লেখা:

ঈদ, পূজা বা কোনো সরকারি ছুটি এলেই ঢাকা যেন হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়। মানুষ চলে যায় গ্রাম নামক শিকড়ে। সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ব্যক্তিগত আলাপ—সব জায়গাতেই তখন উঠে আসে ‘ফাঁকা ঢাকা’র গল্প।
১৬১০ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে শহরটি বহু চড়াই-উতরাই পার করেছে। তবুও একটি বিষয় সবসময়ই একই থেকেছে—ঢাকার আয়তন ও জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে; এর লেখচিত্র কতখানি স্থির বা নিম্নমুখী হয়েছে কি না, তা পরিসংখ্যানবিদরাই ভালো বলতে পারবেন।
আজকের গল্পটা শুধুই জনসংখ্যার। পরিসংখ্যান বলছে, ১৮৭২ সালের প্রথম ব্রিটিশ জনশুমারিতে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৬৯,২১২ জন। যা ২০২৫-২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী বেড়ে প্রায় ২ কোটি ৫৩ লাখে পৌঁছেছে। ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জনশুমারিতে এই সংখ্যা ছিল ১৭,৭২,৪৩৮। অর্থাৎ, গত অর্ধশতাব্দীতে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ১৩২৫-১৩৩০%, গড়ে প্রায় ১৩২৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দেখা যায় ১৯৭৪ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে, যখন বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৯.৯৪%। স্বাধীনতার পর থেকে কর্মসংস্থানের খোঁজে গ্রাম থেকে ঢাকায় ব্যাপক হারে মানুষের আগমনই এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে; তবে সাথে যুক্ত হয়েছে উন্নত শিক্ষা, মানসম্মত চিকিৎসা ও আধুনিক জীবনের আকাঙ্ক্ষা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘জনসংখ্যা কি শুধু ঢাকায় বেড়েছে?’ উত্তর হলো, ঢাকার মতো দ্রুত না হলেও দেশের প্রায় সব নগর এলাকায় জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে ইতোমধ্যে শহরে বসবাসরত বাসিন্দাদের মাঝে উচ্চ জন্মহারের কারণে, অন্যদিকে নানাবিধ কারণে গ্রামের মানুষ শহরে চলে আসার ফলে।
অদ্ভুত হলেও সত্য, গত পাঁচ দশক ধরে একাধিক গণতান্ত্রিক সরকার শাসন করেছে, যাদের অধীনস্থ দেশের জনসংখ্যার বড় অংশই গ্রামীণ। তাহলে কি সরকারগুলোর নীতি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি, যার ফলে প্রান্তিক মানুষকে শহরে স্থানান্তরিত হতে হয়েছে?
বাংলাদেশের বিভিন্ন নগর এলাকার উপর ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর এক সমীক্ষা ও গবেষণায় দেখা যায় যে, ৭২% মানুষ জীবিকার তাগিদে, ১১.৬% মানুষ উন্নত শিক্ষার জন্য এবং ৪.৩% মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরিত ও থিতু হয়।
বাংলাদেশে গ্রাম থেকে শহরে চলে আসবার সিদ্ধান্ত কেবল মানুষের ব্যক্তিগত বিবেচনা নয়, এটি দেশের জননীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গত কয়েক দশকে উন্নয়ন কৌশলে শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতিকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তৈরি পোশাক শিল্পসহ বড় বড় কারখানা ও কর্মসংস্থান প্রধানত ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহর ও তার পার্শ্ববর্তী অন্যান্য শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে। পরিসংখ্যান বলে, দেশে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করে, যার সিংহভাগই দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চল থেকে আগত এবং এই খাত থেকে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে। এতে শহরে তুলনামূলকভাবে বেশি কাজের সুযোগ ও নিয়মিত নগদ আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষিখাতের তুলনায় শিল্প ও সেবাখাতের গুরুত্ব বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক দশকে কৃষির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, অন্যদিকে শিল্পখাতের অংশ বেড়েছে। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমশ শহরমুখী হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতির অধিকাংশই এখনও মূলত কৃষিনির্ভর, যেখানে জমির আকার ছোট হয়ে যাওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজার দামের অনিশ্চয়তা এবং প্রাকৃতিক ঝুঁকি মানুষের আয়কে অনিরাপদ করে তোলে। বাস্তবতা হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিতে কর্মসংস্থানের অংশ কমলেও সংখ্যার দিক দিয়ে এখনও দেশের একটি বড় অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অনেক মানুষ নিম্ন আয় বা আংশিক কর্মসংস্থানে আটকে থাকে এবং বিকল্প জীবিকার সন্ধানে শহরের দিকে ঝোঁকে।
একই সঙ্গে অবকাঠামো ও সেবাখাতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ শহরাঞ্চলে বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও যোগাযোগের সুবিধা শহরে তুলনামূলক উন্নত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে—১৯৯০ সালের প্রায় ২০ শতাংশ থেকে বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকভাবেও মানুষকে শহরের দিকে আকৃষ্ট করে।
গ্রামে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও সব মানুষের কাছে সেগুলো সমানভাবে পৌঁছায় না; ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি অংশ শহরে গিয়ে কাজ খোঁজাকে বেশি বাস্তবসম্মত মনে করে। শহরে অনানুষ্ঠানিক খাত—যেমন রিকশা চালানো, নির্মাণ শ্রম, ছোট দোকান বা হকারিসহ নানাবিধ কায়িক পেশায় সহজে প্রবেশযোগ্য হওয়ায় নতুন আগতদের জন্য কিছু না কিছু আয়ের পথ তৈরি হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নগদ অর্থভিত্তিক অর্থনীতি। শহরে কাজ করলে তুলনামূলকভাবে নিয়মিত নগদ আয়ের সুযোগ বেশি থাকে এবং পরিবারে অর্থ পাঠানোও সহজ হয়, যা গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে সীমিত। বিভিন্ন গবেষণায় গ্রাম ও শহরের আয়ের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা মানুষকে শহরমুখী হতে উৎসাহিত করে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—বিশেষ করে বন্যা, নদীভাঙন, উপকূলীয় ঝুঁকিসহ অন্যান্য প্রতিকূলতা গ্রামীণ জীবিকাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে, যা গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশের জননীতিতে শিল্প ও সেবাখাতের শহরকেন্দ্রিক বিকাশ, গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি সব একসাথে কাজ করে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে শহর মানুষকে আকর্ষণ করে এবং গ্রাম ছেড়ে যেতে অনেককেই প্রভাবিত করে।
একইভাবে শিক্ষাও গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তরের একটি অন্যতম, কিন্তু অনেক সময় কম আলোচিত কারণ। বাস্তবে দেখা যায়, শুধু কর্মসংস্থানের জন্য নয়, অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের ভালো শিক্ষার সুযোগের জন্য উপজেলা, জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরে চলে আসে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকেই এই স্থানান্তর শুরু হয়, আর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তা আরও বেশি স্পষ্ট। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ও মানসম্মত কলেজগুলো প্রধানত শহরকেন্দ্রিক।
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রবেশ ও প্রবেশাধিকার দুটোই অনেক বেড়েছে। প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির হার এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু বিশ্বব্যাংক এবং ইউনিসেফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, শেখার মান এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তর শেষ করার পরও সেখানে সাবলীলভাবে বাংলা ও ইংরেজি পড়তে, নির্ভুলভাবে লিখতে এবং মৌলিক গণিত সমস্যার সমাধান করতে অক্ষম।
এর পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা কাজ করে। প্রথমত, অনেক গ্রামীণ বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা চাহিদার তুলনায় কম এবং ব্যাপক এমপিওভুক্তি, সরকারীকরণ ও কোটাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের ফলে গ্রামাঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষকের মান ও শিক্ষার সামগ্রিক গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষাসামগ্রী ও সহায়ক শেখার পরিবেশ (যেমন: লাইব্রেরি, ডিজিটাল সুবিধা) অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। তৃতীয়ত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকরা অর্থনৈতিক, পেশাগত ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ও উন্নতির জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শহরমুখী হতে আগ্রহী হন; ফলে গ্রামে তাঁদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার মনে করে, গ্রামে থাকলে সন্তানের শিক্ষাগত ভিত্তি দুর্বল থেকে যেতে পারে। তাই তাদের অনেকের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য না থাকা সত্ত্বেও শহরে চলে আসে বা সন্তানকে শহরে পাঠায়। ফলে শিক্ষা কেবল একটি সামাজিক খাত নয়, এটি গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তব চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
তবে সরকারি ও আধা-সরকারি শিক্ষা নীতি ও ব্যবস্থাপনা কি কেবল গ্রামীণ মানুষের জন্যই অপ্রতুল? শহরের জন্যও যদি অপ্রতুল না হতো, তবে ৯০-এর দশকের শেষ দিকে ‘ছায়া শিক্ষা কার্যক্রম’—অর্থাৎ কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের যে উত্থান, তা এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকত না।
অর্থনীতি ও শিক্ষা বাদেও আরও যে কারণে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে, তার মধ্যে অপ্রতুল চিকিৎসা সুবিধা ও জলবায়ু পরিবর্তন অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের আলাপটা খানিকটা দীর্ঘ ও জটিল, তাই তা ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ের জন্য রেখে চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতা নিয়ে এগোনো যাক। বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা তিন স্তরে গঠিত—কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ, ইউনিয়ন কেন্দ্রে মা-শিশু ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা, আর উপজেলা কমপ্লেক্সে হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা ও জরুরি সেবা প্রদান করা হয়।
তিন স্তরবিশিষ্ট হলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত সংস্থানের অভাবে এত বড় কর্মযজ্ঞ স্রেফ ‘কাগুজে বাঘ’ হয়েই বসে আছে বলে জানাচ্ছে গবেষণা। বড় বড় শহরগুলোতে যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা রয়েছে তাও এত বৃহৎ জনসংখ্যার জন্য অপ্রতুল। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপক চাহিদা ও উত্থান তাই নির্দেশ করে। যেহেতু আজকের আলোচনার অনেকটাই গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর নিয়ে, তাই মূল আলোচনায় আবার ফেরা যাক।
বাংলাদেশে গ্রাম থেকে শহরে স্থায়ীভাবে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরিত মানুষের সংখ্যা মোট স্থানান্তরিতের তুলনায় খুবই কম। সাধারণত গ্রামীণ মানুষ চিকিৎসার জন্য শহরে গিয়ে চিকিৎসা শেষে আবার গ্রামে ফিরে আসে। তবে কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ী স্থানান্তর ঘটে। প্রথমত, বয়োজ্যেষ্ঠরা চিকিৎসার জন্য বারবার যাতায়াতের পরিবর্তে শহরে বসবাসরত সন্তান বা আত্মীয়দের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। তবে এ ক্ষেত্রে চিকিৎসা সুবিধা অন্যতম কারণ হলেও একমাত্র নয়। অন্যদিকে, কেবল চিকিৎসার জন্য শহরে স্থানান্তরিত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবার প্রথম দল বা বয়োজ্যেষ্ঠ শ্রেণির তুলনায় একদম কম।
বাংলাদেশে গ্রাম থেকে শহরমুখী জনসংখ্যা স্থানান্তরের পেছনে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা রেখেছে পাবলিক পলিসি বা জননীতির কাঠামোগত অসামঞ্জস্য, বিশেষ করে উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভৌগোলিক ও খাতভিত্তিক ভারসাম্যহীনতা। স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও এই উন্নয়ন প্রধানত কয়েকটি বড় শহর, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। নীতিগতভাবে শিল্প ও কর্মসংস্থানকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সীমিত অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত রাখার ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্থানীয়ভাবে টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে শহরমুখী অভিবাসন অনেকাংশে একটি কাঠামোগতভাবে তৈরি হওয়া বাধ্যতামূলক পছন্দে পরিণত হয়েছে।
একই সঙ্গে কৃষিখাতকে আধুনিক, লাভজনক ও টেকসই পেশায় রূপান্তর করার ক্ষেত্রে নীতিগত ঘাটতি স্পষ্ট। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির কিছু সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও কৃষকের আয় স্থিতিশীল করা, বাজারব্যবস্থা শক্তিশালী করা, যথাযথ মাত্রায় ভর্তুকি, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। ফলে কৃষি ক্রমশ অনিশ্চিত ও কম আয়ের খাতে পরিণত হয়েছে, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে বিকল্প জীবিকার সন্ধানে শহরের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
জননীতির আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অসম বণ্টন। নীতিগতভাবে সেবার বিস্তার ঘটানো হলেও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দক্ষ শিক্ষক এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রধানত শহরেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। গ্রামীণ এলাকায় অবকাঠামো থাকলেও সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি ও বিনিয়োগের যথেষ্ট অভাব ছিল। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারগুলো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও আর্থসামাজিক উন্নতির আশায় শহরমুখী হতে বাধ্য হয়েছে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক পরিকল্পনার দুর্বলতা—বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শহরগুলোকে বিকল্প অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলবার ব্যর্থতা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ত্রুটি। যদি উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে সমানভাবে শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক সেবা সমন্বিতভাবে উন্নত করা যেত, তাহলে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ অন্যান্য প্রধান শহরগুলোর ওপর এতটা চাপ সৃষ্টি হতো না। কিন্তু এই ধরনের বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন কৌশলের অভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম এককভাবে সুযোগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
সবশেষে, পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকিকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় পর্যাপ্তভাবে অন্তর্ভুক্ত না করাও একটি নীতিগত দুর্বলতা। নদীভাঙন, বন্যা ও উপকূলীয় ক্ষয়ক্ষতির মতো বিষয়গুলো গ্রামীণ জীবিকাকে ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ করে তুললেও এসব ঝুঁকির মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার পরিকল্পনা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য হয়ে শহরে স্থানান্তরিত হয়েছে।
সমাধান কী?
