বুলবুল সিদ্দিকী

রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি খুব সহজে বদলায় না। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অভাব। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পরে যে সুযোগ এসেছিল তার সদ্ব্যবহার আমরা করতে পারিনি। তবে বিভিন্ন সময় প্রচেষ্টা যে ছিল না, তা কিন্তু নয়। এর পরও সুযোগ এসেছে। সেসবের মধ্যে বোধ হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় সবচেয়ে বেশি আশা জাগানিয়া ছিল। এই সময়ে দেশের অধিকাংশ মানুষই মনেপ্রাণে রাজনৈতিক ধারার একটি সুষ্ঠু পরিবর্তন চেয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখলাম, সুষ্ঠু রাজনৈতিক কিংবা গণতান্ত্রিক ধারার পরিবর্তন হয়নি। বরং নানা উগ্রবাদী ধ্যান ধারণার বিস্তার এবং সামাজিক পরিসরে তাদের দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বড় যে হতাশাজনক বিষয় হলো, এত বড় সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও আমরা একটি সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারলাম না। তাই প্রশ্ন জাগে, সুস্থ ধারার রাজনৈতিক চর্চা গড়ে তোলার উপায় কী?
সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা গড়ে তোলার অন্যতম অন্তরায় ছিল বিগত সময়ের কর্তৃতবাদী শাসনব্যবস্থা। একটা লম্বা সময় সেই ধরনের শাসনব্যবস্থায় থাকার ফলে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক বৈকল্য এখন দৃশ্যমান। কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য গড়ে উঠেছে একটি শোষণ মূলক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আদতে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মদদে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীও গড়ে উঠেছে। এই শোষণমূলক প্রক্রিয়ায় কর্তৃত্ববাদীব্যবস্থা এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখে। লম্বা সময় কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা টিকে থাকার কারণে আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছিল। একটি ব্যবস্থা যখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লে তাকে নতুন করে দাঁড় করাতেও লম্বা সময় প্রয়োজন।
একটি সফল রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে পারলে হয়তো আমাদের রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুরো খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো। তারপরেও মনে রাখতে হবে, সেই ধরনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন কখনো একদিনের মধ্যে হয় না। কেন না পরিবর্তন ও সংস্কার একটি চলমান ও ধীর প্রক্রিয়া। সেটি আমরা বিভিন্ন দেশের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে তাকালেও দেখতে পাই। উদাহরণ হিসেবে চীনের বিপ্লবের কথা উল্লেখ করা যায়। চীন এখনো মনে করে, তাদের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কার পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হয়নি। তারা এখনো মধ্যম আয়ের দেশ। এজন্য তারা তাদের অর্থনৈতিক সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংস্কারকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে রেখেছে। তারা মনে করে সেটি একই অর্থে তাদের সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তাই রাজনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থাকে একটি বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে একটি সমন্বিত জায়গা থেকে দেখতে হবে। আজ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার যে করুণ রূপ, এর পেছনে আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক নানাবিধ বিষয় যুক্ত রয়েছে। রাজনীতি মানে কেবল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার নানাবিধ ডিসকার্সিভ ক্ষেত্র রয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলো সমাজের নানা জায়গার মানুষ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। আর তার মধ্য দিয়ে নানাভাবে প্রকাশিত হয়ে সমাজকে একটি আকৃতি দান করে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সব অংশীদার একে অপরের সঙ্গে একটি জটিল প্রক্রিয়ায় ওতোপ্রতোভাবে যুক্ত থাকে। ফলে রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের দুর্নীতির সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলা যায়। দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়। একে সাংস্কৃতিক বিষয় হিসেবেও দেখতে হবে। এই সংস্কৃতি একদিনের চর্চায় গড়ে উঠেনি। লম্বা সময় ধরে আমাদের সামাজিক পরিসরের রাজনীতিকীকরণের মধ্য দিয়ে এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
