নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণ: বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ১২: ১১
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি : সংগৃহীত
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ছবি : সংগৃহীত

জনাব মির্জা ফখরুল ইসলামের একটি বিখ্যাত ছবি আছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে, পুলিশ তাকে প্রিজন ভ্যানে উঠাচ্ছে আর তিনি হাত উঁচিয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য। বর্তমানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে, বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায় এসেছে । আরো আশার বাণী, জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩ তম রাষ্টপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে যখন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সংকুচিত হয়েছে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর জনগণের আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, তখন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া নিঃসন্দেহে নতুন আশার জন্ম দিয়েছে। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পুনর্গঠন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার একটি সুযোগ সৃষ্টি করেছে।

রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি দীর্ঘদিন বিরোধী রাজনীতিতে থেকে গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করেছেন। রাজনৈতিক জীবনের একটি বড় সময় তিনি ক্ষমতার বাইরে থেকে গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অধিকার ও অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সামনে এখন একটি ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা। আগে তাঁকে গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করতে হয়েছে ক্ষমতার বাইরে থেকে। এখন তাঁকে প্রমাণ করতে হবে—ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও তিনি কীভাবে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করেন। এটি নিঃসন্দেহে কঠিন কাজ। কারণ গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা এক বিষয় নয়। আন্দোলন মানুষকে একত্রিত করে; কিন্তু প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে হয় নিয়ম, কাঠামো, জবাবদিহি এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছার মাধ্যমে।

বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ব্যক্তিনির্ভর রাজনীতি থেকে প্রতিষ্ঠাননির্ভর রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে যাত্রা করা। নতুন রাষ্ট্রপতির সামনে তাই একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে—তিনি এমন কিছু প্রতিষ্ঠান ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির ভিত্তি তৈরি করতে পারেন, যা তাঁর নিজের রাজনৈতিক জীবনকেও অতিক্রম করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গণতন্ত্রকে সুরক্ষা দেবে।

গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম থেকে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ

গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। বিরোধী রাজনীতির সময় গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য থাকে ক্ষমতাসীন সরকারের কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা মোকাবিলা করা, অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করা, রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধার করা এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। কিন্তু একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আসল কঠিন কাজ শুরু হয়। কারণ তখন প্রশ্ন ওঠে—যে গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করা হয়েছে, সেই গণতন্ত্রকে কীভাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্থায়ী করা হবে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের ইতিহাসে আমরা দেখেছি, একটি সরকার পতনের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এসে কখনো কখনো পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি করে। রাজনৈতিক নিয়োগের পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক নিয়োগ আসে। প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক প্রভাবের পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরোনো দলীয় আধিপত্যের পরিবর্তে নতুন দলীয় আধিপত্য তৈরি হয়। দুর্নীতিবিরোধী প্রতিষ্ঠান আগের মতোই ক্ষমতাবানদের ক্ষেত্রে দুর্বল থাকে। তখন রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়, কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন হয় না। বিগত ছয় মাসে অনেকের মতে বিএনপি সরকার একই পথে হাঁটছে। তবে, বাংলাদেশের সামনে এখনও এই ঝুঁকি এড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কেননা নতুন রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক ইতিহাস তাঁকে গণতন্ত্রের পক্ষে একটি নৈতিক অবস্থান দিয়েছে। কিন্তু তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার নির্ধারিত হবে তিনি কতটা এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেন, যা ভবিষ্যতে তাঁর নিজের রাজনৈতিক ঘরানার বিরুদ্ধেও প্রয়োজনে স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা এখানেই।

একজন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতিকে কখনো কখনো নিজের রাজনৈতিক মিত্রদের বিরুদ্ধেও প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হয়। তাঁকে এমন নিয়ম প্রতিষ্ঠা করতে হয়, যা ভবিষ্যতে তাঁর নিজের রাজনৈতিক পক্ষকেও সীমাবদ্ধ করতে পারে। কারণ গণতন্ত্রের উদ্দেশ্য সরকারকে শক্তিশালী করা নয়; ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা।

