স্বাস্থ্য খাতে নিয়োগ জনবলসংকটের সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে

সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

স্বাস্থ্য খাতে জনবল সংকট দীর্ঘদিনের। সংকট কাটাতে আগামী তিন মাসের মধ্যে ৪২ হাজার ৩৯০ জনবল নিয়োগের ঘোষণা গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রতি ১১ থেকে ১২ হাজার মানুষের বিপরীতে এখন একজন চিকিৎসক বা নার্সকে সেবা দিতে হয়। নতুন নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তাই প্রশ্নাতীত। তবে এই উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে নিয়োগ পাওয়া জনবল কোথায়, কীভাবে এবং কী ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দেবেন তার ওপরও।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকট বহুমাত্রিক। দীর্ঘদিনের বরাদ্দ স্বল্পতা, আবার বরাদ্দকৃত অর্থ যথাসময়ে ও কার্যকরভাবে ব্যয় করতে না পারা, প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্বলতা, দুর্নীতি-অনিয়ম, অবকাঠামো ও জনবলের মধ্যে অসামঞ্জস্য—সব মিলিয়েই এই সংকট তৈরি হয়েছে। বড় হাসপাতাল ও নতুন ভবন নির্মাণে বিনিয়োগ হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই অবকাঠামোকে কার্যকর রাখার মতো চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান, ওষুধ, যন্ত্রপাতি ও রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা যায়নি। তাই নতুন অবকাঠামোর সঙ্গে জনবল নিয়োগের সমন্বয় অত্যন্ত জরুরি।

এখানে সরকারের বর্তমান উদ্যোগটির একটি বড় সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্যতম বড় বৈষম্য শহর ও গ্রামের মধ্যে। নিয়োগের বড় অংশ যেন রাজধানী ও বড় শহরের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেন্দ্রীভূত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা হলো প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার তুলনামূলক অবহেলা। বড় হাসপাতাল যতই বাড়ানো হোক, রোগ প্রতিরোধ, টিকাদান, মাতৃ ও শিশুসেবা, পুষ্টি এবং ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণ শক্তিশালী না হলে হাসপাতালের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়বে। ফলে নতুন জনবলকে হাসপাতালের শয্যার অনুপাতের পাশাপাশি জনগণের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও স্থানীয় প্রয়োজনের ভিত্তিতেও বণ্টনে বিবেচনা করতে হবে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকারি হাসপাতালকে দালালমুক্ত করা, অবৈধ ক্লিনিক ও ভুয়া চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং চিকিৎসকদের কর্মস্থলে উপস্থিতি নিশ্চিত করার কথাও বলেছেন। এগুলো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সরকারি হাসপাতালের সেবা ব্যবস্থাকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে যাতে রোগী দালালের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য না হন। চিকিৎসকের উপস্থিতি যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি তাঁর কাজের পরিবেশ, নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত সহায়ক জনবল ও জবাবদিহিও নিশ্চিত করা দরকার।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অবশ্য অন্য জায়গায়—নতুন নিয়োগ ও বাড়তি বরাদ্দের ফল কীভাবে মাপা হবে? স্বাস্থ্য খাতে সমস্যাটি শুধু অর্থের স্বল্পতা নয়। অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কতটা কার্যকরভাবে ব্যয় হচ্ছে এবং সেই ব্যয়ের বিনিময়ে মানুষ কী সেবা পাচ্ছে—সেটিই আসল প্রশ্ন। তাই প্রতিটি নিয়োগ, প্রকল্প ও বরাদ্দের সঙ্গে পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা থাকা প্রয়োজন। কতজন রোগী সেবা পেলেন, অপেক্ষার সময় কতটা কমল, গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসক উপস্থিতি কতটা বাড়ল, সরকারি হাসপাতালে ওষুধের প্রাপ্যতা কতটা নিশ্চিত হলো কিংবা মানুষের নিজস্ব চিকিৎসা ব্যয় কতটা কমল—এসব সূচকেই সাফল্য বিচার করতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে জনবল নিয়োগ তাই যেন কেবল নিয়োগের সংখ্যায় আটকে না থাকে। প্রয়োজন জনবল, অর্থ, অবকাঠামো, ওষুধ, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহির সমন্বিত সংস্কার। রেকর্ড বরাদ্দ অর্থবহ হবে কখন? যখন তার প্রতিফলন মানুষের জীবনে দেখা যাবে। যখন চিকিৎসার জন্য মানুষকে নিঃস্ব হতে হবে না। যখন ভালো চিকিৎসার জন্য ঢাকামুখী হতে হবে না। স্বাস্থ্য খাতে যে কোন পদক্ষেপের সুফল পরিমাপ করতে হবে প্রধান মানদন্ড দিয়ে। আর সেই মানদন্ড হলো—বরাদ্দ টাকা ও জনবল দিয়ে মানুষ কতটা স্বাস্থ্যসেবা পেল।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত