সবাই আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। ঠিক যেমন রাতের প্রচণ্ড ঝগড়ার পর সকালে উঠে স্বামী-স্ত্রী ভান করে যেন কিছুই ঘটেনি। দিনের আলো ফুটতেই স্বস্তির নেশায় সবাই আবার নিজের নিজের চেনা চেহারায় ফিরে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ঝানু ব্যবসায়ীর মতো আচরণ করছেন। তিনি বলছেন, ‘অনেক ইতিবাচক কাজ হবে! প্রচুর টাকা কামানো যাবে।’ কিয়ার স্টারমার তাঁর পুরোনো চরিত্রে ফিরে গেছেন। তিনি এখন ভূ-রাজনৈতিক ব্যাক-আপ প্ল্যানের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন। হরমুজ প্রণালি পুনরায় নিরাপদ করতে জোট গোছানোর চেষ্টা করছেন। ন্যাটো প্রধান মার্ক রুট বিশ্ব রাজনীতির ‘গেম অব থ্রোনস’-এর থিওন গ্রেজয়ের মতো আচরণ করছেন। তিনি ওয়াশিংটনে ছুটে যাচ্ছেন ট্রাম্পের কানে উদযাপনের কথা ফিসফিস করতে।
তারা সবাই চায় আমরা গতকালের বলা কথাগুলো ভুলে যাই। ‘একটা সভ্যতাকে এক রাতে ধ্বংস করার হুমকির’ কথা মনে রাখা এখন আর সুবিধাজনক হবে না। তার চেয়ে বরং শেয়ার বাজার স্থির হচ্ছে দেখে আমাদের আনন্দ পাওয়া উচিত। পেট্রোলের দাম স্বাভাবিক হচ্ছে দেখে স্বস্তি পাওয়া উচিত। সূর্যের দিকে তাকিয়ে ভান করা উচিত যে পৃথিবীটা আসলে যতটা খারাপ আমরা ভাবছি, তার চেয়ে ভালো। আমাদের উচিত নিজেদের নীতি-আদর্শকে ক্ষণস্থায়ী স্মৃতির সঙ্গেই মরতে দেওয়া।
কিন্তু আমি বলছি—আপনারা ভুলবেন না। ভোলা উচিত নয়। গত মঙ্গলবার সব নৈতিক সীমা অতিক্রম করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নামে লোকটা। আর আমরা যদি এখন ভান করি যে এমন কিছু ঘটেনি, তবে আমাদের প্রতিটি মূল্যবোধের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করব।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট গণহত্যার হুমকি দিয়েছেন। এই বাক্যের সঙ্গে কোনো ‘যদি’ বা ‘কিন্তু’ জুড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এর বিরুদ্ধে কোনো বৈধ পাল্টা যুক্তি নেই। এর সংজ্ঞায় কোনো অস্পষ্টতা নেই। তিনি মাত্র কয়েক শব্দে এই কাজ করেছেন। আমাদের অবশ্যই সেই শব্দগুলো আজীবন মনে রাখতে হবে।
ট্রাম্প এখন আমাদের বলবেন, তাঁর ওই কথাগুলো কাজ করেছে। তিনি বলবেন যে ওটা ছিল একটা চাল। তিনি দাবি করবেন, তারা জিতেছেন। তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গ ও মদদদাতারাও এই সুরে সুর মেলাবে। তারা জোর দিয়ে বলবে, ট্রাম্পের এই হুমকি আসলে একধরনের চতুর কৌশল। এই কৌশলের কারণেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া গেছে।
যুদ্ধবিরতি আলোচনায় কী কী শর্ত মানা হয়েছে সে সম্পর্কে কারও কোনো পরিষ্কার ধারণা নেই। সম্ভবত ওয়াশিংটন এবং তেহরানেরও নেই। কিন্তু প্রাথমিকভাবে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প ইরানের শান্তি পরিকল্পনাকে ‘কার্যকর’ বলে মেনে নিয়েছেন। সেই পরিকল্পনায় হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া প্রত্যেক জাহাজের জন্য ইরান প্রায় ২০ লাখ ডলার টোল আদায় করবে—এমন প্রস্তাবও আছে।
যদি এই কথা সত্যি হয়, তবে তা হবে ভিয়েতনামের সায়গনের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে বড় বেইজ্জতি। আলোচনার মাঝপথে ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন খামাখাই যুদ্ধ বাঁধিয়েছে। এতে হাজার হাজার মানুষের প্রাণ গেছে। কোটি কোটি টাকার গোলাবারুদ নষ্ট হয়েছে। এরপর ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। এখন যুদ্ধবিরতি হলেও ইরান আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে থাকবে। কারণ তারা ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর কার্যকর উপায় খুঁজে পেয়েছে।
