লেখা:

উপমহাদেশের সংগীতের ইতিহাস কেবল সুর পরিবর্তনের ইতিহাস নয়। এই ইতিহাস এক বিশাল সামাজিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের গল্প। এই পরিবর্তনটি ছিল সংগীতকে তার ‘সামাজিক ও মরমী শিকড়’ থেকে উপড়ে ফেলে একটি ‘বিচ্ছিন্ন পণ্যে’ রূপান্তর করার প্রক্রিয়া।
মনে রাখতে হবে, ভারতীয় সংগীত সরাসরি জীবনবোধ ও সাধনার অংশ ছিল। সেই সাধনার ব্যাপকতা এমন ছিল যে মুসলিমদের আগমনের পর তাঁরাও সরাসরি এই সাধনার অংশ হয়ে নিজেরা এর রূপান্তরে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন। যার ফলে একই দরবারে নায়ক গোপাল ও তানসেন গায়ক ছিলেন। ছিলেন খেয়ালের স্রষ্টা বলে খ্যাত কবি, ঐতিহাসিক ও সংগীতজ্ঞ খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার প্রিয় শিষ্য আমির খসরু।
আশা ভোসলের মতো শিল্পীদের বুঝতে হলে ভারতীয় সংগীতের রূপান্তরের তিনটি প্রধান স্তরকে বুঝতে হবে।
ব্রিটিশ আমলের আগের হিন্দুস্তানে সংগীতচর্চা ছিল মূলত সামাজিক, আধ্যাত্মিক ও দরবারি সংস্কৃতির অংশ। তখন সংগীত ছিল মানুষের যাপনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। রাজদরবার, সুফি খানকাহ কিংবা মন্দির—সবই ছিল সংগীতচর্চার কেন্দ্র। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় সঞ্চারিত এই ধারাকে শিল্পীরা একজন বাহকের মতো পরম যত্নে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেন।
সেই সময়ে ‘ধ্রুপদ’, ‘খেয়াল’, ‘গজল’ বা ‘লোকসংগীত’—এগুলো আজকের মতো আলাদা বাজারজাত কোনো ‘ক্যাটাগরি’ ছিল না; বরং ছিল ধারাবাহিক নান্দনিক ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এর মূল্য নির্ধারিত হতো অভ্যন্তরীণ মানদণ্ডে—রাগদক্ষতা, লয়, বোধ এবং সাধনার গভীরতা দিয়ে। কোনো বাজারের চাহিদায় তখন সুর বাঁধা হতো না।
ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ এসে এই বহু পুরোনো ব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেখানে জাঁকিয়ে বসে ঔপনিবেশিক আধুনিকতা। প্রিন্ট-সংস্কৃতি, রেকর্ডিং প্রযুক্তি, শহরের নতুন মধ্যবিত্ত শ্রোতা এবং একটি ক্রমবর্ধমান পুঁজিবাদী বাজার মিলে সংগীতকে একটি ‘পণ্য’ বানিয়ে ফেলে।
আজকের ক্লাসিক্যাল, গজল বা ফিল্মি গানের যে শ্রেণিবিন্যাস, তা মূলত বাজারের প্রয়োজনেই তৈরি। এই সময়েই গজল ‘মেহফিল’ থেকে বের হয়ে গ্রামোফোন রেকর্ডে স্থায়ী রূপ পায়। এই ধারাতেই আমরা পাই উস্তাদ মেহদি হাসান বা উস্তাদ গুলাম আলী খানকে। একই সময়ে ধ্রুপদী সংগীত সিনেমার মাধ্যমে জনপ্রিয় হতে শুরু করে, যার ধারক হিসেবে উঠে আসেন আশা ভোসলে, মোহাম্মদ রাফি, লতা মঙ্গেশকর কিংবা তালাত মাহমুদের মতো কিংবদন্তিরা।
এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা শিল্পীদের কণ্ঠে এক ধরনের ‘দ্বৈততা’ লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা একদিকে ধ্রুপদী সংগীতের শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন, অন্যদিকে আধুনিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছিলেন। বোম্বে ফিল্মি দুনিয়ায় যখন আশা ভোসলে গাওয়া শুরু করেন, সেখানে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ থাকলেও শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা এতটুকু কমেনি। নওশাদ, গুলাম মুহাম্মদ বা খৈয়ামের মতো সুরকাররা কড়াভাবে শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য রক্ষা করে চলতেন।
তবে মনে রাখতে হবে, উস্তাদ বড় গুলাম আলী খাঁ থেকে পণ্ডিত ভীমসেন জোশী—সবারই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ব্রিটিশ উপনিবেশের ভেতরে। তাঁরা কোনো ‘বিশুদ্ধ প্রাক-ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের’ প্রতিনিধি নন, বরং সেই ভাঙন-পরবর্তী সময়েরই মানুষ।
একই সময়ে বামপন্থী কবি ও গীতিকাররা (যেমন কাইফি আজমি, মজরুহ সুলতানপুরি, সাহির লুধিয়ানভি) সিনেমার গানকে ব্যক্তিগত বিরহ-বেদনার গণ্ডি থেকে বের করে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষায় রূপান্তর করেন। ফলে সংগীত এখানে দ্বৈত ভূমিকা পালন করে: একদিকে বাজারের পণ্য, অন্যদিকে বিপ্লবের মাধ্যম।
আশা ভোসলে ছিলেন এই উপনিবেশ-উত্তর পুঁজিবাদী সংগীত-সংস্কৃতির ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের প্রতীক। যেখানে হাজার বছরের পুরোনো সাধনা আর আধুনিক পেশাদারিত্ব এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। তাঁর এই যাত্রাকে বুঝতে হলে তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটটি দেখা জরুরি।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে নারী চরিত্র বা গায়িকাদের অবস্থান ছিল সামাজিকভাবে অবমাননাকর। সেই সময় গান বা অভিনয়ের সাথে যুক্ত নারীরা মূলত আসতেন তাওয়ায়েফ বা বাইজি বাড়ি থেকে। ‘ভদ্রবিত্ত’ পরিবার থেকে মেয়েদের সিনেমায় আসা ছিল অকল্পনীয়। ঠিক এই জায়গায় আশা ভোসলে এবং তাঁর দিদি লতা মঙ্গেশকর ছিলেন এক বিশাল ব্যতিক্রম। তাঁরা এসেছিলেন পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের মতো এক প্রথিতযশা শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও থিয়েটার ব্যক্তিত্বের ঘরানাদার পরিবার থেকে। বাইজি সংস্কৃতির সেই ‘সামাজিক হেয়’ তকমা মুছে ফেলে প্লেব্যাক সিংগিং-কে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পেছনে এই পরিবারের সংগ্রাম ছিল অপরিসীম।
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই: পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর যখন মারা যান, লতা মঙ্গেশকরের বয়স ছিল মাত্র ১৩ এবং আশা আরও ছোট। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে রাতারাতি এই ঘরানাদার পরিবারটি পথে বসার উপক্রম হয়। আভিজাত্য থাকলেও পকেটে পয়সা ছিল না। কিশোরী বয়সেই দুই বোনকে কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল পুরো পরিবারের দায়িত্ব। তাঁদের সেই জীবন ছিল স্রেফ দুবেলা দুমুঠো ভাতের সংস্থান করার লড়াই। ১৯৪০-এর দশকে ‘ভদ্রঘরের’ মেয়েদের জন্য সিনেমার ‘হালকা’ গান গাওয়াকে সমাজ ভালো চোখে দেখত না। লতা ও আশাকে একদিকে সিনেমার ভেতরের সেই নিচু নজরের সাথে লড়তে হয়েছে, আবার বাইরের সমাজের ‘জাত গেল’ অপবাদের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছে।
আশার ব্যক্তিগত অগ্নিপরীক্ষা: আশা ভোসলের সংগ্রাম ছিল দিদি লতার চেয়েও কঠিন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে বিয়ে করে ঘর ছাড়েন তিনি। সেই বিয়ে টেকেনি। চরম লাঞ্ছনা আর অভাবের মধ্যে তিন সন্তানকে নিয়ে তাঁকে আবার রাস্তায় দাঁড়াতে হয়েছিল। মঙ্গেশকর পরিবারের আভিজাত্য থেকে ছিটকে পড়ে একদম শূন্য থেকে শুরু করার এই লড়াই ছিল এক যুদ্ধ।
সংগীতের জগতে তখন লতা মঙ্গেশকরের একচ্ছত্র আধিপত্য। সমস্ত বড় মিউজিক ডিরেক্টর এবং রোমান্টিক গান ছিল লতার জন্য সংরক্ষিত। আশার সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল দিদির অনুকরণ না করে নিজের আলাদা একটি ‘সিগনেচার’ তৈরি করা। লতা যখন ‘ভদ্র’ ও ‘সতী-সাধ্বী’ নায়িকার কণ্ঠ হয়ে উঠলেন, আশা তখন বাধ্য হয়েই বেছে নিলেন ক্যাবারে, ক্লাব ড্যান্স আর চটুল গান—যাকে সমাজ তখন ‘খারাপ মেয়ের গান’ বলত। সেই ‘ভ্যাম্প’ বা ‘খারাপ মেয়ে’র কণ্ঠকে নিজের সাধনা দিয়ে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, আবার ‘উমরাও জান’-এর মতো সিনেমায় গজল গেয়ে প্রমাণ করা যে তিনি দিদির চেয়ে কোনো অংশে কম নন। এটি ছিল এক দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক ও পেশাদারী যুদ্ধ।
আশা ভোঁসলে ও তাঁর পরিবার প্রমাণ করেছিলেন যে, একজন নারী তাওয়ায়েফ না হয়েও, একটি অত্যন্ত সম্মানীয় শাস্ত্রীয় ঘরানা থেকে এসেও চলচ্চিত্রের গানকে উচ্চমার্গের শিল্পে রূপান্তর করতে পারেন। তাঁর জীবন ও সংগীত আসলে সেই ইতিহাসেরই প্রতিধ্বনি, যেখানে ঐতিহ্য আধুনিকতার সাথে সন্ধি করে, আর ব্যক্তিগত সংগ্রাম হয়ে ওঠে সামাজিক রূপান্তরের মহাকাব্য।

উপমহাদেশের সংগীতের ইতিহাস কেবল সুর পরিবর্তনের ইতিহাস নয়। এই ইতিহাস এক বিশাল সামাজিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের গল্প। এই পরিবর্তনটি ছিল সংগীতকে তার ‘সামাজিক ও মরমী শিকড়’ থেকে উপড়ে ফেলে একটি ‘বিচ্ছিন্ন পণ্যে’ রূপান্তর করার প্রক্রিয়া।
মনে রাখতে হবে, ভারতীয় সংগীত সরাসরি জীবনবোধ ও সাধনার অংশ ছিল। সেই সাধনার ব্যাপকতা এমন ছিল যে মুসলিমদের আগমনের পর তাঁরাও সরাসরি এই সাধনার অংশ হয়ে নিজেরা এর রূপান্তরে প্রত্যক্ষ ভূমিকা রেখেছিলেন। যার ফলে একই দরবারে নায়ক গোপাল ও তানসেন গায়ক ছিলেন। ছিলেন খেয়ালের স্রষ্টা বলে খ্যাত কবি, ঐতিহাসিক ও সংগীতজ্ঞ খাজা নিজামউদ্দিন আউলিয়ার প্রিয় শিষ্য আমির খসরু।
আশা ভোসলের মতো শিল্পীদের বুঝতে হলে ভারতীয় সংগীতের রূপান্তরের তিনটি প্রধান স্তরকে বুঝতে হবে।
ব্রিটিশ আমলের আগের হিন্দুস্তানে সংগীতচর্চা ছিল মূলত সামাজিক, আধ্যাত্মিক ও দরবারি সংস্কৃতির অংশ। তখন সংগীত ছিল মানুষের যাপনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। রাজদরবার, সুফি খানকাহ কিংবা মন্দির—সবই ছিল সংগীতচর্চার কেন্দ্র। গুরু-শিষ্য পরম্পরায় সঞ্চারিত এই ধারাকে শিল্পীরা একজন বাহকের মতো পরম যত্নে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেন।
সেই সময়ে ‘ধ্রুপদ’, ‘খেয়াল’, ‘গজল’ বা ‘লোকসংগীত’—এগুলো আজকের মতো আলাদা বাজারজাত কোনো ‘ক্যাটাগরি’ ছিল না; বরং ছিল ধারাবাহিক নান্দনিক ও আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এর মূল্য নির্ধারিত হতো অভ্যন্তরীণ মানদণ্ডে—রাগদক্ষতা, লয়, বোধ এবং সাধনার গভীরতা দিয়ে। কোনো বাজারের চাহিদায় তখন সুর বাঁধা হতো না।
ব্রিটিশ উপনিবেশবাদ এসে এই বহু পুরোনো ব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়। রাজদরবারের পৃষ্ঠপোষকতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর সেখানে জাঁকিয়ে বসে ঔপনিবেশিক আধুনিকতা। প্রিন্ট-সংস্কৃতি, রেকর্ডিং প্রযুক্তি, শহরের নতুন মধ্যবিত্ত শ্রোতা এবং একটি ক্রমবর্ধমান পুঁজিবাদী বাজার মিলে সংগীতকে একটি ‘পণ্য’ বানিয়ে ফেলে।
আজকের ক্লাসিক্যাল, গজল বা ফিল্মি গানের যে শ্রেণিবিন্যাস, তা মূলত বাজারের প্রয়োজনেই তৈরি। এই সময়েই গজল ‘মেহফিল’ থেকে বের হয়ে গ্রামোফোন রেকর্ডে স্থায়ী রূপ পায়। এই ধারাতেই আমরা পাই উস্তাদ মেহদি হাসান বা উস্তাদ গুলাম আলী খানকে। একই সময়ে ধ্রুপদী সংগীত সিনেমার মাধ্যমে জনপ্রিয় হতে শুরু করে, যার ধারক হিসেবে উঠে আসেন আশা ভোসলে, মোহাম্মদ রাফি, লতা মঙ্গেশকর কিংবা তালাত মাহমুদের মতো কিংবদন্তিরা।
এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা শিল্পীদের কণ্ঠে এক ধরনের ‘দ্বৈততা’ লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা একদিকে ধ্রুপদী সংগীতের শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন, অন্যদিকে আধুনিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছিলেন। বোম্বে ফিল্মি দুনিয়ায় যখন আশা ভোসলে গাওয়া শুরু করেন, সেখানে আধুনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ থাকলেও শাস্ত্রীয় সংগীতের গভীরতা এতটুকু কমেনি। নওশাদ, গুলাম মুহাম্মদ বা খৈয়ামের মতো সুরকাররা কড়াভাবে শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য রক্ষা করে চলতেন।
তবে মনে রাখতে হবে, উস্তাদ বড় গুলাম আলী খাঁ থেকে পণ্ডিত ভীমসেন জোশী—সবারই জন্ম ও বেড়ে ওঠা ব্রিটিশ উপনিবেশের ভেতরে। তাঁরা কোনো ‘বিশুদ্ধ প্রাক-ঔপনিবেশিক ঐতিহ্যের’ প্রতিনিধি নন, বরং সেই ভাঙন-পরবর্তী সময়েরই মানুষ।
একই সময়ে বামপন্থী কবি ও গীতিকাররা (যেমন কাইফি আজমি, মজরুহ সুলতানপুরি, সাহির লুধিয়ানভি) সিনেমার গানকে ব্যক্তিগত বিরহ-বেদনার গণ্ডি থেকে বের করে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের ভাষায় রূপান্তর করেন। ফলে সংগীত এখানে দ্বৈত ভূমিকা পালন করে: একদিকে বাজারের পণ্য, অন্যদিকে বিপ্লবের মাধ্যম।
আশা ভোসলে ছিলেন এই উপনিবেশ-উত্তর পুঁজিবাদী সংগীত-সংস্কৃতির ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের প্রতীক। যেখানে হাজার বছরের পুরোনো সাধনা আর আধুনিক পেশাদারিত্ব এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। তাঁর এই যাত্রাকে বুঝতে হলে তৎকালীন সামাজিক প্রেক্ষাপটটি দেখা জরুরি।
ভারতীয় চলচ্চিত্রের শুরুর দিকে নারী চরিত্র বা গায়িকাদের অবস্থান ছিল সামাজিকভাবে অবমাননাকর। সেই সময় গান বা অভিনয়ের সাথে যুক্ত নারীরা মূলত আসতেন তাওয়ায়েফ বা বাইজি বাড়ি থেকে। ‘ভদ্রবিত্ত’ পরিবার থেকে মেয়েদের সিনেমায় আসা ছিল অকল্পনীয়। ঠিক এই জায়গায় আশা ভোসলে এবং তাঁর দিদি লতা মঙ্গেশকর ছিলেন এক বিশাল ব্যতিক্রম। তাঁরা এসেছিলেন পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকরের মতো এক প্রথিতযশা শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী ও থিয়েটার ব্যক্তিত্বের ঘরানাদার পরিবার থেকে। বাইজি সংস্কৃতির সেই ‘সামাজিক হেয়’ তকমা মুছে ফেলে প্লেব্যাক সিংগিং-কে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার পেছনে এই পরিবারের সংগ্রাম ছিল অপরিসীম।
অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই: পণ্ডিত দীননাথ মঙ্গেশকর যখন মারা যান, লতা মঙ্গেশকরের বয়স ছিল মাত্র ১৩ এবং আশা আরও ছোট। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে রাতারাতি এই ঘরানাদার পরিবারটি পথে বসার উপক্রম হয়। আভিজাত্য থাকলেও পকেটে পয়সা ছিল না। কিশোরী বয়সেই দুই বোনকে কাঁধে তুলে নিতে হয়েছিল পুরো পরিবারের দায়িত্ব। তাঁদের সেই জীবন ছিল স্রেফ দুবেলা দুমুঠো ভাতের সংস্থান করার লড়াই। ১৯৪০-এর দশকে ‘ভদ্রঘরের’ মেয়েদের জন্য সিনেমার ‘হালকা’ গান গাওয়াকে সমাজ ভালো চোখে দেখত না। লতা ও আশাকে একদিকে সিনেমার ভেতরের সেই নিচু নজরের সাথে লড়তে হয়েছে, আবার বাইরের সমাজের ‘জাত গেল’ অপবাদের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়েছে।
আশার ব্যক্তিগত অগ্নিপরীক্ষা: আশা ভোসলের সংগ্রাম ছিল দিদি লতার চেয়েও কঠিন। মাত্র ১৬ বছর বয়সে পরিবারের অমতে বিয়ে করে ঘর ছাড়েন তিনি। সেই বিয়ে টেকেনি। চরম লাঞ্ছনা আর অভাবের মধ্যে তিন সন্তানকে নিয়ে তাঁকে আবার রাস্তায় দাঁড়াতে হয়েছিল। মঙ্গেশকর পরিবারের আভিজাত্য থেকে ছিটকে পড়ে একদম শূন্য থেকে শুরু করার এই লড়াই ছিল এক যুদ্ধ।
সংগীতের জগতে তখন লতা মঙ্গেশকরের একচ্ছত্র আধিপত্য। সমস্ত বড় মিউজিক ডিরেক্টর এবং রোমান্টিক গান ছিল লতার জন্য সংরক্ষিত। আশার সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল দিদির অনুকরণ না করে নিজের আলাদা একটি ‘সিগনেচার’ তৈরি করা। লতা যখন ‘ভদ্র’ ও ‘সতী-সাধ্বী’ নায়িকার কণ্ঠ হয়ে উঠলেন, আশা তখন বাধ্য হয়েই বেছে নিলেন ক্যাবারে, ক্লাব ড্যান্স আর চটুল গান—যাকে সমাজ তখন ‘খারাপ মেয়ের গান’ বলত। সেই ‘ভ্যাম্প’ বা ‘খারাপ মেয়ে’র কণ্ঠকে নিজের সাধনা দিয়ে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, আবার ‘উমরাও জান’-এর মতো সিনেমায় গজল গেয়ে প্রমাণ করা যে তিনি দিদির চেয়ে কোনো অংশে কম নন। এটি ছিল এক দীর্ঘ মনস্তাত্ত্বিক ও পেশাদারী যুদ্ধ।
আশা ভোঁসলে ও তাঁর পরিবার প্রমাণ করেছিলেন যে, একজন নারী তাওয়ায়েফ না হয়েও, একটি অত্যন্ত সম্মানীয় শাস্ত্রীয় ঘরানা থেকে এসেও চলচ্চিত্রের গানকে উচ্চমার্গের শিল্পে রূপান্তর করতে পারেন। তাঁর জীবন ও সংগীত আসলে সেই ইতিহাসেরই প্রতিধ্বনি, যেখানে ঐতিহ্য আধুনিকতার সাথে সন্ধি করে, আর ব্যক্তিগত সংগ্রাম হয়ে ওঠে সামাজিক রূপান্তরের মহাকাব্য।

বাংলাদেশকে বলা হয় ‘বারো আউলিয়ার দেশ’। ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে সুফি সাধকরা এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচার করতে শুরু করেন। তাঁদের প্রয়াণের পর তাঁদের সমাধিস্থল বা মাজারগুলো কেন্দ্র করে এক ধরনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে। মূলত আধ্যাত্মিক সাধনা, মানসিক শান্তি এবং লৌকিক মানত পূরণের আশায় মানুষ এসব মাজারে ভিড় করে।
২ ঘণ্টা আগে
প্রিয় পাঠক, আপনার জন্য দেয়া হলো আশা ভোসলের গাওয়া ১০টি জনপ্রিয় বাংলা গানের তালিকা; শিল্পীকে মনে রেখে যোগ করতে পারেন আপনার প্লে-লিস্টে।
৩ ঘণ্টা আগে
আশা ভোসলের প্রথম প্লেব্যাক ছিল ১৯৪৩ সালে। তখন বয়স মাত্র ১০ বছর। গানটি ছিল মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাল’। গানের নাম ‘চলা চলা নব বালা’। এরপর ১৯৪৮ সালে ‘চুনারিয়া’ ছবির ‘সাওয়ান আয়া’ গান দিয়ে বলিউডের চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক গায়িকা হিসেবে অভিষেক ঘটে। তবে শুরুর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না।
৩ ঘণ্টা আগে
ভারতীয় সংগীত জগতের কিংবদন্তি আশা ভোসলে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কয়েক প্রজন্মের এই প্রিয় শিল্পীর মৃত্যুতে যেন সুরের একটি যুগের অবসান হলো। ৮০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ২০ ভাষায় ১২ হাজারেরও বেশি গান গেয়ে তিনি জয় করেছেন অগণিত মানুষের হৃদয়।
৫ ঘণ্টা আগে