জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

ঈদসংখ্যা: স্মৃতির পাতা, নাকি এখনো সত্যিকারের পাঠকের সঙ্গী

প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬, ১৭: ১১
স্ট্রিম গ্রাফিক

আমার বাবা এদেশের একজন প্রখ্যাত কবি। সংসারে আমরা ছিলাম ছয় ভাইবোন। বাবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন, মা সামলাতেন ঘর। নিম্ন মধ্যবিত্তের সেই জীবনে বিলাসিতার কোনো জায়গা ছিল না। নতুন জামার জন্য অপেক্ষা করতে হতো, কখনো হতো না-ও। কিন্তু একটি জায়গায় বাবা কোনো দিন কার্পণ্য করেননি। সেটি, বই। দেশের বা বিদেশের, দুর্লভ বা সহজলভ্য, যে বইটা পড়া দরকার সেটা কিনতে হবেই। এ বিষয়ে তাঁর কোনো আপস ছিল না।

ঈদ আসার আগে থেকেই বাবার মধ্যে একটা আলাদা চাঞ্চল্য দেখা যেত। পোশাকের জন্য নয়, সংসারের বাজার করার জন্য নয়, ঈদসংখ্যার জন্য। পূজার সময় কলকাতার শারদীয় সংখ্যাগুলোর জন্যও ছিল একই অপেক্ষা। সেই মোটা আর রঙিন পত্রিকাগুলো হাতে পেলে তাঁর চোখে যে প্রশান্তি দেখতাম, সেটা অন্য কিছুতে দেখিনি। আমরা ছেলেমেয়েরা জানতাম, বাবা ওই পাতাগুলোর মধ্যে ঢুকে গেলে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না কিছুক্ষণের জন্য।

সেই পত্রিকাগুলো শুধু বাবার ছিল না। মা পড়তেন রান্নার পাতা, আপারা খুঁজতেন প্রিয় অভিনেত্রীর ইন্টারভিউ, আমি খুঁজতাম ছোটদের গল্প। একটাই পত্রিকা, কিন্তু পুরো পরিবারের প্রত্যেকের জন্য কিছু না কিছু ছিল সেখানে। উৎসবের আনন্দ আর পাঠের আনন্দ তখন একটিই ছিল, আলাদা কিছু ছিল না।

বাংলাদেশে ঈদসংখ্যার ইতিহাস একশ বছরেরও পুরোনো। বিশ শতকের শুরুতে ছোট ছোট সাময়িকী দিয়ে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, সত্তর ও আশির দশকে তা রীতিমতো উৎসবের চেহারা নিয়েছিল। নব্বইয়ের দশকে এসে ঈদসংখ্যা হয়ে উঠেছিল মধ্যবিত্ত পরিবারের ঈদের কেনাকাটার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আড়াইশ বা তিনশ টাকায় একটি পত্রিকা মানে সাত-আটটি উপন্যাস, অজস্র গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ। আলাদা আলাদা কিনলে যার দাম হতো বহুগুণ বেশি।

এটা শুধু সাহিত্যের কোনো প্যাকেজ ছিল না। ঈদসংখ্যা ছিল একটি সামাজিক ঘটনা। মফস্বলের পরিবারে ঈদসংখ্যা আর পূজার শারদীয় সংখ্যা পাশাপাশি পড়া হতো। ধর্মের সীমানা পেরিয়ে একটি সাংস্কৃতিক সেতু তৈরি হতো। উৎসব সত্যিকার অর্থে সবার হয়ে উঠত। বাবার মতো মানুষেরা কেন ওই পাতার জন্য অপেক্ষা করতেন, তার উত্তর শুধু সাহিত্যের রুচিতে নেই, আছে সেই অনুভবে যে একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি ভাষা একসঙ্গে কিছু একটা পড়ছে, ভাবছে, উদযাপন করছে।

কিন্তু সেই ছবিটা এখন বদলে গেছে। পত্রিকার প্রকাশকেরা বলেন, পাঠক আছেন। কিন্তু যে পত্রিকা একদিন মফস্বলের প্রতিটি শিক্ষিত ঘরে পৌঁছে যেত, এখন সেটা মূলত রাজধানীকেন্দ্রিক। মুদ্রণসংখ্যা কমেছে, পরিধি সংকুচিত হয়েছে। অনেক পুরোনো সংখ্যা নীরবে বন্ধ হয়ে গেছে। বাজারে যা টিকে আছে, তার একটা বড় অংশ চলছে জড়তায়, উদ্ভাবনে নয়।

আরেকটি সমস্যা আছে, যেটা নিয়ে কম কথা হয়। ঈদসংখ্যার লেখা সমালোচনার আলোয় প্রায় আসে না। টেলিভিশনে বিনোদনের জায়গা আছে, খেলাধুলার আলোচনা আছে, কিন্তু সাহিত্য সমালোচনার কোনো গুরুত্বপূর্ণ পরিসর নেই। ফলে কোনটি ভালো লেখা, কোনটি পড়ার যোগ্য, তা নিয়ে পাঠক নিজেই অন্ধকারে থাকেন। সমালোচনার অনুপস্থিতি পাঠককে একটি জরুরি পথনির্দেশনা থেকে বঞ্চিত করে।

আর আছে মানের প্রশ্ন। অনেক লেখক তাড়াহুড়ো করে লেখেন, একই মৌসুমে পাঁচ-ছয়টি পত্রিকায় লেখা দেন। সব লেখায় সমান মনোযোগ দেওয়া মানবিকভাবে অসম্ভব। পাঠক সেটা টের পান। লেখার শরীর থেকে তাড়ার গন্ধ বের হয়। মান কমলে পাঠক মুখ ফেরান, পাঠক মুখ ফেরালে বাজার কমে, বাজার কমলে লেখকের সম্মানীও কমে। এটি একটি দুষ্টুচক্র। আর এই চক্র ভাঙার দায়িত্ব সম্পাদকদেরও।

মা পড়তেন রান্নার পাতা, আপারা খুঁজতেন প্রিয় অভিনেত্রীর ইন্টারভিউ, আমি খুঁজতাম ছোটদের গল্প। একটাই পত্রিকা, কিন্তু পুরো পরিবারের প্রত্যেকের জন্য কিছু না কিছু ছিল সেখানে।

এখানেই আসল প্রশ্নটা। তরুণ প্রজন্ম বড় হচ্ছে ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম আর শর্ট ভিডিওর সংস্কৃতিতে। এই পরিস্থিতিকে দোষ দিয়ে লাভ নেই, কারণ এটাই তাদের বাস্তবতা। কিন্তু এর মানে এই নয় যে তারা গল্প চায় না, বিষয় কিংবা আবেগ চায় না। চায়, শুধু চাওয়ার ভাষাটা আলাদা হয়ে গেছে। আর সেই ভাষায় কথা বলতে না পারলে ঈদসংখ্যা তাদের কাছে পৌঁছাবে না।

ঈদসংখ্যা একসময় পাঠাভ্যাসও হস্তান্তর করত। বাবার হাত থেকে সন্তানের হাতে যাওয়া একটা পত্রিকা আসলে পড়ার একটা অভ্যাসও বহন করত। সেই শৃঙ্খলটা এখন ছিঁড়ে গেছে। মোবাইলের এই যুগে শুধু ছাপার কালির গন্ধ দিয়ে নতুন প্রজন্মকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।

মোবাইল ফোনকে প্রতিপক্ষ ভাবলে আমরা হেরে যাব। মোবাইল ফোনকে পথ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। ঈদসংখ্যার লেখাগুলো যদি সুন্দর ডিজিটাল সংস্করণে পাওয়া যায়, যদি একটি ভালো গল্পের এক পৃষ্ঠা ইনস্টাগ্রামে পাঠককে বাকিটা পড়তে টানে, যদি একটি উপন্যাসের প্রথম অধ্যায় ইউটিউবে পড়ে শোনানো হয়, তাহলে হয়তো সেই পাঠক পরের ঈদে দোকানে গিয়ে পুরো সংখ্যাটা কিনবেন। এটা আপস না, সময়ের সঙ্গে তাল মেলানোর চেষ্টা।

ঈদসংখ্যার পাতায় গল্প আর কবিতার পাশে লোকগীতি, আঞ্চলিক সাহিত্য, আদিবাসী উৎসবের গল্প আরও বেশি জায়গা পেলে বৈচিত্র্য বাড়বে। পত্রিকাটা তখন শুধু ঢাকার পত্রিকা থাকবে না, সারা দেশের মানুষ নিজেকে সেখানে দেখতে পাবেন। একটি সরকারি প্রকাশনা আর্কাইভ তৈরি হলে এই সাহিত্যের ইতিহাস হারিয়ে যাবে না। আর তরুণদের নিজেদের লেখার জায়গা দিতে হবে। নতুন কণ্ঠস্বর না এলে যেকোনো ঐতিহ্য একদিন জাদুঘরে চলে যায়।

সবচেয়ে জরুরি কথাটা এখানেই। ঈদসংখ্যাকে শুধু বাজারের পণ্য হিসেবে না দেখে একটি সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতে হবে। যে পত্রিকাটা বছরে একবার বের হয়, সেটা যদি সত্যিকারের যত্ন নিয়ে তৈরি হয়, তাহলে পাঠক সেটা টের পাবেন। শেষ পর্যন্ত মানুষ ভালো লেখার কাছেই ফিরে আসে, আজও আসে।

আমি মাঝে মাঝে ভাবি, আমার সন্তান যখন বড় হবে, সে কি কোনোদিন সেই অপেক্ষাটা বুঝতে পারবে? তাজা ছাপার কালির সেই ঘ্রাণটা পাবে? সেটা নির্ভর করছে আমাদের ওপর। ঈদসংখ্যা বাংলাদেশের কাগজের পত্রিকার কয়েক দশকের সেই ঐতিহ্য, যা শুধু সাহিত্য নয়, একটি গোটা জীবনযাপনকে ধারণ করেছে। এই ঐতিহ্য শুধু মনে রাখলেই হবে না, নতুনদের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

পুরনো পাঠক আর নতুন পাঠকের মধ্যে সেতু চাই, ছাপার পৃষ্ঠা আর ডিজিটাল পর্দার মধ্যে যোগাযোগ চাই, গতকালের ঐতিহ্য আর আগামীকালের কৌতূহলের মধ্যেও সেতু চাই। আমরা চাইলে নতুন প্রজন্মকে আবার পড়ার আনন্দে ফেরানো সম্ভব। সেটা কি কম কথা?

  • শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

সম্পর্কিত