হরমুজ থেকে তাইওয়ান প্রণালি: সমরকৌশলে নতুন যুগের পদধ্বনি

প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ১৩: ১৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে ভৌগোলিক আধিপত্যের চেয়ে অর্থনৈতিক ‘চোক পয়েন্ট’ নিয়ন্ত্রণই হয়ে উঠেছে শক্তির আসল মহড়া। ইরানের হরমুজ প্রণালিতে সফল ‘ওয়ার অব আনসার্টেনিটি’ আজ বেইজিংয়ের জন্য তাইওয়ান জয়ে এক নতুন ও পরিশীলিত ব্লুপ্রিন্ট হিসেবে হাজির হয়েছে। যেখানে প্রথাগত যুদ্ধজাহাজ ডোবানোর চেয়ে আন্তর্জাতিক বিমা বাজার অচল করে দেওয়া এবং সরবরাহব্যবস্থায় ধস নামানোই মুখ্য কৌশল হতে পারে।

তেলের বিকল্প মজুত থাকলেও সেমিকন্ডাক্টরের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ও অপরিহার্য প্রযুক্তির কোনো বিকল্প নেই, যা তাইওয়ানকে বৈশ্বিক অর্থনীতির স্নায়ুকেন্দ্রে পরিণত করেছে। বিপরীতে চীন বছরের পর বছর ধরে খাদ্য, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের বিশাল মজুত গড়ে তুলে নিজেদের এক অপরাজেয় ‘দুর্গ অর্থনীতিতে’ রূপান্তর করেছে। এই কৌশলগত প্রস্তুতির ফলে বেইজিং এখন দীর্ঘমেয়াদী অবরোধ সহ্য করতে সক্ষম, যা ওয়াশিংটনকে এক কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

হরমুজ থেকে তাইওয়ান—এই সমুদ্রপথগুলো তাই আজ কেবল বাণিজ্যের রুট নয়, বরং বিশ্বব্যবস্থা নির্ধারণের এক অদৃশ্য রিমোট কন্ট্রোল। সমরকৌশলের এই বিবর্তন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামীর যুদ্ধগুলো হয়তো কামানের গোলার চেয়ে অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও লজিস্টিক প্রস্তুতির ওপরই বেশি নির্ভর করবে।

সেমিকন্ডাক্টর: আধুনিক বিশ্বের নতুন ‘তেল’

বিশ শতকের ভূ-রাজনীতি খনিজ তেলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও একুশ শতকের স্নায়ুকেন্দ্র এখন সেমিকন্ডাক্টর, যা আধুনিক প্রযুক্তির প্রতিটি স্তরে অপরিহার্য। তাইওয়ান এই চিপ শিল্পের ৯০ শতাংশের বেশি উন্নত উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বের অবিসংবাদিত নেতা ও অপরিহার্য সরবরাহকারীতে পরিণত হয়েছে। এরফলে তাইওয়ান প্রণালির নিরাপত্তা আজ কেবল আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে স্বীকৃত।

বাজার আধিপত্য

আধুনিক প্রযুক্তির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ১০ ন্যানোমিটারের নিচের চিপ বাজারের প্রায় ৯২% এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তাইওয়ানের টিএসএমসি, যা দেশটিকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অত্যাধুনিক স্মার্টফোন এবং সুপারকম্পিউটারের প্রসেসিং ক্ষমতা সচল রাখতে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র চিপগুলোর কোনো বিকল্প বর্তমানে বিশ্বের কোথাও নেই। এমনকি আধুনিক যুদ্ধকৌশলে ব্যবহৃত নিখুঁত নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র এবং উন্নত রাডার ব্যবস্থার সক্ষমতাও সম্পূর্ণভাবে এই চিপের ওপর নির্ভরশীল। এই বিশাল উৎপাদন ক্ষমতা তাইওয়ানকে ‘সিলিকন শিল্ড’ প্রদান করেছে, কারণ এই সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়া মানে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত স্থবিরতা নেমে আসা। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সেমিকন্ডাক্টরের এই একক আধিপত্যই তাইওয়ানকে পৃথিবীর সবচেয়ে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ডে পরিণত করেছে। এই চিপের অভাব কেবল একটি শিল্প নয়, বরং একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম প্রতিরক্ষা কাঠামোকেও পঙ্গু করে দিতে সক্ষম।

মজুত অসম্ভব

তেল বা প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রে কৌশলগত মজুত গড়ে তুলে সংকটের মোকাবিলা করা সম্ভব হলেও, সেমিকন্ডাক্টরের বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা ও জটিল। মুরের সূত্র অনুযায়ী, প্রতি ১৮ থেকে ২৪ মাস অন্তর চিপের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা দ্বিগুণ হয় এবং পুরনো সংস্করণগুলো দ্রুত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে। এই অতি-দ্রুত বিবর্তনের কারণে সেমিকন্ডাক্টর দীর্ঘদিন গুদামজাত করে রাখা কার্যত অসম্ভব, কারণ নির্দিষ্ট সময় পর তা অকেজো বা সেকেলে সম্পদে পরিণত হয়। ফলে তাইওয়ানের মতো একটি সক্রিয় সরবরাহ উৎসের ওপর বিশ্ব যে পরিমাণ নির্ভরশীল, তার কোনো দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প মজুত পরিকল্পনা আমেরিকার মতো পরাশক্তির পক্ষেও করা সম্ভব নয়। এই কারিগরি সীমাবদ্ধতাই সেমিকন্ডাক্টরকে তেলের চেয়েও অনেক বেশি ভঙ্গুর এবং স্পর্শকাতর একটি ভূ-রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত করেছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব

ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাইওয়ান প্রণালিতে যেকোনো সামরিক সংঘাত বা বড় ধরনের অচলাবস্থা বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলারের ভয়াবহ রক্তক্ষরণ ঘটাবে। এই বিশাল অঙ্কের ক্ষতি বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশের সমান, যা ২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দা কিংবা করোনা মহামারির অর্থনৈতিক আঘাতকেও ম্লান করে দেবে। যেহেতু বিশ্বজুড়ে অটোমোবাইল, টেলিযোগাযোগ এবং প্রতিরক্ষা শিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খল সরাসরি এই অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল, তাই এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারকে এক দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। সেমিকন্ডাক্টরের অভাব কেবল প্রযুক্তি নয়, বরং পুরো আর্থিক ব্যবস্থাকেই ধসিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, যা এই সংকটকে মানব ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পরিণত করবে।

চীনের ‘ফোরট্রেস ইকোনমি’

পশ্চিমাদের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অবরোধকে মোকাবিলা করতে চীন গত এক দশক ধরে তাদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে একটি দুর্ভেদ্য ‘ফোরট্রেস’ বা দুর্গ হিসেবে গড়ে তুলেছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বেইজিং প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং লজিস্টিক খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের মাধ্যমে এমন একটি প্রতিরক্ষা বলয় তৈরি করেছে যা বাইরের নিষেধাজ্ঞায় সহজে ভাঙবে না। এই রণকৌশলের মূল উদ্দেশ্য হলো তাইওয়ান সংকটের মতো দীর্ঘমেয়া; ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও নিজের টিকে থাকার সক্ষমতা নিশ্চিত করা।

খাদ্য নিরাপত্তা

চীনের ‘ফোরট্রেস ইকোনমি’র সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ হলো তাদের নজিরবিহীন খাদ্য মজুত ব্যবস্থা, যা যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি অবরোধে বেইজিংকে কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব দান করে। ২০২২ সালের উপাত্ত অনুযায়ী, বিশ্বের মোট ভুট্টার ৬৯%, চালের ৬০% এবং গমের ৫১% এখন চীনের সরকারি গুদামে সংরক্ষিত, যা দেশটির ১৪০ কোটি মানুষের কয়েক বছরের খাদ্য চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এই বিশাল মজুত নিশ্চিত করে যে, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও বা সমুদ্রপথে অবরোধ সৃষ্টি হলেও চীনে কোনো দুর্ভিক্ষ বা চরম খাদ্যসংকট দেখা দেবে না। যুদ্ধের ময়দানে সেনাদের টিকে থাকার পাশাপাশি সাধারণ জনগণের মনোবল ধরে রাখতে এই খাদ্য নিরাপত্তা চীনের জন্য একটি অঘোষিত ঢাল হিসেবে কাজ করছে। সম্ভাব্য পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং বিশ্ববাজারের অস্থিরতাকে জয় করতেই সি চিন পিং প্রশাসন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই ‘খাদ্য দুর্গ’ গড়ে তুলেছে।

জ্বালানি মজুত

সমুদ্রপথ অবরুদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি মোকাবিলায় চীন তাদের কৌশলগত তেলের মজুতকে এক অভূতপূর্ব উচ্চতায় নিয়ে গেছে, যা যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী জরুরি অবস্থা সামাল দিতে সক্ষম। এর পাশাপাশি তারা মালাক্কা প্রণালির মতো ঝুঁকিপূর্ণ জলপথের ওপর নির্ভরতা কমাতে রাশিয়া ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে স্থলপথের পাইপলাইন সংযোগ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি করছে। এই দ্বিমুখী কৌশলের ফলে মার্কিন নৌ-অবরোধ সত্ত্বেও চীনের শিল্পকারখানা ও সামরিক যন্ত্র সচল রাখার মতো নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত থাকবে। জ্বালানির এই ‘অভ্যন্তরীণ এবং আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক’ চীনকে বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞার মুখেও একটি স্থিতিশীল ও শক্তিশালী অবস্থানে টিকিয়ে রাখবে।

আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রধান অস্ত্র ‘ডলার সিস্টেম’ থেকে নিজেদের মুক্ত করতে চীন অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদের নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম এবং ডিজিটাল ইউয়ানের প্রসার ঘটাচ্ছে। এই ‘ডি-ডলারাইজেশন’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বেইজিং এমন এক বিকল্প আর্থিক কাঠামো তৈরি করছে, যা আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সুইফট বা মার্কিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে কাজ করতে সক্ষম। ফলে তাইওয়ান ইস্যুতে কোনো অবরোধ আরোপ করা হলেও চীনের বিশ্ববাণিজ্য এবং অভ্যন্তরীণ আর্থিক লেনদেন ব্যবস্থা পুরোপুরি অচল করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। মূলত ডলারের একাধিপত্য ভেঙে এই আর্থিক স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনই চীনের ‘ফোরট্রেস ইকনোমি’কে পূর্ণতা দিয়েছে।

সমরকৌশলে নতুন মডেল: ‘গ্রে জোন’ অপারেশন

ইরান হরমুজ প্রণালিতে যে মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল গ্রহণ করেছে, বেইজিং তাইওয়ানের ক্ষেত্রে তার আরও উন্নত ও বহুমাত্রিক ‘গ্রে জোন’ সংস্করণ প্রয়োগের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এটি এমন এক রণকৌশল যেখানে প্রথাগত যুদ্ধ ঘোষণা না করেই সামরিক মহড়া, সাইবার হামলা এবং আইনি মারপ্যাঁচের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দিশেহারা করে ফেলা হয়। সরাসরি সংঘাতে না গিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরির এই মডেলটি চীনকে রক্তপাতহীন বিজয়ের পথে অনেকখানি এগিয়ে দিচ্ছে।

ইনোসেন্ট প্যাসেজ ও আইনি নিয়ন্ত্রণ

আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে চীন যদি তাইওয়ান প্রণালিকে তাদের ‘অভ্যন্তরীণ জলসীমা’ হিসেবে দাবি করে, তবে সেখানে মুক্ত জাহাজ চলাচলের দীর্ঘদিনের অধিকার চরম হুমকির মুখে পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে ‘ইনোসেন্ট প্যাসেজ’ বা নিরীহ চলাচলের সুবিধা পেতেও বেইজিংয়ের অনুমতির প্রয়োজন হবে, যা প্রকারান্তরে আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের চাবিকাঠি চীনের হাতে তুলে দেবে। এরফলে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে হয় দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হবে, নতুবা চীনের আইনি নিয়ন্ত্রণ মেনে নিয়ে এক অনিশ্চিত যাত্রা শুরু করতে হবে। এই আইনি মারপ্যাঁচ ব্যবহার করে বেইজিং কোনো সরাসরি যুদ্ধ ছাড়াই তাইওয়ানকে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করার এক প্রবল শক্তিশালী হাতিয়ার পেয়ে যাবে।

বিমা ও ‘ফাইভ পাওয়ার ক্লজ’

চীনের পরিকল্পিত ‘মিসাইল টেস্ট জোন’ বা সামরিক মহড়ার ঘোষণা আন্তর্জাতিক সমুদ্রবাণিজ্যে এক মরণফাঁদ তৈরি করবে, যা ‘ফাইভ পাওয়ার ক্লজ’ সক্রিয় হওয়ার মাধ্যমে বিমা সুবিধা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে। লন্ডন বা সিঙ্গাপুরের মতো প্রধান বিমা বাজারগুলো যখন এই ঝুঁকি নিতে অস্বীকার করবে, তখন উচ্চ প্রিমিয়ামের ভয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাইওয়ান অভিমুখী যাত্রা স্থগিত করবে। এর ফলে কোনো সরাসরি টর্পেডো বা ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার ছাড়াই বেইজিং কেবল মনস্তাত্ত্বিক ও বাণিজ্যিক চাপ প্রয়োগ করে তাইওয়ানকে বিশ্ব অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে সক্ষম হবে। এই ‘ইন্সুরেন্স ওয়ারফেয়ার’ হবে একবিংশ শতাব্দীর রক্তপাতহীন অবরোধের সবচেয়ে কার্যকরী ও আধুনিক অস্ত্র।

প্রস্তুতি ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

গণতান্ত্রিক মিত্রদেশগুলো—যুক্তরাষ্ট্র, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়া—এখন এই রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি যে, তাইওয়ান সংকটের মতো বহুমুখী চ্যালেঞ্জ কেবল সামরিক শক্তি বা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। চীন যেভাবে তাদের ‘দুর্গ অর্থনীতি’ এবং ‘গ্রে জোন’ কৌশলে অগ্রসর হচ্ছে, তার বিপরীতে মিত্রদের এখন লজিস্টিক এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার দিকে বেশি নজর দিতে হচ্ছে। বিশেষ করে সংকটকালীন সময়ে চিপ এবং অত্যাবশ্যকীয় ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে দেশগুলোর মধ্যে একটি শক্তিশালী ‘অগ্রিম লজিস্টিক চুক্তি’ থাকা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে তাদের ‘চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়িয়ে তাইওয়ানের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা করছে, তবে এই ধরনের বিশাল শিল্প কাঠামো পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে এবং বৈশ্বিক চাহিদার উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করতে আরও কয়েক বছর নিবিড় বিনিয়োগ ও সময়ের প্রয়োজন। এর মধ্যে কোনো আকস্মিক সংঘাত শুরু হলে মিত্র দেশগুলোর হাতে কার্যকর কোনো অর্থনৈতিক ‘রক্ষাকবচ’ বা তেলের মতো ‘জরুরি চিপ মজুত’ নেই। ফলে বর্তমান সময়টি পশ্চিমা জোটের জন্য এক চরম অগ্নিপরীক্ষা, যেখানে তাদের দ্রুত বিকল্প সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সমন্বিত অর্থনৈতিক সুরক্ষা বলয় তৈরি করতে হচ্ছে। চীনের সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক অবরোধের মুখে শুধু সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বাজারের ধস ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।

হরমুজ প্রণালির বর্তমান অস্থিরতা কেবল একটি আঞ্চলিক জ্বালানি সংকট নয়, বরং এটি তাইওয়ান সংকটের প্রেক্ষাপটে চীনের জন্য এক সুপরিকল্পিত কৌশলগত মহড়া। বিশ্ব আজ এক নতুন ধরনের স্নায়ুযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে সমরকৌশল এখন আর কেবল কামানের গোলা বা পদাতিক বাহিনীর শক্তিতে সীমাবদ্ধ নেই। আগামীর যুদ্ধজয়ের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে বিমা পলিসির নিয়ন্ত্রণ, সেমিকন্ডাক্টর চিপের একক আধিপত্য এবং বিশাল খাদ্য ও জ্বালানি মজুতের সক্ষমতার মাঝে। চীন তাদের দুর্গ অর্থনীতির মাধ্যমে যে অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিচ্ছে, তা ভাঙতে প্রথাগত সামরিক শক্তির চেয়েও শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও লজিস্টিক পাল্টা-কাঠামো প্রয়োজন। পরাশক্তিদের এই দাবার ছকে তাইওয়ান ও হরমুজ আজ বিশ্ব অর্থনীতির একেকটি ‘রিমোট কন্ট্রোল’, যার সামান্যতম নড়চড় পুরো বিশ্বব্যবস্থাকে লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে। এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে গণতান্ত্রিক মিত্রদেশগুলোকে এখনই নিজেদের সরবরাহ শৃঙ্খল সুরক্ষিত করতে হবে এবং দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। সংকট যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন কেবল সামরিক মহড়া নয়, বরং অর্থনৈতিক সুরক্ষাই হবে আগামীর শ্রেষ্ঠ প্রতিরক্ষা। সমরকৌশলের এই নতুন যুগে যারা লজিস্টিক এবং প্রযুক্তির স্নায়ুকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করবে, তারাই শেষ পর্যন্ত বিশ্বরাজনীতির ভাগ্যলিপি নির্ধারণ করবে।

  • সুমন সুবহান: নিরাপত্তা বিশ্লেষক

সম্পর্কিত