leadT1ad

গমের উত্থান: বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা

স্ট্রিম গ্রাফিক

রাজধানী ঢাকার একটি সাধারণ সকাল। রাস্তার ধারে দাঁড়ানো ছোট বেকারির সামনে বেশ কিছু মানুষের ভিড় চোখে পড়ে। কর্মজীবী মানুষেরা দ্রুত নাশতা সারতে পাউরুটি বা রুটি কিনছেন, যা গম থেকে তৈরি। এই দৃশ্য শুধু শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, গ্রামাঞ্চলেও ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে।

খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তন গমের চাহিদাকে অভূতপূর্ব মাত্রায় বাড়িয়ে দিয়েছে, যা দেশের খাদ্য অর্থনীতিকে নতুন আকার দিচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এখন রেকর্ড পরিমাণ আমদানির আশায় রয়েছেন, কারণ দেশীয় উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। গমের এই উত্থান কেবল চাহিদার গল্প নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে বড় অর্থনৈতিক বাস্তবতা। এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং খাদ্য নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক, যা বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে গমের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। শহুরে কর্মব্যস্ততায় সহজে প্রস্তুত খাবারের দিকে মানুষের ঝোঁক বেড়েছে। রুটি, পাউরুটি, কেক, বিস্কুট, নুডলস এবং পাস্তার মতো পণ্যগুলো এখন দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক জরিপ থেকে জানা যায়, ২০২২ সালে একজন ব্যক্তির দৈনিক গমভিত্তিক খাবার গ্রহণ ২২ দশমিক ৯০ গ্রামে পৌঁছেছে, যা ২০১৬ সালের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। এই পরিবর্তন শুধু শহরে সীমাবদ্ধ নয়, গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ চালের উচ্চ দাম গ্রামীণ মানুষকে গমের দিকে ধাবিত করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে, গম এখন চালের পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য হয়ে উঠেছে। এটি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে নতুন গতি দিচ্ছে।

এই চাহিদা বৃদ্ধির পেছনে চালের দামের অস্বাভাবিক উত্থান একটি প্রধান কারণ। ২০২৫ সালে মোটা চালের দাম কেজিতে ৫০-৫৫ টাকায় উঠেছে, যেখানে খোলা আটার দাম ৪৫-৪৮ টাকা। এই দামের ফারাক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে গমভিত্তিক খাবারের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্য থেকে দেখা যায়, এই পরিবর্তন খাদ্য ব্যয় কমাতে সাহায্য করছে, কিন্তু একই সঙ্গে গমের চাহিদাকে ৭৫-৮০ লাখ টনে নিয়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্য সচেতনতা; ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ১ কোটি ৩১ লাখে পৌঁছেছে, যারা ভাতের পরিবর্তে রুটি পছন্দ করছেন। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে গমের ভূমিকা আরও বাড়বে, যা অর্থনৈতিক ভারসাম্যকে নতুন দিকনির্দেশনা দেবে।

শিল্প খাতের বিস্তার গমের চাহিদা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। পোলট্রি, মাছ চাষ এবং গবাদি পশুর ফিডে গম এবং তার উপজাত ভুসির ব্যবহার ২০২৫-২৬ সালে ৩ লাখ টনে উঠতে পারে। বেকারি, কনফেকশনারি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পগুলোতে গম কাঁচামাল হিসেবে বহুগুণ বেড়েছে। এই খাতগুলোর বৃদ্ধি অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু একই সঙ্গে আমদানির চাপ বাড়াচ্ছে। রপ্তানিও এখানে যুক্ত হয়েছে; গমভিত্তিক পণ্য যেমন বিস্কুট এবং কেক মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া এবং যুক্তরাজ্যে রপ্তানি বাড়ছে, যা অভ্যন্তরীণ চাহিদাকে আরও তীব্র করে তুলছে।

২০২৪ সালে রপ্তানি থেকে আয় ২০ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে, যা গমের আমদানিকে অনিবার্য করে তুলেছে। এই পরিবর্তন শুধু খাবারের অভ্যাস বদলাচ্ছে না, এটি দেশের অর্থনীতির গতি কোন দিকে যাচ্ছে—সেটারও ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু এর সঙ্গে যুক্ত ঝুঁকিগুলোকে সামলাতে হবে এক সঙ্গে।

