আজ ২৪ আগস্ট ‘ইয়াসমিন হত্যা দিবস’ বা ‘নারী নির্যাতন ও প্রতিরোধ দিবস’।
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট হতদরিদ্র কিশোরী ইয়াসমিনকে পুলিশ সদস্যরা জোরপূর্বক পুলিশ ভ্যানে তুলে দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় ধর্ষণের পর হত্যা করেন। এরপর লাশ রাস্তার পাশে ফেলে চলে যান। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দিনাজপুরবাসী। দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে উত্তাল দিনাজপুরে আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলি চালায় পুলিশ। এতে অন্তত সাত ব্যক্তির মৃত্য হয়। ফুঁসে ওঠেন লেখক-কবি-বুদ্ধিজীবীরাও। তাঁদের প্রতিবাদী লেখাগুলো ছাপা হতে থাকে তৎকালীন সংবাদমাধ্যমগুলোতে। লেখক ও শিক্ষাবিদ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর তেমনই একটি লেখা পুনর্মুদ্রিত হলো।
লেখা:

হাঁড়ির ইন্সপেক্টর হবার দরকার করে না, একটা ভাত টিপে দেখাই যথেষ্ট। দিনাজপুরের ওই এক ঘটনাই সব খবর বলে দিচ্ছে। কিশোরী ইয়াসমিন মারা গিয়ে বলে গেলো আমরা কেউই ভাল নেই। ব্যাপার দুঃখের, ব্যাপার লজ্জারও। সরকার দুঃখ-লজ্জা এসব পাবে এমন ধারণা করা অন্যায়। কোন সরকারই পায়নি, এ সরকারও পাবে না। যা পাবার আমাদেরকেই পেতে হবে।
তবে জানাজানি হয়ে গেছে। বিশ্বময় ছড়িয়ে গেছে এই খবর যে, বাংলাদেশে একটি কিশোরীকে টহল পুলিশ তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়েছিল শহরে পৌঁছে দেবে বলে। মেয়েটি যেতে চায়নি, মেয়েটি পুলিশকে চেনে। পুলিশ বলেছে, এ তাদের কর্তব্য-বিপন্নকে সাহায্য করা। তারপর পুলিশ বলছে, মেয়েটি লাফিয়ে পড়েছিল গাড়ি থেকে। লাফিয়ে পড়ে মারা গেছে। কেন লাফালো? আশ্রয়দাতাদের নিরাপত্তা থেকে কেন লাফিয়ে পড়লো মরবার জন্য, কোন্ আতঙ্কে? না, তার ব্যাখ্যা পুলিশ দিচ্ছে না। কিন্তু বলছে মেয়েটি মারা গেছে দেখে তাকে রাস্তার পাশে রেখে পুলিশ থানায় গিয়েছিল খবর দিতে।
প্রেসনোট বলে যে একটা জিনিস সরকারি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জারি করা হয়; সেটাকে কেউ কখনো বিশ্বাস করে না। কিন্তু এই যে বিজ্ঞপ্তি, মেয়েটি স্বেচ্ছায় লাফিয়ে পড়ে মারা গেল এবং পুলিশ তাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে থানায় গিয়ে খবর দিল এবং মেয়েটির কোন পরিচয় যেহেতু পুলিশের জানা ছিল না তাই কে সে কার মেয়ে এসব খবর সংগ্রহ করার চেষ্টা না করে তৎক্ষণাৎ তাকে বেওয়ারিশ বলে সনাক্ত করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সাহায্যে চাপা দিল মাটির নিচে- এটি পড়ে বড় লজ্জা পেয়েছে মানুষ। সরকার নির্লজ্জ হতে পারে; কিন্তু মানুষের তো লজ্জা আছে।
তাই বলে খবর চাপা থাকেনি। আজকাল থাকে না। বেজিংয়ে বিশ্ব নারী সম্মেলন হচ্ছে, সেখানে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হবে; এই সময়ে এই খবর বাংলাদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে, বহির্বিশ্বেও। ক’দিন আগে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ীদের কয়েকজন গিয়েছিলেন বিদেশে, প্রতিনিধি হয়ে। ফিরে এসে বলেছেন, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি খুবই লজ্জাজনক। আমাদেরকে সবাই সোমালিয়ানদের মত সম্মানহীন মনে করে। ব্যবসায়ীরা আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, ওই ধারণা দূর করার জন্য তারা খুবই চেষ্টা করেছেন। এখন গেলে তারা মুশকিলে পড়তেন। বাংলাদেশী পুলিশের এই কাজের কি ব্যাখ্যা দেবেন ভেবে পেতেন না। ভ্যাবাচেকা খেতে হতো।
পুলিশের গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ার ঘটনা অবশ্য এই প্রথম নয়। অহরহ ঘটছে। অতি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৫-এর পয়লা জানুয়ারী। সিরাজ সিকদার লাফিয়ে পড়েছিলেন পুলিশের গাড়ি থেকে। তা তিনি লাফিয়ে পড়বেন এটা স্বাভাবিক ছিল বৈকি। অপরাধী ছিলেন মস্তবড়, আসামী ছিলেন বিচারের। পালানোর জন্য লাফ দিয়েছিলেন। নিরুপায় পুলিশ কি করবে, দিশেহারা হয়ে গুলি করতে বাধ্য হয়েছিল। বেচারা তাতে প্রাণ দিলেন। পরের দিন সেই ঘটনার ওপর সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি বের হয়েছিল। কেউ বিশ্বাস করেনি। মানুষ বরঞ্চ লজ্জা পেয়েছিল সেটি পড়ে। তাতে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়েনি। সেই সরকার চলে গেছে। এখন যারা ক্ষমতায় আছে তারা প্রতিনিয়তই সেই সরকারের সমালোচনা করে, যেন তাদের ব্যর্থতাই এদের একমাত্র যোগ্যতা; কিন্তু