পঞ্চানন কর্মকার কি জানতেন— ‘অ’ থেকে OMG, হুগলি থেকে Hashtag, পুঁথি থেকে Post হবে?
১৭৭৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পশ্চিমবঙ্গের হুগলির ছাপাখানায় ধাতব শরীর পাওয়া সেই বাংলা হরফ আজ বইয়ের পাতা পেরিয়ে পৌঁছে গেছে আমাদের স্মার্টফোনের স্ক্রিনে, কমেন্ট বক্সে, মিমে, ক্যাপশনে ও হ্যাশট্যাগ-এ। এই লেখায় লেখক ফিরে দেখার চেষ্টা করেছেন বাংলা অক্ষরের আড়াইশো বছরের সেই অভিনব যাত্রা— যেখানে ইতিহাস শুধু ছাপাখানা বা বইয়ের পাতায় থেমে নেই; বরং আজকের পোস্ট, স্ক্রিনশট, ইমোজি ও মিম-সংস্কৃতির মধ্যেও তার দীর্ঘ ছায়া রয়ে গেছে। গণযোগাযোগের পরিবর্তিত তত্ত্ব ও বাস্তবতার আলোকে, খানিকটা মজা আর জেন-জেড দৃষ্টিভঙ্গিতে, এই লেখায় অনুসন্ধান করা হয়েছে—পঞ্চানন কর্মকারের হাতে গড়া সেই ‘অ’ যদি আজকের ডিজিটাল পৃথিবীতে এসে দাঁড়াত, তবে সে আমাদের যোগাযোগের এই নতুন পৃথিবীকে কীভাবে দেখত? লিখেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতার শিক্ষক, নিউ মিডিয়া ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিষয়ক গবেষক রাজীব নন্দী।

এক মিনিট! পঞ্চানন কর্মকার মশাই যে পরিশ্রম করে ধাতু পিটিয়ে ‘অ’ গড়েছিলেন, সেই ধাতব অক্ষরটি যদি আজকের ফেসবুক দেখত, তাহলে কী বলত?
সম্ভবত প্রথমেই একটু অবাক হয়ে বলত, “আমাকে বানাতে এত আগুন, এত ধাতু, এত খাটুনি—আর এখন আমাকে দিয়ে কী সব লেখা হচ্ছে!”
তারপর একটু স্ক্রল করত। দেখত, সেই একই বাংলা অক্ষর দিয়ে কেউ প্রেম করছে, কেউ ব্রেকআপের ঘোষণা দিচ্ছে, কেউ রাত দুইটায় জীবন নিয়ে দার্শনিক হয়ে উঠছে, আবার কেউ একটি বিড়ালের ছবির নিচে লিখছে—“এইটাই আমি, যখন স্যার বলে কালকে ভাইভা।”
সেখানেই হয়তো বাংলা অক্ষর বুঝতে পারত— সময় বদলেছে, মাধ্যম বদলেছে, কিন্তু মানুষের কথা বলার নেশা বদলায়নি। আজ ৬ সেপ্টেম্বর। ১৭৭৮ সালের এই দিনে বাংলা মুদ্রণ হরফের ইতিহাসে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তার সঙ্গে আজকের মিম, স্ট্যাটাস, কমেন্ট, রিলের ক্যাপশন কিংবা “Seen করে রিপ্লাই দেয় না কেন?”—এর সম্পর্ক প্রথমে শুনতে একটু অদ্ভুত লাগতে পারে। কিন্তু আসলে সম্পর্কটা বেশ গভীর। কারণ গণযোগাযোগের ইতিহাস কেবল বড় বড় সংবাদপত্র, রাষ্ট্রীয় ঘোষণা বা বিখ্যাত বক্তৃতার ইতিহাস নয়। এটি মানুষের কথা বলার ধরন বদলে যাওয়ার ইতিহাসও।
পঞ্চানন কর্মকার কি জানতেন?