দুর্নীতির মধ্য দিয়ে সমাজের একটি শ্রেণী অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে লাভবান হচ্ছে। তাদের নিজেদের স্বার্থেই সেই দুর্নীতির বলয়কে টিকিয়ে রাখার জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজন। তাই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয় ক্ষমতার চর্চা। বিগত সময়ের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন কিংবা দুর্নীতির দিকে তাকালে দেখা যাবে যে প্রতিটি দুর্বৃত্তায়ন কিংবা দুর্নীতির ঘটনার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসূত্রতা খুঁজে পাব।
দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যাক দেশের নানারকম হত্যাকাণ্ড কিংবা সহিংসতার বিষয়গুলো। অধিকাংশ সহিংসতা কিংবা হত্যাকাণ্ডের পিছনে কোন না কোনোভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয়টি দেখা যায়। এটি হতে পারে বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি সহিংসতা কিংবা নিজ দলের একাধিক উপদলের মধ্যকার সহিংসতা। এখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ কিংবা সদস্যপদ একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করে। সমাজবিজ্ঞানে একে ক্ষমতার একটি ডিসকার্সিভ বলয় হিসেবে দেখা হয়। বলয়টির মধ্যে ক্ষমতার উদ্ভব ঘটে, ক্ষমতার চর্চা হয় এবং ক্ষমতার বিস্তার ঘটে, যার দুটি অন্যতম প্রধান ফলাফল হিসেবে দেখা যায় অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি।
তৃতীয়ত, প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতা কী করে আমাদের প্রতিদিনের সামাজিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে, তা বোঝা। যেমন আমরা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে নানা সময় ছোট ছোট তথাকথিত উপকার হাসিল করতে পারি। এখন জ্বালানি তেলের এই সংকট চলছে দেশে। অনেকেই রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তিন ঘন্টা লাইনে না দাঁড়িয়ে অন্যদের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহ করে ঘরে রাখতে চাইছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এতটুকু তেল ঘরে রেখে আপনি আসলে কতদিন চলতে পারবেন।
এখানে মূল বিষয়টি আসলে চলতে পারার নয়। বরং মূল বিষয় হলো, ব্যক্তির রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চাকে অন্যের সামনে তুলে ধরা। অথবা সেই ব্যক্তি যে রাজনৈতিকভাবে একজন ক্ষমতাবান মানুষ, সেটি জনপরিসরে ও তার সামাজিক বলয়ে তুলে ধরা। এই তুলে ধরতে পারা একভাবে সেই ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির একটি চিহ্ন হিসেবে কাজ করে। ম্যাক্স ওয়েবারের শ্রেণির ধারণা দিয়ে বিষয়টাকে বোঝা যায়। সমাজে ব্যক্তির মর্যাদা এবং তার সামাজিক শ্রেণি নির্ধারিত হয় কিছু দৃশ্যমান প্রতীকী চিহ্ন দিয়ে। সামাজিক পরিসরে রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারের এই চর্চাকে ম্যাক্স ওয়েবারের শ্রেণির ধারণাকেই দৃশ্যমান করে।
সামাজিক পরিসরে রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারের আরও নানারকম উদাহরণ দেখা যায়। রাজনীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা সামাজিক ও জনপরিসরে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে। তাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কারণ আমাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের মধ্যে রাজনীতি রয়েছে। সামাজিক ও জনপরিসরে রাজনৈতিক ক্ষমতার এই বিস্তারের ফলে এর একটি দীর্ঘ নেতিবাচক প্রভাব সমাজে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছে।
ফলে এমন একটি সমাজে রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চার বদল খুব একটা সহজসাধ্য কাজ নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজের প্রতিটি মানুষ রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার উপায় হিসেবে দেখবে, ততদিন আসলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল আশা করা যায় না। রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে অলিখিত চুক্তি ও চর্চা থাকে। সেই সংস্কৃতি বদলের জন্যেও আমাদের কাজ করতে হবে। কারণ আর এই দৃষ্টিভঙ্গির বদল না ঘটলে আদতে রাজনীতিকে একটি লাভবান অর্থনৈতিক উপায় হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাবে না। ফলে আমাদের একটি লম্বা পথ এখনো পাড়ি দিতে হবে।
যথাযথ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চা গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল হতে হবে মৌলিক পদক্ষেপ যার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক পরিকল্পনা। আমরা প্রত্যাশা রাখতে চাই, বর্তমান সরকার ও বিরোধীদল একটি ইতিবাচক সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সেই পরিকল্পনা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি খুব সহজে বদলায় না। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে সুস্থ ধারার গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার অভাব। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পরে যে সুযোগ এসেছিল তার সদ্ব্যবহার আমরা করতে পারিনি। তবে বিভিন্ন সময় প্রচেষ্টা যে ছিল না, তা কিন্তু নয়। এর পরও সুযোগ এসেছে। সেসবের মধ্যে বোধ হয় জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় সবচেয়ে বেশি আশা জাগানিয়া ছিল। এই সময়ে দেশের অধিকাংশ মানুষই মনেপ্রাণে রাজনৈতিক ধারার একটি সুষ্ঠু পরিবর্তন চেয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখলাম, সুষ্ঠু রাজনৈতিক কিংবা গণতান্ত্রিক ধারার পরিবর্তন হয়নি। বরং নানা উগ্রবাদী ধ্যান ধারণার বিস্তার এবং সামাজিক পরিসরে তাদের দৃশ্যমানতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বড় যে হতাশাজনক বিষয় হলো, এত বড় সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও আমরা একটি সুস্থ ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করতে পারলাম না। তাই প্রশ্ন জাগে, সুস্থ ধারার রাজনৈতিক চর্চা গড়ে তোলার উপায় কী?
সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা গড়ে তোলার অন্যতম অন্তরায় ছিল বিগত সময়ের কর্তৃতবাদী শাসনব্যবস্থা। একটা লম্বা সময় সেই ধরনের শাসনব্যবস্থায় থাকার ফলে আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক বৈকল্য এখন দৃশ্যমান। কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য গড়ে উঠেছে একটি শোষণ মূলক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সেই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আদতে কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় মদদে একটি স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীও গড়ে উঠেছে। এই শোষণমূলক প্রক্রিয়ায় কর্তৃত্ববাদীব্যবস্থা এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখে। লম্বা সময় কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থা টিকে থাকার কারণে আমাদের দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়েছিল। একটি ব্যবস্থা যখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লে তাকে নতুন করে দাঁড় করাতেও লম্বা সময় প্রয়োজন।
একটি সফল রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিপ্লব ঘটাতে পারলে হয়তো আমাদের রাজনৈতিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পুরো খোলনলচে পাল্টে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হতো। তারপরেও মনে রাখতে হবে, সেই ধরনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন কখনো একদিনের মধ্যে হয় না। কেন না পরিবর্তন ও সংস্কার একটি চলমান ও ধীর প্রক্রিয়া। সেটি আমরা বিভিন্ন দেশের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে তাকালেও দেখতে পাই। উদাহরণ হিসেবে চীনের বিপ্লবের কথা উল্লেখ করা যায়। চীন এখনো মনে করে, তাদের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কার পরিপূর্ণভাবে অর্জিত হয়নি। তারা এখনো মধ্যম আয়ের দেশ। এজন্য তারা তাদের অর্থনৈতিক সামাজিক এবং রাজনৈতিক সংস্কারকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে রেখেছে। তারা মনে করে সেটি একই অর্থে তাদের সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
তাই রাজনীতি ও সামাজিক ব্যবস্থাকে একটি বিচ্ছিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে একটি সমন্বিত জায়গা থেকে দেখতে হবে। আজ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার যে করুণ রূপ, এর পেছনে আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক নানাবিধ বিষয় যুক্ত রয়েছে। রাজনীতি মানে কেবল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের রাজনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাজনীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতার নানাবিধ ডিসকার্সিভ ক্ষেত্র রয়েছে। এই ক্ষেত্রগুলো সমাজের নানা জায়গার মানুষ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। আর তার মধ্য দিয়ে নানাভাবে প্রকাশিত হয়ে সমাজকে একটি আকৃতি দান করে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় সব অংশীদার একে অপরের সঙ্গে একটি জটিল প্রক্রিয়ায় ওতোপ্রতোভাবে যুক্ত থাকে। ফলে রাজনীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আলাদা ও বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই।
উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের দুর্নীতির সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলা যায়। দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়। একে সাংস্কৃতিক বিষয় হিসেবেও দেখতে হবে। এই সংস্কৃতি একদিনের চর্চায় গড়ে উঠেনি। লম্বা সময় ধরে আমাদের সামাজিক পরিসরের রাজনীতিকীকরণের মধ্য দিয়ে এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।
দুর্নীতির মধ্য দিয়ে সমাজের একটি শ্রেণী অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে লাভবান হচ্ছে। তাদের নিজেদের স্বার্থেই সেই দুর্নীতির বলয়কে টিকিয়ে রাখার জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োজন। তাই দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয় ক্ষমতার চর্চা। বিগত সময়ের রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন কিংবা দুর্নীতির দিকে তাকালে দেখা যাবে যে প্রতিটি দুর্বৃত্তায়ন কিংবা দুর্নীতির ঘটনার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতার যোগসূত্রতা খুঁজে পাব।
দ্বিতীয় উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যাক দেশের নানারকম হত্যাকাণ্ড কিংবা সহিংসতার বিষয়গুলো। অধিকাংশ সহিংসতা কিংবা হত্যাকাণ্ডের পিছনে কোন না কোনোভাবে রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বিষয়টি দেখা যায়। এটি হতে পারে বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রতি সহিংসতা কিংবা নিজ দলের একাধিক উপদলের মধ্যকার সহিংসতা। এখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ব্যক্তির আনুষ্ঠানিক কিংবা অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ কিংবা সদস্যপদ একজন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতায়িত করে। সমাজবিজ্ঞানে একে ক্ষমতার একটি ডিসকার্সিভ বলয় হিসেবে দেখা হয়। বলয়টির মধ্যে ক্ষমতার উদ্ভব ঘটে, ক্ষমতার চর্চা হয় এবং ক্ষমতার বিস্তার ঘটে, যার দুটি অন্যতম প্রধান ফলাফল হিসেবে দেখা যায় অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি।
তৃতীয়ত, প্রয়োজন রাজনৈতিক ক্ষমতা কী করে আমাদের প্রতিদিনের সামাজিক পরিসরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক হিসেবে কাজ করে, তা বোঝা। যেমন আমরা রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে নানা সময় ছোট ছোট তথাকথিত উপকার হাসিল করতে পারি। এখন জ্বালানি তেলের এই সংকট চলছে দেশে। অনেকেই রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে তিন ঘন্টা লাইনে না দাঁড়িয়ে অন্যদের চেয়ে বেশি তেল সংগ্রহ করে ঘরে রাখতে চাইছে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, এতটুকু তেল ঘরে রেখে আপনি আসলে কতদিন চলতে পারবেন।
