ফারাক্কা থেকে পদ্মা ব্যারাজ: বাংলাদেশের সংকটের সমাধান কোথায়

স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৭৬ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ দিয়ে গঙ্গার পানি আটকে দেয় ভারত। এর প্রতিবাদে ওই বছরের ১৬ মে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে লংমার্চ হয়। সেই লংমার্চের স্মরণে ‘ফারাক্কা দিবস’ পালন করে বাংলাদেশ। প্রায় অর্ধশতাব্দী পার হলেও এই দিবসের তাৎপর্য আজও দুঃখজনকভাবে প্রাসঙ্গিক।

চলতি সপ্তাহে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের পদ্মা ব্যারাজ মেগাপ্রকল্পের অনুমোদন দেয়। সরকার এই ব্যারাজকে পরিবেশগত সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখছে।

বাংলাদেশের রাজবাড়ী জেলার পাংশায় প্রকল্পের কাঠামো নির্মাণ হবে। বর্ষাকালে পদ্মা নদীর পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে তা পুনরায় বণ্টন করার উদ্দেশ্যেই এই প্রকল্প। শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল অংশ লবণাক্ত ও পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এই প্রকল্প সেই সংকটের সমাধান দেবে, এমনটাই সরকারের নীতিনির্ধারকদের ধারণা।

সরকারি কর্মকর্তারা জানান, এই ব্যারাজে প্রায় ২ হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি ধরে রাখা সম্ভব। এর মাধ্যমে অন্তত পাঁচটি বড় নদীর পুনরুজ্জীবন ঘটবে। ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ ব্যবস্থার উন্নতি হবে। এর পাশাপাশি মৎস্যসম্পদ ও নৌচলাচল বৃদ্ধি পাবে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রিচার্জ হবে এবং সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ শক্তিশালী হবে।

বাংলাদেশের অবকাঠামোগত মানদণ্ডেও এই প্রকল্পের আকার বিশাল। শুধু প্রথম ধাপেই এর ব্যয় ধরা হয়েছে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি। চূড়ান্ত পর্যায়ে এর ব্যয় ৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

ভূ-রাজনীতি ও চুক্তির মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার শঙ্কা

পদ্মা ব্যারাজের তাৎপর্য ভূরাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ-ভারতের স্বাক্ষরিত গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। এই চুক্তি অনুসারে জানুয়ারি থেকে মে মাস শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় পানি বণ্টন হয়।

একসময় এই চুক্তিকে আঞ্চলিক জলকূটনীতিতে যুগান্তকারী সাফল্য হিসেবে দেখা হত। তবে এর ফলাফল নিয়ে বাংলাদেশের অসন্তোষ ক্রমশ বেড়েছে। ঢাকার দীর্ঘদিনের অভিযোগ হলো, খরা মৌসুমে পদ্মায় যে পরিমাণ পানি পৌঁছায় তা কৃষি, নৌপরিবহন এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত।

বাংলাদেশি পানি বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের হাইড্রোলজিকে (পানি, বণ্টন, সঞ্চালন) মৌলিকভাবে পরিবর্তন করেছে।

বাংলাদেশের গড়াই, মধুমতী ও ইছামতির মতো নদীগুলো ধীরে ধীরে পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে। লবণাক্ততা দেশের ভেতরের দিকে আরও গভীরে প্রবেশ করেছে। নদীগুলোর নাব্যতার চরম অবনতি ঘটেছে। মৎস্যসম্পদও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব প্রভাব শুধু পরিবেশগত নয়, সভ্যতাগতও বটে। নদীমাতৃক বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নদীহীন হয়ে পড়ছে।

কারিগরি ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

রাজনৈতিকভাবে উজানের পানির নিশ্চয়তা আদায় করতে না পারলে বাংলাদেশকে বর্ষাকালের পানি সর্বাধিক সংরক্ষণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক স্তরের অনিশ্চয়তা কাটাতে রাষ্ট্র অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষতিপূরণের চেষ্টা করছে। তবে এই যুক্তির সঙ্গে পানিবিজ্ঞানজনিত বাস্তবতার সংঘর্ষ তৈরি হয়। ব্যারাজ কখনো নতুন করে পানি উৎপাদন করে না। বিদ্যমান পানিকে নিয়ন্ত্রণ করাই ব্যারাজের কাজ। এই কারণেই প্রকল্পকে ঘিরে চলা বিতর্ক খুব দ্রুত গঙ্গা চুক্তির ভবিষ্যতের সঙ্গে জুড়ে গেছে।

পানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ২০২৬ সালের পর উজানের পানির প্রবাহ যদি স্বাভাবিক বা নিশ্চিত না হয়, তবে এই ব্যারাজ (বাঁধ) তার উদ্দেশ্য পূরণে হিমশিম খাবে। উজানে পানি সরিয়ে নেওয়া (প্রত্যাহার) এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে আসা গঙ্গার পানির প্রবাহ এমনিতেই ব্যাপকভাবে কমে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা এই ব্যারাজের বড় কারিগরি সমস্যার কথাও বলছেন। পদ্মা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি পলিযুক্ত নদীগুলোর একটি। এই নদীতে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখা কঠিন হবে। হিমালয় থেকে আসা পলির কারণে প্রতিনিয়ত নদীর তলার মাটি উঁচু-নিচু হতে থাকে।

ব্যারাজের সাফল্য প্রকৌশলের চেয়ে কূটনীতির ওপর বেশি নির্ভরশীল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক কূটনীতিক বলেছেন, শুধু আলোচনার মাধ্যমে পানির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার আত্মবিশ্বাস কমে গেছে। এই প্রকল্প সেই হতাশারই প্রমাণ।