পঞ্চানন কর্মকার কি কল্পনা করেছিলেন, তাঁর হাতে গড়া বাংলা হরফ একদিন শুধু বইয়ের পাতায় নয়, মানুষের পকেটেও বাস করবে? যে ‘অ’ একসময় ধাতুর ছাঁচে অবয়ব পেয়েছিল, সেই অক্ষরই কি একদিন OMG-এর পাশেই জায়গা করে নেবে? হুগলির একটি ছাপাখানার সঙ্গে কি কখনো হ্যাশট্যাগ-এর কোনো অদৃশ্য সম্পর্ক তৈরি হবে? আর পুঁথির পাতায় সংরক্ষিত শব্দ একদিন ফেসবুক পোস্ট, ক্যাপশন, কমেন্ট, মিম আর স্ক্রিনশট হয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠবে—এমন ভবিষ্যৎ কি তখন কল্পনা করা সম্ভব ছিল? সম্ভবত নয়।
কিন্তু ১৭৭৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া বাংলা মুদ্রণ অক্ষরের যাত্রাপথের সবচেয়ে বড় ‘প্লট টুইস্ট’ হয়তো এটিই—একসময় যে অক্ষরকে যন্ত্রে বসিয়ে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, আড়াইশো বছর পরে সেই অক্ষরই মানুষকে নিয়ে মিম বানাচ্ছে, কমেন্ট বক্সে তর্ক করছে এবং স্ক্রিনের এপাশ-ওপাশে কোটি কোটি মানুষকে প্রতিদিন নতুনভাবে কথা বলিয়ে যাচ্ছে। সেই বিস্ময়কর রূপান্তরের গল্পেই এবার ফিরে দেখা যাক ১৭৭৮-এর বাংলা অক্ষরের একেবারে অন্যরকম যাত্রা।
বাংলা অক্ষরের সবচেয়ে বড় চারিত্রিক রূপান্তর
একসময় বাংলা অক্ষরের জীবন ছিল বেশ সিরিয়াস। বইয়ে থাকবে, পুঁথিতে থাকবে, সাহিত্য রচনা করবে, জ্ঞান সংরক্ষণ করবে এবং গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য বহন করবে। আজ তার জীবন অনেক বেশি বহুমুখী। সকালে সে পরীক্ষার খাতায়, দুপুরে অফিসের ই-মেইলে, বিকেলে কোনো ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপনে, সন্ধ্যায় রাজনৈতিক বিতর্কে, রাতে প্রেমের মেসেজে, আর গভীর রাতে—“ঘুম আসে না কেন?”
একই অক্ষরের এই অসংখ্য পরিচয় গণযোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে সামনে আনে। যোগাযোগের মাধ্যম বদলালে শুধু বার্তা কোথায় পৌঁছাবে তা বদলায় না; বদলে যায় বার্তা তৈরির ধরন, ভাষা এবং মানুষের অংশগ্রহণের ধরনও। মার্শাল ম্যাকলুহান বলেছিলেন, “দ্যা মিডিয়াম ইজ দ্য মেসেজ”—মাধ্যম নিজেই বার্তার অর্থ ও প্রভাবকে বদলে দেয়। অর্থাৎ, একই বাক্য বইয়ে পড়া এবং মিমে দেখা এক জিনিস নয়। একটি সংবাদ কাগজের প্রথম পাতায় দেখলে যে গুরুত্ব তৈরি হয়, সেটি হয়তো ফেসবুকের স্ক্রলে তৈরি হয় না। আবার একটি সাধারণ বাক্যের সঙ্গে একটি ছবি, জিফ বা ইমোজি যোগ হলে তার অর্থ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।
বাংলা অক্ষর তাই শুধু টিকে থাকেনি; প্রতিটি নতুন মাধ্যমের সঙ্গে নিজের চরিত্রও বদলেছে। সোজা ভাষায়—অক্ষর একই, কিন্তু তার ব্যক্তিত্বের নবায়ন হয়েছে।
একসময় পাঠক ছিল, এখন সবাই ‘ক্রিয়েটর’