আমেরিকান সাম্রাজ্য প্রমাণ করেছে যে তারা একগুঁয়ে, অযৌক্তিক, অগোছালো এবং ভরসাযোগ্য নয়।
তবে এত সব বেইজ্জতির মধ্যেও গত মঙ্গলবারের ট্রাম্পের দেওয়া সেই হুমকি আমাদের ভুলে গেলে চলবে না: ‘আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে।’ এই কথা ফিরিয়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে এই কথাকে মেলানোর কোনো উপায় নেই। অথচ বিশ্বনেতারা কার্যকরভাবে ঠিক সেই কাজটাই করেছেন।
ইউরোপীয় নেতারা কিছুই বলেননি। তাঁরা কিছুই করেননি। ছিলেন পুরোপুরি অকেজো। স্টারমার চুপ ছিলেন। ফ্রান্সের এমানুয়েল মাখোঁ চুপ ছিলেন। জার্মানির ফ্রিডরিখ মের্জ চুপ ছিলেন। ইউরোপীয় কাউন্সিলের সভাপতি আন্তোনিও কস্তাও নীরব ছিলেন।
বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধবিরোধী প্রকল্প হলো ইউরোপ। সংঘাতকে অসম্ভব করে তোলার জন্য ইতিহাসের সবচেয়ে দৃঢ় এবং উচ্চাভিলাষী প্রচেষ্টার নাম ইউরোপ। গত বিশ্বযুদ্ধের ছাই থেকে এর জন্ম। অথচ সেই একই পরিস্থিতি যখন আবার ফিরে আসছে, তখন ইউরোপ একদম বোবা হয়ে আছে। তারা পুরোপুরি নির্বাক, সম্পূর্ণ অকার্যকর এবং অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। এককথায় আশাহীন।
গতকাল কেবল পোপই বিশ্বনেতা হিসেবে যথাযথ আচরণ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সবাই জানি ইরানের পুরো জনগণের বিরুদ্ধে এই হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা অগ্রহণযোগ্য। এখানে অবশ্যই আন্তর্জাতিক আইনের বিষয় জড়িত আছে। তবে তার চেয়েও বড় কথা, জনগণের মঙ্গলের জন্য এটি একটি নৈতিক প্রশ্ন।’
বাকি সব জায়গায় ছিল শুধু নীরবতা। আর সেই নীরবতার মধ্যে লুকিয়ে আছে বিশ্বাসঘাতকতা। সারা জীবন ধরে আমরা নিজেদের যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছি, তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা। স্মৃতিস্তম্ভের পাশে দাঁড়িয়ে বা ইতিহাসের বই পড়ার সময় আমরা নিজেদের এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছি। দাদা-দাদির গল্প শোনার সময় বা হলোকাস্ট মিউজিয়াম পরিদর্শনের সময় আমরা বারবার বলেছি, ‘নেভার অ্যাগেইন’। আর কখনো নয়।
যদি আমরা সত্যিই এই ‘আর কখনো নয়’ কথায় বিশ্বাস করতাম, তবে এর রূপ কেমন হতো? আমরা কি কেবল ফাঁকা বুলি আওড়াতাম?
প্রথমেই আমাদের স্বীকার করতে হতো, বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকের মিল রয়েছে। আমাদের বুঝতে হতো, ক্ষমতায় একজন উন্মাদ বসে আছেন, যিনি ক্ষোভ এবং ষড়যন্ত্র তত্ত্ব দ্বারা চলেন। যিনি প্রকাশ্যে গণহত্যার ঘোষণা দিচ্ছেন।
দ্বিতীয়ত, এই নেতাকে একঘরে করতে এবং আটকাতে আমাদের সম্ভাব্য সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে হতো। আমরা রাজকীয় সফর বাতিলের মাধ্যমে এই কাজ শুরু করতে পারতাম। এরপর আমরা স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল তৈরি করতাম। যে কোনো মূল্যের বিনিময়েই হোক না কেন, আমরা নিজেদের যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বলয় থেকে বের করে আনতাম। এবং আমরা কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির দর্শনের প্রতি স্পষ্টভাবে এবং সর্বান্তকরণে সমর্থন জানাতাম। তাঁর দর্শন হলো প্রথাগত পরাশক্তির বাইরে গিয়ে মাঝারি শক্তির সঙ্গে সম্মানের ভিত্তিতে মানবিক কূটনীতি।
সবাই চাইবে আপনি যেন আজকের সকালের কথা ভুলে যান। সূর্য উঠেছে। তাৎক্ষণিক বিপদ কেটে গেছে। আসন্ন অর্থনৈতিক সংকট হয়তো এড়ানো গেছে। অন্তত কিছুটা কমানো গেছে। তারা সবাই ভান করতে চাইবে, ট্রাম্প ওই কথাগুলো কখনো বলেননি। এমন কিছু কখনো ঘটেইনি।
বাস্তবতা হলো, কথাগুলো বলা হয়েছে। ঘটনাগুলো ঘটেছে। এরপর আর পৃথিবী আগের মতো থাকতে পারে না।
লেখক: ব্রিটিশ লেখক এবং সাংবাদিক