প্রকল্পের সমালোচকদের ভয় হলো, পলি সরানোর কোনো আধুনিক ব্যবস্থা না থাকলে নদীর তলদেশ দ্রুত ভরাট হয়ে যাবে। এতে নৌকা বা জাহাজ চলাচলের পথ যেমন বন্ধ হবে, তেমনি পানি ধরে রাখার জায়গাও কমে যাবে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনসহ অন্যান্য সংগঠন প্রশ্ন তুলছে, অনুমোদনের আগে এই প্রকল্প বাস্তবসম্মত কি না, তা যাচাই করা বা বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছিল কি না। বড় বড় প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশের আগের অভিজ্ঞতা খুব একটা ভালো না হওয়ায়, মানুষের এই সন্দেহগুলো থেকেই যাচ্ছে।

বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ—সব আমলেই অবকাঠামো বানানোর ক্ষেত্রে প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দেখানো, জিনিসপত্র কেনায় দুর্নীতি এবং জবাবদিহি না থাকার অভিযোগ উঠেছে।

শেখ হাসিনার আমলের মেগা প্রকল্পগুলোর বারবার সমালোচনা করেছেন বিএনপি নেতারা। তাদের যুক্তি, ঋণ করে জাঁকজমকপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।

পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত তাই বিএনপির নীতিগত পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রজেক্টকে জাঁকজমকপূর্ণ সেতু বা এক্সপ্রেসওয়ে হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং মিঠা পানির প্রাপ্যতার আলোকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখতে হবে।

তবে প্রকল্পের সমর্থকরাও স্বীকার করেন, ব্যারাজের সাফল্য প্রকৌশলের চেয়ে কূটনীতির ওপর বেশি নির্ভরশীল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক কূটনীতিক বলেছেন, শুধু আলোচনার মাধ্যমে পানির ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার আত্মবিশ্বাস কমে গেছে। এই প্রকল্প সেই হতাশারই প্রমাণ।

তিস্তা ইস্যু ও আঞ্চলিক সংকট

ভারত-বাংলাদেশ নদী সম্পর্কের গতিপথের অস্বস্তি গঙ্গা নদীর বাইরেও ছড়িয়ে আছে। এক দশকেরও বেশি সময় আগে বাংলাদেশ ও ভারত তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল। শুধু পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের বিরোধিতার কারণে এই চুক্তি লাইনচ্যুত হয়। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি কীভাবে দ্বিপক্ষীয় কূটনীতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, তিস্তা পানি বণ্টন তার স্থায়ী প্রতীক। তবে এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে হিসাবনিকাশ বদলে যেতে পারে।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার আসার পরপরই কিছু নীতিনির্ধারক নতুন করে আলোচনা শুরুর সুযোগ দেখছেন। অন্যদিকে অনেকে ভয় পাচ্ছেন, পূর্ব ভারতে বিজেপির শক্তিশালী অবস্থান নয়াদিল্লির কৌশলগত নীতিকে আরও কঠোর করতে পারে। বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই শঙ্কা দেখা দিচ্ছে, যখন জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীর পুরো অববাহিকা চরম সংকটের মুখে রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে হিমালয়ের বরফ গলার ধরনে পরিবর্তন আসছে। মৌসুমি বৃষ্টির স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হচ্ছে। পুরো দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে নদীর প্রবাহের অনিশ্চয়তা বাড়ছে। পানি এখন আর শুধু পরিবেশগত বিষয় নয়, বরং কৌশলগত হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

টিকে থাকার লড়াই ও কূটনীতির শূন্যতা

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প ভাটির দেশগুলোর সাধারণ ভূ-রাজনৈতিক প্রবণতারই অংশ; যেখানে আন্তঃসীমান্ত চুক্তির ওপর আস্থা রাখতে না পেরে নিজেদের সুরক্ষায় অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে। কিন্তু এতে মূল সংকট থেকেই যায়। অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে বাংলাদেশ যতই বাঁধ নির্মাণ বা নদী খনন করুক না কেন, উজানের দেশের (ভারত) সদিচ্ছার বিকল্প হিসেবে এসব যথেষ্ট নয়। গঙ্গার মতো আন্তর্জাতিক নদীর ক্ষেত্রে কোনো দেশজ প্রকৌশলই এই বহুমাত্রিক নির্ভরশীলতাকে এড়াতে পারে না।

ঠিক এ কারণেই গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা ও নয়াদিল্লি যদি বিশ্বাসযোগ্য বিকল্প রূপরেখা করতে না পারে, তবে বিপদ বাড়বে। ঢাকা ও দিল্লি নতুন কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে পদ্মা ব্যারাজ সফলতার বদলে উদ্বেগের প্রতীকে পরিণত হবে। আর নতুন চুক্তি হলে সেখানে শুধু পানির ভাগাভাগি নয়, বরং জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ এবং পলি ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোও নিশ্চিত করতে হবে।

সার্বিকভাবে, ‘ফারাক্কা দিবস’ বাংলাদেশের জন্য এই বার্তাই নিয়ে আসে—নদী কেন্দ্রিক সংকট এখনো অমীমাংসিত। পদ্মা ব্যারাজ হয়তো শাখা নদীগুলোর প্রবাহ বৃদ্ধি, লবণাক্ততা হ্রাস এবং কৃষির উন্নয়নে সাফল্য এনে দেবে। কিন্তু অভিন্ন নদীর ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত না হলে, এই মেগা প্রকল্পও সংকটের সমাধান করতে পারবে না।

লেখক: সাংবাদিক (এশিয়া টাইমস থেকে অনূদিত)

সম্পর্কিত