জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ

পড়াশোনার সেরা সময়টাই নষ্ট হচ্ছে, শিক্ষাবর্ষ সেপ্টেম্বর থেকে জুন করা উচিত

ড. মনজুর আহমেদ একজন শিক্ষাবিদ ও নীতি বিশ্লেষক। বর্তমানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। তিনি বাংলাদেশে শিক্ষা সংস্কারে অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচিত। ২০২৪-২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সংস্কার কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা, কোচিং-নির্ভরতা, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং শিক্ষাবর্ষ পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে ঢাকা স্ট্রিমের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬, ১৮: ২৩
অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ

স্ট্রিম: অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আপনি দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন—একটি প্রাথমিক শিক্ষার জন্য, অন্যটি মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য। এই দুটি কমিটিতে কাজ করতে গিয়ে আপনি বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার কী অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন?

মনজুর আহমেদ: হ্যাঁ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিদ্যালয় শিক্ষার এই দুটি স্তর—প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক—নিয়ে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। তৎকালীন সরকারের দুজন উপদেষ্টা এ বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন এবং তারাই কমিটিগুলো গঠন করে দিয়েছিলেন। প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ক কমিটি বছরখানেক আগে এবং মাধ্যমিক শিক্ষা বিষয়ক কমিটি তাদের কার্যকালের শেষের দিকে গঠিত হয়।

আমাদের মনে প্রশ্ন ছিল যে, এই কমিটিগুলোর সুপারিশ কতটা কার্যকর হবে। উত্তরে তারা বলেছিলেন, "অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হিসেবে আমরা হয়তো বড় কোনো সংস্কার করতে পারব না। কিন্তু শিক্ষার সমস্যাগুলো নিয়ে জনমনে যে অসন্তোষ ও সংস্কারের প্রত্যাশা রয়েছে, তা আমরা জানি। আমরা চাই অন্তত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কিছু সুপারিশের মাধ্যমে কাজটি এগিয়ে রাখতে, যাতে পরবর্তী সরকার এসে এর ওপর ভিত্তি করে কাজ করতে পারে।" এই উদ্দেশ্যেই আমরা কাজ শুরু করি।

কমিটির সবাই খুব আগ্রহের সঙ্গে কাজ করেছেন। প্রতিটি কমিটির জন্য আমাদের প্রায় তিন মাস করে সময় দেওয়া হয়েছিল, এবং আমরা সেই সময়কে ভালোভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছি, প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্কুল পরিদর্শন করেছি। এমনকি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা বা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতেও আমরা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি।

সার্বিকভাবে আমরা যা দেখলাম, তা হলো—প্রাথমিক ও মাধ্যমিক, উভয় পর্যায়েই সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা মোটেই গ্রহণযোগ্য বা সন্তোষজনক নয়। প্রাথমিকে প্রায় পুরোটাই সরকারি দায়িত্বে পরিচালিত হয়। মাধ্যমিকে সরকারি স্কুলের সংখ্যা কম হলেও এমপিওভুক্ত স্কুলগুলো মূলত সরকারি অর্থায়নেই চলে। কিন্তু এই প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাকার্যক্রম অত্যন্ত দুর্বল।

স্ট্রিম: এই যে বললেন, শিক্ষাব্যবস্থার অবস্থা সন্তোষজনক নয়, ঠিক কোন কোন ক্ষেত্রে সমস্যাগুলো আপনার কাছে সবচেয়ে প্রকট মনে হয়েছে?

মনজুর আহমেদ: মূল সমস্যা হলো, বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণিকক্ষে ঠিকমতো লেখাপড়া হয় না। শিক্ষার্থীরা ক্লাসে থাকতে চায় না, কারণ তারা মনে করে বিদ্যালয়ে এসে কোনো লাভ হচ্ছে না। শিক্ষকরা হয়তো আসেন, কিন্তু প্রায়ই দেরি করে আসেন। এলেও প্রতিটি ক্লাস গতানুগতিক ৩৫-৪০ মিনিটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। পাঠক্রম অনুযায়ী ওপর থেকে যা যা পড়াতে বলা হয়, তারা এসে বক্তৃতা দেওয়ার মতো করে তা শেষ করে চলে যান। শিক্ষার্থীরা কিছু শিখল কি না, তা দেখার বা বোঝার মতো সময় বা সুযোগ কোনোটিই তাদের থাকে না। অনেক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা এত বেশি যে এটা সম্ভবও নয়। আবার যেখানে শিক্ষার্থী কম, সেখানেও শিক্ষকদের নিজেদের প্রস্তুতি, যোগ্যতা বা দক্ষতার অভাব পরিলক্ষিত হয়। ফলে শ্রেণিকক্ষে প্রায়ই যথেষ্ট সংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত থাকে না।

