ড. খালিদুর রহমান

নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে প্রশংসামূলক কিছু লেখা যায়। তবে স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, প্রশংসার সীমা কোথায় শেষ হচ্ছে আর তোষামোদের শুরু কোথায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে ঘিরে অন্ধ প্রশংসার নজির কম নয়। ফলে কোনো রাজনৈতিক নেতার মানবিক দিক তুলে ধরলেও লেখকের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবু মানুষের প্রতি মানুষের দায়বোধ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বিপদের সময়ে সহমর্মিতা দেখানোর মূল্য রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে।
কারও রাজনৈতিক মত, সিদ্ধান্ত কিংবা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা থাকতে পারে; তাই বলে তার মানবিক কাজের স্বীকৃতি অস্বীকার করতে হবে, এমন নয়। একইভাবে রাজনৈতিক অবদান স্বীকার করাও তার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার সমান নয়। মানুষকে বিচার করতে হলে তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও আচরণের দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আমার এক নারী সহকর্মী তার শিক্ষকতা জীবনের এক মানবিক অভিজ্ঞতার কথা ফেসবুকে লিখেছেন। তার বিভাগের এক ছাত্রী বছর দুয়েক আগে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর ব্যক্তিগত সংকট নিয়ে তার কক্ষে আসে। মেয়েটি দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে বসে থাকে। শিক্ষক কাঁধে হাত রাখতেই সে কেঁদে ফেলে। ধীরে ধীরে জানা যায়, তার বাবা দুই কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নিয়মিত ডায়ালাইসিস করান এবং অসুস্থতার কারণে আর গাড়ি চালানোর কাজ করতে পারেন না। মা দুই বাসায় রান্নার কাজ করেন, ছোট ভাই স্কুলে পড়ে এবং ঢাকায় এক কক্ষের ভাড়া বাসায় সংসার চলে। চিকিৎসা, খাবার, বাসাভাড়া, ভাইয়ের পড়াশোনা এবং মেয়েটির বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ মিলিয়ে পরিবারটির প্রতিদিনের জীবন ছিল কঠিন সংগ্রাম।
শিক্ষক জানতে চান, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তার পড়াশোনার খরচ কীভাবে চলে। ছাত্রী জানায়, পঞ্চম শ্রেণি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত তার পড়াশোনার খরচ বহন করেছেন একজন ‘আঙ্কেল’, যার ব্যক্তিগত গাড়ি তার বাবা চালাতেন। কর্মজীবনের সম্পর্ক কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ববোধে পরিণত হতে পারে, সেই গল্প এখানেই। মেয়েটির শিক্ষা থেমে যায়নি, কারণ তার বাবার সাবেক নিয়োগকর্তা তার সন্তানের ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
শিক্ষক জানতে চান, এখন তো বাবার চাকরি নেই, সেই ব্যক্তির কাছে নতুন করে সাহায্য চাওয়া যায় কি না। ছাত্রী মাথা নিচু করে জানায়, বাবা আর গাড়ি চালাতে পারেন না, কিন্তু তার প্রতি সপ্তাহের ডায়ালাইসিসের খরচও সেই ‘আঙ্কেল’ বহন করেন। তাই নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচের জন্য আবার তার কাছে টাকা চাইতে তার সংকোচ হয়। কথাটির মধ্যে যেমন অসহায়তা আছে, তেমনি আছে আত্মমর্যাদাবোধ। সাহায্য গ্রহণ করেও মানুষ নিজের প্রয়োজনের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারে।
সহকর্মীর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই ছাত্রীর বাবার ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত। ফলে ব্যক্তিগত মানবিকতার এই গল্পটি তার রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। একজন রাজনৈতিক নেতাকে সাধারণত তার বক্তব্য, দলীয় অবস্থান, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে বিচার করা হয়। কিন্তু একজন মানুষের আরেকটি পরিচয় তৈরি হয় তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।
