ডা. এ এম শামীমের সাক্ষাৎকার
বিদেশে চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেন বাংলাদেশিরা। অথচ এই অর্থ দেশে থাকলে একটি গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো সম্ভব। দেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকট, চিকিৎসাসেবার মান, চিকিৎসা ব্যয়, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ ও আগামীর সম্ভাবনা নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম।
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম: দেশে চিকিৎসাসেবা নিয়ে রোগীদের মধ্যে একধরনের অসন্তুষ্টি রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে চিকিৎসা বাবদ। মূল সমস্যাটা কোথায়?
ডা. শামীম: স্বাস্থ্যখাতের সঙ্গে গার্মেন্টস শিল্প বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পার্থক্যটা বুঝতে হবে। একটা পোশাক একদেশে তৈরি করে আরেক দেশে পরা যায়। কিন্তু যার হার্ট অ্যাটাক হয় বা যে বড় রোগে পড়েন, তাঁর চিকিৎসা তো দেশেই হওয়া চাই। এই বোধটা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এখনো সেভাবে তৈরি হয়নি। সংকটের গোড়ায় আছে করনীতির চরম বৈষম্য।
প্রথম কথা হলো কর্পোরেট করের বিষয়। গার্মেন্টস খাতে এই কর মাত্র ১০ শতাংশ, কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ। অথচ স্বাস্থ্যখাতে তা প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ। এই করের হার যদি ১০ থেকে ২০ শতাংশে নামানো যেত, স্বাস্থ্যখাতে নতুন বিনিয়োগের ঢল নামত। এটা প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি দাবি।
দ্বিতীয় সমস্যাটা হলো সুবিধার ব্যাপ্তি নিয়ে। গত বছর সরকার একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে—৫০ বেডের বেশি হাসপাতালের মূলধনী যন্ত্রপাতিতে মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক। কিন্তু প্রাইমারি কেয়ার সেন্টার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও মিড-লেভেল হাসপাতালগুলোতে আগের মতোই ৩৭ থেকে ৪০ শতাংশ শুল্ক বহাল। অথচ এই ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যাই বেশি। দেশে আছে ১৫ থেকে ১৬ হাজার ছোট ক্লিনিক। আর বড় হাসপাতাল হয়তো মাত্র ২০০টি। তাই মূলধনী যন্ত্রপাতির ওপর কম শুল্কের সুবিধা সব স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।
তৃতীয় বিষয়টা আরও অদ্ভুত। একটা সিটি স্ক্যান মেশিন আমদানিতে হয়তো ১ থেকে ৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। কিন্তু যখন সেই মেশিনের টিউব নষ্ট হয়ে যায়, তখন সেটা আমদানিতে শুল্ক দিতে হয় ৪০ শতাংশ। একটি টিউবের দাম ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। তিন বছর রোগী দেখেও এত টাকা আসে না। শুল্ক-ট্যাক্স মিলিয়ে ৪৫ লাখ পড়লে মেশিন পড়েই থাকে, রোগীরা সেবা পান না। যন্ত্রাংশ ও স্পেয়ার পার্টসে শুল্ক ৩ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত।
চতুর্থত, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স বা এআইটি। স্বাস্থ্যখাতে এটা প্রায় ৫ শতাংশ। পরে ফেরত পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু সেই অর্থ ফেরত পেতে বছর পেরিয়ে যায়। এই সময়ে একটা হাসপাতালের কার্যকরী মূলধন আটকে থাকে। স্বাস্থ্যখাতে এআইটি পুরোপুরি তুলে দেওয়া উচিত। এ ছাড়া রিএজেন্ট, কিটস এবং রাসায়নিকে ভ্যাট, এআইটি ও আমদানি শুল্ক মিলিয়ে প্রায় ৩৭ শতাংশ কর দিতে হয়। এ খাত থেকে সরকার বছরে পায় হয়তো ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা। এই হার ১০ শতাংশে নামালে স্বাস্থ্যখাত অনেক উপকৃত হবে। আর রাজস্বের তেমন ক্ষতিও হবে না।
স্ট্রিম: আমাদের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ভালো করছে। এই খাতে কি নির্দিষ্ট কোনো শুল্ক বা নীতিগত বাধা রয়েছে? আর স্বাস্থ্যখাতের বার্ষিক বাজেটের ব্যবহার নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ডা. শামীম: আমাদের ওষুধ শিল্পের অর্জন সত্যিই গর্বের। মাত্র ২ শতাংশ ওষুধ আমদানি করতে হয়। বাকি সব দেশেই তৈরি। কিন্তু কিছু সূক্ষ্ম সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। ওষুধের রং বা কোটিং বিমান করে আনলে শুল্ক ২০ শতাংশ, জাহাজে আনলে মাত্র ৩ শতাংশ। এই পার্থক্যটা অযৌক্তিক।
আরেকটা বিষয় হলো ক্যাপসুল শেল। দেশে জিলাটিন ক্যাপসুল তৈরি হয় বলে বাইরে থেকে আনতে গেলে বেশি শুল্ক গুনতে হয়। কিন্তু আমরা এখন ভেজিটেবল ক্যাপসুল আমদানি করি। এটা নরম, রোগীদের গিলতে সহজ। অথচ এতেও জিলাটিনের মতো ২০ থেকে ৩০ শতাংশ শুল্ক বসানো আছে, কারণ নিয়ন্ত্রকেরা পার্থক্যটা ধরেননি। এই নির্দিষ্ট অসংগতিগুলো দূর করতে পারলে ওষুধ শিল্প আরও এগিয়ে যাবে।
বাজেটের প্রশ্নে বলব, গত বছর স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা। আমার অনুমান, এর প্রায় ৭০ শতাংশই অপচয় হয়। আমি কখনো বলব না যে বরাদ্দ এক লাখ কোটি টাকায় নিয়ে যান বা জিডিপির ৫ শতাংশ করুন। যা আছে তার সদ্ব্যবহার করুন। কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার করলেই স্বাস্থ্যখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
স্ট্রিম: গার্মেন্টসে ১০-১২ শতাংশ কর, আইটিতে বিশেষ সুবিধা—অথচ স্বাস্থ্যখাতে এতটা উদারতা নেই কেন? এখানে তো আইটির মতো বিশাল সম্ভাবনা আছে।
ডা. শামীম: এটা সম্পূর্ণ নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা। ভারত যখন বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধ রেখেছিল, তখন কিন্তু আমরাই সব চিকিৎসা সামলেছি। কোভিডের সময়ও দেশের হাসপাতালগুলোই বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছে। অথচ সরকার সেই মহামারিতে ২০ হাজার কোটি টাকার ভ্যাকসিন বিদেশ থেকে কিনেছে, যা দেশেই তৈরি করা সম্ভব ছিল।
স্বাস্থ্যখাত এখন শুধু সেবাখাত নয়, এটি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময় খাত। সিঙ্গাপুরে হার্টের অপারেশনে যেখানে ৫০ লাখ টাকা লাগে, সেটা আমরা দুই লাখ টাকায় করতে পারছি। স্টেন্ট বা রিএজেন্ট এখনো আমদানি করতে হয়। কিন্তু সরকার একটু প্রণোদনা দিলে ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার উপকরণ দেশেই তৈরি হবে। ডিজিডিএর অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন। কর্তৃপক্ষ যদি সত্যিকার অর্থে মনোযোগ দেয়, এই খাত রূপান্তরিত হবে।
স্ট্রিম: সরকার সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপির মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাত এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। এই মডেলে নীতি কেমন হওয়া উচিত?
ডা. শামীম: পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। তবে এখানে একটা বড় ভুল ধারণা আছে। অনেকে মনে করেন পিপিপি মানে এনজিওর সঙ্গে অংশীদারিত্ব। এনজিও হয়তো সচেতনতা বাড়াবে, শিক্ষা দেবে, ভ্যাকসিনের কথা বলবে। কিন্তু তারা অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন করে না, কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করে না, স্টেন্ট বসায় না। আমরা করি। পিপিপি হতে হবে সক্রিয় বেসরকারি স্বাস্থ্য উদ্যোগের সঙ্গে।
একটা হিসাব দিই। দেশে বেসরকারি খাতে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার বেড আছে, সরকারি আছে ১ লাখ। আমাদের ৪০ হাজার বেড সবসময় খালি পড়ে থাকে। সরকার এই বেডগুলো ভাড়া নিলে কী হয়? প্রতিটি বেড স্থাপনে গড়ে ২ কোটি টাকা ধরলে ৪০ হাজার বেডের মূল্য দাঁড়ায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। ভাড়া নিলে সেই অবকাঠামো সরকার একদিনেই পেয়ে যাবে, কোনো মূলধন ব্যয় ছাড়াই।
মূল্য নির্ধারণের বিষয়টাও সহজ। সরকারি হাসপাতালে একটি অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশনে যদি ২২ হাজার টাকা খরচ হয়, বেসরকারি হাসপাতালকে ১৪ হাজার টাকা দিন। ঢাকার বাইরে হয়তো ৫ হাজার, ঢাকায় ৩০ হাজার হবে। এটা অত্যন্ত কার্যকর একটি মডেল।
বর্তমানে বেসরকারি খাত ৬৬ শতাংশ সেবা দিচ্ছে, সরকারি দিচ্ছে ৩৪ শতাংশ। কিন্তু সেই ৩৪ শতাংশেও বিশাল ঘাটতি— হামে শিশু মারা যাচ্ছে, ভ্যাকসিন নেই, হাসপাতালে জায়গা নেই। ৪২ হাজার কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে যদি ১২ হাজার কোটি টাকার সেবা বেসরকারি খাত থেকে কেনা হয়, তাহলে সরকারের ৩ থেকে ৪ লাখ কোটি টাকার নতুন হাসপাতাল নির্মাণের দরকারই পড়বে না।
দেশে ১৭টি মেডিকেল কলেজের অবকাঠামো তৈরি হয়ে পড়ে আছে। ভেতরে যন্ত্রপাতি নেই বলে চালু হয়নি। এগুলো পিপিপি মডেলে দিয়ে দিন। বেসরকারি খাত যন্ত্রপাতি আনবে, জনবল নিয়োগ দেবে। রোগীর দুই টাকার টিকিট থাকবে, সন্ধ্যার পর হয়তো ২০ শতাংশ পেইং বেড থেকে সামান্য আয় হবে— এভাবেই টিকবে মডেলটা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের দুই-তৃতীয়াংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে করাতে হয়। এটা কেন হচ্ছে? সরকার তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিলে তারা অর্ধেক দামে করে দেবে। ভারতে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পে ৫ কোটি পরিবারের ২০ কোটি মানুষকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। তুরস্কেও একই মডেল। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপই স্বাস্থ্যখাত থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ।
স্ট্রিম: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে চার হাজার কোটি টাকার সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল প্রায় অব্যবহৃত পড়ে আছে। সেটা নিয়ে আপনার মন্তব্য?
ডা. শামীম: এটা সত্যিই একটা জাতীয় ট্র্যাজেডি। চার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো কার্যত অলস পড়ে থাকা মানে জনগণের করের অর্থের অপচয়। এটা পিপিপি মডেলে চালানো হোক। সরকারের পরিকল্পনাই ছিল ৭০ শতাংশ বিনামূল্যে, ৩০ শতাংশ অর্থের বিনিময়ে। ঠিক সেই মডেলেই বেসরকারি খাতকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া যায়। প্রাইভেট খাত সাবসিডি নিয়ে পরিচালনা করলেও হাসপাতালটি একইভাবে চলবে। রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে যে মডেলে সেরা সেবা মেলে, সেই পথেই হাঁটা উচিত।
স্ট্রিম: কোভিড-মহামারি বা সাম্প্রতিক ভারতীয় ভিসা সংকটের সময় বিদেশ যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। তখন দেশের হাসপাতালগুলো সব সামলেছে। বড় অভিযোগ শোনা যায়নি। সেই চাপ কীভাবে সামলালেন?
ডা. শামীম: সত্যি কথাটা হলো জটিল রোগ নিয়ে বিদেশে যান খুব কম মানুষ। বছরে যে এক লাখ রোগী বিদেশে যান, তার মধ্যে ৮০ হাজারই যান শুধু বিশেষজ্ঞ পরামর্শের জন্য—ওটা আমাদের চিকিৎসকরাও দিতে পারেন। আর আমাদের হাসপাতালে সবসময় ২৫ শতাংশ বেড খালি থাকে—পৃথিবীর সর্বত্রই তাই। তাই ওই অতিরিক্ত ২০ শতাংশ রোগী সামলানো আমাদের জন্য খুব কঠিন ছিল না।
তবুও আমরা জরুরি সেবা আরও শক্তিশালী করেছিলাম। যেখানে ২০টি ভেন্টিলেটর ছিল, সেখানে আরও ৩০টি আনলাম। নতুন বিনিয়োগ হলো। একটি রোগীকেও ফিরিয়ে দিইনি।
তুলনা করুন চীনের সঙ্গে—সেখানে কোনো রোগী গেলে সরকারি বিমান যায়, ফুলের মালায় অভ্যর্থনা হয়। আমাদের উদ্যোক্তাদের জন্য এই সমর্থন কোথায়? একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার করতে ১৮টি আলাদা লাইসেন্স লাগে। রপ্তানিমুখী শিল্পের মতো স্বাস্থ্যখাতেও ওয়ান-স্টপ সেবা চালু করা দরকার। আমরা চীন বা ভারতের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামব না— ওদের চিকিৎসা আমাদের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ গুণ বেশি দামি। কিন্তু আমাদের নিজস্ব সুযোগ বিশাল।
ট্রান্সপ্লান্টের প্রসঙ্গ বলি। দশ বছর আগে মিডিয়ায় ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে এত নেতিবাচক প্রচার হলো যে আমরা থামিয়ে দিতে বাধ্য হলাম। এখন বছরে ২০০ লিভার ট্রান্সপ্লান্ট আর ১ হাজার ২০০ কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের রোগী বিদেশে যান। সরকার এবং মিডিয়া যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায়, আমরা এই সেবা দেশেই দিতে পারব।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবাকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মনে করে সরকার নানা কর ও বিধিনিষেধ আরোপ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি কি ঠিক?
ডা. শামীম: ভারতে ম্যাক্স হসপিটাল, অ্যাপোলো—সবই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ভারত সরকার তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। কারণ তারা বোঝে মেডিকেল ট্যুরিজম বিদেশি মুদ্রা আনে। আমাদের দেশে কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষরাও অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির জন্য বিদেশে যান। অথচ এই চিকিৎসা আমরা এখানেই করতে পারি। বিশ বছর আগে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন সাহেব, অধ্যাপক বি. চৌধুরী এখানেই বড় চিকিৎসা নিতেন। গত ১০ থেকে ১৫ বছরে একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে যে ‘বড় চিকিৎসা মানেই বিদেশ’— এটা আমাদের স্বাস্থ্যখাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
স্ট্রিম: বেসরকারি হাসপাতালে মানুষের পকেট থেকে খরচ এখন ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এটা কমানোর উপায় কী? স্বাস্থ্যবিমা কি সমাধান হতে পারে?
ডা. শামীম: সমস্যার মূল হলো আমরা স্বাস্থ্যের জন্য কোনো বাজেট করি না। ঈদে কোরবানির জন্য ২৫ হাজার টাকা আছে, ডিসেম্বরে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য ৩০ হাজার আছে— কিন্তু যদি আজ রাস্তায় পড়ে যান এবং স্টেন্ট করতে হয়, পকেটে এক টাকাও নেই। এটা আমাদের সংস্কৃতির একটা বড় ত্রুটি।
আমার পরামর্শ হলো, কর্মজীবন শুরুর দিন থেকেই বেতনের ১ থেকে ৩ শতাংশ স্বাস্থ্যের জন্য একটি নির্দিষ্ট সঞ্চয়ে রাখুন। ১০ থেকে ১৫ বছর কাজ করলে হাতে কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা থাকত। একটি গুলেন-বারি সিন্ড্রোমের রোগীর ছয়টি ইনজেকশনে সাড়ে ছয় লাখ টাকা লাগে। এই টাকা দিলে রোগী দুদিনে বাড়ি যাবেন; না দিলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মারা যাবেন। কেউ এই টাকা দিয়ে দেবে না—বিমা কোম্পানি না, সরকার না, আত্মীয়স্বজনও না। নিজেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে।
স্বাস্থ্যবিমা প্রসঙ্গে বলব, এটা সমাধান নয়। আমেরিকায় বিমা কোম্পানিগুলো শোষণের হাতিয়ার হয়ে গেছে। যে ভেন্টোলিন ইনহেলার আমরা ২০০ টাকায় বিক্রি করি, আমেরিকায় সেটা ৩০ ডলারে বিক্রি হয়—বিমা কোম্পানির মধ্যবর্তিতার কারণে। সম্প্রতি একটি বীমা কোম্পানির সিইওকে গুলি করে হত্যা করা হলো—কারণ তিনি একজন রোগীর চিকিৎসা আটকে দিয়েছিলেন। এটা বিমার ব্যর্থতার চরম প্রতিফলন। আমরা একসময় স্বাস্থ্যবিমার পক্ষে ছিলাম; ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় দেখলাম, এটা আরও বড় সিন্ডিকেট তৈরি করে।
সমাধান হলো একটি জাতীয় সচেতনতা প্রচারণা। প্রতিটি পরিবার যেন স্বাস্থ্যের জন্য আলাদা বাজেট রাখে।
স্ট্রিম: ল্যাবএইড কীভাবে লাভজনকতা বজায় রেখে সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দিচ্ছে?
ডা. শামীম: আমরা মধ্যবিত্তের কথা মাথায় রেখে মূল্য ঠিক করি এবং মাস স্কেলে চিন্তা করি। ১০ জনের রক্তের শর্করা পরীক্ষা না করে ২০০ জনের পরীক্ষা করা, মাসে ২০টি বাইপাস সার্জারি না করে ১০০টি করা—এই বড় পরিসরেই খরচ কমে।
আমরা চিকিৎসকদের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির মডেলে কাজ করি। নির্দিষ্ট বেতনে হাসপাতাল টিকবে না; রাজস্ব ভাগাভাগিতে চিকিৎসক নিজেও প্রতিষ্ঠানের সাফল্যে আগ্রহী হন। প্রতিটি হাসপাতালের প্রথম পাঁচ বছর কঠিন। ইউনিকো, ইম্পেরিয়াল, ইম্পালস—প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মাসে তিন থেকে পাঁচ কোটি টাকা লোকসান করে শুরু করেছে। আমাদের ক্যানসার হাসপাতালও একই পথে হেঁটেছে; তিন বছরে ব্রেক ইভেনে যাওয়ার লক্ষ্য আছে।
স্ট্রিম: স্বাস্থ্যখাতে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে বাংলাদেশের প্রধান সুবিধা ও প্রতিবন্ধকতা কোথায়?
ডা. শামীম: বিদেশি বিনিয়োগে সরকারের ভূমিকা অপরিহার্য। চীন বাংলাদেশে একটি হাসপাতাল করতে চাইছে—রংপুরের একটি উপজেলায় তিন হাজার বেডের পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। এটা ব্যর্থ হবে, নিশ্চিত বলতে পারি। বিশাল কেন্দ্রীভূত হাসপাতাল এই দেশে কাজ করে না।
যদি চীন সেই পাঁচ হাজার কোটি টাকা ২০ জন বেসরকারি উদ্যোক্তার মাধ্যমে ২৫টি জেলায় ২৫টি হাসপাতাল করত, সেটা অনেক বেশি কার্যকর হতো। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল দেখুন—উত্তরায় ২০ বছর ধরে আছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ায় সেই সুন্দর হাসপাতাল প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগ আসবে তখনই, যখন সরকার রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে মানুষের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবে।
স্ট্রিম: চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎপাদনের অবস্থা কেমন?
ডা. শামীম: গজারিয়ার এপিআই পার্ক কার্যকর হয়নি। প্রতি বছর তিন হাজার কোটি টাকার সক্রিয় ওষুধ উপাদান আমদানি করতে হয়। পার্ক ব্যর্থ হওয়ার কারণ পরিকল্পনার ঘাটতি। ১০টি কোম্পানি যদি একই উপাদান তৈরি করে, কেউ তা কিনবে না। আর একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা ১০০ কোটি টাকায় হলেও একটি এপিআই কারখানায় ৫০০ থেকে ৮০০ কোটি লাগে— উচ্চ সুদে ব্যাংকঋণে এটা সম্ভব নয়।
উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বসুন, সুদের হার কমান, সরকারি নেতৃত্বে বিদেশি সিইওদের আনুন। মালয়েশিয়া এভাবেই শিল্প গড়েছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছেড়ে যারা প্রকৃতপক্ষে কাজ করছেন তাদের সঙ্গে নিয়ে এগোলে স্বাস্থ্যখাত রূপান্তরিত হবে।
স্ট্রিম: আগামী দশ বছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত কোথায় পৌঁছাবে বলে মনে করেন?
ডা. শামীম: ২০০০ সালে আমার মায়ের একটি অ্যাঞ্জিওগ্রামের জন্য আমরা ভারতে গিয়েছিলাম। পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল, পাঁচ দিন কাটাতে হয়েছিল। আজ আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন ৩০টি অ্যাঞ্জিওগ্রাম হচ্ছে। এটাই অগ্রগতির সাক্ষ্য। ২০৩৫ সালে দেখবেন লিভার ট্রান্সপ্লান্টও দেশেই হচ্ছে, লিভার আইসিইউও আছে।
তবে এটা দুটো স্তরে ভাগ করতে হবে। দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য সরকারকে পিপিপি মডেলে আসতে হবে। উচ্চমধ্যবিত্ত ও সচ্ছল মানুষের জন্য আগামী ১০ বছরে আমরা এমন সেবা দিতে পারব যে বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। সরকার এখনই পদক্ষেপ নিলে পাঁচ থেকে সাত কোটি দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
আমাদের ক্যানসার হাসপাতালে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এই মাসেই ১০টি অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করার পরিকল্পনা আছে—এই চিকিৎসায় বিদেশে ৫০ লাখ টাকা লাগে, আমরা করব আট লাখে। বছরে ১০০টি অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন আমাদের লক্ষ্য। আমরা আশাবাদী।
স্ট্রিম: সরকারি হাসপাতালের সেবার মান বাড়ানোর উপায় কী? নতুন মেডিকেল কলেজের মান নিয়েই বা আপনার মূল্যায়ন কী?
ডা. শামীম: প্রথম কথা, মানহীন মেডিকেল কলেজগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। যে কলেজে চিকিৎসক নেই, রোগী নেই, শিক্ষার পরিবেশ নেই—সেগুলো চালু রাখার কোনো কারণ নেই। তবে যারা সত্যিকারের মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান করতে চান, তাদের পথ আটকানো উচিত না।
আমাদের নিজেদের মেডিকেল কলেজ নেই। কিন্তু সারা বাংলাদেশে ৮০০ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আমাদের সঙ্গে কাজ করেন, ৮ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী আছেন, প্রতিদিন ১০ হাজার বহির্বিভাগ রোগী দেখা হয়। আমরা কলেজ করিনি কারণ নির্দিষ্ট মানের নিচে করতে রাজি ছিলাম না। এখন ব্র্যাক বা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের একটি আন্তর্জাতিক মেডিকেল কলেজ করার পরিকল্পনা আছে—অনুমতি পেলে এগিয়ে যাব।
সরকারি হাসপাতালের মান বাড়াতে ব্যবস্থাপনা পর্ষদে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যুক্ত করুন—অংশীদার হিসেবে নয়, বরং ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ হিসেবে। আমাদের মতো যারা ২৫-৩০ বছর এই খাতে আছেন, তারা সমস্যাগুলো ভেতর থেকে জানেন। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সচিবালয় দিয়ে এটা হবে না।
সবচেয়ে জরুরি হলো স্বাস্থ্যখাত থেকে রাজনীতি সরানো। পদায়ন, পদোন্নতি, পোস্টগ্র্যাজুয়েশন—সব যদি দলীয় বিবেচনায় হয়, তাহলে মান উঠবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্বাস্থ্যখাত থেকে রাজনীতি সরাবেন। এই প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে। কারণ এখানে মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
স্ট্রিম: দেশে নার্স ও ধাত্রী সংকট রয়েছে। এই সমস্যা কীভাবে মেটানো সম্ভব?
ডা. শামীম: বিশ বছর আগে আমরা হাসপাতাল শুরু করেছিলাম, তখন দক্ষ নার্স পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। এখন আমাদের নিজেদেরই দুটি নার্সিং কলেজ আছে। সারা দেশে বছরে তিন থেকে চার হাজার মানসম্পন্ন নার্স তৈরি হচ্ছে— এটা ১০ হাজারে নিয়ে যেতে হবে।
তবে বড় বাধা সামাজিক মনোভাব। আমাদের সমাজে নার্সিং পেশাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয় না। কেরালায় নিজে দেখেছি, একটি পরিবারের তিন বোন নার্স হওয়ায় সেই বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে মানুষ সম্মান জানায়। এই সাংস্কৃতিক পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না। তবে নার্সদের বেতন বাড়ছে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ হচ্ছে, বিদেশে যাওয়ার দরজা খুলছে। ধীরে ধীরে সমস্যাটা কমবে।
স্ট্রিম: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এখনই কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার?
ডা. শামীম: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার পথ একটাই—পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ। কিন্তু এখন যা হচ্ছে সেটা দেখে হতাশ লাগে। সোনারগাঁও হোটেলে সিম্পোজিয়াম হচ্ছে, আমলারা বসছেন, বুদ্ধিজীবীরা বক্তৃতা দিচ্ছেন—এতে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা হবে না।
যারা প্র্যাকটিক্যালি কাজ করছেন, মানে অনুশীলনকারী চিকিৎসক, ক্লিনিশিয়ান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপক, বেসরকারি উদ্যোক্তা—তাঁদের নিয়ে এগোতে হবে। না হলে ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ এনজিওদের প্রকল্প প্রস্তাবের কাগজেই আটকে থাকবে।
স্ট্রিম: স্বাস্থ্যখাতে নতুন উদ্যোক্তারা আসছেন না কেন? নতুন সরকারের প্রতি কী পরামর্শ?
ডা. শামীম: এই খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একটি হাসপাতাল মুনাফা করতে চার থেকে পাঁচ বছর লাগে, বিনিয়োগ বিশাল, সামাজিক ঝুঁকি আরও বড়। একজন তরুণ বিসিএস-পাস চিকিৎসককে এমন মার খেতে দেখেছি যে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছে। আমার নিজের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে, ইউনাইটেডের মালিকের বিরুদ্ধে হয়েছে। আকিজ সাহেব নিজে বলেছেন—সারাজীবন বিড়ি বিক্রি করলে কেউ কিছু বলেনি; হাসপাতাল করতে গিয়ে মামলার মুখে পড়লাম।
নতুন উদ্যোক্তারা হিসাব করছেন যে ট্রেডিং, খাদ্য শিল্প, ইলেকট্রনিকসে কম ঝুঁকিতে মুনাফা আসে। স্বাস্থ্যখাতে আসবেন না। ফলে নতুন হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ছে না, মানও উঠছে না। ভারতে অ্যাপোলো ৫০টি, ম্যাক্স ৩০টি, মনিপাল ৮০টি শাখায় পরিণত হয়েছে। আমরা ৫০০ বেডকে ১ হাজার করতেও ভয় পাচ্ছি।
নতুন সরকারের প্রতি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ: পিপিপিতে আসুন এবং যারা স্বাস্থ্যখাতে কাজ করছেন তাদের নিয়ে একটি নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করুন। শুধু সরকারি মানুষ দিয়ে ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ হবে না।
স্ট্রিম: স্বাস্থ্যখাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পেলে প্রথমেই কী করতেন?
ডা. শামীম: প্রথমেই পিপিপি বাস্তবায়ন করতাম। দেশে সাড়ে তিনশোর বেশি বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান খালি পড়ে আছে। সামান্য বিনিয়োগে এগুলো সচল করলে রাতারাতি ৩০ হাজার বেড পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, অপচয় বন্ধ করতাম। সরকারি হাসপাতালে এমআরআই, সিটি মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণে বছরে খরচ হয় মেশিনের মূল্যের ১০ শতাংশ। আমাদের বেলায় তা মাত্র ১ শতাংশ। শুধু এই একটি খাতে সরকারের বছরে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত যাচ্ছে। এই ধরনের ছোট ছোট সংস্কারেই বর্তমান সম্পদ দিয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি সেবা দেওয়া সম্ভব।
স্ট্রিম: সরকারের প্রতি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ কী?
ডা. শামীম: যারা প্র্যাকটিক্যালি কাজ করছেন তাদের ডাকুন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভালো মানুষ। কিন্তু স্বাস্থ্যখাতের ভেতরের সমস্যাগুলো তিনি হয়তো গভীরভাবে জানেন না। সচিব ভালো, কিন্তু আগে অন্য মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। আমরা ৩০ বছর ধরে এই খাতে আছি। কোনো ফি চাই না, কোনো অংশীদারিত্ব চাই না, কোনো অর্থ চাই না—শুধু ডাকুন।
বাংলাদেশে এমন ১০০ জন আছেন যারা স্বাস্থ্যখাত গভীরভাবে বোঝেন এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। তাঁদের একটি জাতীয় পরামর্শ পর্ষদে রাখুন। অন্তর্বর্তী সরকার এটা করেছিল— অনেক ভালো কাজ হয়েছিল।
হামের প্রকোপের কথা বলি। ২০২৩ সাল থেকে ভ্যাকসিন নেওয়া হয়নি বলেই এই সংকট। কোভিডের সময় আমাদের ডেকে পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল। জুম বৈঠকে বসে, মিলে সামলানো গিয়েছিল। হামেও তা হচ্ছে না। গাভির বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আর আমাদের মতো ব্যবস্থাপকদের নিয়ে একটি ২৪ ঘণ্টার জরুরি দল গঠন করুন। তাহলে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু ঠেকানো যাবে। আমরা কেউ কারো শত্রু নই। মানুষের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করাটাই একমাত্র লক্ষ্য।
স্ট্রিম: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
ডা. শামীম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

বিদেশে চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করেন বাংলাদেশিরা। অথচ এই অর্থ দেশে থাকলে একটি গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো সম্ভব। দেশের স্বাস্থ্য খাতের সংকট, চিকিৎসাসেবার মান, চিকিৎসা ব্যয়, পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ ও আগামীর সম্ভাবনা নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন ল্যাবএইড গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম।
স্ট্রিম: দেশে চিকিৎসাসেবা নিয়ে রোগীদের মধ্যে একধরনের অসন্তুষ্টি রয়েছে। প্রতি বছর প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে চিকিৎসা বাবদ। মূল সমস্যাটা কোথায়?
ডা. শামীম: স্বাস্থ্যখাতের সঙ্গে গার্মেন্টস শিল্প বা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের পার্থক্যটা বুঝতে হবে। একটা পোশাক একদেশে তৈরি করে আরেক দেশে পরা যায়। কিন্তু যার হার্ট অ্যাটাক হয় বা যে বড় রোগে পড়েন, তাঁর চিকিৎসা তো দেশেই হওয়া চাই। এই বোধটা নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এখনো সেভাবে তৈরি হয়নি। সংকটের গোড়ায় আছে করনীতির চরম বৈষম্য।
প্রথম কথা হলো কর্পোরেট করের বিষয়। গার্মেন্টস খাতে এই কর মাত্র ১০ শতাংশ, কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ। অথচ স্বাস্থ্যখাতে তা প্রায় সাড়ে ২৭ শতাংশ। এই করের হার যদি ১০ থেকে ২০ শতাংশে নামানো যেত, স্বাস্থ্যখাতে নতুন বিনিয়োগের ঢল নামত। এটা প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি দাবি।
দ্বিতীয় সমস্যাটা হলো সুবিধার ব্যাপ্তি নিয়ে। গত বছর সরকার একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ নিয়েছে—৫০ বেডের বেশি হাসপাতালের মূলধনী যন্ত্রপাতিতে মাত্র ১ থেকে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক। কিন্তু প্রাইমারি কেয়ার সেন্টার, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও মিড-লেভেল হাসপাতালগুলোতে আগের মতোই ৩৭ থেকে ৪০ শতাংশ শুল্ক বহাল। অথচ এই ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যাই বেশি। দেশে আছে ১৫ থেকে ১৬ হাজার ছোট ক্লিনিক। আর বড় হাসপাতাল হয়তো মাত্র ২০০টি। তাই মূলধনী যন্ত্রপাতির ওপর কম শুল্কের সুবিধা সব স্তরে ছড়িয়ে দেওয়া দরকার।
তৃতীয় বিষয়টা আরও অদ্ভুত। একটা সিটি স্ক্যান মেশিন আমদানিতে হয়তো ১ থেকে ৩ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। কিন্তু যখন সেই মেশিনের টিউব নষ্ট হয়ে যায়, তখন সেটা আমদানিতে শুল্ক দিতে হয় ৪০ শতাংশ। একটি টিউবের দাম ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। তিন বছর রোগী দেখেও এত টাকা আসে না। শুল্ক-ট্যাক্স মিলিয়ে ৪৫ লাখ পড়লে মেশিন পড়েই থাকে, রোগীরা সেবা পান না। যন্ত্রাংশ ও স্পেয়ার পার্টসে শুল্ক ৩ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা উচিত।
চতুর্থত, অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স বা এআইটি। স্বাস্থ্যখাতে এটা প্রায় ৫ শতাংশ। পরে ফেরত পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু সেই অর্থ ফেরত পেতে বছর পেরিয়ে যায়। এই সময়ে একটা হাসপাতালের কার্যকরী মূলধন আটকে থাকে। স্বাস্থ্যখাতে এআইটি পুরোপুরি তুলে দেওয়া উচিত। এ ছাড়া রিএজেন্ট, কিটস এবং রাসায়নিকে ভ্যাট, এআইটি ও আমদানি শুল্ক মিলিয়ে প্রায় ৩৭ শতাংশ কর দিতে হয়। এ খাত থেকে সরকার বছরে পায় হয়তো ৩০০ থেকে ৩৫০ কোটি টাকা। এই হার ১০ শতাংশে নামালে স্বাস্থ্যখাত অনেক উপকৃত হবে। আর রাজস্বের তেমন ক্ষতিও হবে না।
স্ট্রিম: আমাদের ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় ভালো করছে। এই খাতে কি নির্দিষ্ট কোনো শুল্ক বা নীতিগত বাধা রয়েছে? আর স্বাস্থ্যখাতের বার্ষিক বাজেটের ব্যবহার নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ডা. শামীম: আমাদের ওষুধ শিল্পের অর্জন সত্যিই গর্বের। মাত্র ২ শতাংশ ওষুধ আমদানি করতে হয়। বাকি সব দেশেই তৈরি। কিন্তু কিছু সূক্ষ্ম সমস্যা এখনো রয়ে গেছে। ওষুধের রং বা কোটিং বিমান করে আনলে শুল্ক ২০ শতাংশ, জাহাজে আনলে মাত্র ৩ শতাংশ। এই পার্থক্যটা অযৌক্তিক।
আরেকটা বিষয় হলো ক্যাপসুল শেল। দেশে জিলাটিন ক্যাপসুল তৈরি হয় বলে বাইরে থেকে আনতে গেলে বেশি শুল্ক গুনতে হয়। কিন্তু আমরা এখন ভেজিটেবল ক্যাপসুল আমদানি করি। এটা নরম, রোগীদের গিলতে সহজ। অথচ এতেও জিলাটিনের মতো ২০ থেকে ৩০ শতাংশ শুল্ক বসানো আছে, কারণ নিয়ন্ত্রকেরা পার্থক্যটা ধরেননি। এই নির্দিষ্ট অসংগতিগুলো দূর করতে পারলে ওষুধ শিল্প আরও এগিয়ে যাবে।
বাজেটের প্রশ্নে বলব, গত বছর স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ ছিল ৪২ হাজার কোটি টাকা। আমার অনুমান, এর প্রায় ৭০ শতাংশই অপচয় হয়। আমি কখনো বলব না যে বরাদ্দ এক লাখ কোটি টাকায় নিয়ে যান বা জিডিপির ৫ শতাংশ করুন। যা আছে তার সদ্ব্যবহার করুন। কয়েকটি সুনির্দিষ্ট সংস্কার করলেই স্বাস্থ্যখাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব।
স্ট্রিম: গার্মেন্টসে ১০-১২ শতাংশ কর, আইটিতে বিশেষ সুবিধা—অথচ স্বাস্থ্যখাতে এতটা উদারতা নেই কেন? এখানে তো আইটির মতো বিশাল সম্ভাবনা আছে।
ডা. শামীম: এটা সম্পূর্ণ নীতিনির্ধারণের ব্যর্থতা। ভারত যখন বাংলাদেশিদের ভিসা বন্ধ রেখেছিল, তখন কিন্তু আমরাই সব চিকিৎসা সামলেছি। কোভিডের সময়ও দেশের হাসপাতালগুলোই বাংলাদেশকে বাঁচিয়েছে। অথচ সরকার সেই মহামারিতে ২০ হাজার কোটি টাকার ভ্যাকসিন বিদেশ থেকে কিনেছে, যা দেশেই তৈরি করা সম্ভব ছিল।
স্বাস্থ্যখাত এখন শুধু সেবাখাত নয়, এটি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময় খাত। সিঙ্গাপুরে হার্টের অপারেশনে যেখানে ৫০ লাখ টাকা লাগে, সেটা আমরা দুই লাখ টাকায় করতে পারছি। স্টেন্ট বা রিএজেন্ট এখনো আমদানি করতে হয়। কিন্তু সরকার একটু প্রণোদনা দিলে ৮ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার উপকরণ দেশেই তৈরি হবে। ডিজিডিএর অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হন। কর্তৃপক্ষ যদি সত্যিকার অর্থে মনোযোগ দেয়, এই খাত রূপান্তরিত হবে।
স্ট্রিম: সরকার সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা পিপিপির মাধ্যমে স্বাস্থ্যখাত এগিয়ে নেওয়ার কথা বলছে। এই মডেলে নীতি কেমন হওয়া উচিত?
ডা. শামীম: পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ আমাদের দীর্ঘদিনের দাবি। তবে এখানে একটা বড় ভুল ধারণা আছে। অনেকে মনে করেন পিপিপি মানে এনজিওর সঙ্গে অংশীদারিত্ব। এনজিও হয়তো সচেতনতা বাড়াবে, শিক্ষা দেবে, ভ্যাকসিনের কথা বলবে। কিন্তু তারা অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশন করে না, কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করে না, স্টেন্ট বসায় না। আমরা করি। পিপিপি হতে হবে সক্রিয় বেসরকারি স্বাস্থ্য উদ্যোগের সঙ্গে।
একটা হিসাব দিই। দেশে বেসরকারি খাতে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার বেড আছে, সরকারি আছে ১ লাখ। আমাদের ৪০ হাজার বেড সবসময় খালি পড়ে থাকে। সরকার এই বেডগুলো ভাড়া নিলে কী হয়? প্রতিটি বেড স্থাপনে গড়ে ২ কোটি টাকা ধরলে ৪০ হাজার বেডের মূল্য দাঁড়ায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। ভাড়া নিলে সেই অবকাঠামো সরকার একদিনেই পেয়ে যাবে, কোনো মূলধন ব্যয় ছাড়াই।
মূল্য নির্ধারণের বিষয়টাও সহজ। সরকারি হাসপাতালে একটি অ্যাপেন্ডিসাইটিস অপারেশনে যদি ২২ হাজার টাকা খরচ হয়, বেসরকারি হাসপাতালকে ১৪ হাজার টাকা দিন। ঢাকার বাইরে হয়তো ৫ হাজার, ঢাকায় ৩০ হাজার হবে। এটা অত্যন্ত কার্যকর একটি মডেল।
বর্তমানে বেসরকারি খাত ৬৬ শতাংশ সেবা দিচ্ছে, সরকারি দিচ্ছে ৩৪ শতাংশ। কিন্তু সেই ৩৪ শতাংশেও বিশাল ঘাটতি— হামে শিশু মারা যাচ্ছে, ভ্যাকসিন নেই, হাসপাতালে জায়গা নেই। ৪২ হাজার কোটি টাকার বাজেটের মধ্যে যদি ১২ হাজার কোটি টাকার সেবা বেসরকারি খাত থেকে কেনা হয়, তাহলে সরকারের ৩ থেকে ৪ লাখ কোটি টাকার নতুন হাসপাতাল নির্মাণের দরকারই পড়বে না।
দেশে ১৭টি মেডিকেল কলেজের অবকাঠামো তৈরি হয়ে পড়ে আছে। ভেতরে যন্ত্রপাতি নেই বলে চালু হয়নি। এগুলো পিপিপি মডেলে দিয়ে দিন। বেসরকারি খাত যন্ত্রপাতি আনবে, জনবল নিয়োগ দেবে। রোগীর দুই টাকার টিকিট থাকবে, সন্ধ্যার পর হয়তো ২০ শতাংশ পেইং বেড থেকে সামান্য আয় হবে— এভাবেই টিকবে মডেলটা।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের দুই-তৃতীয়াংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বাইরের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে করাতে হয়। এটা কেন হচ্ছে? সরকার তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দিলে তারা অর্ধেক দামে করে দেবে। ভারতে ‘আয়ুষ্মান ভারত’ প্রকল্পে ৫ কোটি পরিবারের ২০ কোটি মানুষকে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হচ্ছে। তুরস্কেও একই মডেল। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপই স্বাস্থ্যখাত থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ।
স্ট্রিম: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে চার হাজার কোটি টাকার সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল প্রায় অব্যবহৃত পড়ে আছে। সেটা নিয়ে আপনার মন্তব্য?
ডা. শামীম: এটা সত্যিই একটা জাতীয় ট্র্যাজেডি। চার হাজার কোটি টাকার অবকাঠামো কার্যত অলস পড়ে থাকা মানে জনগণের করের অর্থের অপচয়। এটা পিপিপি মডেলে চালানো হোক। সরকারের পরিকল্পনাই ছিল ৭০ শতাংশ বিনামূল্যে, ৩০ শতাংশ অর্থের বিনিময়ে। ঠিক সেই মডেলেই বেসরকারি খাতকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া যায়। প্রাইভেট খাত সাবসিডি নিয়ে পরিচালনা করলেও হাসপাতালটি একইভাবে চলবে। রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে যে মডেলে সেরা সেবা মেলে, সেই পথেই হাঁটা উচিত।
স্ট্রিম: কোভিড-মহামারি বা সাম্প্রতিক ভারতীয় ভিসা সংকটের সময় বিদেশ যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। তখন দেশের হাসপাতালগুলো সব সামলেছে। বড় অভিযোগ শোনা যায়নি। সেই চাপ কীভাবে সামলালেন?
ডা. শামীম: সত্যি কথাটা হলো জটিল রোগ নিয়ে বিদেশে যান খুব কম মানুষ। বছরে যে এক লাখ রোগী বিদেশে যান, তার মধ্যে ৮০ হাজারই যান শুধু বিশেষজ্ঞ পরামর্শের জন্য—ওটা আমাদের চিকিৎসকরাও দিতে পারেন। আর আমাদের হাসপাতালে সবসময় ২৫ শতাংশ বেড খালি থাকে—পৃথিবীর সর্বত্রই তাই। তাই ওই অতিরিক্ত ২০ শতাংশ রোগী সামলানো আমাদের জন্য খুব কঠিন ছিল না।
তবুও আমরা জরুরি সেবা আরও শক্তিশালী করেছিলাম। যেখানে ২০টি ভেন্টিলেটর ছিল, সেখানে আরও ৩০টি আনলাম। নতুন বিনিয়োগ হলো। একটি রোগীকেও ফিরিয়ে দিইনি।
তুলনা করুন চীনের সঙ্গে—সেখানে কোনো রোগী গেলে সরকারি বিমান যায়, ফুলের মালায় অভ্যর্থনা হয়। আমাদের উদ্যোক্তাদের জন্য এই সমর্থন কোথায়? একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার করতে ১৮টি আলাদা লাইসেন্স লাগে। রপ্তানিমুখী শিল্পের মতো স্বাস্থ্যখাতেও ওয়ান-স্টপ সেবা চালু করা দরকার। আমরা চীন বা ভারতের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতায় নামব না— ওদের চিকিৎসা আমাদের চেয়ে ২০ থেকে ৩০ গুণ বেশি দামি। কিন্তু আমাদের নিজস্ব সুযোগ বিশাল।
ট্রান্সপ্লান্টের প্রসঙ্গ বলি। দশ বছর আগে মিডিয়ায় ট্রান্সপ্লান্ট নিয়ে এত নেতিবাচক প্রচার হলো যে আমরা থামিয়ে দিতে বাধ্য হলাম। এখন বছরে ২০০ লিভার ট্রান্সপ্লান্ট আর ১ হাজার ২০০ কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের রোগী বিদেশে যান। সরকার এবং মিডিয়া যদি আমাদের পাশে দাঁড়ায়, আমরা এই সেবা দেশেই দিতে পারব।
স্ট্রিম: বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবাকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান মনে করে সরকার নানা কর ও বিধিনিষেধ আরোপ করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি কি ঠিক?
ডা. শামীম: ভারতে ম্যাক্স হসপিটাল, অ্যাপোলো—সবই বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু ভারত সরকার তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। কারণ তারা বোঝে মেডিকেল ট্যুরিজম বিদেশি মুদ্রা আনে। আমাদের দেশে কিন্তু রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের মানুষরাও অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির জন্য বিদেশে যান। অথচ এই চিকিৎসা আমরা এখানেই করতে পারি। বিশ বছর আগে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন সাহেব, অধ্যাপক বি. চৌধুরী এখানেই বড় চিকিৎসা নিতেন। গত ১০ থেকে ১৫ বছরে একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে যে ‘বড় চিকিৎসা মানেই বিদেশ’— এটা আমাদের স্বাস্থ্যখাতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
স্ট্রিম: বেসরকারি হাসপাতালে মানুষের পকেট থেকে খরচ এখন ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এটা কমানোর উপায় কী? স্বাস্থ্যবিমা কি সমাধান হতে পারে?
ডা. শামীম: সমস্যার মূল হলো আমরা স্বাস্থ্যের জন্য কোনো বাজেট করি না। ঈদে কোরবানির জন্য ২৫ হাজার টাকা আছে, ডিসেম্বরে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য ৩০ হাজার আছে— কিন্তু যদি আজ রাস্তায় পড়ে যান এবং স্টেন্ট করতে হয়, পকেটে এক টাকাও নেই। এটা আমাদের সংস্কৃতির একটা বড় ত্রুটি।
আমার পরামর্শ হলো, কর্মজীবন শুরুর দিন থেকেই বেতনের ১ থেকে ৩ শতাংশ স্বাস্থ্যের জন্য একটি নির্দিষ্ট সঞ্চয়ে রাখুন। ১০ থেকে ১৫ বছর কাজ করলে হাতে কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা থাকত। একটি গুলেন-বারি সিন্ড্রোমের রোগীর ছয়টি ইনজেকশনে সাড়ে ছয় লাখ টাকা লাগে। এই টাকা দিলে রোগী দুদিনে বাড়ি যাবেন; না দিলে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মারা যাবেন। কেউ এই টাকা দিয়ে দেবে না—বিমা কোম্পানি না, সরকার না, আত্মীয়স্বজনও না। নিজেকেই প্রস্তুত থাকতে হবে।
স্বাস্থ্যবিমা প্রসঙ্গে বলব, এটা সমাধান নয়। আমেরিকায় বিমা কোম্পানিগুলো শোষণের হাতিয়ার হয়ে গেছে। যে ভেন্টোলিন ইনহেলার আমরা ২০০ টাকায় বিক্রি করি, আমেরিকায় সেটা ৩০ ডলারে বিক্রি হয়—বিমা কোম্পানির মধ্যবর্তিতার কারণে। সম্প্রতি একটি বীমা কোম্পানির সিইওকে গুলি করে হত্যা করা হলো—কারণ তিনি একজন রোগীর চিকিৎসা আটকে দিয়েছিলেন। এটা বিমার ব্যর্থতার চরম প্রতিফলন। আমরা একসময় স্বাস্থ্যবিমার পক্ষে ছিলাম; ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় দেখলাম, এটা আরও বড় সিন্ডিকেট তৈরি করে।
সমাধান হলো একটি জাতীয় সচেতনতা প্রচারণা। প্রতিটি পরিবার যেন স্বাস্থ্যের জন্য আলাদা বাজেট রাখে।
স্ট্রিম: ল্যাবএইড কীভাবে লাভজনকতা বজায় রেখে সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দিচ্ছে?
ডা. শামীম: আমরা মধ্যবিত্তের কথা মাথায় রেখে মূল্য ঠিক করি এবং মাস স্কেলে চিন্তা করি। ১০ জনের রক্তের শর্করা পরীক্ষা না করে ২০০ জনের পরীক্ষা করা, মাসে ২০টি বাইপাস সার্জারি না করে ১০০টি করা—এই বড় পরিসরেই খরচ কমে।
আমরা চিকিৎসকদের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির মডেলে কাজ করি। নির্দিষ্ট বেতনে হাসপাতাল টিকবে না; রাজস্ব ভাগাভাগিতে চিকিৎসক নিজেও প্রতিষ্ঠানের সাফল্যে আগ্রহী হন। প্রতিটি হাসপাতালের প্রথম পাঁচ বছর কঠিন। ইউনিকো, ইম্পেরিয়াল, ইম্পালস—প্রতিটি প্রতিষ্ঠান মাসে তিন থেকে পাঁচ কোটি টাকা লোকসান করে শুরু করেছে। আমাদের ক্যানসার হাসপাতালও একই পথে হেঁটেছে; তিন বছরে ব্রেক ইভেনে যাওয়ার লক্ষ্য আছে।
স্ট্রিম: স্বাস্থ্যখাতে বিদেশি বিনিয়োগ আনতে বাংলাদেশের প্রধান সুবিধা ও প্রতিবন্ধকতা কোথায়?
ডা. শামীম: বিদেশি বিনিয়োগে সরকারের ভূমিকা অপরিহার্য। চীন বাংলাদেশে একটি হাসপাতাল করতে চাইছে—রংপুরের একটি উপজেলায় তিন হাজার বেডের পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প। এটা ব্যর্থ হবে, নিশ্চিত বলতে পারি। বিশাল কেন্দ্রীভূত হাসপাতাল এই দেশে কাজ করে না।
যদি চীন সেই পাঁচ হাজার কোটি টাকা ২০ জন বেসরকারি উদ্যোক্তার মাধ্যমে ২৫টি জেলায় ২৫টি হাসপাতাল করত, সেটা অনেক বেশি কার্যকর হতো। কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল দেখুন—উত্তরায় ২০ বছর ধরে আছে। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ায় সেই সুন্দর হাসপাতাল প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগ আসবে তখনই, যখন সরকার রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে মানুষের স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেবে।
স্ট্রিম: চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধে আমদানিনির্ভরতা কমাতে দেশীয় উৎপাদনের অবস্থা কেমন?
ডা. শামীম: গজারিয়ার এপিআই পার্ক কার্যকর হয়নি। প্রতি বছর তিন হাজার কোটি টাকার সক্রিয় ওষুধ উপাদান আমদানি করতে হয়। পার্ক ব্যর্থ হওয়ার কারণ পরিকল্পনার ঘাটতি। ১০টি কোম্পানি যদি একই উপাদান তৈরি করে, কেউ তা কিনবে না। আর একটি ফার্মাসিউটিক্যাল কারখানা ১০০ কোটি টাকায় হলেও একটি এপিআই কারখানায় ৫০০ থেকে ৮০০ কোটি লাগে— উচ্চ সুদে ব্যাংকঋণে এটা সম্ভব নয়।
উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বসুন, সুদের হার কমান, সরকারি নেতৃত্বে বিদেশি সিইওদের আনুন। মালয়েশিয়া এভাবেই শিল্প গড়েছে। রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছেড়ে যারা প্রকৃতপক্ষে কাজ করছেন তাদের সঙ্গে নিয়ে এগোলে স্বাস্থ্যখাত রূপান্তরিত হবে।
স্ট্রিম: আগামী দশ বছরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাত কোথায় পৌঁছাবে বলে মনে করেন?
ডা. শামীম: ২০০০ সালে আমার মায়ের একটি অ্যাঞ্জিওগ্রামের জন্য আমরা ভারতে গিয়েছিলাম। পাঁচ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল, পাঁচ দিন কাটাতে হয়েছিল। আজ আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন ৩০টি অ্যাঞ্জিওগ্রাম হচ্ছে। এটাই অগ্রগতির সাক্ষ্য। ২০৩৫ সালে দেখবেন লিভার ট্রান্সপ্লান্টও দেশেই হচ্ছে, লিভার আইসিইউও আছে।
তবে এটা দুটো স্তরে ভাগ করতে হবে। দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্তের জন্য সরকারকে পিপিপি মডেলে আসতে হবে। উচ্চমধ্যবিত্ত ও সচ্ছল মানুষের জন্য আগামী ১০ বছরে আমরা এমন সেবা দিতে পারব যে বিদেশ যাওয়ার প্রয়োজন হবে না। সরকার এখনই পদক্ষেপ নিলে পাঁচ থেকে সাত কোটি দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব।
আমাদের ক্যানসার হাসপাতালে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। এই মাসেই ১০টি অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করার পরিকল্পনা আছে—এই চিকিৎসায় বিদেশে ৫০ লাখ টাকা লাগে, আমরা করব আট লাখে। বছরে ১০০টি অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন আমাদের লক্ষ্য। আমরা আশাবাদী।
স্ট্রিম: সরকারি হাসপাতালের সেবার মান বাড়ানোর উপায় কী? নতুন মেডিকেল কলেজের মান নিয়েই বা আপনার মূল্যায়ন কী?
ডা. শামীম: প্রথম কথা, মানহীন মেডিকেল কলেজগুলো বন্ধ করে দিতে হবে। যে কলেজে চিকিৎসক নেই, রোগী নেই, শিক্ষার পরিবেশ নেই—সেগুলো চালু রাখার কোনো কারণ নেই। তবে যারা সত্যিকারের মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান করতে চান, তাদের পথ আটকানো উচিত না।
আমাদের নিজেদের মেডিকেল কলেজ নেই। কিন্তু সারা বাংলাদেশে ৮০০ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আমাদের সঙ্গে কাজ করেন, ৮ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী আছেন, প্রতিদিন ১০ হাজার বহির্বিভাগ রোগী দেখা হয়। আমরা কলেজ করিনি কারণ নির্দিষ্ট মানের নিচে করতে রাজি ছিলাম না। এখন ব্র্যাক বা নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের একটি আন্তর্জাতিক মেডিকেল কলেজ করার পরিকল্পনা আছে—অনুমতি পেলে এগিয়ে যাব।
সরকারি হাসপাতালের মান বাড়াতে ব্যবস্থাপনা পর্ষদে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের যুক্ত করুন—অংশীদার হিসেবে নয়, বরং ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ হিসেবে। আমাদের মতো যারা ২৫-৩০ বছর এই খাতে আছেন, তারা সমস্যাগুলো ভেতর থেকে জানেন। শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা সচিবালয় দিয়ে এটা হবে না।
সবচেয়ে জরুরি হলো স্বাস্থ্যখাত থেকে রাজনীতি সরানো। পদায়ন, পদোন্নতি, পোস্টগ্র্যাজুয়েশন—সব যদি দলীয় বিবেচনায় হয়, তাহলে মান উঠবে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্বাস্থ্যখাত থেকে রাজনীতি সরাবেন। এই প্রতিশ্রুতি রাখতে হবে। কারণ এখানে মানুষের জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।
স্ট্রিম: দেশে নার্স ও ধাত্রী সংকট রয়েছে। এই সমস্যা কীভাবে মেটানো সম্ভব?
ডা. শামীম: বিশ বছর আগে আমরা হাসপাতাল শুরু করেছিলাম, তখন দক্ষ নার্স পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। এখন আমাদের নিজেদেরই দুটি নার্সিং কলেজ আছে। সারা দেশে বছরে তিন থেকে চার হাজার মানসম্পন্ন নার্স তৈরি হচ্ছে— এটা ১০ হাজারে নিয়ে যেতে হবে।
তবে বড় বাধা সামাজিক মনোভাব। আমাদের সমাজে নার্সিং পেশাকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেওয়া হয় না। কেরালায় নিজে দেখেছি, একটি পরিবারের তিন বোন নার্স হওয়ায় সেই বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে মানুষ সম্মান জানায়। এই সাংস্কৃতিক পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না। তবে নার্সদের বেতন বাড়ছে, উচ্চশিক্ষার সুযোগ হচ্ছে, বিদেশে যাওয়ার দরজা খুলছে। ধীরে ধীরে সমস্যাটা কমবে।
স্ট্রিম: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এখনই কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার?
ডা. শামীম: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার পথ একটাই—পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ। কিন্তু এখন যা হচ্ছে সেটা দেখে হতাশ লাগে। সোনারগাঁও হোটেলে সিম্পোজিয়াম হচ্ছে, আমলারা বসছেন, বুদ্ধিজীবীরা বক্তৃতা দিচ্ছেন—এতে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা হবে না।
যারা প্র্যাকটিক্যালি কাজ করছেন, মানে অনুশীলনকারী চিকিৎসক, ক্লিনিশিয়ান, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, হাসপাতাল ব্যবস্থাপক, বেসরকারি উদ্যোক্তা—তাঁদের নিয়ে এগোতে হবে। না হলে ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ এনজিওদের প্রকল্প প্রস্তাবের কাগজেই আটকে থাকবে।
স্ট্রিম: স্বাস্থ্যখাতে নতুন উদ্যোক্তারা আসছেন না কেন? নতুন সরকারের প্রতি কী পরামর্শ?
ডা. শামীম: এই খাতে বিনিয়োগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। একটি হাসপাতাল মুনাফা করতে চার থেকে পাঁচ বছর লাগে, বিনিয়োগ বিশাল, সামাজিক ঝুঁকি আরও বড়। একজন তরুণ বিসিএস-পাস চিকিৎসককে এমন মার খেতে দেখেছি যে সারাজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছে। আমার নিজের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছে, ইউনাইটেডের মালিকের বিরুদ্ধে হয়েছে। আকিজ সাহেব নিজে বলেছেন—সারাজীবন বিড়ি বিক্রি করলে কেউ কিছু বলেনি; হাসপাতাল করতে গিয়ে মামলার মুখে পড়লাম।
নতুন উদ্যোক্তারা হিসাব করছেন যে ট্রেডিং, খাদ্য শিল্প, ইলেকট্রনিকসে কম ঝুঁকিতে মুনাফা আসে। স্বাস্থ্যখাতে আসবেন না। ফলে নতুন হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ছে না, মানও উঠছে না। ভারতে অ্যাপোলো ৫০টি, ম্যাক্স ৩০টি, মনিপাল ৮০টি শাখায় পরিণত হয়েছে। আমরা ৫০০ বেডকে ১ হাজার করতেও ভয় পাচ্ছি।
নতুন সরকারের প্রতি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ: পিপিপিতে আসুন এবং যারা স্বাস্থ্যখাতে কাজ করছেন তাদের নিয়ে একটি নতুন ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করুন। শুধু সরকারি মানুষ দিয়ে ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ হবে না।
স্ট্রিম: স্বাস্থ্যখাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা পেলে প্রথমেই কী করতেন?
ডা. শামীম: প্রথমেই পিপিপি বাস্তবায়ন করতাম। দেশে সাড়ে তিনশোর বেশি বড় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান খালি পড়ে আছে। সামান্য বিনিয়োগে এগুলো সচল করলে রাতারাতি ৩০ হাজার বেড পাওয়া যায়।
দ্বিতীয়ত, অপচয় বন্ধ করতাম। সরকারি হাসপাতালে এমআরআই, সিটি মেশিনের রক্ষণাবেক্ষণে বছরে খরচ হয় মেশিনের মূল্যের ১০ শতাংশ। আমাদের বেলায় তা মাত্র ১ শতাংশ। শুধু এই একটি খাতে সরকারের বছরে ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত যাচ্ছে। এই ধরনের ছোট ছোট সংস্কারেই বর্তমান সম্পদ দিয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি সেবা দেওয়া সম্ভব।
স্ট্রিম: সরকারের প্রতি সুনির্দিষ্ট পরামর্শ কী?
ডা. শামীম: যারা প্র্যাকটিক্যালি কাজ করছেন তাদের ডাকুন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ভালো মানুষ। কিন্তু স্বাস্থ্যখাতের ভেতরের সমস্যাগুলো তিনি হয়তো গভীরভাবে জানেন না। সচিব ভালো, কিন্তু আগে অন্য মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। আমরা ৩০ বছর ধরে এই খাতে আছি। কোনো ফি চাই না, কোনো অংশীদারিত্ব চাই না, কোনো অর্থ চাই না—শুধু ডাকুন।
বাংলাদেশে এমন ১০০ জন আছেন যারা স্বাস্থ্যখাত গভীরভাবে বোঝেন এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। তাঁদের একটি জাতীয় পরামর্শ পর্ষদে রাখুন। অন্তর্বর্তী সরকার এটা করেছিল— অনেক ভালো কাজ হয়েছিল।
হামের প্রকোপের কথা বলি। ২০২৩ সাল থেকে ভ্যাকসিন নেওয়া হয়নি বলেই এই সংকট। কোভিডের সময় আমাদের ডেকে পরামর্শ নেওয়া হয়েছিল। জুম বৈঠকে বসে, মিলে সামলানো গিয়েছিল। হামেও তা হচ্ছে না। গাভির বিশেষজ্ঞ, শিশু বিশেষজ্ঞ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আর আমাদের মতো ব্যবস্থাপকদের নিয়ে একটি ২৪ ঘণ্টার জরুরি দল গঠন করুন। তাহলে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু ঠেকানো যাবে। আমরা কেউ কারো শত্রু নই। মানুষের কল্যাণে একসঙ্গে কাজ করাটাই একমাত্র লক্ষ্য।
স্ট্রিম: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
ডা. শামীম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

গত সাত দিনের সংবাদপত্রের পাতা উল্টে দেখুন। এমন একটি দিনও কি গেছে, যেদিন শিশু বা নারী ধর্ষণের খবর আপনার চোখে পড়েনি? উত্তরটা অবধারিতভাবেই ‘না’। দেশে যখন ধর্ষণের এক ভয়াবহ মহামারি চলছে, তখন মেহেরপুরের একটি খবর আমাদের কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।
৩ ঘণ্টা আগে
বর্তমান বাংলাদেশে সংঘটিত অমানবিক সহিংস ঘটনাগুলোর প্রতিক্রিয়ায় অতি-ডানপন্থী চিন্তক ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো ‘প্রকাশ্যে শাস্তি’র দাবি উত্থাপন করছে। এটি কেবল অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ভাষা হিসেবে সামনে আসছে না। বরং ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, নৈতিক আধিপত্য তৈরি, সামাজিক নিয়ন্ত্রণের বিস্তার কৌশল হিসেবেও কাজ করছে।
১ দিন আগে
একটি রাজনৈতিক দল, যার লোগো কোনো ফুল, হাত বা সাইকেল নয়—বরং একটি ‘তেলাপোকো’। যার স্লোগান হলো—‘ভয়েস অব দ্য লেজি অ্যান্ড আনএমপ্লয়েড’। শুনতে অদ্ভুত ও অবিশ্বাস্য মনে হলেও প্রথাগত রাজনীতির চেনা ছক ও প্রচলিত প্রতীকের বাইরে গিয়ে ভারতের বুকে জন্ম নিয়েছে এক নতুন ধারার ইন্টারনেট বিপ্লব।
১ দিন আগে
একটা পিকআপ ভ্যানের পেছনে গাদাগাদি করে মানুষ উঠছে। একজন আরেকজনকে টেনে তুলছে। কয়েকজন উঠে পড়েছে এরইমধ্যে। কেউ ঝুলছে পেছনের রড ধরে। পাশেই এক তরুণী (দেখে মনে হলো গার্মেন্টসকর্মী) তাঁর বৃদ্ধা মাকে বলছিলেন, ‘মা, আর গাড়ি পাইমু না। এইডাতেই উইঠা পড়ো।’
১ দিন আগে