অধিকাংশ শিক্ষার্থীই তেমন কিছু না শিখে শুধু মুখস্থ করে কিছু গতানুগতিক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পরীক্ষায় পাস করছে। আমরা বছরের পর বছর ধরে ৮০-৯০ শতাংশ পাসের হার দেখে আসছি, কিন্তু শিক্ষার্থীরা আদতে কিছুই শিখছে না। এর প্রমাণও মিলেছে। যেমন, গত বছর পরীক্ষা কিছুটা নিয়ম মেনে নেওয়ার চেষ্টা করতেই পাসের হার অনেকটা কমে আসে। এটিই প্রমাণ করে যে শেখার প্রক্রিয়াটি কতটা অন্তঃসারশূন্য।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে আমরা যা বুঝেছি, তারা মনে করে কোচিং সেন্টার বা প্রাইভেট টিউটরের কাছে গেলে গাইড বই মুখস্থ করে পরীক্ষায় পাস করা সহজ। অভিভাবকরাও বাস্তবতা বুঝে গেছেন এবং তারাও সেভাবেই চিন্তা করেন। সামগ্রিক চিত্রটা দাঁড়িয়েছে এমন যে, বিদ্যালয়ে কার্যকর কিছুই হচ্ছে না। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউটর আর গাইড বইয়ের দিকে ঝুঁকছে।

স্ট্রিম: এই কোচিং-নির্ভরতা এবং বিদ্যালয়ে পাঠদান না হওয়ার ফলে শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ক্ষেত্রে কী ধরনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন?

মনজুর আহমেদ: এর ফলে দুটি বড় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। প্রথমত, শিক্ষার্থীরা গাইড বই মুখস্থ করে কেবল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, কিন্তু তাদের প্রকৃত জ্ঞানার্জন হচ্ছে না। তারা আসলে কিছুই শিখছে না। দ্বিতীয়ত, কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউটর ও গাইড বইয়ের পেছনে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। যে পরিবারগুলো এই ব্যয় বহন করতে পারে, তারা তাদের সন্তানদের সেখানে পাঠাতে পারছে। কিন্তু বাকিদের পক্ষে তা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে সমাজে একটি বড় ধরনের শিক্ষাবৈষম্য তৈরি হচ্ছে।

দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ শিক্ষার্থীই তেমন কিছু না শিখে শুধু মুখস্থ করে কিছু গতানুগতিক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে পরীক্ষায় পাস করছে। আমরা বছরের পর বছর ধরে ৮০-৯০ শতাংশ পাসের হার দেখে আসছি, কিন্তু শিক্ষার্থীরা আদতে কিছুই শিখছে না। এর প্রমাণও মিলেছে। যেমন, গত বছর পরীক্ষা কিছুটা নিয়ম মেনে নেওয়ার চেষ্টা করতেই পাসের হার অনেকটা কমে আসে। এটিই প্রমাণ করে যে শেখার প্রক্রিয়াটি কতটা অন্তঃসারশূন্য।

এছাড়াও, বিভিন্ন গবেষণা ও স্যাম্পল সার্ভের মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে যে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন করা হয়েছে, তাতে দেখা গেছে—পঞ্চম শ্রেণি পাস করা অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী ঠিকমতো বাংলা পড়তে বা লিখতে পারে না। গণিতের চারটি মৌলিক নিয়ম—যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ—তারা আয়ত্ত করতে পারেনি। এটাই এখনকার সামগ্রিক বাস্তবতা। দুঃখজনক হলো, এই অগ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা কর্তৃপক্ষের মধ্যে—সেটি মাঠ পর্যায়েই হোক বা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে—তেমন কোনো উদ্বেগ বা চিন্তাভাবনা আমাদের চোখে পড়েনি। এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।

স্ট্রিম: আপনি একটি বিরল অভিজ্ঞতার অধিকারী, কারণ আপনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক—উভয় স্তরের শিক্ষা কমিটিরই নেতৃত্বে ছিলেন। আপনার পর্যবেক্ষণে এই দুটি স্তরের সমস্যাগুলোর মধ্যে কী কী মিল বা অমিল রয়েছে?