ছাত্রীটি শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের কাছে টিউশনি জোগাড় করে দেওয়ার অনুরোধ করেছিল। শিক্ষক তাকে টিউশনি জোগাড় করে দেন। নিজের শ্রমের বিনিময়ে পাওয়া সেই আয় দিয়েই মেয়েটি সিলেটে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ। সহায়তার সর্বোত্তম রূপ অনেক সময় কাউকে স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল করে রাখা নয়, বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া। সামান্য একটি টিউশনি একজন শিক্ষার্থীর জীবনপথে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অবশ্য শুধু এই ব্যক্তিগত মানবিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকেও খাটো করা হবে। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দলটির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ ছিলেন। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে দলীয় অবস্থান তুলে ধরা, সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপির গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, অবাধ নির্বাচন এবং রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত দাবিও বারবার সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতার প্রশ্নে তার ধারাবাহিক বক্তব্য। বিএনপির সংস্কার প্রস্তাবগুলোতেও নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও জবাবদিহিমূলক করার কথা বলা হয়েছে। এসব রাজনৈতিক অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। বিএনপির রাজনীতি এবং মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনাও গণতান্ত্রিক পরিসরের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থানকে ইতিহাসের আলোচনার বাইরে রাখা যায় না।
ন্যায্য রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নিজের পছন্দের মানুষের জন্য যে মানদণ্ড, প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা। আমরা প্রায়ই রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে পক্ষ ও বিপক্ষের সরল ছকে ভাগ করি। ফলে নিজের পছন্দের নেতার ভালো কাজ সহজেই প্রশংসিত হয়, অথচ অপছন্দের নেতার ভালো কাজ স্বীকার করতেও অনেকে সংকোচ বোধ করেন। এই মানসিকতা সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। একজন রাজনৈতিক নেতার মানবিক কাজের স্বীকৃতি তার সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমর্থন নয়। একইভাবে তার রাজনৈতিক অবদান স্বীকার করা তার প্রতি অন্ধ আনুগত্যও নয়।
মির্জা ফখরুলের সামনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখন আরও বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক জীবনে তিনি গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের কথা বলেছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সকল নাগরিকের প্রতি সমান মর্যাদা প্রদর্শনের দাবি রাখে। তার অতীতের রাজনৈতিক বক্তব্য তাই এখন শুধু ইতিহাসের বিষয় নয়; ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তা একটি নৈতিক প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যে ভরা দেশে মানবিক রাষ্ট্রের পাশাপাশি ন্যায্য রাজনৈতিক সংস্কৃতিও জরুরি। অবাধ ভোট, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। আবার মানবিকতা ছাড়া গণতন্ত্রও মানুষের জীবনে পূর্ণ অর্থ বহন করে না। একজন দরিদ্র শিক্ষার্থীর শিক্ষার পথ খোলা রাখা যেমন মানবিক রাষ্ট্রের প্রতীক, তেমনি একজন নাগরিকের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করাও ন্যায্য রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
সেই কারণে এই ছাত্রীর গল্পকে শুধু একজন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানানোর উপলক্ষ্য হিসেবে দেখলে এর গভীরতা কমে যাবে। এখানে আছে একজন অসুস্থ বাবার সংগ্রাম, একজন মায়ের শ্রম, একজন শিক্ষার্থীর আত্মমর্যাদা, একজন শিক্ষকের সহমর্মিতা এবং একজন সাবেক নিয়োগকর্তার দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ববোধ। পাশাপাশি আছে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্র ও ন্যায্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার দাবিতে অবস্থান নেওয়া একজন নেতার গল্প।
আজ তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের চোখে নয়, সেই ছাত্রীর চোখ দিয়েও দেখতে চাই। তার রাজনৈতিক অবদানের মূল্যায়ন হোক যুক্তি ও ইতিহাসের আলোকে, তার মানবিক কাজের স্বীকৃতি আসুক মানবিকতার জায়গা থেকে। দুই ক্ষেত্রেই অন্ধ সমর্থনের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ন্যায্য বিচার।
প্রত্যাশা থাকবে, ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেও মানুষের কষ্ট দেখার সেই চোখ অটুট থাকবে। রাজনৈতিক জীবনে যে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, সহনশীলতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার কথা বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে তার মর্যাদা আরও দৃঢ় হবে। রাষ্ট্র যেন শুধু ক্ষমতার প্রতিষ্ঠান না হয়ে নাগরিকের আশ্রয়ের জায়গা হয়। কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থী যেন অর্থের অভাবে স্বপ্ন হারিয়ে না ফেলে, কোনো অসুস্থ শ্রমজীবী যেন চিকিৎসার অভাবে অসহায় না হয়, আর কোনো নাগরিক যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু আইন, প্রশাসন কিংবা অর্থনীতিতে নয়; তার শক্তি নাগরিকের প্রতি মমতা, ন্যায়বোধ এবং সমান মর্যাদা প্রদানে। সেই মানবিকতা ও ন্যায্য রাজনীতির প্রত্যাশাতেই নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন।

নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে প্রশংসামূলক কিছু লেখা যায়। তবে স্বাভাবিকভাবেই অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, প্রশংসার সীমা কোথায় শেষ হচ্ছে আর তোষামোদের শুরু কোথায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে ঘিরে অন্ধ প্রশংসার নজির কম নয়। ফলে কোনো রাজনৈতিক নেতার মানবিক দিক তুলে ধরলেও লেখকের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবু মানুষের প্রতি মানুষের দায়বোধ, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বিপদের সময়ে সহমর্মিতা দেখানোর মূল্য রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে।
কারও রাজনৈতিক মত, সিদ্ধান্ত কিংবা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা থাকতে পারে; তাই বলে তার মানবিক কাজের স্বীকৃতি অস্বীকার করতে হবে, এমন নয়। একইভাবে রাজনৈতিক অবদান স্বীকার করাও তার প্রতিটি সিদ্ধান্তকে সমর্থন করার সমান নয়। মানুষকে বিচার করতে হলে তার প্রকাশ্য রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও আচরণের দিকটিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
আমার এক নারী সহকর্মী তার শিক্ষকতা জীবনের এক মানবিক অভিজ্ঞতার কথা ফেসবুকে লিখেছেন। তার বিভাগের এক ছাত্রী বছর দুয়েক আগে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর ব্যক্তিগত সংকট নিয়ে তার কক্ষে আসে। মেয়েটি দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে বসে থাকে। শিক্ষক কাঁধে হাত রাখতেই সে কেঁদে ফেলে। ধীরে ধীরে জানা যায়, তার বাবা দুই কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় নিয়মিত ডায়ালাইসিস করান এবং অসুস্থতার কারণে আর গাড়ি চালানোর কাজ করতে পারেন না। মা দুই বাসায় রান্নার কাজ করেন, ছোট ভাই স্কুলে পড়ে এবং ঢাকায় এক কক্ষের ভাড়া বাসায় সংসার চলে। চিকিৎসা, খাবার, বাসাভাড়া, ভাইয়ের পড়াশোনা এবং মেয়েটির বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ মিলিয়ে পরিবারটির প্রতিদিনের জীবন ছিল কঠিন সংগ্রাম।
শিক্ষক জানতে চান, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তার পড়াশোনার খরচ কীভাবে চলে। ছাত্রী জানায়, পঞ্চম শ্রেণি থেকে এইচএসসি পর্যন্ত তার পড়াশোনার খরচ বহন করেছেন একজন ‘আঙ্কেল’, যার ব্যক্তিগত গাড়ি তার বাবা চালাতেন। কর্মজীবনের সম্পর্ক কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ববোধে পরিণত হতে পারে, সেই গল্প এখানেই। মেয়েটির শিক্ষা থেমে যায়নি, কারণ তার বাবার সাবেক নিয়োগকর্তা তার সন্তানের ভবিষ্যৎকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।
শিক্ষক জানতে চান, এখন তো বাবার চাকরি নেই, সেই ব্যক্তির কাছে নতুন করে সাহায্য চাওয়া যায় কি না। ছাত্রী মাথা নিচু করে জানায়, বাবা আর গাড়ি চালাতে পারেন না, কিন্তু তার প্রতি সপ্তাহের ডায়ালাইসিসের খরচও সেই ‘আঙ্কেল’ বহন করেন। তাই নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচের জন্য আবার তার কাছে টাকা চাইতে তার সংকোচ হয়। কথাটির মধ্যে যেমন অসহায়তা আছে, তেমনি আছে আত্মমর্যাদাবোধ। সাহায্য গ্রহণ করেও মানুষ নিজের প্রয়োজনের সীমা সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারে।
সহকর্মীর বর্ণনা অনুযায়ী, ওই ছাত্রীর বাবার ব্যক্তিগত গাড়ির মালিক ছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। আজ তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অধিষ্ঠিত। ফলে ব্যক্তিগত মানবিকতার এই গল্পটি তার রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়। একজন রাজনৈতিক নেতাকে সাধারণত তার বক্তব্য, দলীয় অবস্থান, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে বিচার করা হয়। কিন্তু একজন মানুষের আরেকটি পরিচয় তৈরি হয় তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক, দায়িত্ববোধ এবং দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।
ছাত্রীটি শেষ পর্যন্ত শিক্ষকের কাছে টিউশনি জোগাড় করে দেওয়ার অনুরোধ করেছিল। শিক্ষক তাকে টিউশনি জোগাড় করে দেন। নিজের শ্রমের বিনিময়ে পাওয়া সেই আয় দিয়েই মেয়েটি সিলেটে থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই ঘটনাটিও গুরুত্বপূর্ণ। সহায়তার সর্বোত্তম রূপ অনেক সময় কাউকে স্থায়ীভাবে নির্ভরশীল করে রাখা নয়, বরং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া। সামান্য একটি টিউশনি একজন শিক্ষার্থীর জীবনপথে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অবশ্য শুধু এই ব্যক্তিগত মানবিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখলে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনকেও খাটো করা হবে। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন দলটির অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক মুখ ছিলেন। প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে দলীয় অবস্থান তুলে ধরা, সাংগঠনিক ঐক্য ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার রাজনৈতিক পথচলায় বিএনপির গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, অবাধ নির্বাচন এবং রাজনৈতিক অধিকারসংক্রান্ত দাবিও বারবার সামনে এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, নির্বাচনী ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ন্যায্যতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতার প্রশ্নে তার ধারাবাহিক বক্তব্য। বিএনপির সংস্কার প্রস্তাবগুলোতেও নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে আরও জবাবদিহিমূলক করার কথা বলা হয়েছে। এসব রাজনৈতিক অবস্থান বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। বিএনপির রাজনীতি এবং মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমালোচনাও গণতান্ত্রিক পরিসরের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু তার দীর্ঘ রাজনৈতিক ভূমিকা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থানকে ইতিহাসের আলোচনার বাইরে রাখা যায় না।
ন্যায্য রাজনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো নিজের পছন্দের মানুষের জন্য যে মানদণ্ড, প্রতিপক্ষের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা। আমরা প্রায়ই রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে পক্ষ ও বিপক্ষের সরল ছকে ভাগ করি। ফলে নিজের পছন্দের নেতার ভালো কাজ সহজেই প্রশংসিত হয়, অথচ অপছন্দের নেতার ভালো কাজ স্বীকার করতেও অনেকে সংকোচ বোধ করেন। এই মানসিকতা সুস্থ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর। একজন রাজনৈতিক নেতার মানবিক কাজের স্বীকৃতি তার সব রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সমর্থন নয়। একইভাবে তার রাজনৈতিক অবদান স্বীকার করা তার প্রতি অন্ধ আনুগত্যও নয়।
মির্জা ফখরুলের সামনে রাষ্ট্রপতি হিসেবে এখন আরও বড় পরীক্ষা। রাজনৈতিক জীবনে তিনি গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যের কথা বলেছেন। রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার দায়িত্ব দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সকল নাগরিকের প্রতি সমান মর্যাদা প্রদর্শনের দাবি রাখে। তার অতীতের রাজনৈতিক বক্তব্য তাই এখন শুধু ইতিহাসের বিষয় নয়; ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও তা একটি নৈতিক প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের মতো সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যে ভরা দেশে মানবিক রাষ্ট্রের পাশাপাশি ন্যায্য রাজনৈতিক সংস্কৃতিও জরুরি। অবাধ ভোট, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা, আইনের শাসন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না। আবার মানবিকতা ছাড়া গণতন্ত্রও মানুষের জীবনে পূর্ণ অর্থ বহন করে না। একজন দরিদ্র শিক্ষার্থীর শিক্ষার পথ খোলা রাখা যেমন মানবিক রাষ্ট্রের প্রতীক, তেমনি একজন নাগরিকের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করাও ন্যায্য রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব।
সেই কারণে এই ছাত্রীর গল্পকে শুধু একজন রাষ্ট্রপতিকে অভিনন্দন জানানোর উপলক্ষ্য হিসেবে দেখলে এর গভীরতা কমে যাবে। এখানে আছে একজন অসুস্থ বাবার সংগ্রাম, একজন মায়ের শ্রম, একজন শিক্ষার্থীর আত্মমর্যাদা, একজন শিক্ষকের সহমর্মিতা এবং একজন সাবেক নিয়োগকর্তার দীর্ঘমেয়াদি দায়িত্ববোধ। পাশাপাশি আছে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে গণতন্ত্র ও ন্যায্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার দাবিতে অবস্থান নেওয়া একজন নেতার গল্প।
আজ তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের চোখে নয়, সেই ছাত্রীর চোখ দিয়েও দেখতে চাই। তার রাজনৈতিক অবদানের মূল্যায়ন হোক যুক্তি ও ইতিহাসের আলোকে, তার মানবিক কাজের স্বীকৃতি আসুক মানবিকতার জায়গা থেকে। দুই ক্ষেত্রেই অন্ধ সমর্থনের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন ন্যায্য বিচার।
প্রত্যাশা থাকবে, ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেও মানুষের কষ্ট দেখার সেই চোখ অটুট থাকবে। রাজনৈতিক জীবনে যে গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, সহনশীলতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার কথা বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে তার মর্যাদা আরও দৃঢ় হবে। রাষ্ট্র যেন শুধু ক্ষমতার প্রতিষ্ঠান না হয়ে নাগরিকের আশ্রয়ের জায়গা হয়। কোনো দরিদ্র শিক্ষার্থী যেন অর্থের অভাবে স্বপ্ন হারিয়ে না ফেলে, কোনো অসুস্থ শ্রমজীবী যেন চিকিৎসার অভাবে অসহায় না হয়, আর কোনো নাগরিক যেন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়।
রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি শুধু আইন, প্রশাসন কিংবা অর্থনীতিতে নয়; তার শক্তি নাগরিকের প্রতি মমতা, ন্যায়বোধ এবং সমান মর্যাদা প্রদানে। সেই মানবিকতা ও ন্যায্য রাজনীতির প্রত্যাশাতেই নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন।
.png)

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে সম্প্রতি যে কথাগুলো এসেছে, তা শুনে যেকোনো বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হতবাক হতে বাধ্য। রাষ্ট্রের একজন মন্ত্রী, যিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখেন, তাঁর এমন বক্তব্য রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান,
৩ ঘণ্টা আগে
শিল্পকারখানা একবার বন্ধ হয়ে গেলে তা আবার চালু করা কতটা কঠিন, তা বোঝা যায় বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানার সংখ্যার দিকে তাকালেই। দুই হাজারের বেশি কারখানা থেকে কমে সেই সংখ্যা এখন আটশোর ঘরে নেমে এসেছে।
৭ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মন্ত্রিপরিষদ সচিব দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান হিসেবে মাননীয় (অব.) বিচারপতি এ.কে.এম. আসাদুজ্জামানের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই এ নিয়োগের পক্ষে-বিপক্ষে মতামত দিচ্ছেন এবং প্রশ্ন উঠেছে, নিয়োগ আইনসিদ্ধ হলো কিনা। বাংলাদেশে সংবিধানই রা
১ দিন আগে
বাংলাদেশ-ভারত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ঐতিহাসিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলেও, সাম্প্রতিককালে এতে এক কৌশলগত রূপান্তর বা 'প্যারাডাইম শিফট' ঘটেছে। ক্ষমতার পরিবর্তন, জনগণের মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর এবং নতুন পররাষ্ট্রনীতির আগমন এই বহুমাত্রিক সম্পর্ককে এক জটিল ও সংবেদনশীল মোড়ে এনে দাঁড় করিয়েছে।
২২ আগস্ট ২০২৬