জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইরান যুদ্ধের প্রথম ১৫ দিন, কোন দিকে গড়াচ্ছে ভবিষ্যৎ

লেখা:
লেখা:
রামি জি খুরি

প্রকাশ : ১৬ মার্চ ২০২৬, ১৫: ০৭
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার দুই সপ্তাহ পেরিয়েছে। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার প্রথম দুই সপ্তাহে বিপুল খবর, প্রচার আর জল্পনা-কল্পনা তৈরি হয়েছে। সব পক্ষের রাজনীতিক ও বিশ্লেষকেরা একে অন্যের বিপরীত কথা বলেছেন। ফলে যুদ্ধের ময়দানের বাস্তবতা অনেকটাই আড়ালে থেকে গেছে। বিশ্বজুড়ে মানুষও তথ্যের চাপে বিভ্রান্ত হয়েছে।

সংঘাত ইতিমধ্যেই তৃতীয় সপ্তাহে ঢুকেছে। তবু ঠান্ডা মাথায় দেখলে কিছু নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা চোখে পড়ে। এগুলো এই যুদ্ধের ফল, মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ, এমনকি বৈশ্বিক পরিস্থিতিকেও প্রভাবিত করতে পারে। এসব বাস্তবতা একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আরও বড় সংকট তৈরি করছে।

প্রথমত, এই যুদ্ধের পরিধি অনেক বেড়েছে। সামরিক সংঘর্ষ এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের এক ডজনেরও বেশি রাষ্ট্রকে ছুঁয়ে গেছে। পাশাপাশি দুই পক্ষকে সহায়তা করা বিভিন্ন দেশও এতে জড়িয়ে পড়েছে। এই মাত্রার আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা আগে দেখা যায়নি। এতে সেই ধারণা ভেঙে গেছে যে, লড়াইয়ের বাইরে থাকলে কোনো দেশ নিরাপদ থাকতে পারবে। যখন ইরান উপসাগরীয় দেশ, ইরাক, জর্ডান, সাইপ্রাস ও তুরস্ককে লক্ষ্যবস্তু বানায়, তখন সেটাই স্পষ্ট হয়। কারণ এসব দেশে মার্কিন, ব্রিটিশ বা মিত্র বাহিনীর উপস্থিতি আছে।

দ্বিতীয়ত, এই যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তেল ও গ্যাসের ঘাটতি, জাহাজ চলাচলে বাধা, দাম বেড়ে যাওয়া এবং মন্দার আশঙ্কা—সবই এখন বাস্তব চাপ। কোনো দেশই এই প্রভাব থেকে নিজেকে পুরো আলাদা রাখতে পারছে না। শুধু রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি নয়, সাধারণ পরিবারের খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির নিরাপত্তাও এতে ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

তৃতীয়ত, এই যুদ্ধ কত দীর্ঘ হবে, সেটাই এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অনেকটা ঠিক করবে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিব শুরুতে দ্রুত ও নিশ্চিত জয়ের আশা করেছিল। তারা ভেবেছিল, কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের নেতৃত্বকে হত্যা করে শাসন ব্যবস্থা ভেঙে ফেলতে পারবে। কিন্তু টানা ১৪ দিনের হামলার পরও তারা সে লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। অন্যদিকে ইরান ও তার মিত্ররা দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চায়, যাতে হামলাকারীদের সামরিক শক্তি ও রাজনৈতিক ধৈর্য ক্ষয়ে যায়। তাদের লক্ষ্য, প্রতিপক্ষকে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতিতে বাধ্য করা।

চতুর্থত, এই সংঘাতের পেছনের আদর্শিক ভিত্তিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন-ইসরায়েল জোট এই অঞ্চলে পশ্চিমা নিবাসী-ঔপনিবেশিক প্রকল্পের শেষ বড় বাহক। এই ধারাই জায়নবাদকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করতে সহায়তা করেছে এবং এখন পুরো অঞ্চলে সামরিক ও অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। বিপরীতে, ইরান ও তার মিত্ররা এই ঔপনিবেশিক চাপকে ঠেকাতে এবং উল্টো ঘুরিয়ে দিতে চায়। কারণ উনিশ শতক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় সব দেশই এমন চাপের শিকার হয়েছে।

পঞ্চমত, এই যুদ্ধ এটাই দেখাচ্ছে যে আমরা যুদ্ধের এক নতুন যুগে ঢুকে পড়েছি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের শক্তিশালী বিমান ও স্যাটেলাইট সক্ষমতা ব্যবহার করে সামরিক, শিল্প ও বেসামরিক স্থাপনায় ভয়াবহ আকাশ হামলা চালাচ্ছে। কিন্তু তুলনামূলকভাবে সীমিত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ইরান ও তার মিত্ররা প্রযুক্তি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন কৌশল তৈরি করেছে। এতে আকাশ হামলার প্রভাব অনেকটাই কমে যাচ্ছে এবং তারা পাল্টা লড়াই চালিয়ে যেতে পারছে।

ইরান তুলনামূলক কম খরচের হলেও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে। এর ফলে বহু মিলিয়ন ডলারের মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও চাপে পড়েছে। দ্রুতগামী ড্রোন ও হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে তারা প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে ফেলেছে। ফলে বহু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা সম্ভব হয়েছে। ইসরায়েলের ভেতরেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অথচ দেশটি নিজেকে সবচেয়ে উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ‘আয়রন ডোম’ প্রযুক্তির অধিকারী বলে তুলে ধরে। এমনকি নিজেদের দুর্বলতা আড়াল করতে তাদের গণমাধ্যম ও নাগরিকদের ওপরও কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে হয়েছে।

এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরব দেশগুলোর নির্ভরতা তাদের সত্যিকারের নিরাপদ রাখতে পারেনি। গত অর্ধশতকে তারা উন্নত অস্ত্র কিনতে ও মার্কিন ঘাঁটি রাখতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। কিন্তু এখন অনেক আরব রাজধানী দেখছে, এই বিনিয়োগের বাস্তব সুফল খুব কম।

ষষ্ঠত, গত একশ বছরে পশ্চিমা ও জায়নবাদী শক্তির হামলা থেকে ইরান গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছে। যুদ্ধের প্রথম দিনগুলোতে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ বহু শীর্ষ নেতাকে হত্যার চেষ্টা বা হামলার পরও তেহরান পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। নেতৃত্বে দ্রুত পরিবর্তন এনে তারা প্রতিরোধ চালিয়ে গেছে। এতে বোঝা যায়, তারা বিকেন্দ্রীভূত যুদ্ধব্যবস্থার গুরুত্ব বুঝেছে। যেমন—আগে থেকেই নেতৃত্ব বদলের পরিকল্পনা, টেকসই কমান্ড কাঠামো, ছড়িয়ে রাখা অস্ত্র কারখানা ও গুদাম, এবং গোপন ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ প্ল্যাটফর্ম।

সপ্তমত, এখনই এই যুদ্ধের পূর্ণ ক্ষয়ক্ষতি নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। পরে হয়তো তা পরিষ্কার হবে। তবে এটুকু স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের প্রথম হামলার পর থেকে সব পক্ষই আন্তর্জাতিক আইনের সেই নিয়মগুলো উপেক্ষা করছে, যেগুলো যুদ্ধের সময় বেসামরিক এলাকা, জরুরি অবকাঠামো ও সাংস্কৃতিক স্থাপনাকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা বলে। বিশেষ করে বেসামরিক মানুষের বিরুদ্ধে অনেক হামলার নির্মমতা ছিল বিস্ময়কর। গাজায় চলমান ভয়াবহতা এবং ইরান ও লেবাননের কিছু অংশকে গাজার মতো ধ্বংসস্তূপ বানানোর ইসরায়েলি হুমকি বিবেচনায় নিলে এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

সবশেষে, এই যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আরব দেশগুলোর নির্ভরতা তাদের সত্যিকারের নিরাপদ রাখতে পারেনি। গত অর্ধশতকে তারা উন্নত অস্ত্র কিনতে ও মার্কিন ঘাঁটি রাখতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। কিন্তু এখন অনেক আরব রাজধানী দেখছে, এই বিনিয়োগের বাস্তব সুফল খুব কম। তাই তাদের নতুন করে ভাবতে হবে, কীভাবে নিজেদের সক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের এই বড় ঘাটতি পূরণ করবে। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা কৌশল ও কূটনৈতিক অগ্রাধিকারও নতুনভাবে সাজাতে হবে।

এই সবকটি বাস্তবতা একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। আর শেষ পর্যন্ত সবকিছু গিয়ে মিলে ফিলিস্তিন প্রশ্নে। ইরানের এই যুদ্ধও আসলে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতেরই আরেক প্রকাশ। এই অমীমাংসিত সংঘাত ৭৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল ও বিশ্বের অস্থিরতার বড় উৎস হয়ে আছে।

ন্যায়ভিত্তিক সমাধান ছাড়া স্থিতিশীলতা ও শান্তি আসবে না। তার আগে পর্যন্ত আরব, ইরানি ও ইসরায়েলিরা সংঘাত ও ভয়ের মধ্যেই বেঁচে থাকবে। আর বিশ্বের অন্য মানুষও এর কুফল ভোগ করতে থাকবে। কারণ জায়নবাদ, আরব জাতীয়তাবাদ এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের পশ্চিমা ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী প্রতিরোধের এই দীর্ঘ সংঘাত এখনো শেষ হয়নি।

(আল-জাজিরায় প্রকাশিত আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুতের পাবলিক পলিসি ফেলো এবং আরব সেন্টার, ওয়াশিংটন ডিসির সিনিয়র ফেলো রামি জি খুরির লেখার ভাবানুবাদ করেছেন মাহবুবুল আলম তারেক)

সম্পর্কিত