মনজুর আহমেদ: আমি সবসময় বলি যে, বিদ্যালয় শিক্ষাকে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত। ১৯৯০ সালে প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। এর আগে ১৯৭৪ সালের কুদরত-এ-খুদা কমিশন দশ বছরের মধ্যে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছিল, কিন্তু তা বাস্তবায়িত হয়নি। আমরা প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছি বটে, কিন্তু তা মূলত ভর্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে এলেও সবাই টিকে থাকছে না এবং যারা থাকছে, তারাও সঠিকভাবে শিখছে না।

এখন ২০২৫ সাল চলে এসেছে। আমাদের উচিত বিদ্যালয় শিক্ষাকে সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করা, যাতে সবাই এর সুফল পায়। কিন্তু সে সংক্রান্ত কোনো পরিকল্পনা নেই। এসডিজি-৪ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে সকলের জন্য মাধ্যমিক পর্যন্ত সর্বজনীন ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে আমরা আন্তর্জাতিকভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনেরও কোনো পরিকল্পনা চোখে পড়ছে না। তাই আপনার প্রশ্নের উত্তরে বলব, বিদ্যালয় শিক্ষাকে সামগ্রিকভাবেই দেখতে হবে।

স্ট্রিম: আপনি শুরুতে বলেছিলেন এই দুই স্তরের মধ্যে কিছু অমিল বা তফাৎও রয়েছে। কাঠামোগত বা পাঠদানের দিক থেকে সেই পার্থক্যগুলো আসলে কোথায়?

মনজুর আহমেদ: প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের (ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে ধরলে) মধ্যে একটি বড় তফাৎ রয়েছে। প্রাথমিকের মূল লক্ষ্য হলো সাক্ষরতা (লিটারেসি) এবং গাণিতিক সাক্ষরতা (নিউমারেসি) অর্জন করানো। এটিই শিক্ষার ভিত্তি। 'শিখতে শেখা' বা 'পড়তে শেখা' -এর মতো মৌলিক দক্ষতাগুলো এখান থেকেই আসে। এই ভিত্তি তৈরি না হলে পরবর্তী পর্যায়ের শিক্ষা অর্থহীন হয়ে পড়ে। অথচ আমরা এই ভিত্তিমূলক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছি। প্রাথমিকে আমরা ছয়-সাতটি বিষয় পড়াই এবং সবগুলোকে সমান গুরুত্ব দিই, কিন্তু মূল দক্ষতার ওপর যে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন, সেই স্বীকৃতিটিই পুরোপুরি অনুপস্থিত।

পঞ্চম শ্রেণি পাস করা অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষার্থী ঠিকমতো বাংলা পড়তে বা লিখতে পারে না। গণিতের চারটি মৌলিক নিয়ম—যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ—তারা আয়ত্ত করতে পারেনি। এটাই এখনকার সামগ্রিক বাস্তবতা। দুঃখজনক হলো, এই অগ্রহণযোগ্য পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য শিক্ষা কর্তৃপক্ষের মধ্যে—সেটি মাঠ পর্যায়েই হোক বা কেন্দ্রীয় পর্যায়ে—তেমন কোনো উদ্বেগ বা চিন্তাভাবনা আমাদের চোখে পড়েনি।

অন্যদিকে, মাধ্যমিকে গিয়ে বিষয়ভিত্তিক পাঠদান শুরু হয়। সেখানে বিজ্ঞান, সমাজপাঠ, উচ্চতর গণিত, ইংরেজি ইত্যাদি বিষয় আসে। তখন বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক এবং সে অনুযায়ী পাঠ-পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন প্রয়োজন। প্রাথমিকের মূল্যায়ন হওয়া উচিত মূলত সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতার ওপর, অন্যান্য বিষয় সেখানে তুলনামূলকভাবে কম জরুরি। এই কাঠামোগত পার্থক্যটি পাঠদানের ক্ষেত্রে স্বীকার করে নিতে হবে।

তবে শিক্ষাকে সর্বজনীন করতে চাইলে এর ব্যবস্থাপনাকে সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে এবং একটি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। প্রতিটি এলাকায় মানসম্মত বিদ্যালয় থাকতে হবে। এখনকার মতো লটারি করে ভালো স্কুলে ভর্তির জন্য ছোটাছুটি করার যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

স্ট্রিম: আপনার কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ছিল প্রি-প্রাইমারি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি মন্ত্রণালয় বা কর্তৃপক্ষের অধীনে নিয়ে আসা। বর্তমান ব্যবস্থার প্রধান সমস্যা কোথায় এবং এই পরিবর্তন আনা হলে কী সুবিধা হবে?