দেশীয় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা এই চাহিদা বৃদ্ধির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে গমের আবাদ মাত্র ১১ লাখ টনের কাছাকাছি, যা মোট চাহিদার ১৩-১৫ শতাংশ মাত্র। জমির স্বল্পতা, কৃষকদের ধান এবং অন্যান্য ফসলের প্রতি আগ্রহ, রোগাক্রান্ততা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উৎপাদন বাড়াতে বাধা দিচ্ছে। ইউএসডিএ-র সাম্প্রতিক রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ২০২৫-২৬ বিপণন বছরে উৎপাদন আরও কমে ১০ লাখ টনের ঘরে থাকবে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখলে, আমদানির ওপর নির্ভরতা ৮৫-৮৭ শতাংশে পৌঁছেছে, যা খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বিষয়টি গভীরভাবে দেখলে, দেশীয় উৎপাদন না বাড়ালে আমদানির চাপ আরও বাড়বে, যা ডলার সংকট বা আন্তর্জাতিক অস্থিরতায় প্রভাবিত হতে পারে।

ব্যবসায়ীরা এই চাহিদা সামলাতে রেকর্ড আমদানির আশায় রয়েছেন, যা ২০২৫-২৬ সালে ৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন টনে পৌঁছতে পারে। ইউএসডিএ-র প্রক্ষেপণ অনুসারে, এটি আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। বিশ্ববাজারে গমের দাম কমে ২৩০-২৩৫ ডলার প্রতি টনে নেমেছে, যা আমদানিকে সহজতর করেছে। রাশিয়া থেকে সবচেয়ে বেশি আমদানি হচ্ছে, যেখানে প্রথম ৯ মাসে ২৭ লাখ টন এসেছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ৫ বছরের চুক্তিতে বার্ষিক ৭ লাখ টন আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে, যার অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ২ লাখ টনের বেশি চালান এসেছে। এই অবস্থান থেকে ভাবলে, বেসরকারি খাত ৯০ শতাংশ আমদানি করে, যা বাজারের সরবরাহ নিশ্চিত করছে। ব্যবসায়ীদের ধারণা, এই পরিমাণ আমদানি বাজারে স্বস্তি আনতে পারে, যদিও এর ফল কতটা ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাবে—সেটি এখনো খোলা প্রশ্ন।

অন্যদিকে, এই আমদানি নির্ভরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ উভয়ই সৃষ্টি করছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সাহায্য করছে, কিন্তু দামের প্রভাবও ফেলছে। মার্কিন গমের দাম ৩০৮ ডলার প্রতি টন, যেখানে রাশিয়ান গম ২২৬-২৩০ ডলারে পাওয়া যাচ্ছে। যদিও মানের পার্থক্য রয়েছে, তবুও এই বাড়তি খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপ ফেলতে পারে। তবে মনে রাখা দরকার যে এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি বাজার রক্ষা করছে, যা ৮ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি নিশ্চিত করছে। অথচ, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মতো সংকটে সরবরাহ ব্যাহত হলে ঝুঁকি বাড়বে। বিপরীতে দেখা যায় যে বিশ্ববাজারের স্থিতিশীলতা এখন আমদানিকে সহায়তা করছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি টেকসই হওয়া দরকার।

চালের উচ্চ দাম গ্রামীণ মানুষকে গমের দিকে ধাবিত করছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে, গম এখন চালের পর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য হয়ে উঠেছে। এটি অর্থনীতির বিভিন্ন খাতকে নতুন গতি দিচ্ছে।

তবে সত্য হলো যে এই চাহিদা বৃদ্ধি নিম্ন ও মধ্যবিত্তের খাদ্য ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমদানি না হলে ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা দাম বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি ঘটাতে পারে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের রিপোর্ট থেকে জানা যায়, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২০২৫ সালে ৮ শতাংশ ছাড়িয়েছে, যা গমের আমদানির ওপর নির্ভর করে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে যে সিন্ডিকেটের মতো অসৎ গ্রুপ দাম নিয়ন্ত্রণ করে কি না। এতে সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে পর্যাপ্ত আমদানি হলে দাম কমবে, কিন্তু বর্তমান নিরিখে খুচরা পর্যায়ে আটার দাম ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে। সাধারণ চোখেই বিষয়টি ধরা পড়ে যে এই চাপ নিম্নবিত্তদের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলছে, যা অর্থনৈতিক অসমতার কারণ হতে পারে।

এই বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে, গমের চাহিদা বৃদ্ধিকে তুলনামূলকভাবে দেখলে অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। ভারত বা পাকিস্তানে গমের উৎপাদন বেশি হলেও, বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে আমদানির নির্ভরতা বেশি। আইএমএফ-এর তথ্য থেকে দেখা যায়, এশিয়ায় খাদ্য আমদানির গড় ২০ শতাংশ বেড়েছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। যদিও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি ৩৪ শতাংশ বেড়েছে ২০২৪ সালে। তবু, এই তুলনায় বাংলাদেশের সুবিধা হলো বিশ্ববাজারের স্থিতিশীলতা, যা আমদানিকে সহজ করেছে। বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে অন্য দেশগুলোর মতো উন্নত জাতের গম চাষ না বাড়ালে চ্যালেঞ্জ বাড়বে।

এমন অবস্থায়, গমের চাহিদা বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করছে, কারণ এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করতে পারে। বিশ্ববাজারে গমের দাম কম থাকায় আমদানি সহজ হয়েছে, যা শিল্প খাতকে বাড়তে সাহায্য করছে। ইউএসডিএ-র সর্বশেষ আপডেট অনুসারে, ২০২৫-২৬ সালে আমদানি ৬ দশমিক ৭ মিলিয়ন টনে স্থির থাকবে, কিন্তু খরচ ৭ দশমিক ৭ মিলিয়ন টনে উঠবে, যা ১ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি। এই বৃদ্ধি রপ্তানি বাড়াতে সাহায্য করছে, যেমন গমভিত্তিক পণ্যের রপ্তানি ২২৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পরিকল্পনা ঠিক থাকলে গমের এই বাড়তি চাহিদাই অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করছে।

সুতরাং, দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে, যাতে এই সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়। উন্নত বীজ, আধুনিক চাষপদ্ধতি এবং কৃষকদের প্রণোদনা দিলে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন (এফএও)-এর পরামর্শ অনুসারে, বহুমুখী উৎস থেকে খাদ্য সংগ্রহ এবং স্থানীয় উৎপাদন জোরদার করা দরকার। তাই বলা যায় যে আমদানির পাশাপাশি সরকারি মনিটরিং এবং সিন্ডিকেট রোধ জরুরি। মোদ্দা কথা এই যে, এই সমন্বয় না হলে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়বে, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনায় এটি অর্থনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবে।

শেষ কথা এই যে, গমের চাহিদা বৃদ্ধি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সুযোগ এবং চ্যালেঞ্জ উভয়। রেকর্ড আমদানি যদি ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমায়, তাহলে এটি ইতিবাচক। সবশেষে বলা যায় যে সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়ে আমদানি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করলে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যাবে। সারকথা হলো, এই প্রক্রিয়া সময়োপযোগী হলে ভোক্তাদের চাপ কমবে এবং অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। এক কথায়, গমের এই উত্থানকে সঠিকভাবে পরিচালনা করলে বাংলাদেশের খাদ্য ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

তথ্যসূত্র:

1. USDA Foreign Agricultural Service (FAS) Grain and Feed Update, December 2025.

2. Bangladesh Bureau of Statistics (BBS) Household Income and Expenditure Survey, 2022-2023.

3. World Bank Global Economic Prospects Report, June 2025.

4. International Monetary Fund (IMF) World Economic Outlook, October 2025.

5. Food and Agriculture Organization (FAO) of the United Nations, Food Outlook Biannual Report, November 2025.

6. Trading Corporation of Bangladesh (TCB) Monthly Price Reports, 2025.

7. National Board of Revenue (NBR) Import Statistics, 2024-2025.

  • শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

(এই লেখাটি লেখকের ব্যক্তিগত বিশ্লেষণ ও মতামত, যা প্রকাশিত সরকারি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রচিত। এখানে উল্লিখিত মতামত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে বিবেচ্য নয়)

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত