কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির বিকাশে বিভিন্ন খাতে অব্যাহতভাবে কর্ম সংকোচন হচ্ছে উন্নত অনেক দেশে। বলা হয়, এ প্রযুক্তি বিকাশের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বিলুপ্ত হবে এন্ট্রি লেভেলের অনেক চাকরি। অর্থ হলো, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে এন্ট্রি লেভেলের চাকরির জন্য যারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন– ২০৩০ সালের পর তাদের সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে অনেকটাই। এ তথ্য একদিকে যেমন উদ্বেগের; তেমনি এ থেকে আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হয়, নিকট ভবিষ্যতে যারা চাকরিতে প্রবেশ করতে চাইবেন; এআই লিটারেসি ছাড়া তাদের পক্ষে এটি প্রাপ্তি সহজ হবে না।
এআই প্রযুক্তি বিকাশের প্রভাব বাংলাদেশের চাকরির বাজারে অবশ্য তেমন লাগেনি এখনও। কারণ এখানকার প্রতিষ্ঠানগুলো সেভাবে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেনি এ প্রযুক্তি ব্যবহারে। কিছু প্রতিষ্ঠান কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠানের মুনাফা বাড়াতে নতুন এ প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিলেও সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানই এখনও রয়েছে এর বাইরে। তবে বিদ্যমান বাস্তবতায় প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় টিকে থাকতে তারাও এক সময় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের। অর্থাৎ বলা যায়, আমাদের দেশে এআইয়ের কারণে চাকরির বাজারে তেমন প্রভাব না পড়লেও অর্থাৎ কর্মসংকোচন না হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে যে এখানেও এর বড় প্রভাব পড়বে এবং কাজের প্রকৃতিতে পরিবর্তন আসবে, তা অনেকটাই নিশ্চিত।
এ অবস্থায় প্রশ্ন ওঠে, যেসব তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের করণীয় কী? মনে রাখা প্রয়োজন, যে কোনো চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিবেচ্য হলো প্রায়োগিক জ্ঞানের পাশাপাশি চাকরি-সংশ্লিষ্ট দক্ষতা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় তাত্ত্বিক জ্ঞান দেওয়া হলেও শিক্ষার্থী প্রায়োগিক জ্ঞান ও কাজ-সংশ্লিষ্ট দক্ষতা অর্জন করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হয় না। এটাও শিক্ষিত বেকারত্বের অন্যতম কারণ। এ অবস্থায় তরুণ জনগোষ্ঠীর উচিত হবে, চাকরির বাজারে প্রবেশের জন্য এআই-সংশ্লিষ্ট যেসব দক্ষতা প্রয়োজন, সেগুলো সম্পর্কে জানা এবং তা অর্জনের চেষ্টা করা। এ ক্ষেত্রে মনে রাখা জরুরি, এন্ট্রি লেভেলের চাকরিতে যেসব দক্ষতা এতদিন প্রয়োজন হতো, আগামীতে সেইসব সেবা পাওয়া যাবে এআইয়ের কাছ থেকেই। আর যেসব সেবা এআইয়ের কাছে মেলে, সেসব পদে প্রতিষ্ঠানগুলো জনবল নিয়োগে আগ্রহী হবে না স্বভাবতই। বিদ্যমান কিছু পদেরও বিলুপ্তি হবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চাকরিতে প্রবেশে ইচ্ছুকদের প্রয়োজন হবে মিডিয়াম লেভেলের দক্ষতা অর্জনে মনোযোগী হওয়া– বিশেষত যেসব কাজ সম্পাদনে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন হয় ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। বলা যায়, তাহলে চাকরি পাওয়া তাদের জন্য সহজ হবে অনেকটাই।
বাস্তবতা হলো, এআই যুগে বৈশ্বিক বাস্তবতায় টিকে থাকা এবং নতুন পরিস্থিতিতে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে তরুণদের মধ্যে যেসব দক্ষতা প্রয়োজন, তার উন্নয়নে উপযুক্ত পদক্ষেপ তেমন একটা লক্ষ করা যাচ্ছে না। আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এখনও পরিচালিত হচ্ছে গতানুগতিক পদ্ধতিতে। এআই প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ হতে থাকলেও তরুণ জনগোষ্ঠীকে এটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখানোর ব্যাপারে সরকারি উদ্যোগ তেমন লক্ষ করা যাচ্ছে না। আর বেসরকারি কিংবা নিজ উদ্যোগে যারা এ প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত হচ্ছেন, তারাও অনেকটা সন্দিহান। কী হবে এসব শিখে? কারণ চাকরির বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হচ্ছে তাদের। আর ভবিষ্যৎ বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে এ প্রযুক্তি ব্যবহারে যারা অভ্যস্ত হচ্ছেন, তারাও রয়েছেন অনেকটা দোদুল্যমান অবস্থায়। কারণ যে কোনো দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে মানুষ চায় কর্মপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা। বিশেষভাবে এআইনির্ভর সরকারি চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে তাদের সামনে এখনও নেই আশার আলো। সরকারি খাতে কর্মী নিয়োগ পদ্ধতি এখনও গতানুগতিক। তাহলে সরকারি চাকরিতে যাদের আগ্রহ, তারা এআই শিখবেন কোন বিবেচনায়? এর মধ্যেও একটি অংশ রয়েছে, তারা নতুন এ প্রযুক্তি-সংক্রান্ত দক্ষতা অর্জন করছেন নিজ তাগিদে। যারা এমনটি করছেন, তারা হয়তো থাকছেন অনেকটা এগিয়ে। কিন্তু চাকরির বাজারে প্রবেশে নিয়োগ প্রক্রিয়া, পদ্ধতি ও অন্যান্য বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে যারা এ প্রযুক্তি ব্যবহার এবং এ সংক্রান্ত দক্ষতা উন্নয়নে এখনও সম্পৃক্ত হতে পারেননি, শঙ্কা তাদের নিয়েই।
নতুন কোনো প্রযুক্তি যখন বাজারে আসে, সেটা ঘিরে ইতিবাচক ও নেতিবাচক– দুই ধরনের কথাই চালু হয়; যেমনটা হয়েছিল কম্পিউটার ব্যাপকভাবে প্রচলন শুরুর পর। এখনও শোনা যাচ্ছে, এআইয়ের কারণে চাকরি হারাবে অনেক মানুষ। এ ক্ষেত্রে সচেতনভাবে বিবেচনার বিষয়, এআই হয়তেো মানুষের কাজকে প্রতিস্থাপন করতে পারবে; কিন্তু তার অভিজ্ঞতা ও মানবিক গুণাবলীকে নয়। এআই দ্বারা জনবল প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় এটাই।
বস্তুত ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র অনেকটাই হবে এআইনির্ভর। আবেগ দিয়ে এটাকে অস্বীকারের সুযোগ নেই। এ অবস্থায় আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী যদি এআই সংক্রান্ত দক্ষতা উন্নয়ন এবং এর ব্যবহার সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকে, তাহলে দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত তো হবেই; কাজ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে প্রবাসেও।
এও মনে দরকার, প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগে নতুন কোনো দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকার অর্থ নিজেকে পিছিয়ে রাখা। চাকরি গ্রহণে ইচ্ছুক তরুণ জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য অংশ এ সম্পর্কে এখনও বেখবর। কিছুদিন আগে প্রকাশিত এক খবরে জানা যায়, বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮৪ শতাংশ জানে না এআই কী; এ প্রযুক্তি কীভাবে ব্যবহার করতে হয় এবং এর ব্যবহারের উপকারিতা কী? বিপুল জনসংখ্যার এ দেশে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য যেহেতু তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হয়, সে ক্ষেত্রে টিকে থাকার জন্যই তাদের অর্জন করতে হবে কর্মবাজারের চাহিদায় থাকা কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা। কর্মী নিয়োগে প্রতিষ্ঠান স্বভাবতই চিন্তা করে, তার মধ্যে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা আছে কি না। কাজের প্রকৃতির কারণে বর্তমানে বিভিন্ন খাতে অদক্ষ জনবল টিকে থাকলেও এআইয়ের যুগে সেটা সহজ হবে বলে মনে হয় না। এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে, কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। অপ্রয়োজনীয় কর্মীর ভার কোনো প্রতিষ্ঠান বেশিদিন বহন করতে চায় না সঙ্গত কারণেই। সংশ্লিষ্টদের কোনো প্রস্তুতি কি রয়েছে এ ব্যাপারে?
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা যে ধারায় পরিচালিত হচ্ছে, তাতে একজন শিক্ষার্থীর এআই সংক্রান্ত দক্ষতা অর্জন কঠিন বলেই মনে হয়। কারণ শিক্ষাব্যবস্থায় এখনও এআইকে সম্পৃক্ত করা হয়নি। বিশ্বে যখন এআইয়ের উদ্ভাবনের কারণে চাকরির বাজারে পরিবর্তন এসেছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়োগ পলিসি পরিবর্তন করছে, কর্মক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত দক্ষতাতেও এসেছে পরিবর্তন, সে অবস্থায় আমাদের নীতিনির্ধারকরা এখনও পিছিয়ে কেন, সেটাও বড় প্রশ্ন। শিক্ষাব্যবস্থায় এ সংক্রান্ত পাঠ যদি সন্নিবেশ করা না হয়, তাহলে বিশেষত যারা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করেন এবং নিম্ন আয়ের মানুষ, তাদের জন্য এ প্রযুক্তি সম্পর্কে দক্ষতা অর্জন অনেকটা কঠিন হবে বলে মনে হয়। কর্মক্ষেত্রে চাহিদায় থাকা দক্ষতা তারা যদি অর্জন করতে না পারেন, তাহলে চাকরির প্রতিযোগিতায় নিজেকে প্রমাণ করবেন কীভাবে? এজন্য বৈশ্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় তরুণ জনগোষ্ঠীকে, বিশেষত প্রান্তিক যারা নিকট ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবেন, তাদেরকে এআই শেখানোর ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকেই।
বস্তুত ভবিষ্যতের কর্মক্ষেত্র অনেকটাই হবে এআইনির্ভর। আবেগ দিয়ে এটাকে অস্বীকারের সুযোগ নেই। এ অবস্থায় আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠী যদি এআই সংক্রান্ত দক্ষতা উন্নয়ন এবং এর ব্যবহার সক্ষমতায় পিছিয়ে থাকে, তাহলে দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ সীমিত তো হবেই; কাজ খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে প্রবাসেও। অস্বীকার করা যাবে না, প্রবাসী আয় আমাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। জনশক্তির অদক্ষতাজনিত কারণে এর প্রবাহ ব্যাহত হলে সেজন্য সামগ্রিকভাবে ভুগবে অর্থনীতি। এজন্য উচিত হবে সরকারি উদ্যোগে ব্যাপকভাবে তরুণ জনগোষ্ঠীর এআই সংক্রান্ত দক্ষতা উন্নয়নে পদক্ষেপ নেওয়া। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের যে সুবিধা আমরা পাচ্ছি– ২০৪০ সালের পর তা আর থাকবে না। অর্থাৎ দেশে যে বিপুলসংখ্যক তরুণ রয়েছে, ২০৪০ সালের পর এর চিত্র ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন হবে। কথা হলো, তরুণদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা, কাজ ও উপার্জন যদি না থাকে, তাহলে তারা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখবেন কীভাবে?
সার্বিক পরিস্থিতিতে আমাদের উচিত, তরুণরা যাতে এআই-সংক্রান্ত দক্ষতা উন্নয়নে আগ্রহী হয়, সেজন্য তাদেরকে উৎসাহ জোগানো। এ সংক্রান্ত লজিস্টিক সাপোর্ট প্রদান করা। আমরা যদি তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা এখন থেকেই উন্নয়ন করতে না পারি কিংবা তাদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে না পারি, তাহলে এমনকি দেশে যে বিপুলসংখ্যক দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হবে, সেটার জোগান আসবে কোত্থেকে? বিপুল জনগোষ্ঠীকে বেকার রেখে আমরা তো আর বাইরে থেকে কর্মী আমদানি করব না। অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সেটা উচিতও হবে না। এজন্য নীতিনির্ধারকদের উচিত হবে দেশের জনগোষ্ঠীর বিদ্যমান সক্ষমতা, অর্থনীতির বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ কর্মক্ষেত্রের কাঙ্ক্ষিত দক্ষতা বিবেচনায় রেখে তরুণদের কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে প্রস্তুত করতে সামগ্রিকভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া।
লেখক: ব্যাংক কর্মকর্তা