খাদ্যপণ্যের বাজারে সংস্কার অপরিহার্য

প্রকাশ : ৩১ জুলাই ২০২৬, ২২: ০৪
সম্পাদকীয় প্রতীকী ছবি। স্ট্রিম গ্রাফিক

বাজারে যাওয়া মানুষ মাত্রই জানেন, দাম কেবল সংখ্যা নয়; সংসারের খরচের হিসাব। নিত্যপণ্যের দাম যখন সপ্তাহে সপ্তাহে বদলায়, তখন সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েন সীমিত আয়ের মানুষ। বাংলাদেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি চার-পাঁচ বছর ধরে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে আছে।

এই চাপ সবার জন্য সমান নয়। বিবিএসের গৃহস্থালি আয়-ব্যয় জরিপ বলছে, দরিদ্রতম পাঁচ শতাংশ পরিবার মোট ব্যয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ খাদ্যের জন্য খরচ করে, যেখানে সবচেয়ে ধনী পাঁচ শতাংশ পরিবারে এটা মাত্র ২৯ শতাংশের কাছাকাছি। নামমাত্র মজুরি বাড়লেও টানা মূল্যস্ফীতিতে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি। ফলে একই হারে খাদ্যমূল্য বাড়লে ধনী পরিবারের চেয়ে গরিব পরিবারে আঘাত অনেক বেশি।

কেন দাম এত বাড়ে, তা বোঝার জন্য সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেছে। চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, কাঁচামরিচ, বেগুন, ডিম, গরুর মাংস, মাছ ও মুরগি—এই দশটি নিত্যপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল অনুসরণ করে গবেষকরা ঢাকা বিভাগের দশটি বাজারে ৮২০ জন ব্যবসায়ী ও কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছেন। গবেষণায় উঠে এসেছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা। প্রথমত, দশটি পণ্যের ছয়টির ক্ষেত্রে খুচরা বিক্রেতারা মূলত শহুরে আড়তদারদের ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা কিছু নির্দিষ্ট মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে দামের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে। দ্বিতীয়ত, সরবরাহ শৃঙ্খল যত লম্বা; দামের বৃদ্ধি তত বেশি। আলুর ক্ষেত্রে এটা প্রায় ১১৬ শতাংশ; কাঁচামরিচেও অনেক বেশি। বিপরীতে ডিম, মুরগি, গরুর মাংস ও মাছের মতো তুলনামূলক ছোট শৃঙ্খলে দামের লাফ অনেকটা কম। তৃতীয়ত, খুচরা দাম বাড়লেই যে কৃষক লাভবান, তা সব ক্ষেত্রে সত্য নয়। খাদ্য ও পশুচিকিৎসা খরচ বাড়ায় মুরগি ও গরুর খামারিরা ঋণাত্মক নিট মুনাফার সম্মুখীন। অর্থাৎ ভোক্তা বেশি দাম দিলেও উৎপাদক সুফল পাচ্ছেন না। প্রায় সব দিক দিয়ে ভোক্তাই সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। আবার দায় নির্ধারণে প্রত্যেক পক্ষ তার ঠিক ওপরের দিকে আঙুল তোলে—খুচরা বিক্রেতা আড়তদারকে দোষ দেন; আড়তদার বেপারিকে, বেপারি কৃষককে। পারস্পরিক দোষারোপে প্রকৃত কাঠামোগত সমস্যা প্রায়ই আড়ালে চলে যায়।

গবেষণায় বলা হয়েছে, মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি মানেই দোষী প্রমাণ হওয়া নয়; বড় মুনাফার অর্থ সব সময় অন্যায্য মুনাফা নয়; বাজারে কিছু প্রতিষ্ঠানের প্রাধান্য মানেই যোগসাজশ প্রমাণ হওয়া নয়। পরিবহন, সংরক্ষণ, সংগ্রহ ও ঝুঁকি বহনের মতো সেবা মধ্যস্বত্বভোগীরা দিয়ে থাকেন। তাই সমাধান খোঁজার সময় গোটা ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে দোষারোপ ঠিক হবে না; বরং নজর দিতে হবে কাঠামোগত দুর্বলতায়।

এ অবস্থায় কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেসব পণ্যে দামের উল্লম্ফন বেশি; যেমন আলু, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ ও বেগুন, সেখানে সমবায় ও সংগ্রহ কেন্দ্রের মাধ্যমে উৎপাদক ও খুচরা বিক্রেতার মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো জরুরি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও প্রতিযোগিতা কমিশনকে সেই সব পাইকারি বাজারের ওপর বিশেষ নজর রাখতে হবে, যেখানে খুচরা বিক্রেতারা অল্পসংখ্যক আড়তদারের ওপর নির্ভরশীল। যোগসাজশের প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নিতে হবে; তবে ব্যবসাকে বাধাগ্রস্ত করে নয়। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে খামারমূল্য, পাইকারি ও খুচরা দামের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করতে হবে; যাতে কৃষক, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সবাই তা যাচাই করতে পারেন। পচনশীল পণ্যের বেলায় আধুনিক সংরক্ষণাগার ও পরিবহন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ালে ফসল-পরবর্তী ক্ষতি কমবে; সরবরাহেও স্থিতিশীলতা আসবে। মুরগি ও গরুর মাংসের ক্ষেত্রে খাদ্য ও পশুচিকিৎসা ব্যয় কমাতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন, যাতে প্রশাসনিকভাবে দাম বেঁধে না দিলেও উৎপাদন খরচ সহনীয় থাকে। আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি যত দিন এই রকম চাপে রাখছে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোকে, তত দিন ওএমএস ও লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি আরও কার্যকরভাবে চালিয়ে যেতে হবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত