পরিবেশ রক্ষায় উদ্যোগ ও বাস্তবতা

সালাহউদ্দিন আহমেদ রায়হান
সালাহউদ্দিন আহমেদ রায়হান

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

পরিবেশ রক্ষা কোন একক ব্যক্তি বা কোন সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি। বাংলাদেশ পৃথিবীতে সবচেয়ে কম পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে, মাত্র ০.৩ শতাংশ। কিন্তু জলবায়ু অভিঘাতে বিপর্যস্ত দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিপর্যস্ত একটি নাম বাংলাদেশ।

উন্নত দেশগুলোর অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের কারণে উন্নয়নশীল দেশের মানুষের জীবন আজ চরম বিপর্যয়ের মুখে। উপকূলীয় অঞ্চলে জ্বলোচ্ছাসের কারণে মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে। লবণাক্ততা বেড়ে সুপেয় পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। কৃষিজমির পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে কমছে। বায়ুমান নিম্নগামী হওয়ায় মানুষের আয়ুষ্কাল কমে যাচ্ছে। তাপমাত্রার পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়াতে বৃষ্টিপাতের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে। কখনও অসময়ে অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা হয়ে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি অনাবৃষ্টির ফলে দেখা দিচ্ছে খরা। বিপন্ন হচ্ছে কৃষকদের জীবনমান।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই ক্ষতি মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে বাংলাদেশের যে পরিমাণ অনুদান পাওয়ার কথা ছিল, বাস্তবে তার খুব সামান্যই পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ সব মিলিয়ে মাত্র ২৪৭.৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান এবং ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ পেয়েছে। অথচ ২০৩৫ সালের মধ্যে 'এনডিসি ৩.০' লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কার্বন নিঃসরণ কমাতে বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে ১১৬.১৮ বিলিয়ন ডলার।

শর্তহীনভাবে ২৬.৭৪ মিলিয়ন টন কার্বন কমানোর জন্য বাংলাদেশ তার নিজস্ব তহবিল থেকে ২৫.৯৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে। কিন্তু শর্তযুক্ত ৫৮.২৩ মিলিয়ন টন কার্বন কমানোর কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের জন্য আরও ৯০.২৩ বিলিয়ন ডলার বিদেশি সাহায্য প্রয়োজন। এ থেকে সহজেই বোঝা যায়, বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েও সবচেয়ে কম অনুদান বা ঋণ পাচ্ছে।

বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে পরিবেশের উপর ব্যাপক কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ এ ধরনের উচ্চাভিলাষী কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য আকাঙ্ক্ষা। এর মাধ্যমে যেমন সবুজ আচ্ছাদনের পরিমাণ বাড়ানোর একটি প্রয়াস, তেমনি বায়ুমানের উন্নয়ন এবং কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণের মাধ্যমে কার্বন ক্রেডিট অর্জনের একটি কার্যকরী প্রয়াস পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই বৃক্ষরোপণ অভিযান চলে আসছে কিন্তু বর্তমান সরকারের উদ্যোগকে সুচিন্তিত মনে হচ্ছে। আমরা সকলেই জানি ১ টন কার্ব ডাই অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে পারলে ১ টি কার্বন ক্রেডিট অর্জন করা যায়। এ ক্ষেত্রে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করতে পারে।

বাংলাদেশ সব মিলিয়ে মাত্র ২৪৭.৩৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান এবং ২৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ পেয়েছে। অথচ ২০৩৫ সালের মধ্যে 'এনডিসি ৩.০' লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কার্বন নিঃসরণ কমাতে বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে ১১৬.১৮ বিলিয়ন ডলার।

সরকার ৩০ লক্ষ চারা দিয়ে ম্যানগ্রোভ বনায়ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং জিপিএস ও জিআইএস সিস্টেমের মাধ্যমে চারাগুলোর অবস্থান ও বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা রাখছে। এবং এর মাধ্যমে ৩.৫ লক্ষ সবুজ কর্মসংস্থান হবে বলে আশা করছে।

পরিবেশ সুরক্ষিত রাখতে হলে সবার আগে দেশে সবুজের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের উদ্যোগও খুব জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর বন, পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ সহকারী ডক্টর সাইমুম পারভেজ বাপা সহ প্রায় ৩৪ টি সংগঠন আয়োজিত সেমিনারে একটি আবেদন রেখেছেন। পরিবেশ রক্ষাকে সরকারের একটি প্রজেক্ট না ভেবে এটাকে মানুষের জীবনের সংস্কৃতির মধ্যে নিয়ে আসার অনুরোধ করেছেন। ধারণাটি এক অর্থে চমৎকার।

আমরা যখন আমাদের দৈনন্দিন চলাফেরায় যত্রতত্র ময়লা, খাবারের প্যাকেট, বাদামের খোসা ফেলা বন্ধ করব, তখন রাস্তাগুলো এমনিতেই অর্ধেকের বেশি পরিষ্কার থাকবে। ড্রেনে ক্লগিং এর সম্ভাবনা কমে জলাবদ্ধতা নিরসন সহজ হবে। আবার আমাদের যখন নিজেদেরই গাছ লাগানোর অভ্যাস গড়ে উঠবে, আমরা যখন প্রতিবছর নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে আমাদের বাসা বাড়িতে বা রাস্তার ধারে বা জলাধারের পাশে, খোলা পতিত জায়গায় গাছ লাগাব তখন এটা আমাদের জীবনের একটি অংশ হয়ে দাঁড়াবে।

সরকারের খাল খনন কর্মসূচি বর্তমান সময়ের জন্য আরেকটি কার্যকর উদ্যোগ। ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের প্রয়াস বাস্তবায়িত হলে কৃষির জন্য এবং পরিবেশের বিরূপ প্রভাব কমাতে সহায়ক হবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে উপযোগী হবে।

এটা খুবই বেদনার বিষয় আমাদের কোনো বর্জ্য শোধনাগার নেই। আমিনবাজার এবং মাতুয়াইলে আমাদের দুটি ল্যান্ডফিল আছে কিন্তু সেই বর্জ্য শোধনের কোন ব্যবস্থা নেই। বর্তমান সরকার আমিনবাজার ল্যান্ডফিল থেকে ওয়েস্ট টু এনার্জি প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে যেটা তাদের নির্বাচনি ইশতেহারেও ছিল এবং এর মাধ্যমে ৩ হাজারি টন বর্জ্য শোধন করে প্রতিদিন ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। সরকার থ্রি-আর পলিসিতে রিডিউস, রি-ইউজ, রিসাইকেল পদ্ধতিতে জোর দিচ্ছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিবেশ দূষণ কমানোর অন্যতম বড় হাতিয়ার। জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সারা পৃথিবীই এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ছুটছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি কার্বন ক্রেডিট অর্জনের অন্যতম বড় উপায়। প্যারিস চুক্তিতে পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.৫ থেকে ২ ডিগ্রি এর মধ্যে রাখার যে লক্ষ্যমাত্রা, তা অর্জনের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। বর্তমান সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ইতিমধ্যে সৌর প্যানেলের উপর বাজেটে কর ও শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে।

বাংলাদেশে মাত্র ১৪ টি সোলার পার্ক ক্রিয়াশীল। সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য রুফটপ সোলারের সাথে সাথে সৌর পার্ক বেশ কার্যকরী। ভেনেজুয়েলা, পাকিস্তানসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ সৌরপার্ক স্থাপন করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বহুলাংশে বাড়িয়েছে।

তাছাড়া কার্বন ক্রেডিট অর্জনের জন্য নতুন প্রজেক্ট বেশ উপযোগী। কারণ নতুন প্রজেক্টের মাধ্যমে কতটুকু কার্বন নিঃসরণ কম হচ্ছে তার একটি প্রকৃত বিশ্লেষণমূলক তথ্য উন্নত দেশ ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছে উপস্থাপন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ডক্টর সাইমুম পারভেজের বরাতেই জানতে পারলাম, মেট্রোরেল করার মাধ্যমে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ কম হচ্ছে তার কোনো ডেটাবেস করা হয়নি এবং কোনো কার্বন ক্রেডিট দাবি করা হয়নি। এটি পূর্ববর্তী সরকারের চরম অজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন সংস্থাও নিজ নিজ উদ্যোগে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করছে। ইউজিসি দেশের ৪৭ টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১ টি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমীক্ষা চালিয়ে ৩১ টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সোলার সিস্টেমের মাধ্যমে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।

বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনি ইশতেহারে পরিবেশের উপর ব্যাপক কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। পরিবেশ সুরক্ষিত রাখতে হলে সবার আগে দেশে সবুজের পরিমাণ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের উদ্যোগও খুব জরুরি।

সরকার লেকগুলো রক্ষা করার উদ্যোগ নিয়েছে। গুলশানের মতো জায়গায় মনুষ্য বর্জ্য সরাসরি লেকে গিয়ে পড়ে অথচ এখনও পর্যন্ত কোন এসটিপি (সিউয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) করা হয়নি। ৫৫ বছরের বাংলাদেশের মানুষের জন্য এ এক দুঃখজনক অধ্যায়, একই সঙ্গে সরকারগুলোর চরম ব্যর্থতা। বর্তমান সরকার লেকগুলো রক্ষা করার জন্য এসটিপি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে ৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বুড়িগঙ্গা সহ দেশের সকল নদীগুলোর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য র‍্যাপিড অ্যাকশন নেওয়া জরুরি। ৩০৮ টি নদীর নাব্যতা ফেরানো জরুরি।

পরিবেশ সুরক্ষা, নদী বা উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন এবং আমাদের হারিয়ে যাওয়া সম্পদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উন্নত দেশগুলো এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে অনুদান পেতে সবার সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি। মানুষ হিসেবে আমাদেরকে পরিবেশবান্ধব হতে হবে। বর্তমান সরকার অনেক জায়গায় বড় বড় গাছ কাটার হাত থেকে রক্ষা করেছে। প্রধানমন্ত্রী পত্রিকার রিপোর্ট দেখে নিজে হস্তক্ষেপ করছেন। কক্সবাজারে একটি রাস্তার ডিজাইন চেইঞ্জ করে হাজার গাছ রক্ষা করেছেন। উখিয়াতে মা বৃক্ষ নিধন বন্ধ করেছেন। ডুলাহাজারাতে বৃক্ষরোপণ করতে গিয়ে বিপন্ন প্রজাতির তেলি গর্জন ও নাগলিঙ্গম গাছ রোপণ করেছেন। এগুলো প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের আন্তরিকতা তুলে ধরে। তারপরও পরিবেশ বিপর্যয়ের কাজ চলছেই।

পত্রিকান্তরে জানা যায় নড়াইলে শতবর্ষী গাছ কাটা হচ্ছে, সৈয়দপুরে শতবর্ষী গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলোর বিরুদ্ধেও সরকারকে সোচ্চার হতে হবে। একটি শতবর্ষী গাছ বাস্তুতন্ত্র রক্ষায়, পরিবেশ রক্ষায় নতুন অনেক গাছের সম্মিলিত প্রয়াসের চেয়ে বেশি কার্যকরী। পাশাপাশি প্রতিটি পৌরসভায় সরকার বর্জ্যের জন্য যে ডাম্পিং স্টেশন করার উদ্যোগ নিয়েছে তাও দ্রুত কার্যকর করা জরুরি।

একটি পরিবার, সমাজ ও দেশের গুণগত পরিবর্তনের জন্য যেমন মানুষের ঐকান্তিক প্রয়াস জরুরি, সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি, ছোট ছোট উদ্যোগ জরুরি, ঠিক তেমনি আমাদের চারপাশের পরিবেশ ঠিক করার জন্যও নাগরিক উদ্যোগ জরুরি। প্রাইমারি পাঠ্যসূচিতেই পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতামূলক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন, এবং আমাদের কোমলমতি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই পরিবেশ সচেতন করতে হবে। যত্রতত্র চিপস এর প্যাকেট, বাদামের খোসা, পলিথিন ব্যবহার না করা হাতে কলমে শেখাতে হবে।

পরিবেশ ও জলবায়ুকর্মী গ্রেটা থানবার্গের একটি বইয়ের নাম “নো ওয়ান ইজ টু স্মল টু মেক আ ডিফারেন্স”। বইটি সম্বন্ধে প্রথম জানতে পারি যখন বইটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টাকে উপহার দিয়েছিলেম।

আসলেই তো যে কোনো ভালো পরিবর্তনের জন্য মনের একাগ্রতা ও সততা জরুরি। বাংলাদেশ নিকট ভবিষ্যতে দেশের বায়ুমান উন্নয়ন করবে, নদীগুলোর প্রাণ ফেরাবে, সবুজ আচ্ছাদন বাড়াবে এবং কার্বন ক্রেডিট বিক্রি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে, এই প্রত্যাশা করি, এবং এই অর্জনে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিক সরকারের একেকজন অ্যাডভোকেট হবে। ক্লিন এন্ড গ্রিন বাংলাদেশ কোনো স্বপ্ন নয়, এটা এখন বাস্তবতা।

  • সালাহউদ্দিন আহমেদ রায়হান: প্রকৌশলী ও কলামিস্ট
Ad 300x250

সম্পর্কিত