নূর জাহান বেগমের করুণ মৃত্যু: আমাদের পরিণতি ভিন্ন হবে?

ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ
ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ

এই কক্ষেই পাওয়া গিয়েছিল নূরজাহান বেগমের মরদেহ। ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি রাজধানীর মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের করুণ মৃত্যু সমগ্র দেশকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। কয়েকদিন ধরে বাসায় তাঁর মৃতদেহ পড়ে ছিল, অথচ কেউ তা জানতে পারেনি। সংবাদটি প্রকাশ হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বস্তরে ক্ষোভ, বেদনা এবং বিস্ময়ের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিক হলো: নূর জাহান বেগম কোনো অসহায়, নিঃসন্তান বা পথবাসী নারী ছিলেন না। তাঁর সন্তানরা সবাই উচ্চশিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত এবং সমাজে সম্মানজনক অবস্থানে রয়েছেন।

একজন মা হিসেবে তিনি জীবনের সবটুকু শক্তি, শ্রম ও স্বপ্ন ব্যয় করেছিলেন সন্তানদের মানুষ করার জন্য। তিনি সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সমাজে মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন। একজন মা হিসেবে তিনি হয়তো নিজেকে সফলই মনে করেছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষ মুহূর্তে এসে তিনি উপলব্ধি করার সুযোগও পেলেন না যে তিনি সন্তানদের শিক্ষিত করতে পেরেছেন, কিন্তু প্রকৃত মানুষ করে তুলতে পারেননি।

নূর জাহান বেগমের মৃত্যু তাই কেবল একজন মায়ের মৃত্যু নয়; এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম সামাজিক আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের মুখ দেখতে পাচ্ছি।

শিক্ষিত না মানুষ?

আমাদের সমাজে বহুদিন ধরেই একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে ভালো ফলাফল, নামী প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা, উচ্চ ডিগ্রি এবং ভালো চাকরি মানেই একজন মানুষ সফল। সন্তান স্কুলে প্রথম হলে আমরা আনন্দিত হই, বিদেশে পড়তে গেলে গর্ববোধ করি, বড় পদে চাকরি পেলে আত্মীয়-স্বজনদের সামনে বুক ফুলিয়ে কথা বলি। কিন্তু খুব কম পরিবারই প্রশ্ন করে—আমার সন্তান কতটা মানবিক? কতটা দায়িত্বশীল? কতটা সহমর্মী?

আমরা সন্তানদের বলি, “ভালো রেজাল্ট করো”, “ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হও”, “বড় চাকরি করো”, “জীবনে প্রতিষ্ঠিত হও”। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই বলি, “একজন ভালো মানুষ হও”, “বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশে থেকো”, “অসহায় মানুষের কষ্ট বুঝতে শেখো”, “মানবিক হও”।

আজকের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত প্রতিযোগিতা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক। বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দিচ্ছি, কিন্তু নৈতিকতা, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে।

ফলাফল হিসেবে আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করছি যারা প্রযুক্তিতে দক্ষ, পেশাগতভাবে সফল, কিন্তু আবেগগত ও নৈতিকভাবে ক্রমশ শূন্য হয়ে যাচ্ছে। তারা কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে, কিন্তু বৃদ্ধ মায়ের হাত ধরে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারে না; তারা জটিল কর্পোরেট সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কিন্তু একাকী বাবা-মায়ের নিঃসঙ্গতা বুঝতে পারে না।

সার্টিফিকেটমুখী শিক্ষার বিপজ্জনক পরিণতি

আজকের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত প্রতিযোগিতা, দক্ষতা এবং কর্মসংস্থানকেন্দ্রিক। বিদ্যালয়, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দিচ্ছি, কিন্তু নৈতিকতা, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে।

শিক্ষার্থীরা শিখছে কীভাবে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হয়, কীভাবে চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হয়, কীভাবে ব্যক্তিগত সাফল্য অর্জন করতে হয়। কিন্তু তারা শিখছে না কীভাবে একজন অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে প্রবীণ বাবা-মায়ের যত্ন নিতে হয়, কিংবা কীভাবে সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে হয়।

ফলে শিক্ষা জ্ঞান দিচ্ছে, কিন্তু প্রজ্ঞা দিচ্ছে না; দক্ষতা দিচ্ছে, কিন্তু মানবিকতা গড়ে তুলছে না; পেশাজীবী তৈরি করছে, কিন্তু মানুষ তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। নূর জাহান বেগমের ঘটনাই তার নির্মম প্রমাণ।

পরিবারে মূল্যবোধ শিক্ষার অবক্ষয়

একসময় পরিবার ছিল নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের প্রথম বিদ্যালয়। শিশু তার বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানির কাছ থেকে সম্মান, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক বন্ধনের শিক্ষা পেত।

কিন্তু আধুনিক নগরজীবন, একক পরিবার ব্যবস্থা, কর্মব্যস্ততা, ভোগবাদী সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনধারা পরিবারকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের কথোপকথন কমছে, যৌথ পারিবারিক অভিজ্ঞতা হারিয়ে যাচ্ছে, প্রবীণরা অনেক ক্ষেত্রেই পরিবারের কেন্দ্র থেকে প্রান্তে সরে যাচ্ছেন।

আমরা সন্তানদের জন্য দামি স্কুল, কোচিং, গ্যাজেট এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করছি; কিন্তু মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা করছি। আমরা তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে উদ্বিগ্ন, কিন্তু তাদের মানবিক চরিত্র নিয়ে নয়।

প্রশ্ন হলো: যে সন্তান ছোটবেলা থেকে শিখেছে সাফল্য মানেই অর্থ, পদমর্যাদা ও ব্যক্তিগত অর্জন, সে কেন বার্ধক্যে বাবা-মায়ের সেবা-যত্নকে অগ্রাধিকার দেবে?

এটি অর্থনৈতিক সংকট নয়, নৈতিক দারিদ্র্যের সংকট

অনেকে প্রবীণদের অবহেলার বিষয়টিকে অর্থনৈতিক সংকটের সঙ্গে যুক্ত করেন। কিন্তু নূর জাহান বেগমের ঘটনা স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে, সমস্যাটি অর্থের অভাব নয়।

বাংলাদেশের অসংখ্য দরিদ্র পরিবারে সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও সন্তানরা বাবা-মায়ের সেবায় নিবেদিত থাকে। আবার অনেক সচ্ছল পরিবারে আর্থিক প্রাচুর্য থাকলেও ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতা অনুপস্থিত।

অর্থনৈতিক দারিদ্র্য মানুষকে কষ্ট দেয়, কিন্তু নৈতিক দারিদ্র্য মানুষকে অমানবিক করে তোলে।

আজ আমাদের সমাজে যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তা মূলত নৈতিক দারিদ্র্যের সংকট। এই দারিদ্র্য কোনো সরকারি ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক পুনর্জাগরণ।

আইন কি সমাধান দিতে পারবে?

বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে “পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন” প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনটি সন্তানদের ওপর বাবা-মায়ের ভরণপোষণ, চিকিৎসা ও যত্নের দায়িত্ব আরোপ করেছে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, আইন কাউকে শাস্তি দিতে পারে, ভালোবাসতে বাধ্য করতে পারে না। আদালত ভরণপোষণের টাকা আদায় করতে পারে, কিন্তু সন্তানের হৃদয়ে মায়ের প্রতি মমত্ববোধ সৃষ্টি করতে পারে না।

আজ আমাদের সমাজে যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তা মূলত নৈতিক দারিদ্র্যের সংকট। এই দারিদ্র্য কোনো সরকারি ভাতা, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে দূর করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মূল্যবোধভিত্তিক সামাজিক পুনর্জাগরণ।

অতএব, আইন প্রয়োজনীয় হলেও যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সম্মিলিত উদ্যোগে মানবিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

আমাদের পরিণতি কি ভিন্ন হবে?

নূর জাহান বেগমের ঘটনা নিয়ে আমরা ক্ষুব্ধ হচ্ছি, শোক প্রকাশ করছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছি। কিন্তু আমাদের প্রত্যেকেরই নিজেকে একটি প্রশ্ন করা প্রয়োজন:

আমরা কি আমাদের সন্তানদের শুধু ভালো ফলাফল, উচ্চশিক্ষা এবং প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত করছি, নাকি মানুষ হওয়ার শিক্ষাও দিচ্ছি?

আমরা কি সন্তানদের শেখাচ্ছি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের হাত ধরে হাঁটতে, অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়াতে, মানবিক হতে?

যদি না শেখাই, তাহলে কী নিশ্চয়তা আছে যে আমাদের পরিণতি নূর জাহান বেগমের চেয়ে ভিন্ন হবে?

আজ যেসব বাবা-মা সন্তানের ক্যারিয়ার গড়ার জন্য নিজেদের সবকিছু উৎসর্গ করছেন, তাদের মনে রাখা উচিত, একজন সফল সন্তান সবসময় একজন ভালো মানুষ হয় না। কিন্তু একজন সত্যিকার ভালো মানুষ কখনো খারাপ সন্তান হতে পারে না।

নূর জাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন রেখে গেছে—আমরা কি সত্যিই উন্নত হচ্ছি, নাকি কেবল উন্নয়নের অভিনয় করছি?

একটি জাতির প্রকৃত উন্নয়ন তার সেতু, মহাসড়ক, গগনচুম্বী অট্টালিকা কিংবা মাথাপিছু আয়ে নয়; বরং তার মানুষের মানবিকতা, নৈতিকতা এবং পারিবারিক মূল্যবোধে প্রতিফলিত হয়।

সমস্যা ভরণপোষণ দেওয়ার অক্ষমতা নয়; সমস্যা হলো মানবিকতার অবক্ষয়। সমস্যা অর্থের সংকট নয়; সমস্যা নীতি-নৈতিকতার সংকট। সমস্যা শিক্ষার অভাব নয়; সমস্যা এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা, যা সার্টিফিকেট দেয় কিন্তু চরিত্র গড়ে না, দক্ষতা শেখায় কিন্তু মানবিকতা শেখায় না।

আমাদের এখনই জাগতে হবে। সন্তানদের শুধু উচ্চশিক্ষিত বা সফল পেশাজীবী নয়, বরং একজন মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাটা আজ সবচেয়ে জরুরি। আমরা নূর জাহান বেগমের করুণ মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছি। কিন্তু আজ যদি আমাদের সন্তানদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষাকে সমান গুরুত্ব না দিই তাহলে আমাদের প্রত্যেকেরই নূর জাহান বেগমের মতো এক নিঃসঙ্গ ও অবহেলিত পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, ওয়েলবিয়িং-ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ।

সম্পর্কিত