বিশ বছর পরেও যে একই রকমের প্রেস বিজ্ঞপ্তি বের হচ্ছে এবং লজ্জায় পড়তে হচ্ছে মানুষকে, তার ব্যাখ্যা কি? বোঝা যাচ্ছে গত বিশ বছরে দেশে অভ্যুত্থান, নির্বাচন, সরকার বদল বহু কিছু হয়েছে বটে; কিন্তু কোন রদবদল হয়নি সরকারের চরিত্র। একই রয়ে গেছে। সে সময়ে আরো ঘটনা ঘটেছিল। বাসন্তীকে মাছ ধরার জাল পরতে হয়েছিল সম্ভ্রম রক্ষার জন্য। আজ আরেক বাসন্তীকে, ইয়াসমিনকে প্রাণ দিতে হলো ওই সম্ভ্রম বাঁচাতে গিয়েই। ওই বাসন্তী তবু প্রাণে বেঁচেছিল, এই বাসন্তী বাঁচলো না। ওর ঘটনা কতটা সত্য ছিল সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে; এর ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই। এ শুয়ে আছে কবরের নিচে।
ঝড়ঝাপটা মেয়েদের ওপর দিয়েই যায় বেশি। বড় সহজে। সেজন্য মেয়েদের অবস্থা দেখেই বোঝা যায় বাদ-বাকিরা কেমন আছে। রুয়ান্ডা থেকে, বসনিয়া থেকে নারী নির্যাতনের ও মেয়েদের দূর্দশার যেসব খবর আসছে তাতে অন্য খবর আর দরকার করে না, ওই এক খবরই বলে দেয় বাকি সব খবর, জানিয়ে দেয় মানুষ সেখানে কেমন আছে। একাত্তর সালে পাকিস্তানী হানাদারদের বর্বরতা অনেক অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে ধরা পড়েছে, কিন্তু তদের মুখচ্ছবি যে দর্পণে সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে সে হচ্ছে নারী নির্যাতন। পুরুষদের তবু দুষ্কৃতকারী বলবার মুখ ছিল তাদের, মেয়েদেরকে কি বলবে; মেয়েরা কোন্ বিপদ ঘটিয়েছিল কোথায় যে বন্যজন্তুর মত তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
নির্যাতনের অবশ্য নানা রূপ আছে। ভদ্রভাবেও নির্যাতন সম্ভব। ভদ্রতার আড়ালে। নিগ্রহের শিকার মেয়েরা পথেঘাটে হয়, নানাভাবে হয়। অগ্রসর দেশগুলোতে জরিপ নিলেই বের হয়ে আসে সেসব খবর। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিল। যেমন ভাল সাবান পাওয়া যেত না, সুন্দর জুতোরও অপ্রতুলতা ছিল। কিন্তু সেখানে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে—এমন খবর তাদের শত্রুপক্ষও দিতে পারত না। সেসব দেশ এখন ‘মুক্ত’ হয়েছে: বাজার ঢুকে পড়েছে তাদের সর্বত্র এবং সেই বাজারে মেয়েদের হয়রানি, মর্যাদাহানি, পণ্য হিসেবে তাদের ব্যবহার কোন কিছুরই আজ আর অবধি নেই। তাতেই বোঝা যায় উন্নতির মাশুল সাধারণ মানুষকে কিভাবে গুণতে হচ্ছে।
আমাদের দেশে মেয়েরা কেমন আছে দিনাজপুরে ইয়াসমিনের মৃত্যুই তা বলে দিল। প্রতিদিন খবর আসে মেয়েদের নিগ্রহের, আত্মহত্যার। তারা নিহত হয় পণ্যের জন্য। ধর্ষিত হয় নারী হওয়ার অপরাধে। গৃহপরিচারিকারা নির্যাতিত ও নিহত হয়। মোল্লারা ফতোয়া ছাড়ে। ভাত দিতে পারে না, বিচার করতে বসে। এসব খবর তো কিছু কিছু কাগজে আসে, যা একেবারেই আসে না তা হচ্ছে নীরব নির্যাতনের খবরগুলো। দরিদ্র পরিবারে তো বটেই, সম্পন্ন পরিবারেও মেয়েরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। অযত্নে বাড়ে, পুষ্টিহীনতায় ভোগে। স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না। পদে পদে দুর্বৃত্তরা পিছু নেয়। অপেক্ষাকৃত শান্তরা কটুকাটব্য করে। গলির পরে গলি উঠছে ঢাকা শহরে। ছেলেরাই মাঠ পায় না খেলার, পথ পায় না হাঁটার। মেয়েরা কি করবে, আটকা পড়ে থাকে ঘরের ভেতর, দিনের পর দিন। গ্রামের মেয়েদের পক্ষে ঘরের বের হওয়া মানেই অন্যায় কাজ করা। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষরা যে ভাল নেই এ আমরা সবাই জানি। অনেক রকম অসুবিধায় আছে তারা। সবচেয়ে বড় অসুবিধা এখন দাঁড়িয়েছে মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব। নিরাপদ বোধ করে না। কোথাও প্রকাশ্যে,. বহুক্ষেত্রে প্রচ্ছন্নভাবে তারা পাত্র হয় বৈষম্যের। সম্পত্তির ওপর চোখ রাখে প্রতিবেশী, পারলে গ্রাস করবে। অত্যন্ত বড় বিপদ মেয়েদের নিয়ে। দেশে এখন সব মেয়েই বিপন্ন; সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেয়েদের বিপদটা আরো বেশি। বাবা-মা ভয় পায়। মেয়েরা নিজেরা তো বটেই।
