সৈয়দ মিসবাহ উদ্দিন আহমদ

“জো ডর গায়া, সমঝো মর গায়া”—শোলে চলচ্চিত্রে গব্বর সিংয়ের এই বিখ্যাত সংলাপটি মূলত ভীতি সৃষ্টির একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। কিন্তু জনপ্রিয় সংস্কৃতির অনেক সংলাপের মতো এটিও চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর বাস্তবতার একটি রূপক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ছোট রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক: বড় শক্তির সামনে ভয় পাওয়া কি দুর্বলতার লক্ষণ? আর ভয় না পাওয়ার অর্থ কি সংঘাতকে বেছে নেওয়া?
আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা অবশ্য এতটা সরল নয়। রাষ্ট্রের জগৎ গব্বর সিংয়ের জগতের মতো নয়। এখানে শক্তির পাশাপাশি কাজ করে অর্থনীতি, কূটনীতি, সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক আইন, ভূগোল এবং জনমত। ফলে গব্বরের সংলাপকে রাষ্ট্রীয় নীতির দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি এর অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক সত্যটিকে অস্বীকার করাও ভুল।
ছোট রাষ্ট্রের প্রথম দুর্বলতা অনেক সময় তার সামরিক শক্তির ঘাটতি নয়; বরং নিজের শক্তি সম্পর্কে অনাস্থা। কোনো রাষ্ট্র যদি আগেভাগেই ধরে নেয় যে বড় প্রতিবেশীর সামনে তার কিছুই করার নেই, তাহলে প্রতিপক্ষকে চাপ প্রয়োগের জন্য খুব বেশি কিছু করতে হয় না। আত্মসমর্পণ তখন সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই ঘটে যায়। সুতরাং “ভয় না পাওয়া”র অর্থ বেপরোয়া হওয়া নয়। এর অর্থ হলো—ভয়কে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ন্ত্রক হতে না দেওয়া।
বাস্তববাদী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা সমান নয়। বড় শক্তির সঙ্গে ছোট রাষ্ট্রের সামরিক প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রেই অসম। কিন্তু এই অসমতা ছোট রাষ্ট্রকে কৌশলহীন হওয়ার কোনো অজুহাত দেয় না। বরং এখানেই কৌশলের গুরুত্ব বাড়ে।
একটি ছোট রাষ্ট্রকে তাই প্রশ্ন করতে হয়—আমি কতটা শক্তিশালী, শুধু সেটি নয়; বরং আমার কোন শক্তিকে প্রতিপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারি?
রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার আয়তন, জনসংখ্যা কিংবা সামরিক বাজেট দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। ভূ-কৌশলগত অবস্থান, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, বন্দর, সমুদ্রপথ, প্রাকৃতিক সম্পদ, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও রাষ্ট্রীয় শক্তির উপাদান। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো সিঙ্গাপুর।
আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও দক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বন্দর ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাধ্যমে দেশটি তার কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়েছে। অর্থাৎ ছোট হওয়া নিজে কোনো কৌশলগত দুর্বলতা নয়। দুর্বলতা হলো নিজের সম্পদকে কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তর করতে না পারা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রবন্দর, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, উৎপাদন সক্ষমতা, জনশক্তি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে আমাদের অবস্থান—এসবকে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পদ।
বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি জলভাগ নয়। এটি বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নীল অর্থনীতির কেন্দ্র। এই সামুদ্রিক বাস্তবতাকে জাতীয় কৌশলের কেন্দ্রে নিয়ে আসা তাই কোনো বিলাসিতা নয়। বরং এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার অপরিহার্য অংশ।
কূটনৈতিক স্বাধীনতা অনেকাংশে অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যে রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট দেশ, বাজার বা সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, তার কূটনৈতিক বিকল্পও সংকুচিত হয়। তাই বাজার বহুমুখীকরণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশকে শুধু অর্থনৈতিক নীতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এগুলো জাতীয় নিরাপত্তারও উপাদান।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো—একটি মাত্র বাজার বা একটি মাত্র অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংযোগ তৈরি করা। যত বেশি বিকল্প, তত বেশি দরকষাকষির ক্ষমতা।
ছোট রাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো বহুমুখী কূটনীতি। এর অর্থ কারও বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া।
বাংলাদেশের জন্য তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উপসাগরীয় দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব এক নয়; প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রও আলাদা। কোথাও নিরাপত্তা, কোথাও বাণিজ্য, কোথাও অবকাঠামো বা প্রযুক্তি, কোথাও শ্রমবাজার—প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব মূল্য রয়েছে। তাই একটি সম্পর্ককে অন্যটির বিকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় স্বার্থের পৃথক স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলাই হতে পারে অধিক কার্যকর কৌশল।
এটি কোনো পক্ষের প্রতি বৈরিতা নয়। বরং এটি কৌশলগত বৈচিত্র্য—যেখানে রাষ্ট্র তার বিকল্পগুলো যত বেশি বিস্তৃত রাখে, তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরও তত বড় হয়।
ছোট রাষ্ট্রের হাতে বড় শক্তির মতো সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা না থাকলেও তাদের হাতে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান। জাতিসংঘ, ডব্লিউটিও, আনক্লোস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক কাঠামো ছোট রাষ্ট্রকে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সুবিধা গ্রহণের সুযোগ দেয়।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের অভিজ্ঞতা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আন্তর্জাতিক আইন ও সালিশি ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সামুদ্রিক অধিকারের একটি সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। এখানে একটি বড় শিক্ষা আছে। আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল রাষ্ট্রের আশ্রয় হিসেবে দেখার পরিবর্তে এটিকে রাষ্ট্রীয় শক্তির একটি উপাদান হিসেবে দেখতে হবে।
রাষ্ট্রীয় আত্মমর্যাদার সবচেয়ে বড় ভুল ব্যাখ্যা হলো—প্রতিটি বিষয়ে কঠোর হওয়াকেই সাহস মনে করা। আসলে কৌশলগত পরিপক্বতা হলো কোথায় দৃঢ় হতে হবে এবং কোথায় নমনীয় হতে হবে, তা জানা।
কোনো বিষয়ে আপস করা যায়, কোনো বিষয়ে যায় না। কোথাও নীরবতা কৌশল। কোথাও প্রকাশ্য অবস্থান প্রয়োজন হলেও কোথাও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কার্যকর। আবার কোথাও বহুপাক্ষিক মঞ্চ অধিক কার্যকর। যে রাষ্ট্র প্রতিটি প্রশ্নকে “সম্মান বনাম অপমান” হিসেবে দেখে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের কৌশলগত বিকল্পই কমিয়ে ফেলে। সত্যিকারের শক্তি হলো—সংঘাত এড়াতে সক্ষম হওয়া, কিন্তু প্রয়োজন হলে নিজের স্বার্থ রক্ষায় প্রস্তুত থাকা।
বাংলাদেশের জন্য গব্বর সিংয়ের দর্শন নয়, বরং তার একটি পরিশীলিত বিপরীত দর্শন প্রয়োজন। ভয়কে অস্বীকার নয়—ভয়কে বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রতিবেশীকে ভয় নয়—প্রতিবেশীর স্বার্থ বুঝতে হবে। বড় শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য চ্যালেঞ্জ নয়—নিজের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কূটনৈতিক নিরপেক্ষতার নামে নিষ্ক্রিয়তা নয়—জাতীয় স্বার্থভিত্তিক সক্রিয় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সামরিক প্রস্তুতিতে কোনরূপ ছাড় না দেয়া।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের কৌশলগত চিন্তাকে স্থলসীমা থেকে সমুদ্রের দিকে আরও বিস্তৃত করা। বঙ্গোপসাগরকে শুধু বাণিজ্যিক জলসীমা হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনীতি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও ভূ-কৌশলের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে।
একটি রাষ্ট্র তখনই তার ভৌগোলিক আকারের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, যখন অন্যরা তাকে তার আয়তন দিয়ে নয়, তার কৌশলগত মূল্য দিয়ে বিচার করতে শুরু করে।
গব্বরের সংলাপ “জো ডর গয়া, সমঝো মর গয়া”—এই সংলাপ রাষ্ট্রীয় নীতির পূর্ণাঙ্গ দর্শন হতে পারে না। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতি বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো দস্যুর জগৎ নয়। এখানে সামরিক শক্তির সঙ্গে অর্থনীতি, অর্থনীতির সঙ্গে কূটনীতি, কূটনীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন এবং সবকিছুর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দূরদৃষ্টি কাজ করে।
তবু সংলাপটির একটি শিক্ষা আছে। তা হলো- ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করা যাবে না। তবে ভয় না পাওয়ার অর্থও বেপরোয়া হওয়া নয়। প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক ভয়কে অস্বীকার করেন না। বরং তিনি ভয়কে পরিমাপ করেন, ঝুঁকি হিসাব করেন এবং সেই অনুযায়ী কৌশল নির্ধারণ করেন।
ছোট রাষ্ট্রের শক্তির নতুন সংজ্ঞা তাই হতে পারে—
ভীত নই, কিন্তু বেপরোয়া ও নই।
নমনীয়, কিন্তু নত নই।
শান্তিপ্রিয়, কিন্তু অপ্রস্তুত নই।
ছোট, কিন্তু মাথা নোয়াবার নই।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার হাতে থাকা অস্ত্রে নয়; বরং কখন শক্তি প্রয়োগ করতে হবে, কখন কূটনীতি করতে হবে, কখন অপেক্ষা করতে হবে এবং কখন নিজের কৌশলগত সম্পদকে কাজে লাগাতে হবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায়। গব্বর সিংয়ের ভাষায় নয়, রাষ্ট্রনায়কের ভাষায় বলতে গেলে—ভয় নয়, কৌশলই ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি।

“জো ডর গায়া, সমঝো মর গায়া”—শোলে চলচ্চিত্রে গব্বর সিংয়ের এই বিখ্যাত সংলাপটি মূলত ভীতি সৃষ্টির একটি মনস্তাত্ত্বিক অস্ত্র। কিন্তু জনপ্রিয় সংস্কৃতির অনেক সংলাপের মতো এটিও চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর বাস্তবতার একটি রূপক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ছোট রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক: বড় শক্তির সামনে ভয় পাওয়া কি দুর্বলতার লক্ষণ? আর ভয় না পাওয়ার অর্থ কি সংঘাতকে বেছে নেওয়া?
আন্তর্জাতিক রাজনীতির বাস্তবতা অবশ্য এতটা সরল নয়। রাষ্ট্রের জগৎ গব্বর সিংয়ের জগতের মতো নয়। এখানে শক্তির পাশাপাশি কাজ করে অর্থনীতি, কূটনীতি, সামরিক সক্ষমতা, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক আইন, ভূগোল এবং জনমত। ফলে গব্বরের সংলাপকে রাষ্ট্রীয় নীতির দর্শন হিসেবে গ্রহণ করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি এর অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক সত্যটিকে অস্বীকার করাও ভুল।
ছোট রাষ্ট্রের প্রথম দুর্বলতা অনেক সময় তার সামরিক শক্তির ঘাটতি নয়; বরং নিজের শক্তি সম্পর্কে অনাস্থা। কোনো রাষ্ট্র যদি আগেভাগেই ধরে নেয় যে বড় প্রতিবেশীর সামনে তার কিছুই করার নেই, তাহলে প্রতিপক্ষকে চাপ প্রয়োগের জন্য খুব বেশি কিছু করতে হয় না। আত্মসমর্পণ তখন সংঘাত শুরু হওয়ার আগেই ঘটে যায়। সুতরাং “ভয় না পাওয়া”র অর্থ বেপরোয়া হওয়া নয়। এর অর্থ হলো—ভয়কে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের নিয়ন্ত্রক হতে না দেওয়া।
বাস্তববাদী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক আমাদের শেখায় যে রাষ্ট্রগুলোর সক্ষমতা সমান নয়। বড় শক্তির সঙ্গে ছোট রাষ্ট্রের সামরিক প্রতিযোগিতা অনেক ক্ষেত্রেই অসম। কিন্তু এই অসমতা ছোট রাষ্ট্রকে কৌশলহীন হওয়ার কোনো অজুহাত দেয় না। বরং এখানেই কৌশলের গুরুত্ব বাড়ে।
একটি ছোট রাষ্ট্রকে তাই প্রশ্ন করতে হয়—আমি কতটা শক্তিশালী, শুধু সেটি নয়; বরং আমার কোন শক্তিকে প্রতিপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারি?
রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার আয়তন, জনসংখ্যা কিংবা সামরিক বাজেট দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। ভূ-কৌশলগত অবস্থান, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, মানবসম্পদ, প্রযুক্তি, বন্দর, সমুদ্রপথ, প্রাকৃতিক সম্পদ, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতাও রাষ্ট্রীয় শক্তির উপাদান। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো সিঙ্গাপুর।
আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও দক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বন্দর ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো এবং বহুমুখী আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মাধ্যমে দেশটি তার কৌশলগত গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়েছে। অর্থাৎ ছোট হওয়া নিজে কোনো কৌশলগত দুর্বলতা নয়। দুর্বলতা হলো নিজের সম্পদকে কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তর করতে না পারা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই উপলব্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রবন্দর, বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, উৎপাদন সক্ষমতা, জনশক্তি এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে আমাদের অবস্থান—এসবকে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো বাংলাদেশের কৌশলগত সম্পদ।
বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি জলভাগ নয়। এটি বাণিজ্য, জ্বালানি, যোগাযোগ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ নীল অর্থনীতির কেন্দ্র। এই সামুদ্রিক বাস্তবতাকে জাতীয় কৌশলের কেন্দ্রে নিয়ে আসা তাই কোনো বিলাসিতা নয়। বরং এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার অপরিহার্য অংশ।
কূটনৈতিক স্বাধীনতা অনেকাংশে অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। যে রাষ্ট্র একটি নির্দিষ্ট দেশ, বাজার বা সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, তার কূটনৈতিক বিকল্পও সংকুচিত হয়। তাই বাজার বহুমুখীকরণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশকে শুধু অর্থনৈতিক নীতি হিসেবে দেখা উচিত নয়। এগুলো জাতীয় নিরাপত্তারও উপাদান।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ হলো—একটি মাত্র বাজার বা একটি মাত্র অংশীদারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সংযোগ তৈরি করা। যত বেশি বিকল্প, তত বেশি দরকষাকষির ক্ষমতা।
ছোট রাষ্ট্রের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হলো বহুমুখী কূটনীতি। এর অর্থ কারও বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়। বরং জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে সবার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হওয়া।
বাংলাদেশের জন্য তুরস্ক, সৌদি আরব, পাকিস্তান, ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উপসাগরীয় দেশ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব এক নয়; প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রও আলাদা। কোথাও নিরাপত্তা, কোথাও বাণিজ্য, কোথাও অবকাঠামো বা প্রযুক্তি, কোথাও শ্রমবাজার—প্রতিটি সম্পর্কের নিজস্ব মূল্য রয়েছে। তাই একটি সম্পর্ককে অন্যটির বিকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় স্বার্থের পৃথক স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তোলাই হতে পারে অধিক কার্যকর কৌশল।
এটি কোনো পক্ষের প্রতি বৈরিতা নয়। বরং এটি কৌশলগত বৈচিত্র্য—যেখানে রাষ্ট্র তার বিকল্পগুলো যত বেশি বিস্তৃত রাখে, তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরও তত বড় হয়।
ছোট রাষ্ট্রের হাতে বড় শক্তির মতো সামরিক বা অর্থনৈতিক ক্ষমতা না থাকলেও তাদের হাতে রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ—আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান। জাতিসংঘ, ডব্লিউটিও, আনক্লোস এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক কাঠামো ছোট রাষ্ট্রকে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার সুবিধা গ্রহণের সুযোগ দেয়।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের অভিজ্ঞতা তার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আন্তর্জাতিক আইন ও সালিশি ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার সামুদ্রিক অধিকারের একটি সুস্পষ্ট আন্তর্জাতিক ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। এখানে একটি বড় শিক্ষা আছে। আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল রাষ্ট্রের আশ্রয় হিসেবে দেখার পরিবর্তে এটিকে রাষ্ট্রীয় শক্তির একটি উপাদান হিসেবে দেখতে হবে।
রাষ্ট্রীয় আত্মমর্যাদার সবচেয়ে বড় ভুল ব্যাখ্যা হলো—প্রতিটি বিষয়ে কঠোর হওয়াকেই সাহস মনে করা। আসলে কৌশলগত পরিপক্বতা হলো কোথায় দৃঢ় হতে হবে এবং কোথায় নমনীয় হতে হবে, তা জানা।
কোনো বিষয়ে আপস করা যায়, কোনো বিষয়ে যায় না। কোথাও নীরবতা কৌশল। কোথাও প্রকাশ্য অবস্থান প্রয়োজন হলেও কোথাও দ্বিপাক্ষিক আলোচনা কার্যকর। আবার কোথাও বহুপাক্ষিক মঞ্চ অধিক কার্যকর। যে রাষ্ট্র প্রতিটি প্রশ্নকে “সম্মান বনাম অপমান” হিসেবে দেখে, সে শেষ পর্যন্ত নিজের কৌশলগত বিকল্পই কমিয়ে ফেলে। সত্যিকারের শক্তি হলো—সংঘাত এড়াতে সক্ষম হওয়া, কিন্তু প্রয়োজন হলে নিজের স্বার্থ রক্ষায় প্রস্তুত থাকা।
বাংলাদেশের জন্য গব্বর সিংয়ের দর্শন নয়, বরং তার একটি পরিশীলিত বিপরীত দর্শন প্রয়োজন। ভয়কে অস্বীকার নয়—ভয়কে বিশ্লেষণ করতে হবে। প্রতিবেশীকে ভয় নয়—প্রতিবেশীর স্বার্থ বুঝতে হবে। বড় শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার জন্য চ্যালেঞ্জ নয়—নিজের দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে হবে। কূটনৈতিক নিরপেক্ষতার নামে নিষ্ক্রিয়তা নয়—জাতীয় স্বার্থভিত্তিক সক্রিয় ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সামরিক প্রস্তুতিতে কোনরূপ ছাড় না দেয়া।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাংলাদেশের কৌশলগত চিন্তাকে স্থলসীমা থেকে সমুদ্রের দিকে আরও বিস্তৃত করা। বঙ্গোপসাগরকে শুধু বাণিজ্যিক জলসীমা হিসেবে নয়, জাতীয় অর্থনীতি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও ভূ-কৌশলের অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে।
একটি রাষ্ট্র তখনই তার ভৌগোলিক আকারের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, যখন অন্যরা তাকে তার আয়তন দিয়ে নয়, তার কৌশলগত মূল্য দিয়ে বিচার করতে শুরু করে।
গব্বরের সংলাপ “জো ডর গয়া, সমঝো মর গয়া”—এই সংলাপ রাষ্ট্রীয় নীতির পূর্ণাঙ্গ দর্শন হতে পারে না। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতি বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো দস্যুর জগৎ নয়। এখানে সামরিক শক্তির সঙ্গে অর্থনীতি, অর্থনীতির সঙ্গে কূটনীতি, কূটনীতির সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইন এবং সবকিছুর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দূরদৃষ্টি কাজ করে।
তবু সংলাপটির একটি শিক্ষা আছে। তা হলো- ভয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করা যাবে না। তবে ভয় না পাওয়ার অর্থও বেপরোয়া হওয়া নয়। প্রকৃত রাষ্ট্রনায়ক ভয়কে অস্বীকার করেন না। বরং তিনি ভয়কে পরিমাপ করেন, ঝুঁকি হিসাব করেন এবং সেই অনুযায়ী কৌশল নির্ধারণ করেন।
ছোট রাষ্ট্রের শক্তির নতুন সংজ্ঞা তাই হতে পারে—
ভীত নই, কিন্তু বেপরোয়া ও নই।
নমনীয়, কিন্তু নত নই।
শান্তিপ্রিয়, কিন্তু অপ্রস্তুত নই।
ছোট, কিন্তু মাথা নোয়াবার নই।
শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার হাতে থাকা অস্ত্রে নয়; বরং কখন শক্তি প্রয়োগ করতে হবে, কখন কূটনীতি করতে হবে, কখন অপেক্ষা করতে হবে এবং কখন নিজের কৌশলগত সম্পদকে কাজে লাগাতে হবে—সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায়। গব্বর সিংয়ের ভাষায় নয়, রাষ্ট্রনায়কের ভাষায় বলতে গেলে—ভয় নয়, কৌশলই ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি।
.png)

জনাব মির্জা ফখরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত ছবি আছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, পুলিশ তাকে প্রিজন ভ্যানে উঠাচ্ছে আর তিনি হাত উঁচিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য। বর্তমানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে, বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে । আরো আশার বাণী, জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশে
৩ ঘণ্টা আগে
গ্যাস নেই। তাই চুলা জ্বলছে না। তাই কারখানার বয়লার চলছে না। এই একটি সহজ বাক্যেই আজকের বাংলাদেশের শিল্পখাতের ছবি ফুটে ওঠে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগে। এই টার্মিনাল দেশের মোট গ্যাসের একটি অংশ সরবরাহ করত। আগুনের পর সেই সরবরাহ প্রায় অর্ধেক কমে
১৭ ঘণ্টা আগে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে গত ১৭ আগস্ট আবারও সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান। এর আগে জুলাই ও আগস্টজুড়ে সৌদি বিনিয়োগ, বন্দর-লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং দীর্ঘমেয়াদি ‘কৌশলগত অংশীদারত্ব’ নিয়ে ঢাকার সঙ্গে রিয়াদের ধারাবাহিক উচ্চপর্যায়ের য