সমাধান একক কোনো পদক্ষেপে সম্ভব নয়—কারণ সমস্যাটা কাঠামোগত। তাই জননীতিতেও সমাধান হতে হবে সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং ভৌগোলিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত: ঢাকার ওপর চাপ কমানো নয়, বরং ‘ঢাকার বাইরে সুযোগ তৈরি করা’।
১. সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা: শিল্প, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোকে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ না রেখে উপজেলা, জেলা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে ছড়িয়ে দিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে ‘সেকেন্ডারি সিটি’ বা মধ্যম আকারের শহরগুলোকে অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে—যেখানে শিল্পাঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসন একসাথে উন্নত হবে। এতে মানুষ ঢাকায় না এসেও কাছাকাছি শহরে কাজ ও সেবা পেতে পারবে।
২. কৃষিখাতকে টেকসই ও লাভজনক করা: শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং কৃষকের আয় স্থিতিশীল করা এখানে মূল বিষয়। এজন্য প্রয়োজন উন্নত বাজারব্যবস্থা, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা, যথাযথ ভর্তুকি, কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি। কৃষিকে যদি ‘অলাভজনক আয়’ খাত থেকে ‘টেকসই জীবিকা’য় রূপান্তর করা যায়, তাহলে গ্রাম ছাড়ার চাপ অনেকাংশে কমে যাবে।
৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানগত বৈষম্য কমানো: গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় মানসম্মত স্কুল, কলেজ ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও ধরে রাখা এবং ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। একইভাবে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে যতটা সম্ভব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ যেন মৌলিক সেবার জন্য শহরে যেতে বাধ্য না হয়—এটাই হতে হবে লক্ষ্য।
৪. গ্রামীণ অর্থনীতিকে বহুমুখী করা: কৃষির পাশাপাশি ছোট শিল্প, গ্রামীণ উদ্যোগ, সার্ভিস সেক্টর, ফ্রিল্যান্সিং এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সুযোগ তৈরি করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগ বাড়ানো গেলে গ্রামেই যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
৫. বিকেন্দ্রীকৃত নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন: ঢাকাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা ও ব্যাপক বরাদ্দের যে চর্চা, তার পরিবর্তে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত নগর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বিভিন্ন শহর একে অপরের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত থাকবে। এতে একটি শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে না।
সবশেষে, বাস্তবায়ন কাঠামো শক্তিশালী করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে অনেক ভালো নীতি থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। তাই পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও সমাধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমাধান হলো—সুযোগকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া, মানুষকে সুযোগের পেছনে ঢাকায় টেনে না আনা। এবং জননীতিগুলো হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী; যাতে সরকারে যেই আসুক, জনকল্যাণ যেন অব্যাহত থাকে যুগের পর যুগ।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। ই-মেইল: [email protected]

ঈদ, পূজা বা কোনো সরকারি ছুটি এলেই ঢাকা যেন হঠাৎ ফাঁকা হয়ে যায়। মানুষ চলে যায় গ্রাম নামক শিকড়ে। সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ব্যক্তিগত আলাপ—সব জায়গাতেই তখন উঠে আসে ‘ফাঁকা ঢাকা’র গল্প।
১৬১০ সালে মোগল সুবেদার ইসলাম খান চিশতি ঢাকাকে বাংলার রাজধানী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পর থেকে শহরটি বহু চড়াই-উতরাই পার করেছে। তবুও একটি বিষয় সবসময়ই একই থেকেছে—ঢাকার আয়তন ও জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে; এর লেখচিত্র কতখানি স্থির বা নিম্নমুখী হয়েছে কি না, তা পরিসংখ্যানবিদরাই ভালো বলতে পারবেন।
আজকের গল্পটা শুধুই জনসংখ্যার। পরিসংখ্যান বলছে, ১৮৭২ সালের প্রথম ব্রিটিশ জনশুমারিতে ঢাকার জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৬৯,২১২ জন। যা ২০২৫-২৬ সালের পূর্বাভাস অনুযায়ী বেড়ে প্রায় ২ কোটি ৫৩ লাখে পৌঁছেছে। ১৯৭৪ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জনশুমারিতে এই সংখ্যা ছিল ১৭,৭২,৪৩৮। অর্থাৎ, গত অর্ধশতাব্দীতে ঢাকার জনসংখ্যা প্রায় ১৩২৫-১৩৩০%, গড়ে প্রায় ১৩২৮% বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে বেশি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দেখা যায় ১৯৭৪ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে, যখন বার্ষিক বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় ৯.৯৪%। স্বাধীনতার পর থেকে কর্মসংস্থানের খোঁজে গ্রাম থেকে ঢাকায় ব্যাপক হারে মানুষের আগমনই এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। বর্তমানে সেই প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে; তবে সাথে যুক্ত হয়েছে উন্নত শিক্ষা, মানসম্মত চিকিৎসা ও আধুনিক জীবনের আকাঙ্ক্ষা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, ‘জনসংখ্যা কি শুধু ঢাকায় বেড়েছে?’ উত্তর হলো, ঢাকার মতো দ্রুত না হলেও দেশের প্রায় সব নগর এলাকায় জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিকে ইতোমধ্যে শহরে বসবাসরত বাসিন্দাদের মাঝে উচ্চ জন্মহারের কারণে, অন্যদিকে নানাবিধ কারণে গ্রামের মানুষ শহরে চলে আসার ফলে।
অদ্ভুত হলেও সত্য, গত পাঁচ দশক ধরে একাধিক গণতান্ত্রিক সরকার শাসন করেছে, যাদের অধীনস্থ দেশের জনসংখ্যার বড় অংশই গ্রামীণ। তাহলে কি সরকারগুলোর নীতি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি, যার ফলে প্রান্তিক মানুষকে শহরে স্থানান্তরিত হতে হয়েছে?
