রাজনৈতিক দল ছাড়াই সফল গণআন্দোলন: ভারতের তরুণেরা কী বার্তা দিল

লেখা:
লেখা:
নিখিল সঞ্জয় রেখা আদসুল

দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া ছবির ওয়াটার স্কেচ: এআই

ভারতের ইতিহাসে বড় বড় আন্দোলনের পেছনে সাধারণত বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি ‘ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট’ (নিট) প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদ সেই প্রচলিত ধারাকে ভেঙে দিয়েছে। এই আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, তীব্র এবং অরাজনৈতিক।

অনেকেই ২০২৬ সালের এই ঘটনাকে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন। ২০১৪ সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় সরকারকে ঘিরে এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যেখানে জনরোষের মুখেও জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়াই ছিল নিয়ম। কৌশল ছিল একই—জনতার ক্ষোভের ঢেউ থামার অপেক্ষা করা, টেলিভিশনের খবর প্রচার বদলে যাওয়া পর্যন্ত সময় নেওয়া, আন্দোলনকারীদের বিরোধী দলের লোক বলে আখ্যা দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সব প্রতিবাদকে বিদেশি শক্তির মদদপুষ্ট ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরা।

এই কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—জনচাপের মুখে কখনোই কোনো মন্ত্রীকে বলি না দেওয়া। অথচ স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র সঙ্গে তৃতীয় দফার আলোচনার কয়েক ঘণ্টা আগেই সেই অবস্থান ভেঙে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে অটল ও অনমনীয় রাষ্ট্রের যে ভাবমূর্তি গড়ে তোলা হয়েছিল, তা মুহূর্তেই নড়ে যায়। ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ শুধু একটি মন্ত্রিত্বের অবসান নয়, এটি প্রমাণ করে যে আধুনিক ভারতে তরুণ প্রজন্ম রাষ্ট্রের কাছ থেকে জবাবদিহি আদায়ের নতুন পথ তৈরি করেছে।

সরকার যে ভুলটি বুঝতে পারেনি

আন্দোলনের শুরু থেকেই নয়াদিল্লির রাজনৈতিক কৌশলবিদেরা পরিস্থিতিকে ভুলভাবে মূল্যায়ন করেছিলেন। তাঁদের ধারণা ছিল, এটি ছোট পরিসরের ছাত্র অসন্তোষ মাত্র, যা প্রশাসনিক পদক্ষেপ কিংবা কঠোর দমননীতির মাধ্যমে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।

কিন্তু তাঁরা বুঝতে পারেননি, জাতীয় পর্যায়ের ভর্তি পরীক্ষাগুলোর ধারাবাহিক ব্যর্থতা লাখো শিক্ষার্থীর জীবনে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক আঘাত হেনেছে। আন্দোলনের প্ল্যাকার্ড, স্লোগান ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওগুলো সেই ক্ষোভেরই প্রতিফলন। একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ও অবিশ্বস্ত পরীক্ষাব্যবস্থা কোটি তরুণের ভবিষ্যৎ ও স্বপ্নকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

এই ঘটনার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বুঝতে হলে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যায় আটকে থাকলে চলবে না। বরং নজর দিতে হবে তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত শক্তির দিকে।

স্বাধীনতার পরের প্রচলিত ছাত্র আন্দোলনের ধারা থেকে ভিন্ন

ভারতে এর আগেও অনেকবার ছাত্র আন্দোলন হয়েছে। তবে সেসব আন্দোলন কোনো না কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বের ছায়ায় পরিচালিত হয়েছে।

ষাটের দশকে তামিলনাড়ুর ভাষা আন্দোলন দেশের ভাষানীতি ও রাজনীতিকে বদলে দেয়। সত্তরের দশকে গুজরাটের নবনির্মাণ আন্দোলন এবং বিহারের ঐতিহাসিক জেপি আন্দোলন হাজারো তরুণকে দুর্নীতিবিরোধী সংগ্রামে একত্র করেছিল। সেই আন্দোলনগুলো কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল এবং দেশের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিল। পরে ২০১১ সালের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনও দেখিয়েছিল, সঠিকভাবে সংগঠিত হলে তরুণদের শক্তি প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে।

তবে এসব আন্দোলনের একটি মিল ছিল। এগুলো পরিচালিত হয়েছে বিরোধী দলের অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের নেতৃত্বে, সুসংগঠিত সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায়। শিক্ষার্থীরা ছিল আন্দোলনের শক্তি, কিন্তু রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা দিতেন প্রতিষ্ঠিত নেতারাই।