এখানে মূল বিষয়টি আসলে চলতে পারার নয়। বরং মূল বিষয় হলো, ব্যক্তির রাজনৈতিক ক্ষমতার চর্চাকে অন্যের সামনে তুলে ধরা। অথবা সেই ব্যক্তি যে রাজনৈতিকভাবে একজন ক্ষমতাবান মানুষ, সেটি জনপরিসরে ও তার সামাজিক বলয়ে তুলে ধরা। এই তুলে ধরতে পারা একভাবে সেই ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধির একটি চিহ্ন হিসেবে কাজ করে। ম্যাক্স ওয়েবারের শ্রেণির ধারণা দিয়ে বিষয়টাকে বোঝা যায়। সমাজে ব্যক্তির মর্যাদা এবং তার সামাজিক শ্রেণি নির্ধারিত হয় কিছু দৃশ্যমান প্রতীকী চিহ্ন দিয়ে। সামাজিক পরিসরে রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারের এই চর্চাকে ম্যাক্স ওয়েবারের শ্রেণির ধারণাকেই দৃশ্যমান করে।
সামাজিক পরিসরে রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারের আরও নানারকম উদাহরণ দেখা যায়। রাজনীতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতা সামাজিক ও জনপরিসরে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে। তাকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। কারণ আমাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ডের মধ্যে রাজনীতি রয়েছে। সামাজিক ও জনপরিসরে রাজনৈতিক ক্ষমতার এই বিস্তারের ফলে এর একটি দীর্ঘ নেতিবাচক প্রভাব সমাজে ধীরে ধীরে বিস্তার লাভ করেছে।
ফলে এমন একটি সমাজে রাজনৈতিক সংস্কৃতি চর্চার বদল খুব একটা সহজসাধ্য কাজ নয়। যতক্ষণ পর্যন্ত সমাজের প্রতিটি মানুষ রাজনৈতিক ক্ষমতাকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার উপায় হিসেবে দেখবে, ততদিন আসলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল আশা করা যায় না। রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার মধ্যে অলিখিত চুক্তি ও চর্চা থাকে। সেই সংস্কৃতি বদলের জন্যেও আমাদের কাজ করতে হবে। কারণ আর এই দৃষ্টিভঙ্গির বদল না ঘটলে আদতে রাজনীতিকে একটি লাভবান অর্থনৈতিক উপায় হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাবে না। ফলে আমাদের একটি লম্বা পথ এখনো পাড়ি দিতে হবে।
যথাযথ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চা গড়ে তোলা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার হলেও রাজনৈতিক সংস্কৃতির বদল হতে হবে মৌলিক পদক্ষেপ যার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক পরিকল্পনা। আমরা প্রত্যাশা রাখতে চাই, বর্তমান সরকার ও বিরোধীদল একটি ইতিবাচক সংসদীয় ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে সেই পরিকল্পনা গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।

হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি রোগ। একজন আক্রান্ত হলে তার থেকে খুব সহজেই ১২-১৮ জনের মাঝে এটি ছড়িয়ে পড়তে পারে। হাম মূলত শ্বাসতন্ত্র বা রেসপিরেটরি সিস্টেমকে আক্রমণ করে শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাসের আক্রমণে শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা যখন কমে যায়, তখন সেকেন্ডারি সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দেয়।
৬ ঘণ্টা আগে
অ্যারিস্টোটলের গণতন্ত্র এক জিনিস, সোভিয়েত গণতন্ত্র এক জিনিস আবার পুঁজিবাদীদের গণতন্ত্র অন্য জিনিস। আমরা আমাদের সংবিধানে এ রকম একটি ধোঁয়াশাপূর্ণ ধারণাকে স্থান দেয়ার ইচ্ছা রাখি না।
১২ ঘণ্টা আগে
গণঅভ্যুত্থানের মুখে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশের বৈদেশিক অর্থনীতির হিসাব এক দ্বৈত বাস্তবতার চিত্র তুলে ধরেছিল। এর উপরিভাগে ছিল রপ্তানিনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হওয়ার সরকারি বর্ণনা।
১ দিন আগে
বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার অস্বাভাবিক মাত্রায় বেশি। বিশেষ করে ঈদ বা অন্যান্য উৎসবের ছুটিতে আমাদের সড়ক, রেল ও নৌপথে মৃত্যুর মিছিল দেখা যায়। এই দুর্ঘটনাগুলোর দিকে গভীর দৃষ্টি দিলে বোঝা যায়, এগুলো নিছক কোনো ‘দুর্ঘটনা’ বা দৈব দুর্বিপাক নয়।
২ দিন আগে