মনজুর আহমেদ: আমরা সম্প্রতি দেখেছি, সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আনার কথা বলছে। আবার এখন দেখছি, প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার জন্য আলাদা মন্ত্রী দায়িত্ব পেয়েছেন। প্রশাসনিক সুবিধার জন্য দায়িত্ব ভাগ করা যেতে পারে, কিন্তু পরিকল্পনা হতে হবে সমন্বিত ও সামগ্রিক।

আমরা যদি সত্যিই বিদ্যালয় শিক্ষাকে সকলের জন্য সর্বজনীন ও মানসম্মত করতে চাই, তবে সে অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। এখন আর শুধু অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নয়, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্তই এই পরিকল্পনা করতে হবে। এর জন্য এলাকাভিত্তিক সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার, যেখানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় স্তরই অন্তর্ভুক্ত থাকবে। হয়তো ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করতে হবে, কিন্তু পরিকল্পনাটি থাকা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, পাঠক্রমের মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা প্রয়োজন। আমি আগেই বলেছি, প্রাথমিকে বাংলা ও অঙ্কের মতো ভিত্তিমূলক বিষয়ে জোর দিতে হবে। সেই ভিত্তি ঠিকমতো তৈরি হলেই একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনার জন্য প্রস্তুত হবে।

একটি উদাহরণ দিই। প্রথম শ্রেণি থেকেই ইংরেজি পড়ানো শুরু হয়েছে, যা জেনারেল এরশাদের আমলে একটি আদেশের মাধ্যমে চালু হয়েছিল। কিন্তু ইংরেজি পড়ানোর মতো যোগ্য শিক্ষক তখনো ছিল না, এখনো নেই। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে ইংরেজি পড়ানো হলেও শিক্ষার্থীরা কিছুই শিখতে পারে না, এমনকি অনেক শিক্ষক নিজেও ইংরেজি জানেন না। অথচ ষষ্ঠ শ্রেণির ইংরেজি পাঠক্রম দেখলে মনে হবে, শিক্ষার্থীরা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত অনেক কিছু শিখে এসেছে এবং তার ওপর ভিত্তি করেই নতুন পাঠ শুরু হচ্ছে। এই সমন্বয়হীনতা বাংলা বা গণিতের ক্ষেত্রেও অনেকাংশে প্রযোজ্য। তাই এই ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের বর্তমান শিক্ষাপঞ্জিতে বছরের সবচেয়ে ভালো আবহাওয়ার সময়টা—অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত, যখন আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ থাকে—নানা কারণে নষ্ট হয়। এই সময়ে পরীক্ষা, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন উৎসব এবং নতুন বছরে ভর্তির মতো কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে মূল পড়াশোনা ব্যাহত হয়।

শিক্ষকদের প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও একটি মানসম্মত কাঠামো প্রয়োজন, তা সে প্রাথমিক বা মাধ্যমিক—যেকোনো স্তরের জন্যই হোক। এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রয়োজন অনুযায়ী কোনো স্কুল প্রথম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি, কোনোটি প্রথম থেকে পঞ্চম, আবার কোনোটি ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু পাঠক্রম, পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষকদের প্রস্তুতি—এই সবকিছু একটি সমন্বিত পরিকল্পনার অধীনে থাকতে হবে।

স্ট্রিম: কিন্তু আমরা তো শিক্ষাব্যবস্থায় সমন্বিত পরিকল্পনার বদলে প্রায়ই খণ্ডিত পরিবর্তন দেখি। কখনো পাঠক্রম, কখনো স্কুলের কাঠামো, আবার কখনো হঠাৎ করে বই বদলে ফেলা হয়। এই পরিবর্তনগুলো কি কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অধীনে হওয়া উচিত নয়?

মনজুর আহমেদ: অবশ্যই একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অধীনে হওয়া উচিত। এত ঘন ঘন পরিবর্তন, প্রতি বছর নতুন বই ছাপানো—এগুলো শিক্ষার প্রকৃত প্রয়োজনে হচ্ছে বলে মনে হয় না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আমাদের মূল লক্ষ্য কী? শিক্ষার্থীদের পড়তে, লিখতে ও অঙ্ক করতে শেখানো। এই মৌলিক বিষয়গুলো সারা পৃথিবীতে একই রকম। এখানে এত ঘন ঘন পরিবর্তনের প্রয়োজন কী? মাধ্যমিকেও ভাষা, গণিত বা বিজ্ঞানের মতো বিষয়গুলোতে বড় ধরনের পরিবর্তনের অবকাশ নেই।

ইতিহাস বা সমাজপাঠের মতো বিষয়ে যদি পরিবর্তনের কথা বলাও হয়, সেটাও ঘন ঘন হওয়ার প্রয়োজন নেই। আমাদের সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে কীভাবে উপস্থাপন করা হবে, তার একটি বৈশ্বিক মানদণ্ড রয়েছে। কিন্তু আমরা দেখি, অনেক সময় তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক কারণে—কাউকে বেশি সম্মান বা কাউকে উপেক্ষা করার উদ্দেশ্যে—পরিবর্তন আনা হয়। শিক্ষাব্যবস্থাকে এ ধরনের সাময়িক বিবেচনা থেকে দূরে রাখা উচিত, যেন এই ঘন ঘন পরিবর্তনের প্রয়োজন না হয়।

স্ট্রিম: আপনার কমিটির আরেকটি আলোচিত সুপারিশ ছিল শিক্ষাবর্ষ পরিবর্তন করা। বলা হচ্ছে, বছরের যে সময়টা পড়াশোনার জন্য সবচেয়ে উপযোগী, সেই সময়টাই আমরা বিভিন্ন কারণে নষ্ট করি।

মনজুর আহমেদ: এর পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, শিক্ষার্থীর পাঠগ্রহণের সময় একটি অমূল্য সম্পদ। এই সময় একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী, প্রাথমিকে বছরে অন্তত এক হাজার ঘণ্টা পাঠদান হওয়া উচিত। আমাদের দেশে ছুটিছাটা বা অন্যান্য কারণে বছরে পাঁচ-ছয়শো ঘণ্টাও ঠিকমতো হয় কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তাই যেটুকু সময় পাওয়া যায়, তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষাপঞ্জিতে বছরের সবচেয়ে ভালো আবহাওয়ার সময়টা—অর্থাৎ সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত, যখন আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ থাকে—নানা কারণে নষ্ট হয়। এই সময়ে পরীক্ষা, বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন উৎসব এবং নতুন বছরে ভর্তির মতো কার্যক্রমে ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে মূল পড়াশোনা ব্যাহত হয়।

অনেক দেশেই শিক্ষাবর্ষ শুরু হয় সেপ্টেম্বরে এবং শেষ হয় জুনে। জুলাই-আগস্ট মাস গ্রীষ্মকালীন ছুটি হিসেবে থাকে। আমরাও যদি এমন একটি পঞ্জিকা অনুসরণ করি, তবে শীতের এই চমৎকার সময়টাকে পড়াশোনার কাজে পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারব এবং পরীক্ষাগুলো বছরের শেষের দিকে নিতে পারব।

আমার মতে, সেপ্টেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত শিক্ষাবর্ষ নির্ধারণ করে এই সময়টাকে পুরোপুরি পাঠদানের কাজে ব্যবহার করা উচিত। আর জুলাই-আগস্টের ছুটিতে শিক্ষকরা কর্মশালা বা আগামী বছরের জন্য পরিকল্পনা তৈরির মতো কাজগুলো করতে পারেন। বিশ্বের অনেক দেশেই এই ব্যবস্থা চালু আছে এবং আমাদেরও সেভাবে পরিকল্পনা করা প্রয়োজন।

স্ট্রিম: ঢাকা স্ট্রিমকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

মনজুর আহমেদ: ধন্যবাদ ঢাকা স্ট্রিম ও এর পাঠকদেরও।

সর্বাধিক পঠিত
এই মুহূর্তে
Ad 300x250

সম্পর্কিত