তাই আমার মতে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান বিনির্মাণে তিনটি বিষয়ে বর্তমান রাষ্ট্রপতি অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। আমি মনে করি, এ তিনটি ক্ষেত্রে বিনির্মাণের মাধ্যমে, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি রূপরেখা তৈরি হবে—

প্রথম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার

রাষ্ট্রপতি যদি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে অবদান রাখতে চান, তাহলে তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত শিক্ষা খাত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংস্কার। শিক্ষাকে আমরা সাধারণত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ তৈরি কিংবা কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করি। কিন্তু শিক্ষা তার চেয়েও বেশি কিছু। একটি দেশের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে মূলত তার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতর দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ডিগ্রি দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ভবিষ্যৎ নাগরিক, প্রশাসক, রাজনীতিবিদ, বিচারক, সাংবাদিক, গবেষক ও রাষ্ট্রনায়ক তৈরি করে। অতএব বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি শিক্ষার্থীরা শেখে যে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ, তাহলে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রেও সেই সংস্কৃতিই ফিরে আসবে।

যদি তারা শেখে যে ক্ষমতাবান ব্যক্তির সমালোচনা করা যায় না, তাহলে তারা ভবিষ্যতে প্রশাসনে গিয়েও সমালোচনা সহ্য করতে পারবে না। যদি তারা শেখে যে রাজনৈতিক আনুগত্যই সাফল্যের প্রধান পথ, তাহলে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রে মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্য প্রাধান্য পাবে। সুতরাং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেমন নাগরিক তৈরি করছে তার ওপর। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তাই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনর্গঠন জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় আধিপত্যের ক্ষেত্র না বানিয়ে রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, বিতর্ক, গবেষণা, সমালোচনা ও ভিন্নমতের নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় রাজনীতির নয়, গণতান্ত্রিক রাজনীতির ক্ষেত্র হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি থাকা উচিত—কিন্তু সেই রাজনীতি হতে হবে গণতান্ত্রিক, জ্ঞানভিত্তিক ও সহনশীল। একজন শিক্ষার্থী সরকারকে সমর্থন করতে পারে। অন্য একজন সরকারের বিরোধিতা করতে পারে। কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না-ও থাকতে পারে। কিন্তু কোনো শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক অবস্থান যেন তার শিক্ষা, নিরাপত্তা, আবাসন, গবেষণা বা ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের ওপর প্রভাব না ফেলে। এটাই হওয়া উচিত গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মৌলিক নীতি।

বিশ্ববিদ্যালয়কে এমন একটি জায়গায় পরিণত করতে হবে যেখানে একজন শিক্ষার্থী শিখবে কীভাবে ভিন্নমতকে সম্মান করতে হয়, কীভাবে যুক্তি দিয়ে বিতর্ক করতে হয়, কীভাবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়, কীভাবে পরাজয় মেনে নিতে হয় এবং কীভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হয়। এই শিক্ষা কোনো পাঠ্যবই একা দিতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় যদি সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্রের ‘ল্যাবরেটরি’ হয়, তাহলে ছাত্র প্রতিনিধিত্ব, অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং স্বচ্ছ নির্বাচনব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

শিক্ষা সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্ব নির্বাচন। আমাদের এমন বিশ্ববিদ্যালয় নেতা দরকার যারা শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং দক্ষ প্রশাসক—কিন্তু একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান নির্মাণের দৃষ্টিভঙ্গিও রাখেন। একজন ভালো ভাইস-চ্যান্সেলরের প্রধান পরিচয় হওয়া উচিত তিনি কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তা নয়; বরং তিনি কতটা দক্ষ, সৎ, গতিশীল, দূরদর্শী এবং একাডেমিক স্বাধীনতার প্রতি প্রতিশ্রুতিশীল। সুতরাং ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব নির্বাচনে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া প্রয়োজন। যোগ্যতা, একাডেমিক নেতৃত্ব, গবেষণা, প্রশাসনিক দক্ষতা, সততা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি—এসব হওয়া উচিত নিয়োগের প্রধান মানদণ্ড। রাষ্ট্রপতি এই বিষয়ে একটি শক্তিশালী নৈতিক ও সাংবিধানিক বার্তা দিতে পারেন। তিনি বলতে পারেন—রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, যোগ্যতা ও সততাই হবে নিয়োগের প্রধান ভিত্তি।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন মানে জবাবদিহিহীনতা নয়।একদিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করতে হবে, অন্যদিকে আর্থিক ব্যবস্থাপনা, একাডেমিক মান, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ আমাদের প্রয়োজন—স্বায়ত্তশাসন ও জবাবদিহির ভারসাম্য।

