leadT1ad

গোলের চেয়েও বড় খেলা: বিশ্বকাপ যখন অর্থনীতির মাঠে

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

গত বুধবার ব্যাংকের কাউন্টারে এক তরুণ গ্রাহক ঋণের আবেদন নিয়ে এলেন। কথার মাঝখানেই তিনি মোবাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘স্যার, দেখুন এই জার্সিটা অর্ডার দিয়েছি, বিশ্বকাপ শুরুর আগেই হাতে চলে আসবে।’ স্ক্রিনে একটা ব্রাজিলের হলুদ জার্সি, দাম আর ডেলিভারির তারিখ।

আমি একটু হাসলাম। কারণ ছেলেটা বড় একটি ঋণের আবেদন করতে এসেছে, অথচ এরই মধ্যে জার্সি কিনে ফেলেছে। এটা বাংলাদেশের বিশ্বকাপ-অর্থনীতির একটা নিখুঁত রূপক। আমরা খেলি না, আয়োজন করি না, জিতিও না, কিন্তু ঠিকই পকেট খালি করি।

তবে এই ছোট্ট অর্ডারটার মধ্যে আসলে একটা পুরো বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের গল্প লুকিয়ে আছে। একজন তরুণ বাংলাদেশি ক্রেতা, একটা বিদেশি ব্র্যান্ড, একটা কারখানা, সম্ভবত চট্টগ্রাম বা গাজীপুরেই, এবং একটা মহাদেশীয় টুর্নামেন্ট। সব মিলিয়ে একটা সুতো গিয়ে ঠেকছে তার মানিব্যাগে। ততক্ষণে ঋণের কাগজ পড়ে আছে টেবিলে।

৮০ বিলিয়ন ডলারের উন্মাদনা

আমরা যখন বিশ্বকাপের কথা বলি, প্রথমে মনে আসে মাঠের লড়াই, প্রিয় তারকা, মেসির কান্না বা রোনালদোর বিখ্যাত ‘সিউ’ উদযাপন। কিন্তু একজন ব্যাংকারের চোখে এটা ভিন্ন ছবি, সংখ্যার ছবি। ফিফা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার যৌথ সমীক্ষা বলছে, ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হবে ৮০.১ বিলিয়ন ডলারের। বৈশ্বিক জিডিপিতে যুক্ত হবে ৪০.৯ বিলিয়ন ডলার। সরাসরি কর্মসংস্থান হবে ৮ লাখ ২৪ হাজারের বেশি। এই সংখ্যাগুলো এত বড় যে মাথায় ঢোকানোই কঠিন। সহজ করে বলি, সোমালিয়ার সারা বছরের বাজেটের চেয়েও বড় অঙ্ক শুধু এই টুর্নামেন্টের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে চলে যাচ্ছে। এমনকি শুধু তিনটি আয়োজক দেশ, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো, মিলিয়ে প্রত্যক্ষ পর্যটন আয় হবে প্রায় ১৪.৮ বিলিয়ন ডলার। এবার মনে করুন, বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এই মুহূর্তে ২৪ বিলিয়ন ডলারের কিছু বেশি। অর্থাৎ একটা টুর্নামেন্ট থেকে পর্যটন আয়ই আমাদের মোট রিজার্ভের অর্ধেকের বেশি। এবার বুঝুন, খেলার মাঠ আর অর্থনীতির মাঠ আসলে কতটা আলাদা।

বাংলাদেশ কি শুধু দর্শক

প্রশ্নটা স্বাভাবিক, এত বিশাল একটা টুর্নামেন্ট থেকে বাংলাদেশের মতো দেশ কী পায়? আমরা তো আয়োজক নই, অংশগ্রহণকারীও নই। বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচ আমাদের মাঠে হবে না, ট্রফিও আসবে না আমাদের হাতে। তাহলে কি আমাদের ভূমিকা শুধু টিভির সামনে বসে প্রিয় দলের জন্য চিৎকার করা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক করা আর জার্সি-পতাকা কিনে পকেট হালকা করা?

ব্যাপারটা আসলে এতটা সরল নয়। বিশ্বকাপ শুধু ফুটবলের লড়াই নয়, এটি একই সঙ্গে একটি বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ঘটনাও। মাঠের বাঁশি বাজে এক দেশে, কিন্তু তার অর্থনৈতিক প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় হাজার মাইল দূরের অন্য দেশেও। বিশ্বকাপকে অনেকটা স্রোতের মতো বলা যায়; একবার শুরু হলে এর ঢেউ নানা পথ ঘুরে অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও তা ব্যবসার সুযোগ তৈরি করে, কোথাও নতুন আয়ের পথ খুলে দেয়, আবার কোথাও বাড়ায় খরচের চাপ। বাংলাদেশের গল্পটাও ঠিক সেরকম, কখনও সুযোগ হয়ে, কখনও চাপ হয়ে।

প্রথম ঢেউ: আমদানির চাপ

বিশ্বকাপের সময় টিভি, স্মার্টফোন, স্ট্রিমিং ডিভাইসের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। পরিবারগুলো নতুন ৫৫ ইঞ্চি টিভি কেনার "দারুণ কারণ" খুঁজে পায়। জার্সি, পতাকা, ব্যানার, ওয়াল পোস্টারের চাহিদা বহুগুণ বাড়ে। এর একটা বড় অংশ মেটাতে হয় আমদানি করে, যার অর্থ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে বাড়তি চাপ।

এবার মাগুরার এক কৃষকের গল্প ধরা যাক। এই বিশ্বকাপেও তিনি সাড়ে সাত কিলোমিটার পতাকা বানিয়েছেন, জার্মানিকে সমর্থন দিতে। জমি বিক্রি করে। ভদ্রলোকের ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা আমার উদ্দেশ্য নয়, কিন্তু ঘটনাটা বিশ্বকাপের আবেগের অর্থনীতির একটা অতি সংকুচিত মডেল। মানুষ কখনো কখনো হিসাব-নিকাশের চেয়ে অনুভূতিকেই বেশি গুরুত্ব দেয়। প্রিয় দলকে সমর্থন করার আনন্দে খরচের খাতা একটু বেশি খুলে যায়। আর কোটি কোটি মানুষের এমন ছোট ছোট সিদ্ধান্ত একত্রিত হয়েই তৈরি করে বিশ্বকাপের বিশাল ভোক্তা অর্থনীতি।

পোশাকশিল্পের সোনার ডিম

তবে শুধু খরচের হিসাব করলে অর্ধেক গল্প বলা হয়। কারণ বাংলাদেশ এই বিশ্বকাপের একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদনকেন্দ্র। বিশ্বকাপকে ঘিরে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো — নাইকি, অ্যাডিডাস, পুমা — যে বিপুল পরিমাণ জার্সি, ট্রেনিং কিট, ক্যাপ, জ্যাকেট, সোভেনির পোশাক তৈরি করে, তার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আসে আমাদের গার্মেন্ট কারখানা থেকে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসাবে বিশ্বকাপের বছরে বাংলাদেশের স্পোর্টসওয়্যার রপ্তানি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।

তার মানে যে জার্সিটা পরে জার্মান সমর্থকরা মিউনিখের রাস্তায় উল্লাস করছেন, সেটা হয়তো সেলাই করেছেন গাজীপুরের কোনো তরুণী কর্মী। গল্পটা একটু মার্মস্পর্শী, তাই না? আমরা জার্সি বানাই, কিন্তু সেই জার্সি গায়ে গোল উদযাপন করার সুযোগ পাই না।

তবুও, বৈশ্বিক উৎপাদন ব্যবস্থার এই ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়াটা নেহাত কম কথা নয়।

ডিজিটাল অর্থনীতির নতুন মাঠ

আরেকটা দিক যা আগের বিশ্বকাপগুলোতে এতটা স্পষ্ট ছিল না — ডিজিটাল অর্থনীতি। দেশের তরুণদের বিশাল একটা অংশ এখন আর ক্যাবল টিভিতে খেলা দেখে না। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটকে বিশ্বকাপ-সংশ্লিষ্ট কনটেন্টের চাহিদা এই সময় আকাশ ছোঁয়। প্রতিটি গোলের পরে বাংলা ভাষায় শত শত রিঅ্যাকশন ভিডিও তৈরি হয়, বিজ্ঞাপন আসে, মনেটাইজেশন চালু হয়।

দেশের টিভি চ্যানেল, বিজ্ঞাপন সংস্থা, ছোট কনটেন্ট ক্রিয়েটার — সবাই এই সময়টায় বাড়তি আয় করেন। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো বিশেষ ক্যাশব্যাক অফার ছাড়ে, ছোট উদ্যোক্তারা কাস্টম জার্সি প্রিন্ট করে বিক্রি করেন। এটা সেবা খাতের একটা মৌসুমি উচ্ছ্বাস, মাপা কঠিন হলেও প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই।

রাত তিনটার কফি আর উৎপাদনশীলতার ক্ষতি

ব্যাংকিং দৃষ্টিকোণ থেকে আরেকটা মজার পর্যবেক্ষণ হলো খেলার সময়সূচির সঙ্গে স্থানীয় ব্যবসার সমন্বয়।

ইউরোপ বা আমেরিকার ম্যাচ মানেই বাংলাদেশে গভীর রাত। রাত তিনটায় শুরু হওয়া ম্যাচের আগে চা, কফি, পরোটা-ভাজি, ফাস্টফুড আর অনলাইন ফুড ডেলিভারির ব্যবসা রাতারাতি তিন-চারগুণ বেড়ে যায়। রেস্তোরাঁ আর ক্যাফেগুলো বড় পর্দায় খেলা দেখানোর ব্যবস্থা করে, বিশেষ প্যাকেজ দেয়। একটা ম্যাচের রাতে কেবল ঢাকার রেস্তোরাঁ-ক্যাফে মিলিয়ে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়ে যায়।

কিন্তু এর একটা উল্টো পিঠও আছে। পরদিন সকালে অফিসে সেই মানুষটার চোখের নিচে কালো দাগ, হাতে কফির কাপ। কাজে মন নেই।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Oxford Economics-এর একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এবারের বিশ্বকাপের কারণে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের উৎপাদনশীলতা ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য সরাসরি হিসাবটা কেউ করেনি, তবে কল্পনা করুন, সারা দেশের গার্মেন্ট কর্মী থেকে শুরু করে ব্যাংক কর্মকর্তা পর্যন্ত যদি গড়ে দিনে এক ঘণ্টা উৎপাদনশীলতা কম দেখান, সংখ্যাটা নেহাত ছোট হবে না।

আবেগ আর উৎপাদনশীলতার মধ্যে এই চিরন্তন টানাপোড়েন, বিশ্বকাপ তার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রদর্শনী করে।

সুযোগটা কোথায়?

তাহলে কি এই বিশ্বকাপ থেকে আমরা কিছুই পাব না? আমার মতে উত্তরটা নির্ভর করছে এই সময়টাকে আমরা কীভাবে ব্যবহার করি তার উপর। বিশ্বকাপের আবেগকে ঘিরে যে বিপুল অর্থ চলাচল করে, তার একটা অংশ যদি সুনির্দিষ্টভাবে দেশীয় উৎপাদন, স্থানীয় ব্র্যান্ড আর তরুণ উদ্যোক্তাদের দিকে প্রবাহিত করা যায়, তাহলে এই মৌসুমি উন্মাদনা একটা দীর্ঘমেয়াদি সুযোগে রূপ নিতে পারে।

যেমন ধরুন — বাংলাদেশ নিজেই কি একটা জাতীয় সাপোর্টার্স কিট বানাতে পারে না, যেখানে আর্জেন্টিনার জার্সি না কিনে একটা "Made in Bangladesh, Supported by Bangladesh" ব্র্যান্ড তৈরি হবে? অথবা ছোট উদ্যোক্তারা দেশীয় ফ্যাব্রিকে কাস্টম ডিজাইন করে স্থানীয় বাজার ধরতে পারেন। এই সুযোগ কাজে লাগানো না লাগানো আমাদের হাতেই।

দুই ধারের তলোয়ার

বিশ্বকাপ ফুটবলকে যদি একটা দ্বিমুখী তলোয়ার বলি, তাহলে এক পাশে আছে ব্যবসার সম্প্রসারণ, পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি, ছোট উদ্যোক্তাদের নতুন আয় এবং ডিজিটাল কনটেন্ট ইকোনমির বিকাশ। আর অন্য পাশে আছে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, অপ্রয়োজনীয় ভোগের ঝুঁকি এবং উৎপাদনশীলতার ক্ষতি।

একজন ব্যাংকার হিসেবে আমার দায়িত্ব এই দুই দিককে আলাদাভাবে দেখা। তাই দরকার সুসংহত আর্থিক ব্যবস্থাপনা, নীতি পর্যায়ে, প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়েও। ব্যক্তিগত পর্যায়ের কথা বলতে গেলেই ঋণের আবেদন করতে আসা সেই তরুণটির কথা মনে পড়ে। তাকে জার্সি কিনতে নিষেধ করব না। কিন্তু যদি সেই খরচটা একটু ভেবেচিন্তে, দেশীয় পণ্যে বা স্থানীয় উদ্যোক্তার কাছ থেকে করা যায়, তাহলে একই আনন্দের সঙ্গে অর্থনীতিতেও ইতিবাচক অবদান রাখা সম্ভব।

মাঠের বাইরের সত্যিকারের খেলা

ফুটবল শেষ পর্যন্ত আবেগের খেলা। কিন্তু সেই আবেগ যদি একটু দূরদর্শী পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বিশ্বকাপ শুধু চার বছরের একটি উৎসব না থেকে অর্থনৈতিক সুযোগেরও উৎস হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ কী পাবে, সেই প্রশ্নের উত্তর মাঠে নেই। উত্তর আছে নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তে, উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনায় এবং আমাদের ভোক্তা আচরণে। যে তরুণ গ্রাহক আজ একটি জার্সি অর্ডার দিচ্ছেন, সেই অর্ডার যদি কোনো বাংলাদেশি ব্র্যান্ডের হয়, তাহলে একই সঙ্গে আনন্দও হবে, অর্থনীতিও লাভবান হবে। কারণ বিশ্বকাপের আসল খেলা শুধু মাঠে নয়, বাণিজ্য ও অর্থনীতির মাঠেও চলে।

বাংলাদেশের সামনে সুযোগ আছে। বিশ্বকাপের এই বৈশ্বিক উন্মাদনাকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদন, ব্র্যান্ডিং ও ব্যবসা আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পুরোটা আমরা এখনো কাজে লাগাতে পারিনি।

গোলটা দেওয়ার সময় এসেছে।

  • শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
Ad 300x250

সম্পর্কিত