স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ: জনপ্রতিনিধিদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কি জরুরি

প্রকাশ : ২৭ জুলাই ২০২৬, ১১: ৫৯
স্ট্রিম গ্রাফিক

ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীর ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা হতে হবে অন্তত স্নাতক। গত ২১ জুলাই এমন একটি রুল দিয়েছেন হাইকোর্ট—যেখানে ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২৬ ধারার অধীনে ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদ আইনে ইউপি চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য যেসব যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে বয়স কমপক্ষে পঁচিশ বছর এবং মানসিক সুস্থতা। এর বাইরে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান প্রার্থীদের যেসব যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো আদালত কর্তৃক দেউলিয়া হওয়ার মতো সংসদ সদস্যদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মতোই। এসব শর্তের মধ্যে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অর্থাৎ পড়ালেখা না জানা লোকও ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য হতে পারবেন। অতীতে হয়েছেন। এখনও হচ্ছেন।

তবে এবার ইউনিয়ন পরিষদের এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করা হলো। রিটের শুনানি নিয়ে উচ্চ আদালত রুল জারি করে ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ‍ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিতে রুল জারি করলেন। কিন্তু দেশের আইনপ্রণেতা তথা সংসদ সদস্য হতেই ন্যূনতম পড়ালেখার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। পড়ালেখা না জানা কিংবা স্নাতক না হয়েও যে দেশে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি হওয়া যায়। সেই দেশে স্থানীয় সরকারের সর্বনিম্ন ধাপ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হতে কেন কমপক্ষে স্নাতক ডিগ্রি লাগবে?

রিটকারী আইনজীবীদের যুক্তি হলো, কোনো প্রকার শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের জন্য প্রার্থী হতে পারা সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮, ৫৯, ৬০ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এ ছাড়া গ্রাম আদালত আইনে একজন চেয়ারম্যানের বিচারিক ক্ষমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাদের আরেকটি যুক্তি হলো, জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও অন্যান্য বিচারক জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন আইনের অধীনে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য তাদের ন্যূনতম আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করতে হয়। ফৌজদারি কার্যবিধির ৩২ ধারার অধীনে দ্বিতীয় শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড আরোপ করতে পারেন, যা ২০০৬ সালের গ্রাম আদালত আইনের অধীনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের অর্থদণ্ড আরোপের ক্ষমতার সমপর্যায়ের। অথচ ইউনিয়ন পরিষদ আইনের ২৬ ধারায় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার জন্য কোনো ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়নি। শিক্ষাগত যোগ্যতার অভাব একজন চেয়ারম্যানকে তার ওপর অর্পিত আইনগত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনে অযোগ্য করে তুলতে পারে।

শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই ইউপি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন সংবিধানের কয়েকটি অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলা হলেও মূল কারণ হলো তাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব। আইন অনুযায়ী চেয়ারম্যানগণ যৌথ স্বাক্ষরে আয়-ব্যয় পরিচালনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ক্ষমতা অর্পণ, প্রতিবেদন প্রস্তুত এবং লিখিতভাবে নথিপত্র তলব ও আদেশ প্রদান করেন। এসব কাজের জন্য পড়ালেখা জানা প্রয়োজন, নতুবা প্রশাসনিক কর্মকর্তার ওপর নির্ভর করে কেবল স্বাক্ষর বা টিপসই দিতে হবে।

ইউপি চেয়ারম্যানদের সীমিত আকারে বিচারিক ক্ষমতা থাকায় তাদের ন্যূনতম পড়ালেখা থাকা প্রয়োজন, এটি যুক্তির কথা। যুগের পর যুগ ধরে প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা না জানা এই দেশের জনপ্রতিনিধি এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি সামাজিক নানা বিরোধের মীমাংসা করেছেন। একটা সময় পর্যন্ত আমাদের খুব বেশি উপাদান নিয়ে কারবার করতে হতো না। কিন্তু আমাদের পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আমাদের যুক্ত হতে হচ্ছে নিমেষে বদলে যেতে থাকা এক পৃথিবীর সঙ্গে। সেখানে একটা গাছ কাটাও আন্তর্জাতিক কোনো না কোনো সনদের সঙ্গে যুক্ত এক ঘটনা। সব মিলিয়ে আজকে ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে জনপ্রতিনিধিদের এসবের সঙ্গে যুক্ত হতে পারার মতো পড়ালেখা জানা থাকা আবশ্যিক হয়ে গেছে।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে এমপি হওয়ার শর্তে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো বিধান নেই। ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে শিক্ষার হার কম ছিল। রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যক্তি ইমেজ, সমাজসেবা ও পারিবারিক পরিচিতি মুখ্য হওয়ায় তখন এই শর্ত রাখা হয়নি। কিন্তু গত অর্ধশতকে শিক্ষার হার বেড়েছে। প্রান্তিক তরুণেরাও সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিচ্ছে। এখন শিক্ষিত লোক না থাকার যুক্তি আর কাজ করবে না।

শিক্ষাগত যোগ্যতা নিশ্চিত করার এই উদ্যোগটি শুধু ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়াও সকল স্থানীয় সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকারেও থাকা প্রয়োজন। দেশের আইন প্রণয়নকারী সংসদ সদস্যরা পড়ালেখা ছাড়াই কিংবা ন্যূনতম স্নাতক ডিগ্রি ছাড়াই সংসদে চলে যান। তাদের পক্ষে আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন নিয়ে কাজ করা বেশ কঠিন হওয়ার কথা। এমপিদের বিরাট অংশই আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় খুব বেশি অংশ নেন না বা নিতে পারেন না। খুব একটা আগ্রহও দেখান না। নিজেদের এলাকার উন্নয়ন কার্যক্রম এবং ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যেই তাঁরা বেশি সময় দেন। এই প্রশ্ন উঠতেই পারে যে স্থায়ী কমিটিতে বা বিলের ওপর আলোচনায় কেবল ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলা কি যথেষ্ট?

এটা ঠিক যে, এমপি হওয়ার পর তাদের বিভিন্ন ধরনের ওরিয়েন্টেশন হয়। কিন্তু সেসব ওরিয়েন্টেশনের মধ্য দিয়ে একজন এমপি সংবিধান, আইনকানুন, এমনকি সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি (সংসদ পরিচালনার লিখিত নিয়ম) সম্পর্কেই বা কতটুকু জ্ঞান অর্জন করতে পারেন?

২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি সমকালের একটি রিপোর্টে বলছে যে নবম সংসদের মতো দশম সংসদও বিল পাসে সবচেয়ে কম সময় ব্যয় করছে। বিল পাসের প্রক্রিয়ায় ঘুরেফিরে সর্বোচ্চ ১০ জন এমপিকে অংশ নিতে দেখা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিলেন জাতীয় পার্টির সদস্য ফখরুল ইমাম। তিনি বলেন, মন্ত্রীদের সময়ের বড় অভাব। তাঁরা সংসদে যে বিলটি উত্থাপন করেন, তাও ভালোভাবে পড়ে দেখেন না। বিলের ওপর প্রশ্ন করা হলে তাঁরা অন্য প্রসঙ্গে জবাব দেন। সংশোধনী প্রত্যাখ্যান করলেও তার কারণ বলেন না।

দুর্নীতিবিরোধী সংগঠন টিআইবির গবেষণাও বলছে, জাতীয় সংসদে আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত আলোচনাতেই সবচেয়ে কম সংখ্যক সংসদ সদস্য অংশ নেন। ২০১৯ সালের আগস্টে প্রকাশিত টিআইবির একটি গবেষণায় বলা হয়, দশম সংসদের ৩৫০ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে আইন প্রণয়ন (বাজেট ব্যতীত) আলোচনায় অংশ নিয়েছেন মাত্র ৯৪ জন। ওই সংসদের ২৩টি অধিবেশনে আইন প্রণয়ন কার্যক্রমে মোট প্রায় ১৬৮ ঘণ্টা ১২ মিনিট সময় ব্যয় হয়েছে। এটি অধিবেশনগুলোর ব্যয় হওয়া মোট সময়ের মাত্র ১২ শতাংশ।

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদে এমপি হওয়ার শর্তে শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো বিধান নেই। ১৯৭২ সালে স্বাধীন দেশে শিক্ষার হার কম ছিল। রাজনৈতিক কর্মীদের ব্যক্তি ইমেজ, সমাজসেবা ও পারিবারিক পরিচিতি মুখ্য হওয়ায় তখন এই শর্ত রাখা হয়নি। কিন্তু গত অর্ধশতকে শিক্ষার হার বেড়েছে। প্রান্তিক তরুণেরাও সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিচ্ছে। এখন শিক্ষিত লোক না থাকার যুক্তি আর কাজ করবে না। বরং শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম কেন রাজনীতিতে আসছে না সেই উত্তর খোঁজা জরুরি।

রাষ্ট্রের সামগ্রিক সিস্টেম এবং রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নকে দেশের উন্নয়নে প্রধান বাধা বলে মনে করা হয়। সেই সিস্টেম পরিবর্তন তথা দুর্বৃত্তায়ন কমাতে শিক্ষিত মানুষকেই রাজনীতিতে এসে আইনপ্রণেতার ভূমিকা পালন করতে হবে। এটিও বাস্তবতা। শিক্ষিত মানুষকে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সংসদে নিয়ে আসার প্রথম শর্তই হতে পারে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের সংশোধন। অর্থাৎ শুধু এমপি নয়, বরং স্থানীয় সরকারেরও যেকোনো প্রতিষ্ঠানে নির্বাচন করতে হলে ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত জুড়ে দেওয়া উচিত।

এ পর্যন্ত যতবার সংবিধান সংশোধন হয়েছে, কখনোই এ বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ২০১১ সালে যখন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের অনেকখানি পরিবর্তন করার সময়ই বিষয়টি যুক্ত করার সুযোগ ছিল। কিন্তু সেটি সংবিধান সংশোধনে গঠিত বিশেষ কমিটি বিবেচনায় নেয়নি। ওই সংসদেও এমন অনেক এমপি ছিলেন, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা একজন আইনপ্রণেতা হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। হয়তো তারাই তা চাননি। এখনও যে সাড়ে তিনশ এমপি (সংরক্ষিত আসনসহ) আছেন, তাদের মধ্যে কতজন আইনপ্রণেতা হওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞানসম্পন্ন- তা নিয়েও প্রশ্ন হতে পারে।

পরিবর্তনের সূচনা এখনই করা দরকার। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে সংবিধান ‘সংশোধন’ না ‘সংস্কার’—এই তর্ক হয়েছে। সম্প্রতি সংবিধান সংশোধনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে জাতীয় সংসদ। ধারণা করা যায়, শিগগিরই সংবিধান সংশোধনের কাজ শুরু হবে। সেই সুযোগে জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতার বিধান যুক্ত করা যায়। তবে সংসদ সদস্যদের কত শতাংশ এই দাবিতে একমত হবেন তা বলা যাচ্ছে না। তারপরও পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতি এবং ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার এই যুগে পড়ালেখা না জানা লোক জনপ্রতিনিধি হলে সেটি যে দেশের জন্যই অমঙ্গল—এই বাস্তবতাটি সকলেরই উপলব্ধিতে আসা প্রয়োজন।

  • আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক
Ad 300x250

সম্পর্কিত