ওদিকে পুলিশকে এদেশের লোকে কখনোই বন্ধু হিসাবে দেখবার সুযোগ পায়নি। পুলিশ হচ্ছে রাষ্ট্রের রক্ষীবাহিনী এবং রাষ্ট্র জনগণের পক্ষে নয়, জনগণের বিপক্ষে। এই বোধ মানুষের মনের গভীরে প্রোথিত। রাষ্ট্রের ভাঙাগড়া ঘটেছে। জনগণই করেছে ওই কাজ। কিন্তু রাষ্ট্র জনগণের মিত্র হয়নি। হয়নি যে তার অনেক প্রমাণ আছে। একেবারে প্রত্যক্ষ প্রমাণ পুলিশের আচরণ। পুলিশ ঘুষ খায়, এই প্রসিদ্ধি অতি প্রাচীন। সেটি এখনো দূর হয়নি। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এই অভিজ্ঞতা যে পুলিশ অন্যায় করে। পুলিশ আসতে দেখলে অত্যন্ত নিরীহ মানুষও (অপরাধী নয় এই অর্থে) অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়। জানে উপকার করবে না, অপকার করবে। রাস্তায় দেখলে এরকম অনুভূতি জাগে যে ওত পেতে রয়েছে ঝাঁপিয়ে পড়বার অপেক্ষায়। সেই ভয়ঙ্কর ভাবমূর্তির গায়ে ভয়ঙ্কর আরো একটি মাত্রা যোগ হলো দিনাজপুরের ঘটনায়। ইয়াসমিনকে তারা পতিতা বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছিল। যেন পতিতা মানুষ নয়, যেন পতিতার মৃত্যু, মৃত্যু নয়।
দিনাজপুরের মানুষ ওই ঘটনাকে মেনে নেয়নি। তারা অত্যন্ত সরবে এর প্রতিবাদ করেছে। তাতে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছে। আরো কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সরকার এই হত্যাকান্ডকেও অতিরঞ্জিত বলে প্রচার করতে চেয়েছিল। এখন অবশ্য আর পারছে না। ঘটনাকে আচ্ছাদিত করবার মত পর্যাপ্ত কলাকৌশল খুঁজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের পক্ষে।
ওই শহরে যা ঘটেছে তার তাৎপর্য এক নয়, একাধিক। বড় তাৎপর্য এই যে, মানুষ ভাল নেই এবং ক্ষেপে আছে। বিরোধী দলগুলো যে বলে হরতালের মধ্য দিয়ে সরকারের প্রতি দেশবাসী তাদের অনাস্থা প্রকাশ করছে, এর উভয়াংশ সত্য না হলেও একাংশ যে সত্য তাতে কোন সন্দেহ নেই। সরকারের প্রতি মানুষের কোন আস্থা নেই। হরতাল মানুষ কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে করে, কতটা করে ভয়ে সে বিষয়ে সন্দেহ থাকলেও আস্থা থাকবার কারণ নেই। সরকারের পুলিশ যেখানে নারী নির্যাতনে অংশ নেয় এবং সরকার অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে তার অপরাধকে লুকাতে এবং উল্টো নির্যাতিতাকে কলঙ্কিত করতে সচেষ্ট হয় সেখানে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে এমন আশা বাতুলও করবে না। না, উন্নতির জোয়ারে মানুষ এখন মোটেই পোয়াবারো অবস্থায় নেই, বরঞ্চ খুবই তপ্ত অবস্থায় রয়েছে। বারুদের মতো তপ্ত। যে জন্য অগ্নির স্ফুলিঙ্গ পড়া মাত্র ফেটে পড়েছে। দিনাজপুরের তাপ ছিল কিছু বেশি, সেখানে দলীয়করণ ঘটেছিল মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে, মানুষ ক্ষেপেই ছিল, তাদের একটি মেয়েকে টহল পুলিশ তুলে নিয়ে লাঞ্ছি ত করেছে- এই খবরে তারা আগুনের মত জ্বলে উঠেছে। মাত্রার তফাৎ হতে পারে, কিন্তু দেশের সর্বত্রই মানুষ তপ্ত অবস্থাতেই রয়েছে।
কিন্তু মানুষ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করবে তার পথ নেই। ক্ষোভ রাজনৈতিক ও সংগঠিত উপায়েই প্রকাশ করার কথা; সেভাবেই সরকারকে পরাজিত করা সম্ভব। কিন্তু সেই রাস্তা বন্ধ। রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে তাদের নিজেদের ধান্ধায়। তাদের হরতাল বাসন্তী বা ইয়াসমিনদের স্বার্থে নয়, তাদের নিজেদের স্বার্থে। বাসন্তী ইয়াসমিনদের ভাগ্যে কি ঘটলো না ঘটলো সে নিয়ে থোড়াই তাদের মাথাব্যথা; মাথাব্যথা একটি ব্যাপারেই শুধু- কি করে ক্ষমতায় থাকা যায় কিংবা ক্ষমতায় আরোহণ করা যায়।
দিনাজপুরের বিস্ফোরণ তাই সুসংগঠিতভাবে হয়নি, ঘটেনি তা রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে। সমস্তটাই স্বতঃস্ফূর্ত এবং এরকম ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততার যে বিপদ তা এখানেও দেখা গেছে। প্রাণ দিতে হয়েছে; ভাঙচুর, লুটপাট—এসব ঘটেছে। ব্যক্তিগত শত্রুতা উদ্ধার করে নিয়েছে কেউ কেউ; স্থানীয় সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত ছিল কোন কোন মহল, তারা এই সুযোগে পত্রিকার অফিসকে আক্রমণের অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত করে দিয়েছে, ফলে অফিস আক্রান্ত হয়েছে। সর্বোপরি সরকার আশা করতে পারছে যে, এটা হুজুগের ব্যাপার, ক’দিন পরেই কেটে যাবে; তখন যে যে সে সেই।
ব্যাপারটা সামাজিক নয়, রাজনৈতিক। যদি কোন ব্যক্তি ইয়াসমিনের মৃত্যুর জন্য দায়ী হতো তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হতো সেই ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া। অর্থাৎ ব্যাপারটা সমাজে ঘটলেও রূপ নিতো রাজনৈতিক। যেখানে রাষ্ট্রের আইনরক্ষাকারী বাহিনী নিজেই অপরাধী সেখানে ব্যাপারটাতো অতি অবশ্যি রাজনৈতিক। মানুষ সেটা জানে। সে জন্য বিক্ষোভের চরিত্র ছিল রাজনৈতিক, যদিও কোন রাজনৈতিক দল এর নেতৃত্বে ছিল না এবং না থাকার দরুণ রাজনৈতিক দল যে মানুষের জীবন থেকে কতটা দূরে তাই প্রমাণিত হয়েছে—আবারো, নতুন করে। রাষ্ট্রের বাইরে কিছুই নয়, অপরাধ তো নয়ই। রাষ্ট্রের উদ্ভবই হয়েছে অপরাধ দমনের প্রয়োজনে।
এক সময়ে রাষ্ট্র ছিল না। তখন মানুষ যে প্রাকৃতিক অবস্থায় ছিল তাকে কোন কোন দার্শনিক যতই স্বর্গরাজ্য বলে চিহ্নিত করুন না কেন, সে রাজ্য আসলে অমানবিকই ছিল: সেখানে জীবন ছিল নোংরা, হিংস্র ও স্বল্পস্থায়ী। সেই অবস্থা থেকে বাঁচার জন্যই মানুষ রাষ্ট্রের অধীনতা মেনে নিয়েছে এবং আশা করেছে যে রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা দেবে। বলাবাহুল্য, খুব কম ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র সে প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। কোন কোন দার্শনিক, যেমন হেগেল, আশা করতেন রাষ্ট্র হবে স্বাধীনতার রক্ষক। জাতীয় স্বাধীনতার বটেই, ব্যক্তি স্বাধীনতারও। ব্যক্তি স্বাধীনতা রাষ্ট্রেই শুধু সম্ভব, রাষ্ট্রের বাইরে নয়। কেননা রাষ্ট্রে থাকবে আইনের শাসন। রাজার জন্য যে আইন প্রজার জন্য সেই একই আইন। তারা বড় দার্শনিক ছিলেন ঠিকই, কিন্তু এই নির্মম সত্যটা খেয়াল করেননি যে, দুর্বল শ্রেণী তাহলে রাষ্ট্রের ভেতর যদি রাজা ও প্রজার ব্যবধান থাকে, থাকে প্রবল ও সেখানে আইন যতই মানবিক ও সাম্য ভিত্তিক হোক না কেন, আইনের প্রয়োগে বৈষম্য ঘটবে; দুর্বলই অপরাধী বলে চিহ্নিত হবে, তা সে অপরাধ করুক কিংবা না-ই করুক; প্রবলের সাত খুন মাফ হয়ে যাবে; যেমনটা আামদের সমাজে অহরহ ঘটছে।
তাহলে উপায় কি? এখন সিভিল সমাজের কথা খুব করে শোনা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে সিভিল সমাজকে শক্তিশালী করতে হবে। এই সমাজটা কোথায় থাকে? যেখানেই থাকুক, নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের বাইরে থাকে না। অলিগলির ভেতর সমাজ আছে। চৌরাস্তায় বসে আছে মস্তানের দল। যাবার সময় তাদেরকে সালাম, সালামি, চাঁদা এসব দিতে হবে। তারা মেয়েদেরকে দেখে মন্তব্য করবে, যখন ইচ্ছা হবে ধরে নিয়ে যাবে। তখন কি করা? অলিগলির বাসিন্দাদেরকে বলতে পারি আপনারা উন্নত হোন, প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। কিন্তু প্রতিরোধ গড়া যাবে না। কেননা মস্তানদের লোক আছে সমাজের ভেতরে। দ্বিতীয়ত কোন প্রতিরোধেই কাজ হবে না, কারণ মস্তানরা সশস্ত্র। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে গেলে খুনোখুনি হবে। পুলিশ আসবে। এসে মস্তানদের না ধরে বরঞ্চ পাবলিককে ধরে নিয়ে যাবে। আর মস্তানদের ধরলেও দেখা যাবে তারা অবিলম্বে মুক্তি পেয়ে চলে আসছে, স্বস্থানে। কেননা তাদের যোগ আছে পুলিশের কিংবা সরকারের সঙ্গে। আর যদি একটি মস্তানদল উৎখাতও হয়ে যায় তবে অচিরেই অন্য আর এক দল চলে আসবে, যাদের পিছনে সরকারি সমর্থন থাকবে, এবং যাদেরকে উৎখাত করা আরো কঠিন হবে। সিভিল সমাজ অলিগলির ভদ্র বাসিন্দাদের মতই অসহায়। তাদেরকে উপদেশ দেয়া নিষ্ঠুরতার নামান্তর।
সিভিল সমাজকে শক্তিশালী করার কথা যারা বলেন, তারা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে একটি বিপজ্জনক ফাঁদে পা দেন। সেটি হলো মানুষকে রাজনীতি বিমুখ করার ফাঁদ। কোনকিছুই রাষ্ট্রের বাইরে নয়। রাষ্ট্র যেমন পারে অপরাধকে দমন করতে, তেমনি পারে অপরাধকে লালন করতে। সবটাই নির্ভর করছে রাষ্ট্রের চরিত্রের ওপর। সেই চরিত্রে পরিবর্তন না এলে সমাজকে পরিবর্তিত করা যাবে না। ইংরেজ শাসনের সময়ে ওই সিভিল সমাজের কথাটা শোনা যেত; যদিও ভিন্নভাবে। বলা হতো রাজনীতির দরকার নেই, ইংরেজ আছে, থাকে যদি থাকুকগে, চল আমরা সমাজকে উন্নত করি। সেই উপদেশ সকলে শোনেনি। ভাগ্যিস শোনেনি। নইলে আজও আমরা ইংরেজদের অধীনেই থাকতাম। এখনো যে খুব মুক্ত তা অবশ্য নয়; তবে তখন বন্দিত্বের মাত্রা হতো আরও বেশি। সিভিল সমাজের কথাটা এখন সরবে না বললেও নীরবে বলছে কোন কোন মহল। তারা সমাজকে উন্নত করবে, রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাদেরকে বসিয়ে রেখেই যারা গণবিরোধী, হৃদয়হীন এবং বিদেশী কর্তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি। এসব পরমার্শ মানুষ শুনবে না, যেমন দিনাজপুরের মানুষ শোনেনি, তারা ক্ষেপে গিয়ে রাস্তায় বের হয়ে পড়েছেন।
কিন্তু শুধু রাগ তো যথেষ্ট নয়। রেগে গিয়ে মানুষ জীবন দেয়, ভাঙচুর করে; কিন্তু তাতে ব্যবস্থা তো বদলায় না। ব্যবস্থা বদলবার জন্য রাজনৈতিক সংগঠন প্রয়োজন এবং সেই সংগঠনের নেতৃত্বে রাজনৈতিক আন্দোলন।
সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ০৫. ০৯. ১৯৯৫
(লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ সম্পাদিত ‘ইয়াসমিন: বিপ্লবহীনতার কালে একটি রক্তপাতের শিরোনাম’ থেকে নেওয়া)

হাঁড়ির ইন্সপেক্টর হবার দরকার করে না, একটা ভাত টিপে দেখাই যথেষ্ট। দিনাজপুরের ওই এক ঘটনাই সব খবর বলে দিচ্ছে। কিশোরী ইয়াসমিন মারা গিয়ে বলে গেলো আমরা কেউই ভাল নেই। ব্যাপার দুঃখের, ব্যাপার লজ্জারও। সরকার দুঃখ-লজ্জা এসব পাবে এমন ধারণা করা অন্যায়। কোন সরকারই পায়নি, এ সরকারও পাবে না। যা পাবার আমাদেরকেই পেতে হবে।
তবে জানাজানি হয়ে গেছে। বিশ্বময় ছড়িয়ে গেছে এই খবর যে, বাংলাদেশে একটি কিশোরীকে টহল পুলিশ তাদের গাড়িতে তুলে নিয়ে গিয়েছিল শহরে পৌঁছে দেবে বলে। মেয়েটি যেতে চায়নি, মেয়েটি পুলিশকে চেনে। পুলিশ বলেছে, এ তাদের কর্তব্য-বিপন্নকে সাহায্য করা। তারপর পুলিশ বলছে, মেয়েটি লাফিয়ে পড়েছিল গাড়ি থেকে। লাফিয়ে পড়ে মারা গেছে। কেন লাফালো? আশ্রয়দাতাদের নিরাপত্তা থেকে কেন লাফিয়ে পড়লো মরবার জন্য, কোন্ আতঙ্কে? না, তার ব্যাখ্যা পুলিশ দিচ্ছে না। কিন্তু বলছে মেয়েটি মারা গেছে দেখে তাকে রাস্তার পাশে রেখে পুলিশ থানায় গিয়েছিল খবর দিতে।
প্রেসনোট বলে যে একটা জিনিস সরকারি কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জারি করা হয়; সেটাকে কেউ কখনো বিশ্বাস করে না। কিন্তু এই যে বিজ্ঞপ্তি, মেয়েটি স্বেচ্ছায় লাফিয়ে পড়ে মারা গেল এবং পুলিশ তাকে রাস্তার পাশে ফেলে রেখে থানায় গিয়ে খবর দিল এবং মেয়েটির কোন পরিচয় যেহেতু পুলিশের জানা ছিল না তাই কে সে কার মেয়ে এসব খবর সংগ্রহ করার চেষ্টা না করে তৎক্ষণাৎ তাকে বেওয়ারিশ বলে সনাক্ত করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের সাহায্যে চাপা দিল মাটির নিচে- এটি পড়ে বড় লজ্জা পেয়েছে মানুষ। সরকার নির্লজ্জ হতে পারে; কিন্তু মানুষের তো লজ্জা আছে।
তাই বলে খবর চাপা থাকেনি। আজকাল থাকে না। বেজিংয়ে বিশ্ব নারী সম্মেলন হচ্ছে, সেখানে মেয়েদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হবে; এই সময়ে এই খবর বাংলাদেশে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে, বহির্বিশ্বেও। ক’দিন আগে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ব্যবসায়ীদের কয়েকজন গিয়েছিলেন বিদেশে, প্রতিনিধি হয়ে। ফিরে এসে বলেছেন, বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি খুবই লজ্জাজনক। আমাদেরকে সবাই সোমালিয়ানদের মত সম্মানহীন মনে করে। ব্যবসায়ীরা আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, ওই ধারণা দূর করার জন্য তারা খুবই চেষ্টা করেছেন। এখন গেলে তারা মুশকিলে পড়তেন। বাংলাদেশী পুলিশের এই কাজের কি ব্যাখ্যা দেবেন ভেবে পেতেন না। ভ্যাবাচেকা খেতে হতো।
পুলিশের গাড়ি থেকে লাফিয়ে পড়ার ঘটনা অবশ্য এই প্রথম নয়। অহরহ ঘটছে। অতি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭৫-এর পয়লা জানুয়ারী। সিরাজ সিকদার লাফিয়ে পড়েছিলেন পুলিশের গাড়ি থেকে। তা তিনি লাফিয়ে পড়বেন এটা স্বাভাবিক ছিল বৈকি। অপরাধী ছিলেন মস্তবড়, আসামী ছিলেন বিচারের। পালানোর জন্য লাফ দিয়েছিলেন। নিরুপায় পুলিশ কি করবে, দিশেহারা হয়ে গুলি করতে বাধ্য হয়েছিল। বেচারা তাতে প্রাণ দিলেন। পরের দিন সেই ঘটনার ওপর সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি বের হয়েছিল। কেউ বিশ্বাস করেনি। মানুষ বরঞ্চ লজ্জা পেয়েছিল সেটি পড়ে। তাতে সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়েনি। সেই সরকার চলে গেছে। এখন যারা ক্ষমতায় আছে তারা প্রতিনিয়তই সেই সরকারের সমালোচনা করে, যেন তাদের ব্যর্থতাই এদের একমাত্র যোগ্যতা; কিন্তু বিশ বছর পরেও যে একই রকমের প্রেস বিজ্ঞপ্তি বের হচ্ছে এবং লজ্জায় পড়তে হচ্ছে মানুষকে, তার ব্যাখ্যা কি? বোঝা যাচ্ছে গত বিশ বছরে দেশে অভ্যুত্থান, নির্বাচন, সরকার বদল বহু কিছু হয়েছে বটে; কিন্তু কোন রদবদল হয়নি সরকারের চরিত্র। একই রয়ে গেছে। সে সময়ে আরো ঘটনা ঘটেছিল। বাসন্তীকে মাছ ধরার জাল পরতে হয়েছিল সম্ভ্রম রক্ষার জন্য। আজ আরেক বাসন্তীকে, ইয়াসমিনকে প্রাণ দিতে হলো ওই সম্ভ্রম বাঁচাতে গিয়েই। ওই বাসন্তী তবু প্রাণে বেঁচেছিল, এই বাসন্তী বাঁচলো না। ওর ঘটনা কতটা সত্য ছিল সে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে; এর ঘটনা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ নেই। এ শুয়ে আছে কবরের নিচে।
ঝড়ঝাপটা মেয়েদের ওপর দিয়েই যায় বেশি। বড় সহজে। সেজন্য মেয়েদের অবস্থা দেখেই বোঝা যায় বাদ-বাকিরা কেমন আছে। রুয়ান্ডা থেকে, বসনিয়া থেকে নারী নির্যাতনের ও মেয়েদের দূর্দশার যেসব খবর আসছে তাতে অন্য খবর আর দরকার করে না, ওই এক খবরই বলে দেয় বাকি সব খবর, জানিয়ে দেয় মানুষ সেখানে কেমন আছে। একাত্তর সালে পাকিস্তানী হানাদারদের বর্বরতা অনেক অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে ধরা পড়েছে, কিন্তু তদের মুখচ্ছবি যে দর্পণে সবচেয়ে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে সে হচ্ছে নারী নির্যাতন। পুরুষদের তবু দুষ্কৃতকারী বলবার মুখ ছিল তাদের, মেয়েদেরকে কি বলবে; মেয়েরা কোন্ বিপদ ঘটিয়েছিল কোথায় যে বন্যজন্তুর মত তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
নির্যাতনের অবশ্য নানা রূপ আছে। ভদ্রভাবেও নির্যাতন সম্ভব। ভদ্রতার আড়ালে। নিগ্রহের শিকার মেয়েরা পথেঘাটে হয়, নানাভাবে হয়। অগ্রসর দেশগুলোতে জরিপ নিলেই বের হয়ে আসে সেসব খবর। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে ছিল। যেমন ভাল সাবান পাওয়া যেত না, সুন্দর জুতোরও অপ্রতুলতা ছিল। কিন্তু সেখানে নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে—এমন খবর তাদের শত্রুপক্ষও দিতে পারত না। সেসব দেশ এখন ‘মুক্ত’ হয়েছে: বাজার ঢুকে পড়েছে তাদের সর্বত্র এবং সেই বাজারে মেয়েদের হয়রানি, মর্যাদাহানি, পণ্য হিসেবে তাদের ব্যবহার কোন কিছুরই আজ আর অবধি নেই। তাতেই বোঝা যায় উন্নতির মাশুল সাধারণ মানুষকে কিভাবে গুণতে হচ্ছে।
আমাদের দেশে মেয়েরা কেমন আছে দিনাজপুরে ইয়াসমিনের মৃত্যুই তা বলে দিল। প্রতিদিন খবর আসে মেয়েদের নিগ্রহের, আত্মহত্যার। তারা নিহত হয় পণ্যের জন্য। ধর্ষিত হয় নারী হওয়ার অপরাধে। গৃহপরিচারিকারা নির্যাতিত ও নিহত হয়। মোল্লারা ফতোয়া ছাড়ে। ভাত দিতে পারে না, বিচার করতে বসে। এসব খবর তো কিছু কিছু কাগজে আসে, যা একেবারেই আসে না তা হচ্ছে নীরব নির্যাতনের খবরগুলো। দরিদ্র পরিবারে তো বটেই, সম্পন্ন পরিবারেও মেয়েরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক। অযত্নে বাড়ে, পুষ্টিহীনতায় ভোগে। স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে না। পদে পদে দুর্বৃত্তরা পিছু নেয়। অপেক্ষাকৃত শান্তরা কটুকাটব্য করে। গলির পরে গলি উঠছে ঢাকা শহরে। ছেলেরাই মাঠ পায় না খেলার, পথ পায় না হাঁটার। মেয়েরা কি করবে, আটকা পড়ে থাকে ঘরের ভেতর, দিনের পর দিন। গ্রামের মেয়েদের পক্ষে ঘরের বের হওয়া মানেই অন্যায় কাজ করা। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষরা যে ভাল নেই এ আমরা সবাই জানি। অনেক রকম অসুবিধায় আছে তারা। সবচেয়ে বড় অসুবিধা এখন দাঁড়িয়েছে মানসিক স্বাচ্ছন্দ্যের অভাব। নিরাপদ বোধ করে না। কোথাও প্রকাশ্যে,. বহুক্ষেত্রে প্রচ্ছন্নভাবে তারা পাত্র হয় বৈষম্যের। সম্পত্তির ওপর চোখ রাখে প্রতিবেশী, পারলে গ্রাস করবে। অত্যন্ত বড় বিপদ মেয়েদের নিয়ে। দেশে এখন সব মেয়েই বিপন্ন; সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মেয়েদের বিপদটা আরো বেশি। বাবা-মা ভয় পায়। মেয়েরা নিজেরা তো বটেই।
ওদিকে পুলিশকে এদেশের লোকে কখনোই বন্ধু হিসাবে দেখবার সুযোগ পায়নি। পুলিশ হচ্ছে রাষ্ট্রের রক্ষীবাহিনী এবং রাষ্ট্র জনগণের পক্ষে নয়, জনগণের বিপক্ষে। এই বোধ মানুষের মনের গভীরে প্রোথিত। রাষ্ট্রের ভাঙাগড়া ঘটেছে। জনগণই করেছে ওই কাজ। কিন্তু রাষ্ট্র জনগণের মিত্র হয়নি। হয়নি যে তার অনেক প্রমাণ আছে। একেবারে প্রত্যক্ষ প্রমাণ পুলিশের আচরণ। পুলিশ ঘুষ খায়, এই প্রসিদ্ধি অতি প্রাচীন। সেটি এখনো দূর হয়নি। তার সঙ্গে যোগ হয়েছে এই অভিজ্ঞতা যে পুলিশ অন্যায় করে। পুলিশ আসতে দেখলে অত্যন্ত নিরীহ মানুষও (অপরাধী নয় এই অর্থে) অত্যন্ত আতঙ্কিত হয়। জানে উপকার করবে না, অপকার করবে। রাস্তায় দেখলে এরকম অনুভূতি জাগে যে ওত পেতে রয়েছে ঝাঁপিয়ে পড়বার অপেক্ষায়। সেই ভয়ঙ্কর ভাবমূর্তির গায়ে ভয়ঙ্কর আরো একটি মাত্রা যোগ হলো দিনাজপুরের ঘটনায়। ইয়াসমিনকে তারা পতিতা বলে চিহ্নিত করতে চেয়েছিল। যেন পতিতা মানুষ নয়, যেন পতিতার মৃত্যু, মৃত্যু নয়।
দিনাজপুরের মানুষ ওই ঘটনাকে মেনে নেয়নি। তারা অত্যন্ত সরবে এর প্রতিবাদ করেছে। তাতে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছে। আরো কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। সরকার এই হত্যাকান্ডকেও অতিরঞ্জিত বলে প্রচার করতে চেয়েছিল। এখন অবশ্য আর পারছে না। ঘটনাকে আচ্ছাদিত করবার মত পর্যাপ্ত কলাকৌশল খুঁজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না তাদের পক্ষে।
ওই শহরে যা ঘটেছে তার তাৎপর্য এক নয়, একাধিক। বড় তাৎপর্য এই যে, মানুষ ভাল নেই এবং ক্ষেপে আছে। বিরোধী দলগুলো যে বলে হরতালের মধ্য দিয়ে সরকারের প্রতি দেশবাসী তাদের অনাস্থা প্রকাশ করছে, এর উভয়াংশ সত্য না হলেও একাংশ যে সত্য তাতে কোন সন্দেহ নেই। সরকারের প্রতি মানুষের কোন আস্থা নেই। হরতাল মানুষ কতটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে করে, কতটা করে ভয়ে সে বিষয়ে সন্দেহ থাকলেও আস্থা থাকবার কারণ নেই। সরকারের পুলিশ যেখানে নারী নির্যাতনে অংশ নেয় এবং সরকার অপরাধীকে শাস্তি না দিয়ে তার অপরাধকে লুকাতে এবং উল্টো নির্যাতিতাকে কলঙ্কিত করতে সচেষ্ট হয় সেখানে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে এমন আশা বাতুলও করবে না। না, উন্নতির জোয়ারে মানুষ এখন মোটেই পোয়াবারো অবস্থায় নেই, বরঞ্চ খুবই তপ্ত অবস্থায় রয়েছে। বারুদের মতো তপ্ত। যে জন্য অগ্নির স্ফুলিঙ্গ পড়া মাত্র ফেটে পড়েছে। দিনাজপুরের তাপ ছিল কিছু বেশি, সেখানে দলীয়করণ ঘটেছিল মাত্রাতিরিক্ত পরিমাণে, মানুষ ক্ষেপেই ছিল, তাদের একটি মেয়েকে টহল পুলিশ তুলে নিয়ে লাঞ্ছি ত করেছে- এই খবরে তারা আগুনের মত জ্বলে উঠেছে। মাত্রার তফাৎ হতে পারে, কিন্তু দেশের সর্বত্রই মানুষ তপ্ত অবস্থাতেই রয়েছে।
কিন্তু মানুষ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করবে তার পথ নেই। ক্ষোভ রাজনৈতিক ও সংগঠিত উপায়েই প্রকাশ করার কথা; সেভাবেই সরকারকে পরাজিত করা সম্ভব। কিন্তু সেই রাস্তা বন্ধ। রাজনৈতিক দলগুলো রয়েছে তাদের নিজেদের ধান্ধায়। তাদের হরতাল বাসন্তী বা ইয়াসমিনদের স্বার্থে নয়, তাদের নিজেদের স্বার্থে। বাসন্তী ইয়াসমিনদের ভাগ্যে কি ঘটলো না ঘটলো সে নিয়ে থোড়াই তাদের মাথাব্যথা; মাথাব্যথা একটি ব্যাপারেই শুধু- কি করে ক্ষমতায় থাকা যায় কিংবা ক্ষমতায় আরোহণ করা যায়।
দিনাজপুরের বিস্ফোরণ তাই সুসংগঠিতভাবে হয়নি, ঘটেনি তা রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে। সমস্তটাই স্বতঃস্ফূর্ত এবং এরকম ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততার যে বিপদ তা এখানেও দেখা গেছে। প্রাণ দিতে হয়েছে; ভাঙচুর, লুটপাট—এসব ঘটেছে। ব্যক্তিগত শত্রুতা উদ্ধার করে নিয়েছে কেউ কেউ; স্থানীয় সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত ছিল কোন কোন মহল, তারা এই সুযোগে পত্রিকার অফিসকে আক্রমণের অন্যতম কেন্দ্র হিসাবে চিহ্নিত করে দিয়েছে, ফলে অফিস আক্রান্ত হয়েছে। সর্বোপরি সরকার আশা করতে পারছে যে, এটা হুজুগের ব্যাপার, ক’দিন পরেই কেটে যাবে; তখন যে যে সে সেই।
ব্যাপারটা সামাজিক নয়, রাজনৈতিক। যদি কোন ব্যক্তি ইয়াসমিনের মৃত্যুর জন্য দায়ী হতো তাহলে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হতো সেই ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া। অর্থাৎ ব্যাপারটা সমাজে ঘটলেও রূপ নিতো রাজনৈতিক। যেখানে রাষ্ট্রের আইনরক্ষাকারী বাহিনী নিজেই অপরাধী সেখানে ব্যাপারটাতো অতি অবশ্যি রাজনৈতিক। মানুষ সেটা জানে। সে জন্য বিক্ষোভের চরিত্র ছিল রাজনৈতিক, যদিও কোন রাজনৈতিক দল এর নেতৃত্বে ছিল না এবং না থাকার দরুণ রাজনৈতিক দল যে মানুষের জীবন থেকে কতটা দূরে তাই প্রমাণিত হয়েছে—আবারো, নতুন করে। রাষ্ট্রের বাইরে কিছুই নয়, অপরাধ তো নয়ই। রাষ্ট্রের উদ্ভবই হয়েছে অপরাধ দমনের প্রয়োজনে।
এক সময়ে রাষ্ট্র ছিল না। তখন মানুষ যে প্রাকৃতিক অবস্থায় ছিল তাকে কোন কোন দার্শনিক যতই স্বর্গরাজ্য বলে চিহ্নিত করুন না কেন, সে রাজ্য আসলে অমানবিকই ছিল: সেখানে জীবন ছিল নোংরা, হিংস্র ও স্বল্পস্থায়ী। সেই অবস্থা থেকে বাঁচার জন্যই মানুষ রাষ্ট্রের অধীনতা মেনে নিয়েছে এবং আশা করেছে যে রাষ্ট্র তাকে নিরাপত্তা দেবে। বলাবাহুল্য, খুব কম ক্ষেত্রেই রাষ্ট্র সে প্রত্যাশা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছে। কোন কোন দার্শনিক, যেমন হেগেল, আশা করতেন রাষ্ট্র হবে স্বাধীনতার রক্ষক। জাতীয় স্বাধীনতার বটেই, ব্যক্তি স্বাধীনতারও। ব্যক্তি স্বাধীনতা রাষ্ট্রেই শুধু সম্ভব, রাষ্ট্রের বাইরে নয়। কেননা রাষ্ট্রে থাকবে আইনের শাসন। রাজার জন্য যে আইন প্রজার জন্য সেই একই আইন। তারা বড় দার্শনিক ছিলেন ঠিকই, কিন্তু এই নির্মম সত্যটা খেয়াল করেননি যে, দুর্বল শ্রেণী তাহলে রাষ্ট্রের ভেতর যদি রাজা ও প্রজার ব্যবধান থাকে, থাকে প্রবল ও সেখানে আইন যতই মানবিক ও সাম্য ভিত্তিক হোক না কেন, আইনের প্রয়োগে বৈষম্য ঘটবে; দুর্বলই অপরাধী বলে চিহ্নিত হবে, তা সে অপরাধ করুক কিংবা না-ই করুক; প্রবলের সাত খুন মাফ হয়ে যাবে; যেমনটা আামদের সমাজে অহরহ ঘটছে।
তাহলে উপায় কি? এখন সিভিল সমাজের কথা খুব করে শোনা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে সিভিল সমাজকে শক্তিশালী করতে হবে। এই সমাজটা কোথায় থাকে? যেখানেই থাকুক, নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের বাইরে থাকে না। অলিগলির ভেতর সমাজ আছে। চৌরাস্তায় বসে আছে মস্তানের দল। যাবার সময় তাদেরকে সালাম, সালামি, চাঁদা এসব দিতে হবে। তারা মেয়েদেরকে দেখে মন্তব্য করবে, যখন ইচ্ছা হবে ধরে নিয়ে যাবে। তখন কি করা? অলিগলির বাসিন্দাদেরকে বলতে পারি আপনারা উন্নত হোন, প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। কিন্তু প্রতিরোধ গড়া যাবে না। কেননা মস্তানদের লোক আছে সমাজের ভেতরে। দ্বিতীয়ত কোন প্রতিরোধেই কাজ হবে না, কারণ মস্তানরা সশস্ত্র। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতে গেলে খুনোখুনি হবে। পুলিশ আসবে। এসে মস্তানদের না ধরে বরঞ্চ পাবলিককে ধরে নিয়ে যাবে। আর মস্তানদের ধরলেও দেখা যাবে তারা অবিলম্বে মুক্তি পেয়ে চলে আসছে, স্বস্থানে। কেননা তাদের যোগ আছে পুলিশের কিংবা সরকারের সঙ্গে। আর যদি একটি মস্তানদল উৎখাতও হয়ে যায় তবে অচিরেই অন্য আর এক দল চলে আসবে, যাদের পিছনে সরকারি সমর্থন থাকবে, এবং যাদেরকে উৎখাত করা আরো কঠিন হবে। সিভিল সমাজ অলিগলির ভদ্র বাসিন্দাদের মতই অসহায়। তাদেরকে উপদেশ দেয়া নিষ্ঠুরতার নামান্তর।
সিভিল সমাজকে শক্তিশালী করার কথা যারা বলেন, তারা জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে একটি বিপজ্জনক ফাঁদে পা দেন। সেটি হলো মানুষকে রাজনীতি বিমুখ করার ফাঁদ। কোনকিছুই রাষ্ট্রের বাইরে নয়। রাষ্ট্র যেমন পারে অপরাধকে দমন করতে, তেমনি পারে অপরাধকে লালন করতে। সবটাই নির্ভর করছে রাষ্ট্রের চরিত্রের ওপর। সেই চরিত্রে পরিবর্তন না এলে সমাজকে পরিবর্তিত করা যাবে না। ইংরেজ শাসনের সময়ে ওই সিভিল সমাজের কথাটা শোনা যেত; যদিও ভিন্নভাবে। বলা হতো রাজনীতির দরকার নেই, ইংরেজ আছে, থাকে যদি থাকুকগে, চল আমরা সমাজকে উন্নত করি। সেই উপদেশ সকলে শোনেনি। ভাগ্যিস শোনেনি। নইলে আজও আমরা ইংরেজদের অধীনেই থাকতাম। এখনো যে খুব মুক্ত তা অবশ্য নয়; তবে তখন বন্দিত্বের মাত্রা হতো আরও বেশি। সিভিল সমাজের কথাটা এখন সরবে না বললেও নীরবে বলছে কোন কোন মহল। তারা সমাজকে উন্নত করবে, রাষ্ট্র ক্ষমতায় তাদেরকে বসিয়ে রেখেই যারা গণবিরোধী, হৃদয়হীন এবং বিদেশী কর্তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি। এসব পরমার্শ মানুষ শুনবে না, যেমন দিনাজপুরের মানুষ শোনেনি, তারা ক্ষেপে গিয়ে রাস্তায় বের হয়ে পড়েছেন।
কিন্তু শুধু রাগ তো যথেষ্ট নয়। রেগে গিয়ে মানুষ জীবন দেয়, ভাঙচুর করে; কিন্তু তাতে ব্যবস্থা তো বদলায় না। ব্যবস্থা বদলবার জন্য রাজনৈতিক সংগঠন প্রয়োজন এবং সেই সংগঠনের নেতৃত্বে রাজনৈতিক আন্দোলন।
সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ০৫. ০৯. ১৯৯৫
(লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ সম্পাদিত ‘ইয়াসমিন: বিপ্লবহীনতার কালে একটি রক্তপাতের শিরোনাম’ থেকে নেওয়া)
.png)

শব্দ স্তব্ধ হয়ে যায়; কলমের নিব ভেঙে যায়; কম্পিউটারের পর্দা মৃত কালো হয়ে যায়; ‘চোখ ভিজে আসে, চোখ ভিজে যায়, চোখ ভেসে যায়’ সেই কবে ‘অন্তর্গত’ কথাকাব্যে এমত লিখেছিলাম এক ক্রন্দন-কথা; এখন মধ্যরাতে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং আমি দেখি আমার দু’চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল পড়ছে; আমার মেরুদন্ডে বরফ এবং আমার এই
২ ঘণ্টা আগে
আজ তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের চোখে নয়, সেই ছাত্রীর চোখ দিয়েও দেখতে চাই। তার রাজনৈতিক অবদানের মূল্যায়ন হোক যুক্তি ও ইতিহাসের আলোকে, তার মানবিক কাজের স্বীকৃতি আসুক মানবিকতার জায়গা থেকে।
১৬ ঘণ্টা আগে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে সম্প্রতি যে কথাগুলো এসেছে, তা শুনে যেকোনো বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হতবাক হতে বাধ্য। রাষ্ট্রের একজন মন্ত্রী, যিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখেন, তাঁর এমন বক্তব্য রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান,
১৮ ঘণ্টা আগে
শিল্পকারখানা একবার বন্ধ হয়ে গেলে তা আবার চালু করা কতটা কঠিন, তা বোঝা যায় বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানার সংখ্যার দিকে তাকালেই। দুই হাজারের বেশি কারখানা থেকে কমে সেই সংখ্যা এখন আটশোর ঘরে নেমে এসেছে।
১ দিন আগে