দ্বিতীয় অগ্রাধিকার: স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক বিচারব্যবস্থা

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নির্মাণে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বিচারব্যবস্থা। নাগরিকের অধিকার যদি আদালতে সুরক্ষিত না হয়, ক্ষমতাবান ব্যক্তি যদি আইনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করেন এবং বিচারব্যবস্থা যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত না থাকে, তাহলে গণতন্ত্র কাগজে থাকলেও বাস্তবে দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে। বিচারক নিয়োগ, প্রশাসনিক স্বাধীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং জবাবদিহি—সব ক্ষেত্রেই সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং জবাবদিহি পরস্পরের বিপরীত নয়। বিচারককে রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত রাখতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে বিচারকের পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা ও দক্ষতার জন্য কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বিচার বিভাগকে সরকারের অধীন করা যাবে না; আবার বিচার বিভাগও যেন কোনো ধরনের জবাবদিহির বাইরে না থাকে।

বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, যোগ্যতাভিত্তিক এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা জরুরি। রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে একটি জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ নিতে পারেন—যেখানে বিচারক, আইনজীবী, আইনবিদ, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করবেন। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে একজন সাধারণ নাগরিকও বিশ্বাস করতে পারেন—রাষ্ট্রের ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও আদালতে তিনি ন্যায়বিচার পাবেন।

তৃতীয় অগ্রাধিকার: দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রকৃত স্বাধীনতা

গণতন্ত্রের পাশাপাশি রাষ্ট্রের আরেকটি বড় সংকট হলো দুর্নীতি। বাংলাদেশে দুর্নীতি দমনের জন্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান থাকা এবং প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীন ও কার্যকর হওয়া এক বিষয় নয়। দুর্নীতি দমন কমিশনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো এর প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। যদি কোনো দুর্নীতি দমন সংস্থা রাজনৈতিক নির্বাহী, প্রশাসন কিংবা ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়, তাহলে ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব নিয়ে গুরুত্বসহকারে আলোচনা করা যেতে পারে।তবে শুধু সাংবিধানিক মর্যাদা দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন হবে স্বাধীন নিয়োগব্যবস্থা, দক্ষ তদন্তকারী, ফরেনসিক অ্যাকাউন্টিং, ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে কার্যকর সুরক্ষা। একই সঙ্গে কমিশনের নিজের কাজেরও জবাবদিহি থাকতে হবে। কারণ একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান কখনোই জবাবদিহিহীন প্রতিষ্ঠান হতে পারে না।

রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে তাঁর নৈতিক কর্তৃত্ব

রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতা কতটা বিস্তৃত, তা নিয়ে একাধিক আলাপ আগেও হয়েছে। অনেকে এটিকে অর্নামেন্টাল, নৈমিত্তিক, রুটিন কাজ, ইত্যাদি সমার্থক শব্দের মধ্যে সীমিত রাখতে চান। কিন্তু এটি নির্ভর করে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা শুধু সাংবিধানিক ক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরঞ্চ তাঁর নৈতিক কর্তৃত্বও রয়েছে। তিনি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির বার্তা দিতে পারেন। তিনি বলতে পারেন—যোগ্যতা ছাড়া নিয়োগ নয়। তিনি বলতে পারেন—বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনৈতিক ভিন্নমতের জন্য কোনো নাগরিক বৈষম্যের শিকার হবে না। তিনি বলতে পারেন—বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে। তিনি বলতে পারেন—দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক নির্দেশনামুক্তভাবে কাজ করতে দিতে হবে। তিনি বলতে পারেন—রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি নয়; এগুলো জনগণের প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের অবস্থান রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ নয়। বরং এটি হতে পারে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থা পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের দরকার ব্যক্তির চেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান

বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসে আমরা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দেখেছি। কোনো নেতা গণতন্ত্রের প্রতীক হয়ে উঠেছেন, কোনো নেতা উন্নয়নের প্রতীক, আবার কোনো নেতা পরিবর্তনের প্রতীক। কিন্তু একটি রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তির ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। একজন ভালো নেতা থাকলে প্রতিষ্ঠান ভালো থাকবে—এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা গণতান্ত্রিকভাবে নিরাপদ নয়। বরং এমন প্রতিষ্ঠান তৈরি করতে হবে যেখানে একজন খারাপ নেতাও রাষ্ট্রের সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবেন না। এটাই সাংবিধানিক গণতন্ত্রের মূল দর্শন। বাংলাদেশের এখন এমন প্রতিষ্ঠান দরকার, যা সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্র পরিবর্তন করবে না। একটি বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সরকারের নয়। বিচার বিভাগ কোনো দলের নয়। দুর্নীতি দমন কমিশন কোনো রাজনৈতিক পক্ষের নয়। প্রশাসন কোনো ব্যক্তির নয়। এসব প্রতিষ্ঠান রাষ্ট্রের এবং শেষ পর্যন্ত জনগণের।

গণতন্ত্রের পরবর্তী অধ্যায় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ

বাংলাদেশ একটি নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া সেই অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে। কিন্তু একটি নির্বাচন নিজে কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরি করে না। গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখে প্রতিষ্ঠান। স্বাধীন বিশ্ববিদ্যালয় গণতান্ত্রিক নাগরিক তৈরি করে। স্বাধীন বিচার বিভাগ নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে। স্বাধীন দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির আওতায় আনে। স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা রাষ্ট্রে মেধা ও যোগ্যতার মূল্য নিশ্চিত করে। আর শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করে।

নতুন রাষ্ট্রপতির রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করা। এখন তাঁর সামনে আরও কঠিন কাজ—গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্মাণ করা। এই কাজের জন্য তাঁকে হয়তো তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে। কারণ প্রকৃত প্রতিষ্ঠান নির্মাণের অর্থ হলো এমন নিয়ম তৈরি করা, যা একদিন নিজের রাজনৈতিক মিত্রদেরও সীমাবদ্ধ করতে পারে। কিন্তু এটাই একজন সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নেতার পরীক্ষা। রাষ্ট্রপতির উত্তরাধিকার যেন শুধু এই কারণে স্মরণীয় না হয় যে তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছিলেন। বরং তাঁর উত্তরাধিকার হওয়া উচিত—তিনি ক্ষমতার সুযোগ পেয়ে এমন প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিলেন, যা ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীনদেরও জবাবদিহির মধ্যে রাখবে।

বাংলাদেশের জনগণ এখন আর শুধু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি চায় না। তারা পরিবর্তনের প্রমাণ দেখতে চায়। তারা এমন বিশ্ববিদ্যালয় চায় যেখানে মেধা রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তারা এমন আদালত চায় যেখানে ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিক একই আইনের অধীন। তারা এমন দুর্নীতি দমন প্রতিষ্ঠান চায়, যা ক্ষমতার ভয় করে না। তারা এমন রাষ্ট্র চায় যেখানে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, যোগ্যতা ও সততা রাষ্ট্রের দরজা খুলে দেয়। সবশেষে, তারা এমন একটি গণতন্ত্র চায় যেখানে কোনো নেতা বা দল অপরিহার্য নয়—প্রতিষ্ঠানই অপরিহার্য। এই নতুন অধ্যায়ে রাষ্ট্রপতির সবচেয়ে বড় কাজ তাই ক্ষমতা ব্যবহার করা নয়; বরং ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে সহায়তা করা। কারণ একজন নেতা চলে যাবেন। একটি সরকারও একদিন পরিবর্তিত হবে। কিন্তু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থেকে যাবে। আর সেই প্রতিষ্ঠানই একদিন বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে রক্ষা করবে।

  • নূরুল হুদা সাকিব: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি, গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণ: বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