বাংলাদেশের বিভিন্ন নগর এলাকার উপর ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)-এর এক সমীক্ষা ও গবেষণায় দেখা যায় যে, ৭২% মানুষ জীবিকার তাগিদে, ১১.৬% মানুষ উন্নত শিক্ষার জন্য এবং ৪.৩% মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তরিত ও থিতু হয়।
বাংলাদেশে গ্রাম থেকে শহরে চলে আসবার সিদ্ধান্ত কেবল মানুষের ব্যক্তিগত বিবেচনা নয়, এটি দেশের জননীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। গত কয়েক দশকে উন্নয়ন কৌশলে শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতিকে তুলনামূলক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তৈরি পোশাক শিল্পসহ বড় বড় কারখানা ও কর্মসংস্থান প্রধানত ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বড় বড় শহর ও তার পার্শ্ববর্তী অন্যান্য শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে। পরিসংখ্যান বলে, দেশে তৈরি পোশাক খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক কাজ করে, যার সিংহভাগই দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চল থেকে আগত এবং এই খাত থেকে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে। এতে শহরে তুলনামূলকভাবে বেশি কাজের সুযোগ ও নিয়মিত নগদ আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
একই সঙ্গে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃষিখাতের তুলনায় শিল্প ও সেবাখাতের গুরুত্ব বেড়েছে। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত কয়েক দশকে কৃষির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অংশ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, অন্যদিকে শিল্পখাতের অংশ বেড়েছে। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্রমশ শহরমুখী হয়েছে।
অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতির অধিকাংশই এখনও মূলত কৃষিনির্ভর, যেখানে জমির আকার ছোট হয়ে যাওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, বাজার দামের অনিশ্চয়তা এবং প্রাকৃতিক ঝুঁকি মানুষের আয়কে অনিরাপদ করে তোলে। বাস্তবতা হলো, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কৃষিতে কর্মসংস্থানের অংশ কমলেও সংখ্যার দিক দিয়ে এখনও দেশের একটি বড় অংশ এই খাতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অনেক মানুষ নিম্ন আয় বা আংশিক কর্মসংস্থানে আটকে থাকে এবং বিকল্প জীবিকার সন্ধানে শহরের দিকে ঝোঁকে।
একই সঙ্গে অবকাঠামো ও সেবাখাতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ শহরাঞ্চলে বেশি কেন্দ্রীভূত হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বিদ্যুৎ, পরিবহন ও যোগাযোগের সুবিধা শহরে তুলনামূলক উন্নত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের নগর জনসংখ্যার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে—১৯৯০ সালের প্রায় ২০ শতাংশ থেকে বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি। এটি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিকভাবেও মানুষকে শহরের দিকে আকৃষ্ট করে।
গ্রামে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকলেও সব মানুষের কাছে সেগুলো সমানভাবে পৌঁছায় না; ফলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি অংশ শহরে গিয়ে কাজ খোঁজাকে বেশি বাস্তবসম্মত মনে করে। শহরে অনানুষ্ঠানিক খাত—যেমন রিকশা চালানো, নির্মাণ শ্রম, ছোট দোকান বা হকারিসহ নানাবিধ কায়িক পেশায় সহজে প্রবেশযোগ্য হওয়ায় নতুন আগতদের জন্য কিছু না কিছু আয়ের পথ তৈরি হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নগদ অর্থভিত্তিক অর্থনীতি। শহরে কাজ করলে তুলনামূলকভাবে নিয়মিত নগদ আয়ের সুযোগ বেশি থাকে এবং পরিবারে অর্থ পাঠানোও সহজ হয়, যা গ্রামীণ প্রেক্ষাপটে সীমিত। বিভিন্ন গবেষণায় গ্রাম ও শহরের আয়ের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা মানুষকে শহরমুখী হতে উৎসাহিত করে। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—বিশেষ করে বন্যা, নদীভাঙন, উপকূলীয় ঝুঁকিসহ অন্যান্য প্রতিকূলতা গ্রামীণ জীবিকাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে, যা গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, বাংলাদেশের জননীতিতে শিল্প ও সেবাখাতের শহরকেন্দ্রিক বিকাশ, গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি সব একসাথে কাজ করে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে শহর মানুষকে আকর্ষণ করে এবং গ্রাম ছেড়ে যেতে অনেককেই প্রভাবিত করে।
একইভাবে শিক্ষাও গ্রাম থেকে শহরে মানুষের স্থানান্তরের একটি অন্যতম, কিন্তু অনেক সময় কম আলোচিত কারণ। বাস্তবে দেখা যায়, শুধু কর্মসংস্থানের জন্য নয়, অনেক পরিবার তাদের সন্তানদের ভালো শিক্ষার সুযোগের জন্য উপজেলা, জেলা কিংবা বিভাগীয় শহরে চলে আসে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর থেকেই এই স্থানান্তর শুরু হয়, আর উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে তা আরও বেশি স্পষ্ট। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় ও মানসম্মত কলেজগুলো প্রধানত শহরকেন্দ্রিক।
বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় প্রবেশ ও প্রবেশাধিকার দুটোই অনেক বেড়েছে। প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির হার এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু বিশ্বব্যাংক এবং ইউনিসেফসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, শেখার মান এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তর শেষ করার পরও সেখানে সাবলীলভাবে বাংলা ও ইংরেজি পড়তে, নির্ভুলভাবে লিখতে এবং মৌলিক গণিত সমস্যার সমাধান করতে অক্ষম।
এর পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত সমস্যা কাজ করে। প্রথমত, অনেক গ্রামীণ বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংখ্যা চাহিদার তুলনায় কম এবং ব্যাপক এমপিওভুক্তি, সরকারীকরণ ও কোটাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগের ফলে গ্রামাঞ্চলের সরকারি স্কুলগুলোতে শিক্ষকের মান ও শিক্ষার সামগ্রিক গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষাসামগ্রী ও সহায়ক শেখার পরিবেশ (যেমন: লাইব্রেরি, ডিজিটাল সুবিধা) অনেক ক্ষেত্রে সীমিত। তৃতীয়ত, দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকরা অর্থনৈতিক, পেশাগত ও ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য ও উন্নতির জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শহরমুখী হতে আগ্রহী হন; ফলে গ্রামে তাঁদের ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার মনে করে, গ্রামে থাকলে সন্তানের শিক্ষাগত ভিত্তি দুর্বল থেকে যেতে পারে। তাই তাদের অনেকের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য না থাকা সত্ত্বেও শহরে চলে আসে বা সন্তানকে শহরে পাঠায়। ফলে শিক্ষা কেবল একটি সামাজিক খাত নয়, এটি গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বাস্তব চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
তবে সরকারি ও আধা-সরকারি শিক্ষা নীতি ও ব্যবস্থাপনা কি কেবল গ্রামীণ মানুষের জন্যই অপ্রতুল? শহরের জন্যও যদি অপ্রতুল না হতো, তবে ৯০-এর দশকের শেষ দিকে ‘ছায়া শিক্ষা কার্যক্রম’—অর্থাৎ কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের যে উত্থান, তা এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকত না।
অর্থনীতি ও শিক্ষা বাদেও আরও যে কারণে মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরমুখী হচ্ছে, তার মধ্যে অপ্রতুল চিকিৎসা সুবিধা ও জলবায়ু পরিবর্তন অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের আলাপটা খানিকটা দীর্ঘ ও জটিল, তাই তা ভবিষ্যতে কোনো এক সময়ের জন্য রেখে চিকিৎসা সেবার অপ্রতুলতা নিয়ে এগোনো যাক। বাংলাদেশের গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা তিন স্তরে গঠিত—কমিউনিটি ক্লিনিক, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রাথমিক চিকিৎসা ও বিনামূল্যে ওষুধ, ইউনিয়ন কেন্দ্রে মা-শিশু ও পরিবার পরিকল্পনা সেবা, আর উপজেলা কমপ্লেক্সে হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা ও জরুরি সেবা প্রদান করা হয়।
তিন স্তরবিশিষ্ট হলেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও পর্যাপ্ত সংস্থানের অভাবে এত বড় কর্মযজ্ঞ স্রেফ ‘কাগুজে বাঘ’ হয়েই বসে আছে বলে জানাচ্ছে গবেষণা। বড় বড় শহরগুলোতে যে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা রয়েছে তাও এত বৃহৎ জনসংখ্যার জন্য অপ্রতুল। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার ব্যাপক চাহিদা ও উত্থান তাই নির্দেশ করে। যেহেতু আজকের আলোচনার অনেকটাই গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর নিয়ে, তাই মূল আলোচনায় আবার ফেরা যাক।