১৭৭৮ সালের বাংলা মুদ্রণের যুগে একজন মানুষ মূলত যা প্রকাশিত হয়েছে, তা পড়তেন। আজ পড়ার পাশাপাশি সবাই লেখেন, পোস্ট দেন, কমেন্ট করেন, ভিডিও বানান, স্টোরি দেন, মিম বানান এবং অন্যের পোস্টের নিচে এমন মন্তব্য করেন, যা কখনো কখনো মূল পোস্টের চেয়েও বেশি ভাইরাল হয়ে যায়। গণযোগাযোগের এই পরিবর্তনকে বলা যায় অংশগ্রহণমূলক যোগাযোগের এক নতুন বাস্তবতা। আগে যোগাযোগের প্রবাহ অনেকটাই ছিল একমুখী—কেউ লিখছে, অনেক মানুষ পড়ছে। এখন একজন লিখছে, হাজার মানুষ মন্তব্য করছে, কেউ স্ক্রিনশট নিচ্ছে, কেউ সেটিকে মিম বানাচ্ছে, আবার কেউ সেটির ওপর ভিডিও বানিয়ে নতুন আলোচনা শুরু করছে।
একটি বার্তা আর পাঠানোর পর স্থির থাকে না। মানুষ সেটিকে নতুন করে ব্যবহার করে, নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে, কখনো পুরো অর্থই বদলে দেয়। এই যুগে দর্শক আর শুধু দর্শক নয়— দর্শক নিজেই মাঠে নামছেন।
আগেকার ‘পুঁথি’, এখন ‘স্ক্রিনশট’
একসময় একটি লেখা সংরক্ষণ করা মানে ছিল সেটিকে যত্ন করে রেখে দেওয়া। আজকের যুগে? স্ক্রিনশট নাও। কথোপকথন গুরুত্বপূর্ণ? স্ক্রিনশট। প্রমাণ দরকার? স্ক্রিনশট। কেউ কিছু অস্বীকার করেছে? “এক মিনিট, স্ক্রল করছি।” গণযোগাযোগের ইতিহাসে প্রযুক্তি শুধু তথ্যের গতি বাড়ায়নি; তথ্য সংরক্ষণের ধারণাটিও বদলে দিয়েছে। আগে একটি লেখা হারিয়ে গেলে সেটি হয়তো সত্যিই হারিয়ে যেত। এখন একটি পোস্ট মুছে ফেললেও তার স্ক্রিনশট অন্য কারও ফোনে থেকে যেতে পারে।
ফলে ডিজিটাল যুগে যোগাযোগ অনেক বেশি ক্ষণস্থায়ী, আবার একই সঙ্গে অদ্ভুতভাবে স্থায়ীও। একটি স্টোরি ২৪ ঘণ্টায় চলে যায়। কিন্তু স্ক্রিনশট? চিরকাল থেকে যেতে পারে।
গেটকিপার এখন তাহলে কে?
একসময় সংবাদ বা তথ্য জনসমক্ষে পৌঁছানোর আগে নানা স্তর পার হতে হতো। সম্পাদক, প্রকাশক বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা অনেক ক্ষেত্রে ঠিক করতেন কোন তথ্য প্রকাশযোগ্য। গণযোগাযোগের ভাষায় এটিকে বলা হয় ‘গেটকিপিং’। আজ পরিস্থিতি অনেক বেশি মজার। কারণ গেট আছে, কিন্তু গেটকিপারকে সবসময় দেখা যায় না। আপনি হয়তো ভাবছেন, আপনি নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি পোস্ট দেখছেন। কিন্তু কেন ওই পোস্টটি আপনার সামনে এলো? কেন একই ধরনের ভিডিও বারবার দেখছেন? কেন পাঁচ মিনিটের জন্য ফোন খুলে এক ঘণ্টা পরে মনে পড়ছে—“আমি আসলে ফোনটা কেন ধরেছিলাম?”
সম্ভবত এখানেই আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থার সবচেয়ে শক্তিশালী চরিত্রটি নীরবে কাজ করছে—অ্যালগরিদম। তবে আগের লেখাগুলোর মতো এটিকে এখানে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ বা সংকট হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং মজার বিষয় হলো—১৭৭৮ সালে বাংলা অক্ষর ছাপার জন্য মানুষকে হাতে হাতে অক্ষর সাজাতে হতো। আজ আমাদের ফিড সাজানো হচ্ছে অদৃশ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে।
আগে মানুষ অক্ষর সাজাত। এখন অ্যালগরিদম আমাদের সামনে কনটেন্ট সাজায়। সভ্যতা এগিয়েছে। স্ক্রলও বেড়েছে।
আমরা আসলে কেন এত পোস্ট করি?
এখানে গণযোগাযোগের আরেকটি বিখ্যাত তত্ত্ব বেশ কাজে আসে—“ইউজেস অ্যান্ড গ্র্যাটিফিকেশনস থিওরি”। এই তত্ত্বের সহজ কথা হলো, মানুষ শুধু বসে বসে মাধ্যমের প্রভাব গ্রহণ করে না; নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী মাধ্যম ব্যবহার করে। এবং সত্যি বলতে কী, আজকের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার দেখলে তত্ত্বটি বেশ বাস্তব মনে হয়। কেউ তথ্যের জন্য আসে, কেউ বিনোদনের জন্য, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে যুক্ত থাকতে, কেউ নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে, কেউ নিজের কাজ দেখাতে। আর কেউ? “দেখি কে কে আমার স্টোরি দেখছে।”
মানুষ কেন পোস্ট করে, তার কারণ সবসময় এক নয়। কেউ একটি অর্জন শেয়ার করে আনন্দ প্রকাশ করতে চায়। কেউ দুঃখের কথা লিখে সমর্থন খোঁজে। কেউ নিজের মতামত জানাতে চায়। কেউ শুধু বোর হয়ে যায়। অর্থাৎ, যোগাযোগের মাধ্যম মানুষকে ব্যবহার করে না—অনেক ক্ষেত্রেই মানুষও নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী মাধ্যমকে ব্যবহার করে। যদিও মাঝেমধ্যে কে কাকে ব্যবহার করছে, সেটি নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে।
বাংলা ভাষার আসল মাল্টিভার্স
একটি বাংলা অক্ষরের সামনে আজ কত জীবন! একই শব্দ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপত্রে থাকতে পারে, একই শব্দ কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতায় থাকতে পারে, আবার সেই শব্দই পাঁচ মিনিট পর একটি মিমের পাঞ্চলাইন হতে পারে। এটাই ডিজিটাল যুগে ভাষার সবচেয়ে আকর্ষণীয় পরিবর্তন।
বাংলা এখন আর শুধু একটি নির্দিষ্ট ধরনের যোগাযোগের ভাষা নয়। এটি একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিক, ব্যক্তিগত, হাস্যরসাত্মক, রাজনৈতিক এবং ডিজিটাল। কখনো মানুষ শুদ্ধ বাংলায় লেখে। কখনো বাংলিশে। কখনো শুধু দুটি শব্দ—“ভাই, শেষ।” আর আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনেক সময় পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজনও হয় না। এটি ভাষার অবক্ষয় না ভাষার অভিযোজন—সেই বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—বাংলা ভাষা এখন কিবোর্ড-এর এর সঙ্গে নেগোশিয়েশন করতে শিখেছে।
‘ইমোজি’ এসে যখন ভাষার সহকর্মী হলো
১৭৭৮ সালের কোনো বাংলা হরফ যদি আজকের ইমোজি-রাজনীতি দেখত, সম্ভবত সে একটু বিভ্রান্তই হতো। “ঠিক আছে।” “ঠিক আছে 🙂” “ঠিক আছে 👍” “ঠিক আছে…”—চারটি বাক্য, অক্ষর প্রায় একই, কিন্তু পরিস্থিতি? একবারেই আলাদা। ডিজিটাল যোগাযোগে শুধু শব্দ নয়, শব্দের সঙ্গে থাকা চিহ্নও অর্থ তৈরি করছে।
ইমোজি, জিফ, স্টিকার এবং মিম এখন ভাষার বাইরের কিছু নয়; এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই যোগাযোগের অংশ। গণযোগাযোগের দৃষ্টিতে এটিও গুরুত্বপূর্ণ। বার্তা শুধু লেখকের শব্দে সীমাবদ্ধ থাকে না; মাধ্যম, দৃশ্য, প্রতীক এবং গ্রহণকারীর অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে অর্থ তৈরি হয়। সুতরাং, কেউ যদি আপনাকে শুধু “🙂” পাঠায়, তার অর্থ বোঝার জন্য কখনো কখনো ভাষাবিজ্ঞানের চেয়ে সম্পর্কের ইতিহাস বেশি দরকার হয়।
মিম আসলে ছোট্ট গণযোগাযোগ
আমরা মিমকে সাধারণত নিছক হাসির বিষয় ভাবি। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, মিমও গণযোগাযোগের একটি শক্তিশালী রূপ। একটি ছবি, তার সঙ্গে কয়েকটি শব্দ, আর মুহূর্তের মধ্যে একটি সামাজিক অভিজ্ঞতা হাজার মানুষের সঙ্গে ভাগ হয়ে যায়।
পরীক্ষার ভয়, অফিসের চাপ, রাজনৈতিক হতাশা, সম্পর্কের জটিলতা, হলের খাবার কিংবা ডেডলাইনের আতঙ্ক—সবকিছুই মিম হতে পারে। কারণ মিমের শক্তি তথ্যের পরিমাণে নয়; রিলেটিবিলিটি-তে। একজন দেখে হাসে, তারপর ভাবে—“আরে, এটা তো আমার জীবন!” সেখানেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা গণঅভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। সম্ভবত এটিই আধুনিক গণযোগাযোগের সবচেয়ে মজার বৈশিষ্ট্য—কখনো কখনো একটি দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়ে একটি ভালো মিম বেশি মানুষকে একই অনুভূতিতে যুক্ত করতে পারে।
আমরা ইতিহাসকে প্রতিদিন ব্যবহার করি, কিন্তু তা বুঝতে পারি না। আপনি যখন বাংলায় কাউকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান, তখন সেই দীর্ঘ যাত্রার উত্তরাধিকার ব্যবহার করছেন। অ্যাসাইনমেন্ট লেখেন, সেখানে আছে। ক্যাপশন দেন, সেখানে আছে। কমেন্টে তর্ক করেন, সেখানেও আছে। এমনকি একটি মিমের নিচে “এটা আমি” লিখলেও। ইতিহাস সবসময় জাদুঘরে থাকে না। কখনো কখনো ইতিহাস আপনার ফোনের কিবোর্ডে বসে থাকে।
১৭৭৮-এর অক্ষর এখনো আমাদের সঙ্গে আছে
১৭৭৮ সালে বাংলা অক্ষরকে যন্ত্রের মাধ্যমে নতুনভাবে ব্যবহারের যে পথ তৈরি হয়েছিল, তার ভবিষ্যৎ এত বৈচিত্র্যময় হবে—তা হয়তো তখন কেউ ভাবেনি। একদিন সেই অক্ষর বইয়ের পাতায় জ্ঞান বহন করবে। একদিন মানুষের ব্যক্তিগত চিঠিতে ভালোবাসা বহন করবে। একদিন সংবাদপত্রে সমাজের খবর বলবে। আর বহু বছর পরে, একই অক্ষর কারও ফোনে গিয়ে লিখবে—“ভাই, এটা তো একদম আমি!”
এটাই হয়তো ভাষার সবচেয়ে সুন্দর বিষয়। ভাষা কোনো একটি যুগের মধ্যে বন্দী থাকে না। মানুষ যেমন বদলায়, তার হাসি বদলায়, তার রাগ বদলায়, তার যোগাযোগের ধরন বদলায়—অক্ষরও তেমনি নতুন নতুন জীবনে প্রবেশ করে।
হুগলির ধাতব ছাঁচ থেকে বেরিয়ে আসা বাংলা অক্ষর আজ আর শুধু বইয়ের পাতায় বাস করে না। সে আমাদের পকেটে থাকে, নোটিফিকেশনে আসে, কমেন্টে ঝগড়া করে, ক্যাপশনে প্রেম করে এবং মিমে আমাদের নিয়ে হাসে।
হয়তো আড়াইশো বছরের সবচেয়ে বড় প্লট টুইস্ট এটিই—একদিন মানুষ বাংলা অক্ষরকে যন্ত্রে বসিয়েছিল, আর আজ সেই বাংলা অক্ষরই স্ক্রিনের ভেতর বসে মানুষের পুরো জীবনকে “রিলেটেবল কনটেন্ট” বানিয়ে ফেলছে।
- লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়; পিএইচডি রিসার্চ স্কলার, স্কুল অব জার্নালিজম অ্যান্ড ম্যাস কমিউনিকেশন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, ভারত।
.png)









