জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহু কেন সবচেয়ে বিপজ্জনক মানুষ

ডেভিড হার্স্ট
ডেভিড হার্স্ট

স্ট্রিম গ্রাফিক

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি ইলন মাস্কের এআই প্ল্যাটফর্ম ‘গ্রোক’—কে বেশি ঘোরের মধ্যে বাস করছেন, তা বলা মুশকিল। গ্রোক সম্প্রতি গ্লাসগোর একটি অগ্নিকাণ্ডের ভিডিওকে তেল আবিবের ঘটনা বলে চালিয়েছে। আবার ২০১৭ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি দাবানলের ভিডিওকে ইরানের তেলক্ষেত্রে আগুন বলে দাবি করেছে।

অন্যদিকে, ইরানে মার্কিন হামলার পর থেকে ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়ায় যেন প্রলাপ বকছেন। তিনি কখনও ইরানে গণ-অভ্যুত্থানের ডাক দিচ্ছেন, কখনও দেশটির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করছেন, আবার কখনও দাবি করছেন ইরানের পরবর্তী নেতা কে হবেন তা তিনি নিজেই ঠিক করবেন। কিন্তু তার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্যটি ছিল ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা নিয়ে। ট্রাম্প একে “ইরানি জনগণের নিজেদের দেশ ফিরিয়ে নেওয়ার সবচেয়ে বড় সুযোগ” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

বাস্তবতা হলো, ইরানি জনগণ ট্রাম্পের দেওয়া সেই সুযোগ নেয়নি। উল্টো মার্কিন বোমা হামলার মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে খামেনির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে। আধুনিক ইতিহাসে কোনো রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যার এমন ঘটনা বিরল। ট্রাম্প ও এই অভিযানের মূল হোতা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যা ভেবেছিলেন, বাস্তবে ঘটল ঠিক তার উল্টো। খামেনিকে হত্যার এই ঘটনা ইসলামিক প্রজাতন্ত্র এবং ইরানের বিপ্লবকে যেন নতুন করে প্রাণবন্ত করেছে ও দিকনির্দেশনা দিয়েছে।

ইরানের ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা

নিজেদের টিকিয়ে রাখতে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের সরকার দেশের যেকোনো বিদ্রোহ খুব কঠোরভাবে দমন করে থাকে। তবে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা খামেনি ছিলেন একজন বাস্তববাদী মানুষ। তার শাসনামলে ইরান তার শীর্ষ জেনারেল এবং পরমাণু বিজ্ঞানীদের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের তাৎক্ষণিক ও বেপরোয়া জবাব দেয়নি। আর যখন দিয়েছে, তখন তা ছিল অত্যন্ত মাপা, যার উদ্দেশ্য ছিল ইস্যুটির ইতি টানা।

খামেনির অধীনে ইরান তার ‘রেড লাইন’ বজায় রেখেছিল। তার শাসনামলে উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর হামলা হয়নি এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করা হয়নি। বাগদাদ বিমানবন্দরে মার্কিন ড্রোন হামলায় শীর্ষ জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর, কিংবা প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অভিষেকের পর তেহরানে হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়াহ নিহত হওয়ার ঘটনায় ইরান তার প্রতিবেশীদের ওপর কোনো আক্রমণ চালায়নি। খামেনি ঝুঁকি হিসাব করতেন এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতেন। সোলেইমানি হত্যার জবাবে ইরান ইরাকে দুটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছিল ঠিকই, তবে আগে থেকে ইরাক সরকারকে সতর্কও করেছিল। এমনকি তার সময়ে ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্পের সাথে দুবার আলোচনারও চেষ্টা করেছিল।

কিন্তু প্রথম সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সময়কার ইরান এমন ছিল না। খোমেনির ইরান ছিল চরম বিপ্লবী এবং সেই ইরানের আচরণ ছিল অনেকাংশেই অপ্রত্যাশিত। আট বছরের ইরান-ইরাক যুদ্ধ ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-কে একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনীতে পরিণত করেছিল।

পুনর্জাগ্রত বিপ্লবী চেতনা

খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের সেই পুরোনো ‘বিপ্লবী ও অপ্রত্যাশিত’ চেতনা যেন আবার ফিরে এসেছে। তার মৃত্যু ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের বিপ্লবী চেতনাকে শেষ করার বদলে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে।

মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, উপসাগরীয় অঞ্চলে তেল ও গ্যাস উৎপাদন থামিয়ে দিয়েছে এবং ১৯৭৩ সালের চেয়েও কয়েকগুণ বড় একটি বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি করেছে। প্রতিদিন ২ কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে, যা ১৯৭৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সব তেল সংকটের সম্মিলিত রূপের সমান।

এটি উপসাগরীয় শিপিং লেন রক্ষার মার্কিন প্রতিশ্রুতিকে রীতিমতো উপহাসে পরিণত করেছে। ইরান কাতারে অবস্থিত ১.১ বিলিয়ন ডলারের আর্লি ওয়ার্নিং রাডার সিস্টেম মারাত্মকভাবে ধ্বংস করেছে, যা এই অঞ্চলে প্যাট্রিয়ট মিসাইল ব্যাটারি পরিচালনার জন্য অপরিহার্য। আকাশসীমা ও উপসাগরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ১৪টি দেশ সরাসরি এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। খামেনির মৃত্যুর পর ইরানি নেতা আলী লারিজানি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—“আমরা তাদের হৃদয় জ্বালিয়ে দেব, আমেরিকান ও জায়নবাদীদের অনুতপ্ত করব”—ইরান এখন অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করছে।

মোক্ষম জবাব ও জাতীয়তাবাদী ঐক্য

মার্কিন-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ ইরানের জনগণকে ভীত করার বদলে ঐক্যবদ্ধ করেছে। মানুষ গভীর রাত পর্যন্ত রাস্তায় নেমে খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন নেতা হিসেবে মেনে নিয়ে উল্লাস করেছে। ট্রাম্প স্পষ্টভাবে ইরানিদের মোজতবাকে নেতা হিসেবে বেছে নিতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু ৫৬ বছর বয়সী মোজতবাকে বেছে নিয়ে ইরান সরাসরি ট্রাম্পকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছে।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই হামলা ইরানের জনগণের মধ্যে প্রবল জাতীয়তাবাদী চেতনা এবং ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এমনকি ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর নির্বাসিত হওয়া এবং কট্টর সমালোচক হয়ে ওঠা বিশিষ্ট ইরানি দার্শনিক আবদুল করিম সোরুশও আজ দেশের প্রতিরক্ষায় এক হওয়ার ডাক দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “আজ নিরপেক্ষ থাকার অর্থ হলো মূর্খতা ও বিবেকের অভাব। যারা জন্মভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছে, তাদের কপালে কলঙ্কের দাগ চিরকাল থেকে যাবে।”

দিশেহারা ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর উন্মাদনা

কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া কেবল প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে আলোচনার মাঝপথে ইরানে হামলা করে ট্রাম্প এখন দিশেহারা। প্রতিদিনই তিনি নতুন নতুন কথা বলছেন। কখনো স্থলসেনা পাঠানোর কথা ভাবছেন, কখনো কুর্দিদের ব্যবহারের কথা ভাবছেন। কিন্তু কোনোটাই বাস্তবসম্মত নয়।

উপসাগরীয় দেশগুলোর চারপাশে যে নিরাপত্তা ও সম্পদের বলয় ছিল, ইরান তা ভেঙে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এর শেষ কোথায়?

ধীরে ধীরে তেলের বাজার ও বিশ্ব অর্থনীতিতে যে টালমাটাল অবস্থা তৈরি হচ্ছে, তা ট্রাম্পকে এই ব্যর্থ যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করতে পারে। ইসরায়েলি সাংবাদিক রোনেন বার্গম্যানের মতে, খোদ ইসরায়েল ও আমেরিকার এই যুদ্ধের কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা শেষ গন্তব্য জানা নেই। ওয়াল স্ট্রিটের চাপ এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা ভাবলে এই বাজারের অস্থিরতা ট্রাম্পের জন্য কোনো শুভ লক্ষণ নয়।

যদি ট্রাম্প পিছু হটেন, তবে তার নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ধ্বংস হবে এবং ইসরায়েলকে দিয়ে গোটা মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণের যে মেসিয়ানিক বা উন্মাদ রূপকল্প নেতানিয়াহু দেখেছিলেন, তা ধূলিসাৎ হবে।

যুদ্ধে জিততে হলে ট্রাম্পের প্রয়োজন ইরানের দ্রুত পতন। কিন্তু ইরান ভেঙে পড়ার কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছে না; বরং তাদের টিকে থাকার কৌশল দারুণভাবে কাজ করছে। কিন্তু এই ভূ-রাজনৈতিক খেলায় মধ্যপ্রাচ্যের হাজার হাজার নির্দোষ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে, অর্থনীতি ধ্বংস হচ্ছে।

একজনের বিশাল অহংকার এবং আরেকজনের উন্মাদ চিন্তাধারার চরম মূল্য চোকাচ্ছে পুরো অঞ্চল, আর ইউরোপ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। হতাশ ও ক্ষুব্ধ ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু—নিঃসন্দেহে এই মুহূর্তে পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে বিপজ্জনক দুই মানুষ।

মিডল ইস্ট আই থেকে লেখাটি ভাষান্তর করেছেন মুজাহিদুল ইসলাম)

সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত