আজ ২৪ আগস্ট ‘ইয়াসমিন হত্যা দিবস’ বা ‘নারী নির্যাতন ও প্রতিরোধ দিবস’।
১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট হতদরিদ্র কিশোরী ইয়াসমিনকে পুলিশ সদস্যরা জোরপূর্বক পুলিশ ভ্যানে তুলে দিনাজপুরের দশমাইল এলাকায় ধর্ষণের পর হত্যা করেন। এরপর লাশ রাস্তার পাশে ফেলে চলে যান। এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন দিনাজপুরবাসী। দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের দাবিতে উত্তাল দিনাজপুরে আন্দোলনরত জনতার ওপর গুলি চালায় পুলিশ। এতে অন্তত সাত ব্যক্তির মৃত্য হয়। ফুঁসে ওঠেন লেখক-কবি-বুদ্ধিজীবীরাও। তাঁদের প্রতিবাদী লেখাগুলো ছাপা হতে থাকে তৎকালীন সংবাদমাধ্যমগুলোতে। সব্যবাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের তেমনই একটি লেখা পুনর্মুদ্রিত হলো।
লেখা:

শব্দ স্তব্ধ হয়ে যায়; কলমের নিব ভেঙে যায়; কম্পিউটারের পর্দা মৃত কালো হয়ে যায়; ‘চোখ ভিজে আসে, চোখ ভিজে যায়, চোখ ভেসে যায়’ সেই কবে ‘অন্তর্গত’ কথাকাব্যে এমত লিখেছিলাম এক ক্রন্দন-কথা; এখন মধ্যরাতে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং আমি দেখি আমার দু’চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল পড়ছে; আমার মেরুদন্ডে বরফ এবং আমার এই রাত্রি আজ সূর্যোদয়ের চিরসম্ভাবনাহীন; আইজাক আসিমোভের ‘রাত্রিপাত’ বিজ্ঞান-কাহিনীতে যেমন— আমিও আজ সেই দূর কোনো গ্রহের অধিবাসীদের মতো অন্ধকার রাত্রির আসন্নতায় আমার সমস্ত কিছুতেই আগুন ধরিয়ে, বস্তুত আমার সভ্যতা, আমার অর্জন, আমার সকল উত্তরাধিকার দাহ করে আলো সৃষ্টি করবার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠতে চাই।
কিন্তু পড়ে থাকি বিছানায়; বাইরে রাতজাগা পাখির অকস্মাৎ চিৎকার হয় তালগাছের মাথায়; চোখ ভেসে যায়; ইয়াসমিন আখতারের মতো আমিও আমার দক্ষিণ উরুতে থাবার ও নখের নীল দাগ নিয়ে কবরে যেনবা শুয়ে থাকি।
২
ইয়াসমিন আখতার! আপনারা কি জানেন সে আমার কন্যা?
ঢাকা থেকে পদ্মা পেরিয়ে উত্তরে তার মায়ের কাছে যাবে ইয়াসমিন, দিনাজপুরে সে তার দেশের বাড়ি যাবে; নৈশ কোচে উঠেছিল সে; দিনাজপুরের কোচ না পেয়ে ঠাকুরগাঁয়ের কোচে উঠেছিলো; গভীর রাতে বর্ষার প্রমত্ত পদ্মা পাড়ি দিয়েছিল। কোচের হেলপার তাকে নামিয়ে দিয়েছিল মহাসড়কের ‘দশমাইল’ নামে পরিচিত একটি জায়গায়; বাসযাত্রীদের জন্য রাতজাগা পানের দোকানদার জাভেদ আলীকে কোচের হেলপার দোহাই দিয়ে বলেছিলো- মেয়েটিকে দিনাজপুরের বাসে তুলে দিও ভাই।
তখনো ভোর ভাঙেনি; তখনো সাদা সূতা থেকে আলাদা করে চেনা যায় না কালো সুতো; নামাজীরা সুবেহ সাদিকে আজানের আগে আল্পথ ভেঙে আসছে কাছেরই মসজিদের দিকে; তারা ইয়াসমিনকে দেখতে পায়; কেউ কেউ তার সঙ্গে কথা বলে; এই নিশীথে বাড়ন্ত কিশোরীকে একা দেখে তারা বিচলিত হয়; তারা প্রশ্ন করে ইয়াসমিন পানের দোকানে বসে অপেক্ষা করে ভোর হলে দিনাজপুরের বাসে উঠবে।
তারপরের কাহিনী আপনারা দৈনিক পত্রিকার পাতায় নিশ্চয়ই পড়েছেন; চোখ ভেসে যায়; আমি জানি, সে কাহিনী পড়বার পর— মানুষেরই চোখ ভেসে যায়, আপনাদেরও কন্যা হয়ে উঠেছে ইয়াসমিন আখতার; আমি বিশ্বাস করি, আপনি আপনার কন্যাটির দিকে তাকিয়ে আমারই মত দেখতে পাবেন ইয়াসমিন আখতারের মুখ।
ইয়াসমিন বলেছিল, না, আমি সকাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব, আমি বাসের অপেক্ষায় থাকবো- যখন টহলদার পুলিশের পিকআপ ভ্যান এসে থেমেছিলো জাভেদ আলীর পান দোকানের সমুখে আর তারা ইয়াসমিনকে দিনাজপুরে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলো তাদের গাড়িতে; কিন্তু তারা তো আশ্বাস দিয়েছিলো- এই অসময় অন্ধকারে একা এখানে তোমার বসে থাকাটা নিরাপদ নয়; ইয়াসমিনের বয়স কত? মাত্র চৌদ্দ, আর এই চৌদ্দ বছর বয়সেই তার পরিষ্কার জ্ঞান হয়ে গেছে যে নারীদেহ নিয়ে এ পৃথিবীতে কাকে বিশ্বাস করা যায় আর কাকে করা যায় না; কিন্তু তাকে উঠতে হয় পিকআপ ভ্যানে।
তারপর— চোখ ভিজে আসে- মহাসড়কের ওপর— চোখ ভেসে যায়- পড়ে তাকে এক জোড়া স্যান্ডেল, একটি রুমাল, একটি হাতপাখা আর কাঁচের ভাঙ্গা চুড়ি।
আর—আমার কন্যার মৃতদেহ।
দক্ষিণ উরুতে থাবা ও নখের নীল দাগ।
শুনেছি, নাকি বলা হয়েছে, ইয়াসমিন আখতার ছিলো পতিতা। পতিতা তো সে, যে অর্থের বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি করে? তবে আজ কে না পতিতা- রাজনীতিক, ঐতিহাসিক, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, প্রহরী, কে নয়? আপনি পতিত বলেই আমার কন্যাকে আপনি পতিতা বলেন নিজেকে অপতিত প্রমাণ করতে।
যান, গিয়ে দেখে আসুন—দিনাজপুর থেকে ‘দশমাইল’— এই দুইয়ের দূরত্বে পড়ে আছে আমাদের এই বাংলাদেশের বর্তমান।
৩
না, আজ আর আমার কোনো কথা নেই; আজ আর আমি আমার খাতার দিকে তাকাতে পারছি না; আজ আর আমি আমার লাইব্রেরীতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকদের লেখা মহৎ গ্রন্থগুলোর সমুখে দাঁড়াতে পারছি না; আজ আমার পুত্ররা প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত হয়েছে; আজ আমার দিবসের বুকের ওপর কারফিউ দাঁড়িয়ে আছে; আজ আমার জন্মের জন্য লজ্জা হচ্ছে।
কিন্তু কাল ভোরে আমি আবার জেগে উঠবো। আবার আমি কলম হাতে নেবো। আবার আমি অক্ষরের ভেতরে অগ্নির তাপ রচনা করবো। আবার আমি আমার অশ্রুর ভেতরে পদ্ম প্রকাশিত হতে দেখবো।
সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ০৭. ০৯. ১৯৯৫
(লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ সম্পাদিত ‘ইয়াসমিন: বিপ্লবহীনতার কালে একটি রক্তপাতের শিরোনাম’ থেকে নেওয়া)

শব্দ স্তব্ধ হয়ে যায়; কলমের নিব ভেঙে যায়; কম্পিউটারের পর্দা মৃত কালো হয়ে যায়; ‘চোখ ভিজে আসে, চোখ ভিজে যায়, চোখ ভেসে যায়’ সেই কবে ‘অন্তর্গত’ কথাকাব্যে এমত লিখেছিলাম এক ক্রন্দন-কথা; এখন মধ্যরাতে হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় এবং আমি দেখি আমার দু’চোখ বেয়ে অবিরল ধারায় জল পড়ছে; আমার মেরুদন্ডে বরফ এবং আমার এই রাত্রি আজ সূর্যোদয়ের চিরসম্ভাবনাহীন; আইজাক আসিমোভের ‘রাত্রিপাত’ বিজ্ঞান-কাহিনীতে যেমন— আমিও আজ সেই দূর কোনো গ্রহের অধিবাসীদের মতো অন্ধকার রাত্রির আসন্নতায় আমার সমস্ত কিছুতেই আগুন ধরিয়ে, বস্তুত আমার সভ্যতা, আমার অর্জন, আমার সকল উত্তরাধিকার দাহ করে আলো সৃষ্টি করবার জন্য উন্মাদ হয়ে উঠতে চাই।
কিন্তু পড়ে থাকি বিছানায়; বাইরে রাতজাগা পাখির অকস্মাৎ চিৎকার হয় তালগাছের মাথায়; চোখ ভেসে যায়; ইয়াসমিন আখতারের মতো আমিও আমার দক্ষিণ উরুতে থাবার ও নখের নীল দাগ নিয়ে কবরে যেনবা শুয়ে থাকি।
২
ইয়াসমিন আখতার! আপনারা কি জানেন সে আমার কন্যা?
ঢাকা থেকে পদ্মা পেরিয়ে উত্তরে তার মায়ের কাছে যাবে ইয়াসমিন, দিনাজপুরে সে তার দেশের বাড়ি যাবে; নৈশ কোচে উঠেছিল সে; দিনাজপুরের কোচ না পেয়ে ঠাকুরগাঁয়ের কোচে উঠেছিলো; গভীর রাতে বর্ষার প্রমত্ত পদ্মা পাড়ি দিয়েছিল। কোচের হেলপার তাকে নামিয়ে দিয়েছিল মহাসড়কের ‘দশমাইল’ নামে পরিচিত একটি জায়গায়; বাসযাত্রীদের জন্য রাতজাগা পানের দোকানদার জাভেদ আলীকে কোচের হেলপার দোহাই দিয়ে বলেছিলো- মেয়েটিকে দিনাজপুরের বাসে তুলে দিও ভাই।
তখনো ভোর ভাঙেনি; তখনো সাদা সূতা থেকে আলাদা করে চেনা যায় না কালো সুতো; নামাজীরা সুবেহ সাদিকে আজানের আগে আল্পথ ভেঙে আসছে কাছেরই মসজিদের দিকে; তারা ইয়াসমিনকে দেখতে পায়; কেউ কেউ তার সঙ্গে কথা বলে; এই নিশীথে বাড়ন্ত কিশোরীকে একা দেখে তারা বিচলিত হয়; তারা প্রশ্ন করে ইয়াসমিন পানের দোকানে বসে অপেক্ষা করে ভোর হলে দিনাজপুরের বাসে উঠবে।
তারপরের কাহিনী আপনারা দৈনিক পত্রিকার পাতায় নিশ্চয়ই পড়েছেন; চোখ ভেসে যায়; আমি জানি, সে কাহিনী পড়বার পর— মানুষেরই চোখ ভেসে যায়, আপনাদেরও কন্যা হয়ে উঠেছে ইয়াসমিন আখতার; আমি বিশ্বাস করি, আপনি আপনার কন্যাটির দিকে তাকিয়ে আমারই মত দেখতে পাবেন ইয়াসমিন আখতারের মুখ।
ইয়াসমিন বলেছিল, না, আমি সকাল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করব, আমি বাসের অপেক্ষায় থাকবো- যখন টহলদার পুলিশের পিকআপ ভ্যান এসে থেমেছিলো জাভেদ আলীর পান দোকানের সমুখে আর তারা ইয়াসমিনকে দিনাজপুরে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলো তাদের গাড়িতে; কিন্তু তারা তো আশ্বাস দিয়েছিলো- এই অসময় অন্ধকারে একা এখানে তোমার বসে থাকাটা নিরাপদ নয়; ইয়াসমিনের বয়স কত? মাত্র চৌদ্দ, আর এই চৌদ্দ বছর বয়সেই তার পরিষ্কার জ্ঞান হয়ে গেছে যে নারীদেহ নিয়ে এ পৃথিবীতে কাকে বিশ্বাস করা যায় আর কাকে করা যায় না; কিন্তু তাকে উঠতে হয় পিকআপ ভ্যানে।
তারপর— চোখ ভিজে আসে- মহাসড়কের ওপর— চোখ ভেসে যায়- পড়ে তাকে এক জোড়া স্যান্ডেল, একটি রুমাল, একটি হাতপাখা আর কাঁচের ভাঙ্গা চুড়ি।
আর—আমার কন্যার মৃতদেহ।
দক্ষিণ উরুতে থাবা ও নখের নীল দাগ।
শুনেছি, নাকি বলা হয়েছে, ইয়াসমিন আখতার ছিলো পতিতা। পতিতা তো সে, যে অর্থের বিনিময়ে নিজেকে বিক্রি করে? তবে আজ কে না পতিতা- রাজনীতিক, ঐতিহাসিক, ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, প্রহরী, কে নয়? আপনি পতিত বলেই আমার কন্যাকে আপনি পতিতা বলেন নিজেকে অপতিত প্রমাণ করতে।
যান, গিয়ে দেখে আসুন—দিনাজপুর থেকে ‘দশমাইল’— এই দুইয়ের দূরত্বে পড়ে আছে আমাদের এই বাংলাদেশের বর্তমান।
৩
না, আজ আর আমার কোনো কথা নেই; আজ আর আমি আমার খাতার দিকে তাকাতে পারছি না; আজ আর আমি আমার লাইব্রেরীতে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ লেখকদের লেখা মহৎ গ্রন্থগুলোর সমুখে দাঁড়াতে পারছি না; আজ আমার পুত্ররা প্রতিবাদ করতে গিয়ে নিহত হয়েছে; আজ আমার দিবসের বুকের ওপর কারফিউ দাঁড়িয়ে আছে; আজ আমার জন্মের জন্য লজ্জা হচ্ছে।
কিন্তু কাল ভোরে আমি আবার জেগে উঠবো। আবার আমি কলম হাতে নেবো। আবার আমি অক্ষরের ভেতরে অগ্নির তাপ রচনা করবো। আবার আমি আমার অশ্রুর ভেতরে পদ্ম প্রকাশিত হতে দেখবো।
সূত্র: দৈনিক সংবাদ, ০৭. ০৯. ১৯৯৫
(লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ সম্পাদিত ‘ইয়াসমিন: বিপ্লবহীনতার কালে একটি রক্তপাতের শিরোনাম’ থেকে নেওয়া)
.png)

হাঁড়ির ইন্সপেক্টর হবার দরকার করে না, একটা ভাত টিপে দেখাই যথেষ্ট। দিনাজপুরের ওই এক ঘটনাই সব খবর বলে দিচ্ছে। কিশোরী ইয়াসমিন মারা গিয়ে বলে গেলো আমরা কেউই ভাল নেই। ব্যাপার দুঃখের, ব্যাপার লজ্জারও। সরকার দুঃখ-লজ্জা এসব পাবে এমন ধারণা করা অন্যায়। কোন সরকারই পায়নি, এ সরকারও পাবে না।
৩২ মিনিট আগে
আজ তাই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের চোখে নয়, সেই ছাত্রীর চোখ দিয়েও দেখতে চাই। তার রাজনৈতিক অবদানের মূল্যায়ন হোক যুক্তি ও ইতিহাসের আলোকে, তার মানবিক কাজের স্বীকৃতি আসুক মানবিকতার জায়গা থেকে।
১৬ ঘণ্টা আগে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে সম্প্রতি যে কথাগুলো এসেছে, তা শুনে যেকোনো বোধবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ হতবাক হতে বাধ্য। রাষ্ট্রের একজন মন্ত্রী, যিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখেন, তাঁর এমন বক্তব্য রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি, নাগরিক অধিকার এবং আইনের শাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গান,
১৮ ঘণ্টা আগে
শিল্পকারখানা একবার বন্ধ হয়ে গেলে তা আবার চালু করা কতটা কঠিন, তা বোঝা যায় বিকেএমইএর সদস্যভুক্ত কারখানার সংখ্যার দিকে তাকালেই। দুই হাজারের বেশি কারখানা থেকে কমে সেই সংখ্যা এখন আটশোর ঘরে নেমে এসেছে।
১ দিন আগে