বাংলাদেশ-চীন করিডর: নতুন সুযোগ, নাকি কৌশলগত ভারসাম্যের কঠিন পরীক্ষা

প্রকাশ : ০৮ জুলাই ২০২৬, ১৯: ৪০
স্ট্রিম গ্রাফিক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আঞ্চলিক সংযোগ কৌশল নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে। সফরকালে বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো, পানি ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি এবং কৌশলগত সহযোগিতা নিয়ে যেসব সমঝোতা ও আলোচনা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে প্রস্তাবিত চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (সিবিএমইসি)।

বহু বছর ধরে আলোচিত এই উদ্যোগ আবারও সামনে এসেছে এমন এক সময়ে, যখন দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি শুধু একটি অবকাঠামো প্রকল্পের নয়। এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ, ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সক্ষমতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ফলে করিডরটি নিয়ে উচ্ছ্বাস যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে যথেষ্ট সতর্কতারও কারণ।

বাংলাদেশ গত দুই দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু আগামী দশকের চ্যালেঞ্জ ভিন্ন। স্বল্পমূল্যের শ্রমনির্ভর অর্থনীতি থেকে উচ্চমূল্য সংযোজিত উৎপাদন, রপ্তানি বৈচিত্র্য, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগের দিকে অগ্রসর হতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে বৃহৎ আঞ্চলিক করিডরগুলো শুধু রাস্তা বা রেলপথ নয়; এগুলো মূলত অর্থনৈতিক ভূগোল পুনর্গঠনের প্রকল্প।

যদি সিবিএমইসি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের জন্য এর সম্ভাব্য অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিশাল। চট্টগ্রাম ও মাতারবাড়িকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী লজিস্টিকস নেটওয়ার্ক গড়ে উঠতে পারে। বাংলাদেশের শিল্পখাত নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে। পশ্চিম চীনের বাজার, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতি এবং বঙ্গোপসাগরীয় বাণিজ্যপথের মধ্যে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগবিন্দুতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে একটি সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই অবস্থানকে অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপান্তর করার ক্ষেত্রে দেশটি এখনও পুরোপুরি সফল হয়নি। করিডরভিত্তিক সংযোগ উদ্যোগ সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে পারে। ইতিহাস দেখায়, সিঙ্গাপুর, দুবাই কিংবা মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো তাদের ভৌগোলিক অবস্থানকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করে উন্নয়নের নতুন মডেল তৈরি করেছে। বাংলাদেশও একই ধরনের সম্ভাবনা ধারণ করে।

তবে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যত বড়, বাস্তব চ্যালেঞ্জও ততই জটিল। প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা মিয়ানমারকে ঘিরে। প্রস্তাবিত করিডরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রাখাইন রাজ্যের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করার কথা। কিন্তু আজকের বাস্তবতা হলো, মিয়ানমার রাজনৈতিক অস্থিরতা, গৃহযুদ্ধ এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। রাখাইন রাজ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত অনিশ্চিত। বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি আরও সংবেদনশীল, কারণ রোহিঙ্গা সংকটের কেন্দ্রবিন্দুও এই অঞ্চল। একদিকে বাংলাদেশ ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিচ্ছে; অন্যদিকে একই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তোলার আলোচনা চলছে। এই বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো পরিকল্পনা টেকসই হতে পারে না। আর তাই বাংলাদেশের উচিত করিডর আলোচনা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নভাবে না দেখা। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক করিডর কার্যকর হতে পারে না।

দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি ভূরাজনৈতিক। বর্তমান বিশ্বে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম প্রধান বাস্তবতা। এর পাশাপাশি ভারতও দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে নিজের প্রভাব বজায় রাখতে আগ্রহী। ফলে চীনের সহায়তায় নির্মিত যেকোনো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প স্বাভাবিকভাবেই বৃহত্তর কৌশলগত আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে শুধু প্রতিবেশী নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নদীর পানি বণ্টন, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি অপরিহার্য দেশ। এই প্রেক্ষাপটে চীনের উপস্থিতি বৃদ্ধিকে নয়াদিল্লি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে—এটি স্বাভাবিক।

বাংলাদেশের উচিত একটি জাতীয় সংযোগ ও লজিস্টিকস নীতি প্রণয়ন করা, যেখানে সিবিএমইসি, বিমসটেক, বঙ্গোপসাগরীয় বাণিজ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সংযোগকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে ওঠা নয়।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ। ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের মাধ্যমে ওয়াশিংটন এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পৃক্ততা বাড়াতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র অবকাঠামো উন্নয়নের বিরোধিতা করে না, তবে ঋণের স্থায়িত্ব, স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং কৌশলগত নির্ভরতার বিষয়ে নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করে থাকে।

বাংলাদেশের জন্য তাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা গভীর করা যায়, কিন্তু একই সঙ্গে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্যও বজায় রাখা যায়। এখানেই বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার পরীক্ষা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি হলো, দেশটি কখনোই নিজেকে কোনো একক শক্তির প্রভাববলয়ে আবদ্ধ করেনি। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিবর্তন ঘটেছে, কিন্তু বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে। আজকের বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বে এই কৌশল আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম উন্নয়ন অংশীদারদের একটি। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং শিল্পখাতে চীনের অবদান উল্লেখযোগ্য। একই সময়ে ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রধান গন্তব্য। জাপান মাতারবাড়ীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বার্থই হলো বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব বজায় রাখা, কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হওয়া নয়।

করিডর প্রশ্নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অর্থনৈতিক কার্যকারিতা। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগ নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক রয়েছে। কিছু প্রকল্প অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, আবার কিছু প্রকল্প প্রত্যাশিত ফল দেয়নি। এর কারণ সবসময় ঋণের উৎস নয়; বরং প্রকল্প পরিকল্পনা, সুশাসন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজার বিশ্লেষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি।

বাংলাদেশের জন্য মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত: প্রকল্পটি কি অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক? এটি কি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে? এটি কি রপ্তানি বৃদ্ধি করবে? এর পরিবেশগত প্রভাব কী হবে? অর্থায়নের শর্ত কতটা স্বচ্ছ? দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতিতে এর অবদান কতটা হবে? যদি এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর না থাকে, তাহলে শুধু ভূরাজনৈতিক উচ্ছ্বাসের ভিত্তিতে কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত হবে না।

একই সঙ্গে বাংলাদেশকে নিজের দীর্ঘমেয়াদি কানেক্টিভিটি ভিশনও স্পষ্ট করতে হবে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশের সহায়তায় বন্দর, মহাসড়ক, রেলপথ এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু এগুলোকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলের আওতায় আনতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া কঠিন হবে।

বাংলাদেশের উচিত একটি জাতীয় সংযোগ ও লজিস্টিকস নীতি প্রণয়ন করা, যেখানে সিবিএমইসি, বিমসটেক, বঙ্গোপসাগরীয় বাণিজ্য এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সংযোগকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে বিবেচনা করা হবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, কোনো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হয়ে ওঠা নয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। কিন্তু সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য প্রয়োজন বিচক্ষণতা, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তা। বাংলাদেশের সামনে এখন যে সুযোগ এসেছে, তা হয়তো আগামী কয়েক দশকের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরকে তাই শুধু চীনের প্রকল্প বা আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটিকে দেখতে হবে বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের আলোকে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটিই—এই করিডর কি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং আঞ্চলিক গুরুত্ব বৃদ্ধি করবে? বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত সেই উত্তর থেকেই আসা উচিত। কারণ সফল রাষ্ট্রগুলো বড় শক্তিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করে না; তারা নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পরিচালনা করে। বাংলাদেশেরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ সেটিই।

  • ড. নুরুল হুদা সাকিব: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Ad 300x250

সম্পর্কিত