃত ছিল যেটা বহু বছর আগেই আমার নজর কেড়েছিল: ‘তোমার মনে যা কিছুই থাক, সেসব ভুলে যাও। তোমার হাতে যা কিছুই থাক, দিয়ে দাও। তোমার নিয়তিতে যা কিছু আছে তার মুখোমুখি হও।’ জানি না আমার বাবা এই উক্তিটির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন কিনা, কিন্তু তাঁর সামান্য সঙ্গতি থেকে করা দান উদ্ধৃত কথাটার মধ্যেকার আকুতি বহন করে।
বাবা আমাদেরকে বলেছিলেন, ভবঘুরে যোগী বা তপস্বীদের ঐতিহ্যটি খুব সম্ভবত বাংলার প্রাক বৌদ্ধ যুগের ভ্রাম্যমাণ সন্ন্যাসীদের সময় থেকে শুরু হয়েছিল। তিনি আরো বলেছিলেন, স্থানান্তরে সফররত দরবেশদের ঐতিহ্যটিও উত্তর ভারতের কালান্দারি সুফিদের একটি ঐতিহ্য। আমিও পড়েছিলাম যে তথাকথিত মাদারি সুফিরা এই ভ্রাম্যমাণ সুফি-দরবেশদের অন্তর্ভুক্ত। স্কুলে পড়ার সময় আমি তাঁদের কয়েকজনকে দেখেছিলাম। তারপরেও, তখন আমি তাঁদেরকে অন্য চোখে দেখতাম: সংসারের দায়ভার বহনে অনিচ্ছুক পলায়নবাদী ছাড়া তেমন কিছু মনে হতো না। ভাবতাম, তাঁরা কি আসলেই ঐশী পথের সন্ধানী? তাঁরা কি পরিবার থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন? ছোটবেলায় আমি হাট-বাজার, রেলস্টেশন আর স্টিমার ঘাটে সাধু-সন্নাসী ও মরমী-গায়কদের ঘুরে বেড়াতে দেখেছি। পরিবারের লোকজনের মুখে শুনেছি যে আমার দাদা নদীকূলে জড়ো হওয়া এ ধরনের ভ্রাম্যমাণ চরিত্রদের লক্ষ করতেন, কখনো কখনো তাঁদের সঙ্গে কথাও বলতেন। তবে তিনি তাঁদের বাড়িতে ডেকে আনতেন না।
এসব ভবঘুরে সাধু ও দরবেশ এবং তাঁদের আচার-আচরণ সবসময়ই যে কঠোরভাবে বিশেষ একটি ধর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকত এমন নয়। এই যেমন, তাঁরা হিন্দু, মুসলমান, বৈষ্ণব, বাউল—এরকম আরো নানা ধরনের হতেন। তাঁদের বেশিরভাগই এমন কিছু সমন্বয়পন্থী কৃত্যের কথা প্রচার করতেন যা শুনে কেউ কেউ ভ্রুকুটি করতেন বটে, কিন্তু সে সময়ে তাঁরা সহিংস আক্রমণের শিকার হতেন না। তাঁদেরকে বেশির ভাগ আচারনিষ্ঠ মুসলমান্ হীন চোখে দেখতেন এবং সনাতনি হিন্দুদেরও তাঁদের ব্যাপারে সন্দেহ ছিল। তবে এই ধরনের ভ্রাম্যমাণ ব্যক্তিরা মুসলমান ও হিন্দু দুই সম্প্রদায়ের মানুষের কাছেই সংস্কৃতিবান এবং সম্মানিত বলে গণ্য হতেন। আমার বাবা সম্ভবত মানবিকতার খাতিরে তাঁদের অল্প কিছুদিনের জন্য থাকতে দিতেন, আমার ধারণা সেটা ছিল এক ধরনের আধ্যাত্মিক সেবা।
একটি ছোট গ্রামে বাবা তাঁদের যা দিতেন তা ছিল আধুনিক যুগের আগ পর্যন্ত শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে দক্ষিণ এশিয়ার সর্বব্যাপী সুফি আতিথেয়তার ঐতিহ্যেরই প্রতিফলন। তিনি মনে করতেন, খোদ জীবনের মধ্যেই মুসাফিরসুলভ একটা ব্যাপার আছে, তা যেন এক ভ্রাম্যমাণ পর্যটক। এবং এ ধরনের ভ্রামণিকদের অস্থায়ী আশ্রয় ও খাবার দাবারের বন্দোবস্ত করে সাহায্য করা মানুষের একটা নৈতিক কর্তব্য। মাঝেমধ্যে তিনি নিজেকে মরজগতে অস্থায়ীভাবে বাস করা একজন মুসাফির হিসেবে দেখতেন। পরবর্তী জীবনে, কাজাকাস্থান ও উজবেকিস্থানের কিছু সুফি মাজার ভ্রমণ করার পর আমার মনে হয়েছিল, বাবা হয়তো আমাদের কাছারিঘরকে তাঁর খানকা হিসেবে মনে করতেন। (খানকা হচ্ছে আধ্যাত্মিক সমাবেশ করার একটা স্থান যেখানে ধর্মীয় গানবাদ্য আর জিকির–অর্থাৎ এক ধরনের ভক্তি নিবেদন করা হয়, আল্লাহর নাম ও তাঁর গুণাবলির কথা ছন্দের তালে তালে উচ্চারণ করার মাধ্যমে।) মাঝে মধ্যে সেই ঘরে এ ধরনের চর্চা হতো।
আমার এক জ্ঞাতি ভাই এবং আমি সেই ঘরটাকে আমাদের নিয়মিত থাকার জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতাম। সপ্তাহান্তে সেখানে আরো কয়েকজন ছাত্র এসে জড়ো হতো। আবার বাবা তাঁর আয় খানিকটা বাড়াবার জন্য তাঁদের পড়াতেন। সেই ঘরে আমাদের তেমন একটা ব্যক্তিগত পরিসর ছিল না। তখনও সেটা মাঝে মধ্যে বেড়াতে আসা বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়-স্বজনদের অতিথিশালা ছিল। আমার জ্ঞাতি ভাই একটা পৃথক বিছানা করত, সেটা সে অতিথিদের ব্যবহার করতে দিত না। প্রাইভেট টিউশনের জন্যে আসা এসব ছাত্রের বেশিরভাগের কাছেই টাকা-কড়ি তেমন থাকত না। জেলে পরিবারের ছেলেরা মাঝে মধ্যে বড়সড় কোনো মাছ নিয়ে আসত। গরীব চাষীর ছেলেরা কখনো-সখনো টাটকা শাক-সবজি আর ফলমূল আনত। শুধু দুয়েকজন হিন্দু ছেলে মাসের শেষে নগদ টাকা দিত। বাজারে তাঁদের বাবাদের দোকান ছিল।
যাই হোক, এসব ছাত্রের বেশিরভাগই ১৯৪৭-এর দেশভাগের পর ‘নাই’ হয়ে গেল। আর তাছাড়া, কাছারি ঘরটাতে পালকবিশিষ্ট এক ঝাঁক বাসিন্দা এসে ভরে গেল। তাঁরা সেখানে স্থায়ীভাবে রয়ে গেল্—সেগুলো ছিল একদল জালালি কবুতর। বিশ্বাস করা হতো, বাংলা ও আসামে ইসলামের বাণী নিয়ে আসা ১৪শ শতকের এক বুজুর্গ মুসলমান ধর্মপ্রচারক হযরত শাহজালাল সেগুলো সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। সিলেটে তাঁর মাজারকে বাংলাদেশে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখা হয়। সেই পাখিগুলো ছিল আমার বাবার বিশেষ মেহমান: তাদের পুরীষ সারা অঙ্গণে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত, কিন্তু তারপরেও আমাদের বাড়িতে কেউ তাদেরকে তাদের বাসা থেকে তাড়িয়ে দিতে পারত না।
আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, কেউ সেসব কবুতর বা তাদের বাচ্চা খাওয়ার জন্য জবাই করতে পারত না। আমার বাবা এবং গ্রামবাসীর অনেকেই একথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে পাখিগুলোকে কেউ মারলে তার বিরাট ক্ষতি হবে। ফের রাজু চাচার কথায় আসা যাক।

কবি নকিব মুকশির নতুন কাব্যগ্রন্থ ‘ঝিনুকধানী’ প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থে স্থান পেয়েছে ৩৩৪টি সংক্ষিপ্ত অথচ ভাবগভীর কবিতা, যেগুলোকে কবি নাম দিয়েছেন ‘ঝিনুককবিতা’।
১ দিন আগে
‘পোভার্টি পর্ন’ শব্দটি এখন বেশ প্রচলিত। অক্সফোর্ড ডিকশনারি অনুযায়ী, আশির দশকে এর জন্ম। অনেক সময় বিভিন্ন এনজিও দারিদ্র্যকে পুঁজি করে বিজ্ঞাপনের বিষয় বানিয়ে টাকা তোলার চেষ্টা করে। এই প্রবণতাকে পর্নোগ্রাফির সঙ্গে তুলনা করেই শব্দটির উদ্ভব। ‘রইদ’ সিনেমা নিয়ে লিখতে গিয়ে আমি পোভার্টি পর্ন নিয়ে এত কথা বলছি
১ দিন আগে
পাকিস্তান আন্দোলন শেষে ভারতবর্ষ ভেঙে পৃথক দেশ সৃষ্টি প্রায় আট দশক পুরোনো ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে বিস্তর লেখা হয়েছে বহু ভাষায়, বহু দেশে।
১ দিন আগে
২০০৫ সালে ভারতের রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু হয়েছিল এক অদম্য স্বপ্নযাত্রা। দীর্ঘ ২০ বছরের নিরন্তর পথচলা শেষে চীনের শহর গুইলিংয়ে পা রাখার মাধ্যমে ১ হাজার শহর ভ্রমণের মাইলফলক স্পর্শ করলেন ভ্রমণপিপাসু তানভীর অপু।
১ দিন আগে