২০২৬ সালের আন্দোলন এই চিত্র পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এই আন্দোলন পরিচালিত হয়েছে পুরোপুরি ছাত্রদের নেতৃত্বে। এটি ছিল একেবারে আলাদা, অরাজনৈতিক ও স্বতন্ত্র বিক্ষোভ। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আন্দোলনকারীরা শুরু থেকেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব থেকে দূরে ছিল। পরে বিরোধী নেতাদের পক্ষ থেকে সমর্থনের আহ্বান এলেও তারা নিজেদের কোনো রাজনৈতিক পক্ষের হাতিয়ার হতে দেয়নি। সরকারের পতন বা বিরোধী জোটকে ক্ষমতায় বসানো তাদের লক্ষ্য ছিল না। তাদের একমাত্র দাবি ছিল—রাষ্ট্র ও তার প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

ভারতের এই নেতাহীন ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনের মধ্যে হংকংয়ের আমব্রেলা আন্দোলনের নমনীয়তা, আরব বসন্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং কেনিয়ার সাম্প্রতিক তরুণদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের প্রতিফলন দেখা যায়। তিন ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের অভিযোগের প্রতি কার্যত বধির হয়ে পড়েছিল। তাই ডিজিটাল প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত রাস্তায় নেমে আসে।

আধুনিক ভারতের ইতিহাসে সম্ভবত এই প্রথম একটি বড় সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠল, যার কোনো কেন্দ্রীয় নেতা ছিল না। সাধারণ মানুষের অর্থায়নে আন্দোলনটি এগিয়ে গেছে। এর ভিত্তি তৈরি হয়েছে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও কর্মসংস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন এক ঝাঁক মানুষের সংহতির ভিত্তিতে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনটি একজন শক্তিশালী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে। ফলে বহুদিনের সেই ধারণাও ভেঙে গেছে যে, রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া ভারতে কোনো গণআন্দোলন সফল হতে পারে না।

যে আন্দোলনে ছিল না কোনো কেন্দ্রীয় নেতা

এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এর কোনো সুস্পষ্ট কেন্দ্র ছিল না। আগের আন্দোলনের মতো ওপর থেকে নির্দেশ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তরুণরা প্রচলিত আন্দোলনের দীর্ঘসূত্রতা ও ধাপে ধাপে আলোচনার কৌশল ছেড়ে দিয়েছিল।

তাদের কাছে প্রতিবাদ ছিল একটি উন্মুক্ত, অংশগ্রহণমূলক গণতান্ত্রিক প্রকল্প। ইন্টারনেট এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে তারা জটিল নীতিগত ব্যর্থতাকে সহজ ভাষায় মানুষের সামনে তুলে ধরেছে।

যন্তর মন্তরের আন্দোলনস্থলে এই পরিবর্তন স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। রাজনৈতিক দলের পতাকার বদলে হাজারো শিক্ষার্থী গলায় ঝুলিয়েছিল নকল করপোরেট পরিচয়পত্র, যেখানে লেখা ছিল—‘সার্টিফায়েড পাবলিক নুইসেন্স’। সঙ্গে ছিল হাতে আঁকা তেলাপোকার প্রতীক। যে অপমানসূচক শব্দ ব্যবহার করে তাদের ছোট করার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেটিকেই তারা নিজেদের প্রতীকে পরিণত করে। পাশাপাশি এনক্রিপটেড মেসেজিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিভিন্ন শহরে একই সময়ে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে তারা রাষ্ট্রের প্রচলিত নজরদারি ব্যবস্থাকেও পাশ কাটিয়ে যায়।

এই আন্দোলনের আরেকটি বড় শক্তি হচ্ছে, এর কোনো কেন্দ্রীয় নেতা ছিল না। আন্দোলনটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে গেছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চরিত্র বদলে ফেলেছে। ফলে সরকার পুরোনো কৌশল ব্যবহার করেও আন্দোলনের গতি থামাতে পারেনি। রাষ্ট্রের প্রচলিত ক্ষমতা ও বলপ্রয়োগের কাঠামো—যাকে দার্শনিক লুই আলথুসারের ভাষায় রাষ্ট্রযন্ত্র বলা হয়—এই প্রজন্মের সামনে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি। যন্তর মন্তরের দৃশ্য দেখিয়ে দিয়েছে, জেন-জি আন্দোলনকারীদের স্বতঃস্ফূর্ততা ও দ্রুত কৌশল বদলের ক্ষমতার সঙ্গে রাষ্ট্র তাল মেলাতে পারেনি।

