এম হুমায়ুন কবিরের নিবন্ধ

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা দেয়?

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল এক ঐতিহাসিক পালাবদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জিতে প্রথমবারের মতো রাজ্যটিতে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। দেড় দশকের তৃণমূল কংগ্রেসের আধিপত্য ভেঙে বিজেপির এই নিরঙ্কুশ উত্থান কেবল পশ্চিমবঙ্গের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়; বরং পার্শ্ববর্তী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ, সীমান্ত অর্থনীতি এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের মধ্যে কেবল পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গেই বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে ২,২১৭ কিলোমিটার। তাই পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার পালাবদল ঢাকার জন্য নিবিড় পর্যালোচনার দাবি রাখে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে মূলত দুটি সমান্তরাল ধারা কাজ করেছে। প্রথমত, রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবলুপ্তি। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস এবং এরপর টানা ৩৪ বছর বামফ্রন্ট যে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করেছিল, তা বর্তমানে প্রায় নিঃশেষিত। এই দুই প্রধান শক্তির পতনের ফলে সৃষ্ট শূন্যতার ওপর দাঁড়িয়েই বিজেপির শেকড় বিস্তারের শুরু। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুদিন এই স্রোত আটকে রাখতে পারলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন।

কূটনীতিতে বাংলাদেশ সবসময়ই কলকাতাকে নয়, বরং দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে। এতদিন কেন্দ্রে বিজেপি এবং রাজ্যে তৃণমূল থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই দিল্লির নীতির সঙ্গে কলকাতার মতবিরোধ দেখা যেত। যেমন— তিস্তা চুক্তিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাধা, আবার অন্যদিকে বিজেপির মুসলিমবিরোধী প্রচারণার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ।

দ্বিতীয়ত, ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসা তৃণমূল কংগ্রেসের টানা ১৫ বছরের শাসনে পুঞ্জীভূত হওয়া ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’ বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী ক্ষোভ। প্রশাসন পরিচালনা, দুর্নীতি এবং সুশাসনের অভাব নিয়ে জনমনে বিস্তর প্রশ্ন ছিল। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে বিজেপি অত্যন্ত সুকৌশলে তাদের ‘হিন্দুত্ববাদী’রাজনীতির বীজ বপন করেছে। এনআরসি (জাতীয় নাগরিকপঞ্জি) ইস্যুকে ব্যবহার করে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯০ লাখ মানুষকে বাদ দেওয়ার মতো বিতর্কিত পদক্ষেপ, এবং নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনিক কাঠামোর সুচতুর ব্যবহারের মাধ্যমে তারা এই বিজয় নিশ্চিত করেছে।

ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে প্রভাব: সুবিধা নাকি শঙ্কা?

কূটনীতিতে বাংলাদেশ সবসময়ই কলকাতাকে নয়, বরং দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ককে প্রাধান্য দিয়ে এসেছে। এতদিন কেন্দ্রে বিজেপি এবং রাজ্যে তৃণমূল থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই দিল্লির নীতির সঙ্গে কলকাতার মতবিরোধ দেখা যেত। যেমন— তিস্তা চুক্তিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাধা, আবার অন্যদিকে বিজেপির মুসলিমবিরোধী প্রচারণার বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন একটি শক্তিশালী প্রতিরোধ।

এখন পশ্চিমবঙ্গে ‘ডাবল ইঞ্জিন’ (কেন্দ্রে ও রাজ্যে একই দলের সরকার) সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে রাজ্যটি দিল্লির কেন্দ্রীয় নীতিমালার সঙ্গে পুরোপুরি যুক্ত হয়ে যাবে। এর ইতিবাচক দিক হলো, কেন্দ্র যদি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায়, তবে কলকাতা আর কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। কিন্তু নেতিবাচক দিক হলো, কেন্দ্রীয় সরকারের কোনো বাংলাদেশ-বিরোধী বা মুসলিম-বিদ্বেষী সিদ্ধান্ত পশ্চিমবঙ্গেও খুব সহজে বাস্তবায়িত হবে, যা বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তির কারণ হতে পারে। শেষ বিচারে, এখন কলকাতার চেয়ে দিল্লির সিদ্ধান্তই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নিরঙ্কুশ প্রভাব বিস্তার করবে।

তিস্তা চুক্তির জট কি খুলবে?

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং ঢাকা সফর করেন। তার সে সফরে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল। শুষ্ক মৌসুমে প্রায় সমতাভিত্তিক পানি বণ্টনের সেই রূপরেখা কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তিতে আটকে যায়। এখন মমতার অনুপস্থিতিতে সেই জট খোলার একটি তাত্ত্বিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তবে বাস্তব পরিস্থিতি বেশ জটিল। পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশে (দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার), যেখান দিয়ে তিস্তা প্রবাহিত, সেখানে বিজেপি এবার ব্যাপক জনসমর্থন পেয়েছে। ফলে, চুক্তি করার আগে বিজেপিকে অবশ্যই ওই অঞ্চলের ভোটারদের স্বার্থের কথা ভাবতে হবে। পুরো বিষয়টি এখন নির্ভর করবে দিল্লির ভূ-রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতার ওপর।

এনআরসি, অনুপ্রবেশ ও মনোজাগতিক ফারাক

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতা গ্রহণ বাংলাদেশে এনআরসি, সিএএ (নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন) এবং তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ইস্যুগুলোকে নতুন করে সামনে আনতে পারে। এই ইস্যুগুলো বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর হলেও, এগুলো কতটা প্রভাব ফেলবে তা নির্ভর করবে ঢাকা-দিল্লির সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর। সম্পর্ক যদি স্থিতিশীল ও মর্যাদাপূর্ণ থাকে, তবে এসব ইস্যু নিয়ে খুব বেশি নাড়াচাড়া হবে না। কিন্তু সম্পর্কে টানাপোড়েন থাকলে এগুলোকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পূর্ণ আশঙ্কা রয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতা গ্রহণ বাংলাদেশে এনআরসি, সিএএ (নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন) এবং তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশ’ ইস্যুগুলোকে নতুন করে সামনে আনতে পারে। এই ইস্যুগুলো বাংলাদেশের জন্য অস্বস্তিকর হলেও, এগুলো কতটা প্রভাব ফেলবে তা নির্ভর করবে ঢাকা-দিল্লির সামগ্রিক সম্পর্কের ওপর।

পাশাপাশি, দুই বাংলার মানুষের সাংস্কৃতিক ও মনোজাগতিক সম্পর্কেও একটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে। জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষের মনোজগতে একটি স্বাধীন ও স্বকীয় ভাবনার বিকাশ ঘটেছে। ঠিক একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থান তাদের সমাজেও মেরুকরণ সৃষ্টি করছে। বিজেপির প্রকাশ্য মুসলিম-বিদ্বেষী প্রচারণা যদি আরও বাড়ে, তবে সাধারণ মানুষের পর্যায়ে পারস্পরিক যোগাযোগ, চিকিৎসায় যাতায়াত এবং সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান সংকুচিত হয়ে আসতে পারে।

বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশল: সমতা মর্যাদা

পরিবর্তিত এই ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশল কী হওয়া উচিত, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমাদের মনে রাখতে হবে, ট্রানজিট, কানেক্টিভিটি বা সীমান্ত বাণিজ্যের মতো প্রকল্পগুলো মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের এখতিয়ারভুক্ত। কলকাতায় আমাদের একটি ডেপুটি হাই কমিশন রয়েছে, যার মাধ্যমে জনগণের পর্যায়ের যোগাযোগগুলো পরিচালিত হয় এবং তা হয়তো স্বাভাবিক নিয়মেই চলতে থাকবে।

তবে জুলাই-উত্তর বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি এসেছে, তা হলো ভারতের সাথে সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গিতে। বাংলাদেশ এখন স্পষ্টভাবেই চায় যে, ভারতের সাথে সম্পর্ক হতে হবে ‘সমতা ও পারস্পরিক মর্যাদা’র ভিত্তিতে। একতরফা নির্ভরতা বা নতজানু নীতির দিন শেষ। ভারত যদি এই নতুন বাংলাদেশের বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে সম্মানজনক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখে, তবে পশ্চিমবঙ্গে কে ক্ষমতায় থাকল, সেটি কোনো বড় সংকট তৈরি করবে না। বরং আত্মমর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেই বাংলাদেশ তার জাতীয় স্বার্থ আদায় করে নিতে সক্ষম হবে।

এম হুমায়ুন কবির: যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

সম্পর্কিত