বাংলাদেশে গ্রাম থেকে শহরে স্থায়ীভাবে চিকিৎসার জন্য স্থানান্তরিত মানুষের সংখ্যা মোট স্থানান্তরিতের তুলনায় খুবই কম। সাধারণত গ্রামীণ মানুষ চিকিৎসার জন্য শহরে গিয়ে চিকিৎসা শেষে আবার গ্রামে ফিরে আসে। তবে কিছু ক্ষেত্রে স্থায়ী স্থানান্তর ঘটে। প্রথমত, বয়োজ্যেষ্ঠরা চিকিৎসার জন্য বারবার যাতায়াতের পরিবর্তে শহরে বসবাসরত সন্তান বা আত্মীয়দের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। তবে এ ক্ষেত্রে চিকিৎসা সুবিধা অন্যতম কারণ হলেও একমাত্র নয়। অন্যদিকে, কেবল চিকিৎসার জন্য শহরে স্থানান্তরিত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবার প্রথম দল বা বয়োজ্যেষ্ঠ শ্রেণির তুলনায় একদম কম।
বাংলাদেশে গ্রাম থেকে শহরমুখী জনসংখ্যা স্থানান্তরের পেছনে অন্যতম মুখ্য ভূমিকা রেখেছে পাবলিক পলিসি বা জননীতির কাঠামোগত অসামঞ্জস্য, বিশেষ করে উন্নয়ন পরিকল্পনায় ভৌগোলিক ও খাতভিত্তিক ভারসাম্যহীনতা। স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও এই উন্নয়ন প্রধানত কয়েকটি বড় শহর, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হয়ে পড়ে। নীতিগতভাবে শিল্প ও কর্মসংস্থানকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সীমিত অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত রাখার ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্থানীয়ভাবে টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে শহরমুখী অভিবাসন অনেকাংশে একটি কাঠামোগতভাবে তৈরি হওয়া বাধ্যতামূলক পছন্দে পরিণত হয়েছে।
একই সঙ্গে কৃষিখাতকে আধুনিক, লাভজনক ও টেকসই পেশায় রূপান্তর করার ক্ষেত্রে নীতিগত ঘাটতি স্পষ্ট। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির কিছু সরকারি, বেসরকারি উদ্যোগ থাকলেও কৃষকের আয় স্থিতিশীল করা, বাজারব্যবস্থা শক্তিশালী করা, যথাযথ মাত্রায় ভর্তুকি, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। ফলে কৃষি ক্রমশ অনিশ্চিত ও কম আয়ের খাতে পরিণত হয়েছে, যা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে বিকল্প জীবিকার সন্ধানে শহরের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
জননীতির আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অসম বণ্টন। নীতিগতভাবে সেবার বিস্তার ঘটানো হলেও মানসম্মত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দক্ষ শিক্ষক এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা প্রধানত শহরেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। গ্রামীণ এলাকায় অবকাঠামো থাকলেও সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কার্যকর নজরদারি ও বিনিয়োগের যথেষ্ট অভাব ছিল। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পরিবারগুলো নিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও আর্থসামাজিক উন্নতির আশায় শহরমুখী হতে বাধ্য হয়েছে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক পরিকল্পনার দুর্বলতা—বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শহরগুলোকে বিকল্প অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলবার ব্যর্থতা একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ত্রুটি। যদি উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে সমানভাবে শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশাসনিক সেবা সমন্বিতভাবে উন্নত করা যেত, তাহলে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ অন্যান্য প্রধান শহরগুলোর ওপর এতটা চাপ সৃষ্টি হতো না। কিন্তু এই ধরনের বিকেন্দ্রীকৃত উন্নয়ন কৌশলের অভাবে ঢাকা ও চট্টগ্রাম এককভাবে সুযোগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
সবশেষে, পরিবেশ ও জলবায়ু ঝুঁকিকে উন্নয়ন পরিকল্পনায় পর্যাপ্তভাবে অন্তর্ভুক্ত না করাও একটি নীতিগত দুর্বলতা। নদীভাঙন, বন্যা ও উপকূলীয় ক্ষয়ক্ষতির মতো বিষয়গুলো গ্রামীণ জীবিকাকে ক্রমশ ঝুঁকিপূর্ণ করে তুললেও এসব ঝুঁকির মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও বিকল্প জীবিকার পরিকল্পনা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মানুষ বাধ্য হয়ে শহরে স্থানান্তরিত হয়েছে।
সমাধান কী?
সমাধান একক কোনো পদক্ষেপে সম্ভব নয়—কারণ সমস্যাটা কাঠামোগত। তাই জননীতিতেও সমাধান হতে হবে সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি এবং ভৌগোলিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ। মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত: ঢাকার ওপর চাপ কমানো নয়, বরং ‘ঢাকার বাইরে সুযোগ তৈরি করা’।
১. সুষম আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা: শিল্প, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোকে শুধু ঢাকা ও চট্টগ্রামে সীমাবদ্ধ না রেখে উপজেলা, জেলা ও অন্যান্য বিভাগীয় শহরগুলোতে ছড়িয়ে দিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে ‘সেকেন্ডারি সিটি’ বা মধ্যম আকারের শহরগুলোকে অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে—যেখানে শিল্পাঞ্চল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও আবাসন একসাথে উন্নত হবে। এতে মানুষ ঢাকায় না এসেও কাছাকাছি শহরে কাজ ও সেবা পেতে পারবে।
২. কৃষিখাতকে টেকসই ও লাভজনক করা: শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, বরং কৃষকের আয় স্থিতিশীল করা এখানে মূল বিষয়। এজন্য প্রয়োজন উন্নত বাজারব্যবস্থা, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা, যথাযথ ভর্তুকি, কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি। কৃষিকে যদি ‘অলাভজনক আয়’ খাত থেকে ‘টেকসই জীবিকা’য় রূপান্তর করা যায়, তাহলে গ্রাম ছাড়ার চাপ অনেকাংশে কমে যাবে।
৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মানগত বৈষম্য কমানো: গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকায় মানসম্মত স্কুল, কলেজ ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ ও ধরে রাখা এবং ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ বাড়াতে হবে। একইভাবে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে যতটা সম্ভব বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষ যেন মৌলিক সেবার জন্য শহরে যেতে বাধ্য না হয়—এটাই হতে হবে লক্ষ্য।
৪. গ্রামীণ অর্থনীতিকে বহুমুখী করা: কৃষির পাশাপাশি ছোট শিল্প, গ্রামীণ উদ্যোগ, সার্ভিস সেক্টর, ফ্রিল্যান্সিং এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সুযোগ তৈরি করতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ, প্রশিক্ষণ ও বাজার সংযোগ বাড়ানো গেলে গ্রামেই যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
৫. বিকেন্দ্রীকৃত নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন: ঢাকাকেন্দ্রিক পরিকল্পনা ও ব্যাপক বরাদ্দের যে চর্চা, তার পরিবর্তে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত নগর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে, যেখানে বিভিন্ন শহর একে অপরের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে যুক্ত থাকবে। এতে একটি শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে না।
সবশেষে, বাস্তবায়ন কাঠামো শক্তিশালী করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে অনেক ভালো নীতি থাকলেও সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন, সমন্বয় ও জবাবদিহিতার ঘাটতি রয়েছে। তাই পরিকল্পনা প্রণয়নের পাশাপাশি স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করা, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করাও সমাধানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমাধান হলো—সুযোগকে মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়া, মানুষকে সুযোগের পেছনে ঢাকায় টেনে না আনা। এবং জননীতিগুলো হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও সুদূরপ্রসারী; যাতে সরকারে যেই আসুক, জনকল্যাণ যেন অব্যাহত থাকে যুগের পর যুগ।
লেখক: বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রিসার্চ ফেলো, ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। ই-মেইল: [email protected]

ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা এবং ক্ষতি সাধনের লক্ষ্যে তেহরানের এই প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের প্রভাব ক্ষণস্থায়ী নাও হতে পারে। তদুপরি, এই প্রভাব সবখানে সমান নয়।
৯ ঘণ্টা আগে
প্রথম ২৮ দিনে সরকার দৃঢ়ভাবে প্রমাণ করতে চেয়েছে যে, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা দ্রুত ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগের মাধ্যমে পূর্ণরূপে বাস্তবায়িত হবে।
১২ ঘণ্টা আগে
ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। এই প্রণালিতে চলা যেকোনো জাহাজকেই ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলায় উড়িয়ে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে দেশটি। ইরানের এই হুমকি মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এক ধরনের পাল্টা আঘাত।
১৬ ঘণ্টা আগে
পুরো ঢাকা শহর ফাঁকা করে বাড়ি যাচ্ছে মানুষ। সেই দলে আমিও আছি। আসলে কত মানুষ বাড়ি যাচ্ছে এবার?
১ দিন আগে