এম এম মুসা

গ্যাস নেই। তাই চুলা জ্বলছে না। তাই কারখানার বয়লার চলছে না। এই একটি সহজ বাক্যেই আজকের বাংলাদেশের শিল্পখাতের ছবি ফুটে ওঠে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগে। এই টার্মিনাল দেশের মোট গ্যাসের একটি অংশ সরবরাহ করত। আগুনের পর সেই সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমে যায়। এর কিছুদিন পরই কাতার থেকে গ্যাস আমদানিও কমে যায়। ফলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম হয়ে পড়ে। আগস্ট মাসে চাহিদা ছিল দৈনিক প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ নেমে আসে ২,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। এই ঘাটতির সরাসরি ধাক্কা লাগে কারখানায়।
নারায়ণগঞ্জের মেঘনা গ্রুপের কথাই ধরা যাক। এই গ্রুপের ৫৭টি কারখানা আছে। এসব কারখানায় চিনি, ময়দা, ভোজ্যতেল তৈরি হয়। গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রুপের চেয়ারম্যান নিজেই জানিয়েছেন, তাদের অধিকাংশ কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইস্পাত প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম তাদের দশটি বড় কারখানা বন্ধ করে দেয়। নরসিংদীর অবস্থা আরও খারাপ। সেখানকার টেক্সটাইল ও ডাইং মিলের প্রায় ৮০ শতাংশ কারখানা কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, শুধু নরসিংদীতেই প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এই সংখ্যাগুলো শুধু কাগজের হিসাব নয়। প্রতিটি বন্ধ কারখানার পেছনে আছে শত শত শ্রমিকের সংসার।
যেসব কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তারাও স্বাভাবিকভাবে চলতে পারছে না। অনেক কারখানা অর্ধেক ক্ষমতায় চলছে। কেউ কেউ রাতে কাজ করছে, কারণ রাতে গ্যাসের চাপ একটু থাকে। কেউ ডিজেল জেনারেটর ভাড়া করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু ডিজেলে বিদ্যুৎ বানানোর খরচ গ্যাসের চেয়ে প্রায় সাত গুণ বেশি। ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ছোট ও মাঝারি কারখানার পক্ষে এই বাড়তি খরচ সামলানো কঠিন।
পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত। এই সংকট এখন আর শুধু পোশাক খাতের সমস্যা নয়। এটি এখন পুরো শিল্পখাত ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। বিদেশি ক্রেতারা নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য চান। কারখানা যদি সময়মতো পণ্য তৈরি করে জাহাজে তুলতে না পারে, তাহলে ক্রেতা অর্ডার বাতিল করতে পারেন। অথবা সেই অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো এমন সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। একবার অর্ডার হাতছাড়া হয়ে গেলে তা আবার ফিরে পাওয়া সহজ নয়। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক গড়া ক্রেতাও নতুন দেশ খুঁজে নিতে পারেন।
সার কারখানার অবস্থাও ভালো নয়। দেশের প্রধান পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটিই গ্যাসের অভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। কারণ সীমিত গ্যাস আগে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পাঠাতে হচ্ছে। সার উৎপাদন কমে গেলে আগামী মৌসুমে কৃষকদের সমস্যা হতে পারে। তখন হয়তো বিদেশ থেকে দামি সার আমদানি করতে হবে। এভাবে একটি সংকট আরেকটি সংকট ডেকে আনে।
বাংলাদেশ একা এই সমস্যায় পড়েনি। ২০২২ সালে ইউরোপেও একই রকম গ্যাস সংকট হয়েছিল। রাশিয়া হঠাৎ গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয়। তখন জার্মানি খুব দ্রুত কিছু কাজ করে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে জার্মানি পাঁচটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বসিয়ে ফেলে। সাধারণত এমন কাজ করতে বছরের পর বছর লাগে। কিন্তু জার্মানি সরকার আইন পরিবর্তন করে অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করে দেয়। ফলে সংকট অনেকটা সামলানো যায়।
মিসরেও একই সমস্যা হয়েছিল। ২০২৩ সালে গরমকালে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেয়। মিসর সরকার তখন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়। তারা জানিয়ে দেয়, ঘরবাড়ি ও বিদ্যুৎ খাতকে আগে গ্যাস দেওয়া হবে। সার ও রাসায়নিক কারখানায় গ্যাস কিছুদিনের জন্য কমিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে সবাই আগে থেকেই জানতে পারে, কে কতটা গ্যাস পাবে। এই স্বচ্ছতা ব্যবসায়ীদের পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে এখনো এই ধরনের স্পষ্ট ঘোষণা নেই। কোন কারখানা কবে গ্যাস পাবে, তা আগে থেকে জানার উপায় নেই।
সরকার মেরামতের জন্য বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ দল আনিয়েছে। যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রকৌশলী এসেছেন। কিন্তু তারাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না, কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। পাঁচ দিন লাগবে, নাকি দশ দিন— এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারছেন না। এই অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে কষ্টের। একটি কারখানার মালিক যদি জানতেন সংকট কবে শেষ হবে, তাহলে তিনি সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে পারতেন। কিন্তু কিছুই জানা নেই বলে প্রতিদিনই অনিশ্চয়তায় কাটছে।
নতুন কারখানার গ্যাস সংযোগও বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রায় ১,৮৫০টি আবেদন জমা পড়ে আছে। এর মধ্যে অনেক কারখানা আগেই নির্মাণ শেষ করেছে। শুধু গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় তারা বসে আছে। একটি গ্রুপ শুধু কুমিল্লার অর্থনৈতিক অঞ্চলেই কাচ ও ইস্পাত কারখানায় প্রায় সাত হাজার তিনশ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু গ্যাস না পাওয়ায় কারখানা চালু করতে পারছে না। এত বড় বিনিয়োগ বছরের পর বছর অলস পড়ে থাকলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাবেন। নতুন বিনিয়োগ আসাও কমে যাবে।
কারখানা বন্ধ থাকলে সবচেয়ে বেশি ভোগেন শ্রমিকরা। অনেক কারখানায় কাজ না থাকায় শ্রমিকদের বসিয়ে রাখা হচ্ছে। কেউ কেউ পুরো বেতন পাচ্ছেন না। কারখানা মালিকরাও বিপাকে আছেন। উৎপাদন না হলে আয় হয় না। আয় না হলে বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু কারখানায় ওভারটাইম বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিকদের বাড়তি আয়ের সুযোগও কমে গেছে। যেসব পরিবার প্রতি মাসের বেতনের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই অনিশ্চয়তা খুব কঠিন। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেশি। আয় কমে গেলে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে যায়।
ছোট ব্যবসায়ীদের অবস্থাও খারাপ। যারা বড় কারখানার সঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহ করেন, তাদের ব্যবসাও থমকে গেছে। কারখানা বন্ধ থাকলে তাদের কাছে অর্ডার আসছে না। পরিবহন ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত। কারখানায় পণ্য আনা-নেওয়া কমে গেছে। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান অনেক সময় খালি বসে থাকছে। এভাবে একটি কারখানা বন্ধ হলে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
শুধু কারখানা নয়, সাধারণ মানুষও এই সংকটে কষ্ট পাচ্ছেন। ঢাকার অনেক এলাকায় দিনের বড় অংশ গ্যাসের চুলা জ্বলছে না। রান্না করতে দেরি হচ্ছে। কেউ কেউ ইট দিয়ে অস্থায়ী চুলা বানিয়ে রান্না করছেন। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের চাপ কম। ফলে গাড়িতে গ্যাস ভরতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য ঠিক করেছে। কিন্তু ব্যবসায়ী নেতারা নিজেরাই বলছেন, জ্বালানি সংকট এখন এই লক্ষ্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। কারখানা যদি নিয়মিত বন্ধ থাকে, তাহলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে না। নতুন বিনিয়োগও আসবে না। বিদেশি ক্রেতারা যে দেশে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ পান, সেই দেশকেই বেশি পছন্দ করেন। বারবার গ্যাস সংকট হলে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে। এটি শুধু আজকের ক্ষতি নয়, ভবিষ্যতের ক্ষতিও বটে।
অনেক কারখানা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যন্ত্রপাতি কিনেছে। কারখানা চললে তারা কিস্তি শোধ করতে পারে। কিন্তু কারখানা মাসের পর মাস বন্ধ থাকলে আয় হয় না। আয় না হলে কিস্তি দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। এভাবে অনেক ঋণ খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের হিসাবেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। গত এক বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। এটি শুধু কারখানার সমস্যা নয়। এটি ব্যাংক ও পুরো অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
এখনই যা করা দরকার
প্রথমত, মেরামতের একটি স্পষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করা উচিত। মানুষ যদি জানে কবে সংকট কাটবে, তাহলে তারা প্রস্তুতি নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, কোন শিল্প আগে গ্যাস পাবে, তার একটি স্পষ্ট তালিকা করা দরকার। রপ্তানিমুখী কারখানা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কারখানা— এসবকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। তৃতীয়ত, যেসব কারখানার নির্মাণ শেষ হয়েছে, তাদের দ্রুত সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। চতুর্থত, ডিজেলে চলা কারখানার জন্য সাময়িক ভর্তুকি বা করছাড় দেওয়া যেতে পারে, যাতে তাদের বাড়তি খরচের বোঝা কিছুটা কমে। পঞ্চমত, বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে পরিস্থিতি জানানো দরকার, যাতে তারা তাড়াহুড়া করে অর্ডার বাতিল না করেন।
গ্যাস সংকট শুধু জ্বালানি বিভাগের সমস্যা নয়। এটি এখন কারখানার শ্রমিক, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক ও দেশের অর্থনীতির সবার সমস্যা। যত দ্রুত স্বচ্ছতা ও পরিকল্পনা আসবে, তত দ্রুত ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে ক্ষতি শুধু বাড়তেই থাকবে।
• এম এম মুসা: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক

গ্যাস নেই। তাই চুলা জ্বলছে না। তাই কারখানার বয়লার চলছে না। এই একটি সহজ বাক্যেই আজকের বাংলাদেশের শিল্পখাতের ছবি ফুটে ওঠে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগে। এই টার্মিনাল দেশের মোট গ্যাসের একটি অংশ সরবরাহ করত। আগুনের পর সেই সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমে যায়। এর কিছুদিন পরই কাতার থেকে গ্যাস আমদানিও কমে যায়। ফলে দেশের মোট গ্যাস সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অনেক কম হয়ে পড়ে। আগস্ট মাসে চাহিদা ছিল দৈনিক প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সরবরাহ নেমে আসে ২,০০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। এই ঘাটতির সরাসরি ধাক্কা লাগে কারখানায়।
নারায়ণগঞ্জের মেঘনা গ্রুপের কথাই ধরা যাক। এই গ্রুপের ৫৭টি কারখানা আছে। এসব কারখানায় চিনি, ময়দা, ভোজ্যতেল তৈরি হয়। গ্যাস ও বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রুপের চেয়ারম্যান নিজেই জানিয়েছেন, তাদের অধিকাংশ কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইস্পাত প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম তাদের দশটি বড় কারখানা বন্ধ করে দেয়। নরসিংদীর অবস্থা আরও খারাপ। সেখানকার টেক্সটাইল ও ডাইং মিলের প্রায় ৮০ শতাংশ কারখানা কাজ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হিসাবে, শুধু নরসিংদীতেই প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এই সংখ্যাগুলো শুধু কাগজের হিসাব নয়। প্রতিটি বন্ধ কারখানার পেছনে আছে শত শত শ্রমিকের সংসার।
যেসব কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, তারাও স্বাভাবিকভাবে চলতে পারছে না। অনেক কারখানা অর্ধেক ক্ষমতায় চলছে। কেউ কেউ রাতে কাজ করছে, কারণ রাতে গ্যাসের চাপ একটু থাকে। কেউ ডিজেল জেনারেটর ভাড়া করে উৎপাদন সচল রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু ডিজেলে বিদ্যুৎ বানানোর খরচ গ্যাসের চেয়ে প্রায় সাত গুণ বেশি। ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ছোট ও মাঝারি কারখানার পক্ষে এই বাড়তি খরচ সামলানো কঠিন।
পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত। এই সংকট এখন আর শুধু পোশাক খাতের সমস্যা নয়। এটি এখন পুরো শিল্পখাত ও অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি। বিদেশি ক্রেতারা নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য চান। কারখানা যদি সময়মতো পণ্য তৈরি করে জাহাজে তুলতে না পারে, তাহলে ক্রেতা অর্ডার বাতিল করতে পারেন। অথবা সেই অর্ডার অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া বা ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো এমন সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। একবার অর্ডার হাতছাড়া হয়ে গেলে তা আবার ফিরে পাওয়া সহজ নয়। দীর্ঘদিনের সম্পর্ক গড়া ক্রেতাও নতুন দেশ খুঁজে নিতে পারেন।
সার কারখানার অবস্থাও ভালো নয়। দেশের প্রধান পাঁচটি সার কারখানার মধ্যে চারটিই গ্যাসের অভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে। কারণ সীমিত গ্যাস আগে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে পাঠাতে হচ্ছে। সার উৎপাদন কমে গেলে আগামী মৌসুমে কৃষকদের সমস্যা হতে পারে। তখন হয়তো বিদেশ থেকে দামি সার আমদানি করতে হবে। এভাবে একটি সংকট আরেকটি সংকট ডেকে আনে।
বাংলাদেশ একা এই সমস্যায় পড়েনি। ২০২২ সালে ইউরোপেও একই রকম গ্যাস সংকট হয়েছিল। রাশিয়া হঠাৎ গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দেয়। তখন জার্মানি খুব দ্রুত কিছু কাজ করে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে জার্মানি পাঁচটি নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বসিয়ে ফেলে। সাধারণত এমন কাজ করতে বছরের পর বছর লাগে। কিন্তু জার্মানি সরকার আইন পরিবর্তন করে অনুমোদন প্রক্রিয়া দ্রুত করে দেয়। ফলে সংকট অনেকটা সামলানো যায়।
মিসরেও একই সমস্যা হয়েছিল। ২০২৩ সালে গরমকালে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেয়। মিসর সরকার তখন স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নেয়। তারা জানিয়ে দেয়, ঘরবাড়ি ও বিদ্যুৎ খাতকে আগে গ্যাস দেওয়া হবে। সার ও রাসায়নিক কারখানায় গ্যাস কিছুদিনের জন্য কমিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে সবাই আগে থেকেই জানতে পারে, কে কতটা গ্যাস পাবে। এই স্বচ্ছতা ব্যবসায়ীদের পরিকল্পনা করতে সাহায্য করে। বাংলাদেশে এখনো এই ধরনের স্পষ্ট ঘোষণা নেই। কোন কারখানা কবে গ্যাস পাবে, তা আগে থেকে জানার উপায় নেই।
সরকার মেরামতের জন্য বিদেশ থেকে বিশেষজ্ঞ দল আনিয়েছে। যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে প্রকৌশলী এসেছেন। কিন্তু তারাও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না, কবে নাগাদ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে। পাঁচ দিন লাগবে, নাকি দশ দিন— এই প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারছেন না। এই অনিশ্চয়তা ব্যবসায়ীদের জন্য সবচেয়ে কষ্টের। একটি কারখানার মালিক যদি জানতেন সংকট কবে শেষ হবে, তাহলে তিনি সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে পারতেন। কিন্তু কিছুই জানা নেই বলে প্রতিদিনই অনিশ্চয়তায় কাটছে।
নতুন কারখানার গ্যাস সংযোগও বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রায় ১,৮৫০টি আবেদন জমা পড়ে আছে। এর মধ্যে অনেক কারখানা আগেই নির্মাণ শেষ করেছে। শুধু গ্যাস সংযোগের অপেক্ষায় তারা বসে আছে। একটি গ্রুপ শুধু কুমিল্লার অর্থনৈতিক অঞ্চলেই কাচ ও ইস্পাত কারখানায় প্রায় সাত হাজার তিনশ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু গ্যাস না পাওয়ায় কারখানা চালু করতে পারছে না। এত বড় বিনিয়োগ বছরের পর বছর অলস পড়ে থাকলে বিনিয়োগকারীরা আস্থা হারাবেন। নতুন বিনিয়োগ আসাও কমে যাবে।
কারখানা বন্ধ থাকলে সবচেয়ে বেশি ভোগেন শ্রমিকরা। অনেক কারখানায় কাজ না থাকায় শ্রমিকদের বসিয়ে রাখা হচ্ছে। কেউ কেউ পুরো বেতন পাচ্ছেন না। কারখানা মালিকরাও বিপাকে আছেন। উৎপাদন না হলে আয় হয় না। আয় না হলে বেতন দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু কারখানায় ওভারটাইম বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমিকদের বাড়তি আয়ের সুযোগও কমে গেছে। যেসব পরিবার প্রতি মাসের বেতনের ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই অনিশ্চয়তা খুব কঠিন। বাজারে জিনিসপত্রের দাম বেশি। আয় কমে গেলে সংসার চালানো আরও কঠিন হয়ে যায়।
ছোট ব্যবসায়ীদের অবস্থাও খারাপ। যারা বড় কারখানার সঙ্গে কাঁচামাল সরবরাহ করেন, তাদের ব্যবসাও থমকে গেছে। কারখানা বন্ধ থাকলে তাদের কাছে অর্ডার আসছে না। পরিবহন ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত। কারখানায় পণ্য আনা-নেওয়া কমে গেছে। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান অনেক সময় খালি বসে থাকছে। এভাবে একটি কারখানা বন্ধ হলে তার প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।
শুধু কারখানা নয়, সাধারণ মানুষও এই সংকটে কষ্ট পাচ্ছেন। ঢাকার অনেক এলাকায় দিনের বড় অংশ গ্যাসের চুলা জ্বলছে না। রান্না করতে দেরি হচ্ছে। কেউ কেউ ইট দিয়ে অস্থায়ী চুলা বানিয়ে রান্না করছেন। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের চাপ কম। ফলে গাড়িতে গ্যাস ভরতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানির লক্ষ্য ঠিক করেছে। কিন্তু ব্যবসায়ী নেতারা নিজেরাই বলছেন, জ্বালানি সংকট এখন এই লক্ষ্যের পথে সবচেয়ে বড় বাধা। কারখানা যদি নিয়মিত বন্ধ থাকে, তাহলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে না। নতুন বিনিয়োগও আসবে না। বিদেশি ক্রেতারা যে দেশে নির্ভরযোগ্য সরবরাহ পান, সেই দেশকেই বেশি পছন্দ করেন। বারবার গ্যাস সংকট হলে বাংলাদেশের প্রতি আস্থা কমে যেতে পারে। এটি শুধু আজকের ক্ষতি নয়, ভবিষ্যতের ক্ষতিও বটে।
অনেক কারখানা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যন্ত্রপাতি কিনেছে। কারখানা চললে তারা কিস্তি শোধ করতে পারে। কিন্তু কারখানা মাসের পর মাস বন্ধ থাকলে আয় হয় না। আয় না হলে কিস্তি দেওয়া কঠিন হয়ে যায়। এভাবে অনেক ঋণ খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকের হিসাবেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে। গত এক বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়েছে। এটি শুধু কারখানার সমস্যা নয়। এটি ব্যাংক ও পুরো অর্থনীতির জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
এখনই যা করা দরকার
প্রথমত, মেরামতের একটি স্পষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করা উচিত। মানুষ যদি জানে কবে সংকট কাটবে, তাহলে তারা প্রস্তুতি নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, কোন শিল্প আগে গ্যাস পাবে, তার একটি স্পষ্ট তালিকা করা দরকার। রপ্তানিমুখী কারখানা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের কারখানা— এসবকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। তৃতীয়ত, যেসব কারখানার নির্মাণ শেষ হয়েছে, তাদের দ্রুত সংযোগ দেওয়ার ব্যবস্থা করা উচিত। চতুর্থত, ডিজেলে চলা কারখানার জন্য সাময়িক ভর্তুকি বা করছাড় দেওয়া যেতে পারে, যাতে তাদের বাড়তি খরচের বোঝা কিছুটা কমে। পঞ্চমত, বিদেশি ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে পরিস্থিতি জানানো দরকার, যাতে তারা তাড়াহুড়া করে অর্ডার বাতিল না করেন।
গ্যাস সংকট শুধু জ্বালানি বিভাগের সমস্যা নয়। এটি এখন কারখানার শ্রমিক, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক ও দেশের অর্থনীতির সবার সমস্যা। যত দ্রুত স্বচ্ছতা ও পরিকল্পনা আসবে, তত দ্রুত ক্ষতি কমানো সম্ভব হবে। সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে ক্ষতি শুধু বাড়তেই থাকবে।
• এম এম মুসা: উন্নয়নকর্মী ও গবেষক
.png)

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গত ১৭ আগস্ট আবারও সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। এর আগে জুলাই ও আগস্টজুড়ে সৌদি বিনিয়োগ, বন্দর-লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দীর্ঘমেয়াদি ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ নিয়ে ঢাকার সঙ্গে রিয়াদের ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের য
২ ঘণ্টা আগে
‘আনন্দ নিয়ে শেখা’—এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করে আবার পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থায়।
১০ ঘণ্টা আগে
জঙ্গি ইস্যু নিয়ে বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের অস্বীকারের সংস্কৃতি যেমন আছে। প্রতিপক্ষ দমনে জঙ্গি কার্ড ব্যবহারের অভিযোগও বেশ পুরোনো। এরকম সব কারণে কখনোই প্রকৃত অর্থে জঙ্গি নির্মূল করা যায়নি। বরং জঙ্গিরা নানা ফর্মে সমাজের নানা পরিসরে মিশেছিল। এখনও আছে। কেউ একদিনে জঙ্গি হয়ে ওঠে