জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ইরান যুদ্ধে কে জিতল হারল কে

লেখা:
লেখা:
দর্শিনী ডেভিড, ডেপুটি ইকোনমিকস এডিটর, বিবিসি

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০২৬, ১৫: ৫২
যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদকরা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়েছে। ছবি: সংগৃহীত

ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের বাড়িগুলোতে হিটিং অয়েলের বিল আকাশচুম্বী। পাকিস্তানে খরচ বাঁচাতে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আর্থিক প্রভাব ইতিমধ্যেই তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।

ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে তেহরানের এই প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী নাও হতে পারে। তদুপরি, এই প্রভাব সবখানে সমান নয়।

চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে কিছু দেশের। আবার পাশাপাশি এমন কিছু পক্ষও আছে যারা লাভবান হচ্ছে। তাহলে তারা কারা?

জয়ী: নরওয়ে, কানাডা এবং রাশিয়া

নবায়নযোগ্য শক্তির দিকে নানামুখী প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমরা এখনও তেল ও গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। জ্বালানির প্রচুর মজুদ সাধারণত বিশাল সম্পদের প্রতিশ্রুতি দেয়। তাই অপরিশোধিত তেলকে ‘কালো সোনা’ বলা হয়। যখন দাম বাড়ে, তখন উৎপাদনকারীরা সাধারণত লাভবান হয়। আর ব্যবহারকারীদের পকেট খালি হয়। কিন্তু ইরান যুদ্ধ যে পরিস্থিতি তৈরি করেছে তা সাধারণ কোনো তেলের দামের ব্যাপার নয়।

মধ্যপ্রাচ্য এখনও তেল সরবরাহের কেন্দ্রবিন্দু আর হরমুজ প্রণালি এর প্রধান ধমনী।

এই অঞ্চলে জ্বালানি অবকাঠামোতে আক্রমণ এবং অবরোধের প্রভাব কাতার ও সৌদি আরবের মতো উপসাগরীয় উৎপাদকদের ওপর কঠোরভাবে আঘাত হেনেছে। কারণ তেহরান আমেরিকার মিত্রদের লক্ষ্যবস্তু করেছে।

যেহেতু গ্রাহকরা বিকল্প উৎস খুঁজছেন, তাই নরওয়ে এবং কানাডার মতো দেশগুলো লাভবান হতে পারে।

২০২২ সালে রাশিয়া ইউক্রেন আক্রমণ করার পর অনেক দেশ রুশ গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে চেয়েছিল। তখন নরওয়ে উৎপাদন বাড়িয়ে তার সুবিধা নিতে সক্ষম হয়েছিল।

এদিকে, কানাডার জ্বালানিমন্ত্রী টিম হজসন দ্রুত তার দেশকে একটি ‘স্থিতিশীল, নির্ভরযোগ্য এবং মূল্যবোধ-ভিত্তিক জ্বালানি উৎপাদনকারী’ হিসেবে হাজির করেছেন। তবে তারা উৎপাদন কতটা বাড়াতে পারবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এর পরিবর্তে, রাশিয়াই হতে পারে সবচেয়ে বড় জয়ী। ওয়াশিংটন বৈশ্বিক সরবরাহ সংকট কমাতে বিধিনিষেধ শিথিল করেছে। তাই ভারতে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল বিক্রি ৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

কিছু অনুমান বলছে যে, মার্চ মাসের শেষের দিকে মস্কো আরও ৫ বিলিয়ন ডলার (৩.৭ বিলিয়ন পাউন্ড) অতিরিক্ত আয় করতে পারে। ২০২২ সালের পর জ্বালানি সংক্রান্ত রাজস্বের ক্ষেত্রে এটি তাদের সেরা বছর হতে পারে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর বিনিময়ে রাশিয়াকে একটি বিশাল অংকের মুনাফা তুলে দেওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে আমেরিকা। অন্যান্য সম্ভাব্য লাভবান পক্ষও রয়েছে।

যেহেতু কিছু দেশ কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে দিচ্ছে, তাই ইন্দোনেশিয়ার মতো বড় রপ্তানিকারকদের জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। কারণ কয়লার দামও বাড়ছে।

পরাজিত: যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপ

স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের কী অবস্থা? প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন যে, তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র ‘প্রচুর অর্থ উপার্জন করে’।

অবশ্যই, অপরিশোধিত তেলের দাম বর্তমান স্তরে থাকলে আমেরিকান তেল উৎপাদনকারীরা এই বছর ১০ হাজার কোটি ডলার অতিরিক্ত রাজস্ব আয় করতে পারে।

কিন্তু এর ফলে যে যুক্তরাষ্ট্র জিতে গেল তা নয়।

প্রথমত, কিছু উৎপাদনকারী মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। উদাহরণস্বরূপ, এক্সন মবিল-এর কাতারের রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাবের কার্যক্রম মার্চের শুরু থেকে বন্ধ। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় সেখানে ‘ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে।

দ্বিতীয়ত, পাইকারি দাম কমে যাওয়ার মুখে বছরের পর বছর উৎপাদন ক্ষমতা হ্রাস করার কারণে, অনেক তেল উৎপাদনকারী দ্রুত উৎপাদন বাড়াতে পারছে না।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো: মাথাপিছু হিসেবে আমেরিকানরাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় তেল ও গ্যাস ব্যবহারকারী।

মধ্যপশ্চিমের তীব্র শীতে হিটিং চালানো থেকে শুরু করে ড্রাইভিং সিজনে জ্বালানি দেওয়া—সবক্ষেত্রেই তারা জীবাশ্ম জ্বালানির ওঠানামা করা দামের কাছে জিম্মি। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করেছেন যে, যদি তেলের দাম ১৪০ ডলারে উঠে যায় তবে অর্থনীতি সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অবশ্য এই ঝুঁকিতে আমেরিকানরা একা নয়। বিশেষ করে আমদানি করা গ্যাসের ওপর ইউরোপীয় এবং যুক্তরাজ্যের ভোক্তাদের নির্ভরতার অর্থ হলো প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ঝুঁকি।

আর এটি ঘটবে মুদ্রাস্ফীতির আঘাতের মাধ্যমে। গত কয়েক সপ্তাহের বাজার পরিস্থিতি বছরের শেষের দিকে মুদ্রাস্ফীতিকে প্রায় ০.৫% বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ দাম বৃদ্ধির প্রভাব সার এবং শিপিং খরচের মতো বিষয়গুলোতেও ছড়িয়ে পড়বে।

সুসংবাদ হলো, বছরের পর বছর ধরে জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষ হয়ে ওঠার ফলে পশ্চিমারা এখন আগের তুলনায় জ্বালানির দামের ধাক্কা সামলাতে বেশি সক্ষম।

কিন্তু যুক্তরাজ্যে মোট জ্বালানি ব্যবহারের অর্ধেকেরও বেশি আসে তেল ও গ্যাস থেকে। ফলে গৃহস্থালির হিটিং বিল এবং উৎপাদন খাতের মতো জ্বালানি-নিবিড় খাতগুলো ঝুঁকিতেই থাকছে—যা বিশ্বের অনেক দেশের জন্যই সত্য।

এর প্রভাব কতটা হবে তা কেবল ভবিষ্যতের দামের ওপর নয়, বরং সরকারি পদক্ষেপের ওপরও নির্ভর করে।

অনেক দেশ বড় আকারের বেইলআউট বা আর্থিক সহায়তার কথা চিন্তা করতে দ্বিধা করছে। কারণ তাদের নিজেদের অর্থভাণ্ডারও চাপের মুখে। উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকির কারণে বন্ড মার্কেটের প্রতিক্রিয়া ইতিমধ্যেই ঋণগ্রস্ত দেশগুলোর খরচ আরও বিলিয়ন বিলিয়ন বাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিচ্ছে।

স্বভাবতই, সবচেয়ে বড় তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পূর্ব দিকে প্রবাহিত তেল ও তরল গ্যাসের নিয়মিত গ্রাহকদের জন্য।

এশিয়া তার অপরিশোধিত তেলের ৫৯% পায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে যা ৭০% পর্যন্ত। সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া এবং ব্যয় বৃদ্ধির উদ্বেগে সেখানে শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। রাজনীতিবিদরা দেশটির চিপ নির্মাণ শিল্পের ঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

বিশ্বের মেমোরি চিপের অর্ধেকেরও বেশি তৈরি করে দক্ষিণ কোরিয়া। অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং ফিলিপাইনের মতো দেশগুলো জ্বালানি রেশনিং, সপ্তাহে চার দিন কাজ এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

তবে মহাদেশের সবচেয়ে বড় ভোক্তা দেশগুলো পরিকল্পনা এবং কূটনীতির মাধ্যমে কিছুটা ভালো অবস্থায় রয়েছে। চীন কয়েক মাস চলার মতো মজুদ নিয়ে বসে আছে। জানা গেছে তারা ইরান থেকে কেনাকাটা বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভারতের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। তারা রাশিয়া থেকে তেল কেনার সাময়িক সুযোগটি কাজে লাগাচ্ছে।

শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে তা অবশ্যই এই সংঘাতের ভবিষ্যৎ গতিপথের ওপর নির্ভর করবে।

এটা স্পষ্ট যে ইরানের ওপর হামলা শুরু করার আগে কৌশল নির্ধারণের সময় যুক্তরাষ্ট্র এই অর্থনৈতিক পরিণামগুলো পুরোপুরি অনুমান করতে পারেনি।

আর যদি যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে দেশগুলোর ক্ষতির ঝুঁকির সঙ্গে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও প্রবল হবে।

বিবিসি থেকে অনুদিত

সম্পর্কিত