উদ্বেগে বেড়ে ওঠা একটি প্রজন্ম

এই আন্দোলনের পেছনের ক্ষোভ শুধু আদর্শগত নয়, বরং গভীর ব্যক্তিগত ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে জড়িত।

ভারতের মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখা লাখো পরিবারের কাছে নিট বা জেইই-এর মতো প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা রাষ্ট্রের সঙ্গে এক ধরনের অলিখিত সামাজিক চুক্তি। শিক্ষার্থীরা নিজেদের কৈশোর ও তারুণ্য পড়াশোনার জন্য উৎসর্গ করে। অনেকেই দিনে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত পড়ে। পরিবারগুলো সঞ্চয় ভেঙে ব্যয়বহুল কোচিংয়ের খরচ বহন করে। এর বিনিময়ে রাষ্ট্রের একমাত্র দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল একটি নিরপেক্ষ, সৎ ও বিশ্বাসযোগ্য পরীক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করা। কিন্তু ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির ধারাবাহিক ব্যর্থতা সেই বিশ্বাসকে ভেঙে দিয়েছে।

ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে যে বাস্তবতা

ভারতের এই সংকট আসলে বিশ্বব্যাপী একটি বড় প্রবণতার অংশ। পৃথিবীর নানা দেশে তরুণ প্রজন্ম ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারাচ্ছে।

ভারতের এই নেতাহীন ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনের মধ্যে হংকংয়ের আমব্রেলা আন্দোলনের নমনীয়তা, আরব বসন্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং কেনিয়ার সাম্প্রতিক তরুণদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের প্রতিফলন দেখা যায়। তিন ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের প্রচলিত প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের অভিযোগের প্রতি কার্যত বধির হয়ে পড়েছিল। তাই ডিজিটাল প্রতিবাদ শেষ পর্যন্ত রাস্তায় নেমে আসে।

কৌশলগত আত্মসমর্পণের সীমা

ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগপত্র তাঁর বিদায়ের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ স্পষ্ট করে। তিনি পদত্যাগকে ব্যক্তিগত ত্যাগ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ছাত্র আন্দোলনকে বাইরের শক্তি যেন ব্যবহার করতে না পারে, সে কারণেই তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন।

তবে রাস্তায় থাকা তরুণরা এই পদত্যাগের প্রতীকী গুরুত্ব খুব ভালোভাবেই বুঝেছে। তারা জানে, প্রকৃত লড়াই এখনো শেষ হয়নি। আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলো এখনো অপরিবর্তিত। তারা আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য আর্থিক ক্ষতিপূরণ, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার ও সাধারণ ক্ষমা এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির সম্পূর্ণ কাঠামোগত সংস্কার দাবি করছে।

ভারতের তরুণদের নতুন বার্তা

এতদিন অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ভারতের তরুণদের রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় বলে মনে করতেন। তাঁদের মতে, এই প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়ার ছোট ছোট ভিডিওতে আসক্ত। তারা জাতিগত বিভাজনে আটকে আছে এবং দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার মতো ক্ষমতা এদের নেই।

২০২৬ সালের এই আন্দোলন সেই ধারণাকে ভেঙে দিয়েছে। ভারতের তরুণরা দেখিয়ে দিয়েছে, তারা দ্রুত সংগঠিত হতে পারে, পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং প্রয়োজনে কঠোর ও কেন্দ্রীভূত রাষ্ট্রক্ষমতার সামনেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।

২০২৬ সালের ২৫ জুলাইয়ের আগে ও পরের ঘটনাগুলো ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা রেখে গেছে। দেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ, স্বপ্ন ও জীবনকে আর কখনোই রাষ্ট্রের কাছে তুচ্ছ বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ এই প্রজন্ম তাদের লক্ষ্য অর্জন না করা পর্যন্ত থামবে না।

  • নিখিল সঞ্জয় রেখা আদসুল: যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেইটন পেডেন স্কলার এবং আইআইটি-দিল্লির সিনিয়র স্কলার

(দ্য প্রিন্ট থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ করেছেন মাহজাবিন নাফিসা)

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত