লেখা:

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একটি মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় মাজারের প্রধান আবদুর রহমান ওরফে শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশে মাজার বা ওরসে হামলার ঘটনা নতুন নয়; কিন্তু মতাদর্শিক ভিন্নতার কারণে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার এই প্রবণতা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক এবং গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
কেউ একজন আপনার চেয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে পারেন, তার ধর্মীয় বা দার্শনিক বোঝাপড়া আপনার সাথে নাও মিলতে পারে। কিন্তু সেই ভিন্নমতের কারণে কাউকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। ধর্ম অবমাননার মতো সংবেদনশীল অভিযোগ যদি ওঠেও তার তদন্ত ও বিচারের ভার রাষ্ট্রের আইনি কর্তৃপক্ষ বা আদালতের। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, ‘নৈরাজ্য’, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
নিহত শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর মূলত ‘সুরেশ্বরী’ ধারার অনুসারী ছিলেন। বাংলাদেশে সুফিবাদের বহু ধারা প্রবহমান—চিশতিয়া, সুরেশ্বরী, সোহরাওয়ার্দিয়া, নকশবন্দিয়া, মাইজভান্ডারী ইত্যাদি। এই ধারাগুলোর মধ্যে চিন্তাগত ও চর্চাগত বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। যেমন, নকশবন্দিয়া তরিকার অনুসারীরা যেখানে শরিয়তের চর্চায় বেশি জোর দেন, চিশতিয়া বা সুরেশ্বরী ধারার অনুসারীরা সেখানে মারেফত বা আত্মিক তত্ত্বের দিকে বেশি আগ্রহী। আবার মাজার ও আখড়ার মধ্যেও পার্থক্য আছে; লালনের আখড়া আর মাইজভান্ডারীর মাজার এক নয়। বাংলার এই বৈচিত্র্যময় আধ্যাত্মিক ইতিহাস বহু পুরোনো।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে ‘সেক্যুলার বনাম ইসলামিস্ট’ বা ‘মৌলবাদ বনাম প্রগতিশীল’ বাইনারি তৈরি করা হয়েছে, তা মাজারকেন্দ্রিক সমাজেও প্রভাব ফেলেছে। অনেক মাজার অনুসারী মনে করেন প্রথাগত আলেম সমাজ তাদের শত্রু, আবার আলেম সমাজের একাংশও মাজারগুলোকে ইসলামের শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব মূলত আমাদের ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই একটি প্রতিফলন।
মাজারে প্রধানত সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরাই বেশি যান। এর পেছনে একটি বড় আর্থসামাজিক কারণ রয়েছে। যে মানুষটির আধুনিক হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই, যিনি অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তিনি একধরনের মুক্তির আশায় পিরের কাছে যান। তারা বিশ্বাস করেন, একটি ফুঁ বা পানি পড়ায় তাদের রোগমুক্তি ঘটবে।
তবে শুধু অভাবই একমাত্র কারণ নয়, স্পিরিচুয়াল বা আত্মিক তৃষ্ণাও একটি বড় কারণ। আধুনিক নিও-লিবারেল অর্থনীতি রাষ্ট্রকে এমনভাবে সাজিয়েছে, যেখানে নাগরিককে কেবলই ‘ভোক্তা’ বা কনজ্যুমার হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু মানুষ তো কেবল ভোক্তা নয়; তার প্রেম, ভালোবাসা, স্নেহ ও আত্মিক শান্তির প্রয়োজন রয়েছে।
মাজারগুলো ঐতিহাসিকভাবে সেই রুহানিয়াত বা আধ্যাত্মিক চর্চার বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। আধুনিক নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা ও অবিশ্বাসের বিপরীতে মাজারে তারা একটি প্রেমময় সম্পর্ক খুঁজে পান।
অন্যদিকে, যারা মাজার ভাঙতে বা হামলা করতে যায়, তাদের দিকে তাকালেও আমরা এক অদ্ভুত বাস্তবতা দেখতে পাই। কুষ্টিয়ার হামলায় যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এরা তথাকথিত ‘তৌহিদী জনতা’ বা কেবল মাদ্রাসার ছাত্র নয়; এদের অনেকেই আধুনিক পোশাকধারী সাধারণ তরুণ।
এই তরুণেরাও কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি চরম হতাশ। তারা দেখছে দেশে কর্মসংস্থান নেই, পুলিশ কাজ করে না, ন্যায়বিচার নেই। ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাগ্রস্ত এই তরুণেরাই যেকোনো উসকানিতে খুব সহজে মব বা উন্মত্ত জনতায় পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ, যারা মাজারে যাচ্ছে এবং যারা মাজারে হামলা করছে—উভয় পক্ষই আসলে আমাদের বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার শিকার।
শামীম রেজার ওপর হামলার পেছনে একটি ৩০ সেকেন্ডের খণ্ডিত ভাইরাল ভিডিওর ভূমিকা ছিল। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায় যে, ‘যারা কোরআন লিখেছে বা বিশ্বাস করে তারা মূর্খ’। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। মাজারের পির বা আধ্যাত্মিক নেতাদেরও এই ধরনের মন্তব্য করার ক্ষেত্রে অজ্ঞতা বা অসতর্কতা রয়েছে, যা জনরোষকে উসকে দেয়। ২০২১ সালেও তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মামলা হয়েছিল।
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়া যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা গভীর উদ্বেগের। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ডিজাইন করাই হয়েছে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে উসকে দিয়ে ভিউ বা এনগেজমেন্ট বাড়ানোর জন্য। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার সময় মিয়ানমারে ফেসবুক যেভাবে উসকানি ছড়িয়েছিল, বাংলাদেশেও আমরা বারবার তার পুনরাবৃত্তি দেখছি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে। গণমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, হামলাকারীরা আগের দিন থেকে সংগঠিত হচ্ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় উসকানি ছড়ানো হচ্ছিল। স্থানীয় প্রশাসন, ডিসি, ইউএনও কিংবা পুলিশ—সবাই বিষয়টি জানত। অনেকগুলো গ্রাম থেকে মানুষ জড়ো হয়ে দুপুরে হামলা চালাল, অথচ তাদের থামানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ল না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও কোনো তৎপরতা দেখা গেল না। এতগুলো বয়ঃসন্ধিকালীন ও তরুণ বয়সী ছেলেকে দীর্ঘ সময় ধরে মোবিলাইজ করা হলো, অথচ প্রশাসন নীরব দর্শক হয়ে রইল। এই নীরবতা প্রমাণ করে রাষ্ট্র কতটা ভঙ্গুর এবং জনগণের প্রতি কতটা দায়বদ্ধতাহীন।
১৯৭১ সালে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু জনগণের জন্য একটি কল্যাণমুখী ‘রাষ্ট্র’ আমরা আজও গঠন করতে পারিনি। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত—হোক তা স্বৈরাচারী এরশাদের আমল, নব্বইয়ের দশকের পরের গণতান্ত্রিক মোড়কের সরকার, কিংবা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান—সব ক্ষেত্রেই আমরা কেবল শাসকের পরিবর্তন দেখেছি। কিন্তু যে লুটেরা, আমলানির্ভর, বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র কাঠামো মানুষের অধিকার হরণ করে মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে, সেই কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয়নি।
রাজনীতিতে যেমন দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে, সমাজেও সেই নৈরাজ্যের বিস্তার ঘটেছে। জনগণ যখন দেখে পুলিশ কাজ করে না, আইনি ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার মেলে না, তখন তারা আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার ন্যায্যতা খোঁজে। জনগণের আস্থাহীনতার এই শূন্যস্থানটাই কাজে লাগাচ্ছে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো।
মাজার বা দরগা আমাদের ঐতিহ্যের গভীর শেকড়ে প্রোথিত। এটি মানুষের হৃদয়ের সাথে যুক্ত একটি শক্তিশালী ডিসকোর্স বা মতাদর্শ। পৃথিবীতে কোনো মতাদর্শকেই হামলা বা শক্তি প্রয়োগ করে ধ্বংস করা যায় না। বরং নিপীড়নের শিকার হলে সেই মতাদর্শ আরও শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। মাজারে হামলা করা মানে মানুষের রুহানিয়াতের ওপর, ভালোবাসার চর্চার ওপর এবং ধর্মচর্চার একটি নির্দিষ্ট মাধ্যমের ওপর হামলা করা, ঠিক যেমন মন্দির বা মসজিদে হামলা করা হয়। কোনো চিন্তাকে মোকাবেলা করতে হলে পাল্টা চিন্তা বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা দিয়েই তা করতে হবে, হাতুড়ি বা আগুন দিয়ে নয়।
মাজারে হামলাসহ সমাজের এই নৈরাজ্য বন্ধ করতে হলে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। এর মূল সমাধান লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মধ্যে। যতক্ষণ না আমরা একটি ‘প্রো-পিপল’ বা জনবান্ধব রাষ্ট্র কাঠামো, সংবিধান ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারব; যতক্ষণ না সমাজ ও অর্থনীতিতে মানুষের অধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে, ততক্ষণ এই নৈরাজ্য থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই।
রাষ্ট্রকে তার নাগরিকদের কেবল ভোক্তা নয়, মানবিক সত্তা হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। নয়তো আজ মাজারে যে আগুন জ্বলছে, কাল তা সমাজের অন্য কোনো দুর্বল অংশে আঘাত হানবে।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে একটি মাজারে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় মাজারের প্রধান আবদুর রহমান ওরফে শামীম রেজা জাহাঙ্গীরকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশে মাজার বা ওরসে হামলার ঘটনা নতুন নয়; কিন্তু মতাদর্শিক ভিন্নতার কারণে একজন মানুষকে পিটিয়ে হত্যার এই প্রবণতা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক এবং গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।
কেউ একজন আপনার চেয়ে ভিন্নভাবে চিন্তা করতে পারেন, তার ধর্মীয় বা দার্শনিক বোঝাপড়া আপনার সাথে নাও মিলতে পারে। কিন্তু সেই ভিন্নমতের কারণে কাউকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। ধর্ম অবমাননার মতো সংবেদনশীল অভিযোগ যদি ওঠেও তার তদন্ত ও বিচারের ভার রাষ্ট্রের আইনি কর্তৃপক্ষ বা আদালতের। কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া, ‘নৈরাজ্য’, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
নিহত শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর মূলত ‘সুরেশ্বরী’ ধারার অনুসারী ছিলেন। বাংলাদেশে সুফিবাদের বহু ধারা প্রবহমান—চিশতিয়া, সুরেশ্বরী, সোহরাওয়ার্দিয়া, নকশবন্দিয়া, মাইজভান্ডারী ইত্যাদি। এই ধারাগুলোর মধ্যে চিন্তাগত ও চর্চাগত বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। যেমন, নকশবন্দিয়া তরিকার অনুসারীরা যেখানে শরিয়তের চর্চায় বেশি জোর দেন, চিশতিয়া বা সুরেশ্বরী ধারার অনুসারীরা সেখানে মারেফত বা আত্মিক তত্ত্বের দিকে বেশি আগ্রহী। আবার মাজার ও আখড়ার মধ্যেও পার্থক্য আছে; লালনের আখড়া আর মাইজভান্ডারীর মাজার এক নয়। বাংলার এই বৈচিত্র্যময় আধ্যাত্মিক ইতিহাস বহু পুরোনো।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যে ‘সেক্যুলার বনাম ইসলামিস্ট’ বা ‘মৌলবাদ বনাম প্রগতিশীল’ বাইনারি তৈরি করা হয়েছে, তা মাজারকেন্দ্রিক সমাজেও প্রভাব ফেলেছে। অনেক মাজার অনুসারী মনে করেন প্রথাগত আলেম সমাজ তাদের শত্রু, আবার আলেম সমাজের একাংশও মাজারগুলোকে ইসলামের শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস ও দ্বন্দ্ব মূলত আমাদের ত্রুটিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই একটি প্রতিফলন।
মাজারে প্রধানত সমাজের প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষেরাই বেশি যান। এর পেছনে একটি বড় আর্থসামাজিক কারণ রয়েছে। যে মানুষটির আধুনিক হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার সামর্থ্য নেই, যিনি অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, তিনি একধরনের মুক্তির আশায় পিরের কাছে যান। তারা বিশ্বাস করেন, একটি ফুঁ বা পানি পড়ায় তাদের রোগমুক্তি ঘটবে।
তবে শুধু অভাবই একমাত্র কারণ নয়, স্পিরিচুয়াল বা আত্মিক তৃষ্ণাও একটি বড় কারণ। আধুনিক নিও-লিবারেল অর্থনীতি রাষ্ট্রকে এমনভাবে সাজিয়েছে, যেখানে নাগরিককে কেবলই ‘ভোক্তা’ বা কনজ্যুমার হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু মানুষ তো কেবল ভোক্তা নয়; তার প্রেম, ভালোবাসা, স্নেহ ও আত্মিক শান্তির প্রয়োজন রয়েছে।
মাজারগুলো ঐতিহাসিকভাবে সেই রুহানিয়াত বা আধ্যাত্মিক চর্চার বিকল্প কেন্দ্র হিসেবে কাজ করেছে। আধুনিক নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা ও অবিশ্বাসের বিপরীতে মাজারে তারা একটি প্রেমময় সম্পর্ক খুঁজে পান।
অন্যদিকে, যারা মাজার ভাঙতে বা হামলা করতে যায়, তাদের দিকে তাকালেও আমরা এক অদ্ভুত বাস্তবতা দেখতে পাই। কুষ্টিয়ার হামলায় যারা নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এরা তথাকথিত ‘তৌহিদী জনতা’ বা কেবল মাদ্রাসার ছাত্র নয়; এদের অনেকেই আধুনিক পোশাকধারী সাধারণ তরুণ।
এই তরুণেরাও কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি চরম হতাশ। তারা দেখছে দেশে কর্মসংস্থান নেই, পুলিশ কাজ করে না, ন্যায়বিচার নেই। ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশাগ্রস্ত এই তরুণেরাই যেকোনো উসকানিতে খুব সহজে মব বা উন্মত্ত জনতায় পরিণত হচ্ছে। অর্থাৎ, যারা মাজারে যাচ্ছে এবং যারা মাজারে হামলা করছে—উভয় পক্ষই আসলে আমাদের বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার শিকার।
শামীম রেজার ওপর হামলার পেছনে একটি ৩০ সেকেন্ডের খণ্ডিত ভাইরাল ভিডিওর ভূমিকা ছিল। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায় যে, ‘যারা কোরআন লিখেছে বা বিশ্বাস করে তারা মূর্খ’। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের দেশে এ ধরনের মন্তব্য অত্যন্ত সংবেদনশীল। মাজারের পির বা আধ্যাত্মিক নেতাদেরও এই ধরনের মন্তব্য করার ক্ষেত্রে অজ্ঞতা বা অসতর্কতা রয়েছে, যা জনরোষকে উসকে দেয়। ২০২১ সালেও তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার মামলা হয়েছিল।
তবে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সোশ্যাল মিডিয়া যেভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, তা গভীর উদ্বেগের। সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ডিজাইন করাই হয়েছে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে উসকে দিয়ে ভিউ বা এনগেজমেন্ট বাড়ানোর জন্য। ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যার সময় মিয়ানমারে ফেসবুক যেভাবে উসকানি ছড়িয়েছিল, বাংলাদেশেও আমরা বারবার তার পুনরাবৃত্তি দেখছি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে। গণমাধ্যমের রিপোর্ট বলছে, হামলাকারীরা আগের দিন থেকে সংগঠিত হচ্ছিল। সোশ্যাল মিডিয়ায় উসকানি ছড়ানো হচ্ছিল। স্থানীয় প্রশাসন, ডিসি, ইউএনও কিংবা পুলিশ—সবাই বিষয়টি জানত। অনেকগুলো গ্রাম থেকে মানুষ জড়ো হয়ে দুপুরে হামলা চালাল, অথচ তাদের থামানোর কোনো কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ল না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদেরও কোনো তৎপরতা দেখা গেল না। এতগুলো বয়ঃসন্ধিকালীন ও তরুণ বয়সী ছেলেকে দীর্ঘ সময় ধরে মোবিলাইজ করা হলো, অথচ প্রশাসন নীরব দর্শক হয়ে রইল। এই নীরবতা প্রমাণ করে রাষ্ট্র কতটা ভঙ্গুর এবং জনগণের প্রতি কতটা দায়বদ্ধতাহীন।
১৯৭১ সালে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু জনগণের জন্য একটি কল্যাণমুখী ‘রাষ্ট্র’ আমরা আজও গঠন করতে পারিনি। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত—হোক তা স্বৈরাচারী এরশাদের আমল, নব্বইয়ের দশকের পরের গণতান্ত্রিক মোড়কের সরকার, কিংবা চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান—সব ক্ষেত্রেই আমরা কেবল শাসকের পরিবর্তন দেখেছি। কিন্তু যে লুটেরা, আমলানির্ভর, বৈষম্যমূলক রাষ্ট্র কাঠামো মানুষের অধিকার হরণ করে মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করে, সেই কাঠামোর কোনো পরিবর্তন হয়নি।
রাজনীতিতে যেমন দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে, সমাজেও সেই নৈরাজ্যের বিস্তার ঘটেছে। জনগণ যখন দেখে পুলিশ কাজ করে না, আইনি ব্যবস্থায় ন্যায়বিচার মেলে না, তখন তারা আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার ন্যায্যতা খোঁজে। জনগণের আস্থাহীনতার এই শূন্যস্থানটাই কাজে লাগাচ্ছে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীগুলো।
মাজার বা দরগা আমাদের ঐতিহ্যের গভীর শেকড়ে প্রোথিত। এটি মানুষের হৃদয়ের সাথে যুক্ত একটি শক্তিশালী ডিসকোর্স বা মতাদর্শ। পৃথিবীতে কোনো মতাদর্শকেই হামলা বা শক্তি প্রয়োগ করে ধ্বংস করা যায় না। বরং নিপীড়নের শিকার হলে সেই মতাদর্শ আরও শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। মাজারে হামলা করা মানে মানুষের রুহানিয়াতের ওপর, ভালোবাসার চর্চার ওপর এবং ধর্মচর্চার একটি নির্দিষ্ট মাধ্যমের ওপর হামলা করা, ঠিক যেমন মন্দির বা মসজিদে হামলা করা হয়। কোনো চিন্তাকে মোকাবেলা করতে হলে পাল্টা চিন্তা বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা দিয়েই তা করতে হবে, হাতুড়ি বা আগুন দিয়ে নয়।
মাজারে হামলাসহ সমাজের এই নৈরাজ্য বন্ধ করতে হলে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। এর মূল সমাধান লুকিয়ে আছে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের মধ্যে। যতক্ষণ না আমরা একটি ‘প্রো-পিপল’ বা জনবান্ধব রাষ্ট্র কাঠামো, সংবিধান ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারব; যতক্ষণ না সমাজ ও অর্থনীতিতে মানুষের অধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে, ততক্ষণ এই নৈরাজ্য থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই।
রাষ্ট্রকে তার নাগরিকদের কেবল ভোক্তা নয়, মানবিক সত্তা হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। নয়তো আজ মাজারে যে আগুন জ্বলছে, কাল তা সমাজের অন্য কোনো দুর্বল অংশে আঘাত হানবে।

কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন স্ট্রিমের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ আর সেগুলো কাটিয়ে ওঠার উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
৩ ঘণ্টা আগে
রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো বিচার বিভাগ। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ সুশাসনের অন্যতম পূর্বশর্ত। কিন্তু জাতীয় সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় সংক্রান্ত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্
৮ ঘণ্টা আগে
এটা মূলত রাজনৈতিক ব্যাপার, কাজেই তারাই ব্যাপারটা দেখবেন। আবার রাজনীতির ব্যাপার হলেও এটা দেখা হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে। গত ৬ এপ্রিল বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাই কমিশনার দেখা করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে।
১ দিন আগে
ইরান যুদ্ধের সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য পাকিস্তান যখন বিশ্বনেতাদের প্রশংসায় ভাসছে, ঠিক সে সময়ে চীনের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান-আফগানিস্তান শান্তি আলোচনা অনেকটা নীরবেই শেষ হয়েছে। ইরান যুদ্ধের ডামাডোলে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সংঘাতের ঘটনা তেমন প্রচার পায়নি।
১ দিন আগে