দ্য স্টেটসম্যানের বিশ্লেষণ

বিজেপির পশ্চিমবঙ্গ জয়ে বদলে যাবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক!

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্ট্রিম গ্রাফিক্স

পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ভূমিধস জয় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন কৌশলগত সমীকরণ তৈরি করেছে। তিস্তা ও গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তিসহ দ্বিপক্ষীয় অমীমাংসিত ইস্যুতে এখন দুই দেশের নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ভারতঘনিষ্ঠ শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের সঙ্গে শুরু হওয়া ভারতের টানাপোড়েন নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার বদল।

তিস্তা চুক্তি ও উত্তরবঙ্গের রাজনীতি

দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে সৃষ্ট অচলাবস্থার মূলে ছিল পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনড় অবস্থান। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূল সরকার সব সময়ই দাবি করে এসেছে, এই চুক্তি উত্তরবঙ্গের সেচ ও কৃষি খাতে বিপর্যয় ডেকে আনবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, বিজেপি ক্ষমতায় এলে এই জট খুলবে।

তবে ভারতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, নবাগত বিজেপি সরকারও উত্তরবঙ্গের একই স্বার্থ রক্ষায় তিস্তা চুক্তি নিয়ে পিছুটান দিতে পারে। উত্তরবঙ্গ এখন গেরুয়া শিবিরের প্রধান দুর্গে পরিণত হয়েছে এবং এই অঞ্চলের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে স্থানীয় ভোটারদের চটিয়ে বিজেপি নেতৃত্বও এই চুক্তিতে সহজে সায় দেবে না।

চীন ও নিরাপত্তা নিয়ে দিল্লির উদ্বেগ

বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে দিল্লির অস্বস্তির কথা জানিয়ে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘ভারত সীমান্তের একদম কাছে চীনকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্পের পরিকল্পনা এবং ভারতের তিস্তা পানি বণ্টনের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা না করার যে ঘোষণা ঢাকা দিয়েছে, তা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্য ইতিবাচক নয়।’ এ ছাড়া বাংলাদেশ এ বছর চীনের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে সামরিক ড্রোন তৈরির চুক্তি করেছে এবং চীনের তৈরি জে-১০সি যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

মরিশাসের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা শান্তনু মুখার্জি মনে করেন, শিলিগুড়ি করিডোর সংলগ্ন স্পর্শকাতর এলাকায় এই ড্রোনের মোতায়েন ভারতের গোয়েন্দা তথ্যের নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এবং তুরস্কের সক্রিয়তা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলছে।

তারেক রহমানের সরকার ও নতুন প্রত্যাশা

নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ‘ঢাকা না দিল্লি’ স্লোগানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে যে তিক্ততা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই স্তিমিত। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর ভারতই প্রথম তাঁকে অভিনন্দন জানায়। দিল্লির ধারণা, কেন্দ্রের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি ক্ষমতায় থাকায় ঢাকার সাথে অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনা করা এখন সহজ হবে। বিএনপি সরকারের কাছ থেকে দিল্লি আশা করছে, তারা বাণিজ্য ও ঝুলে থাকা কানেক্টিভিটি প্রকল্পগুলো পুনরায় সচল করবে।

গঙ্গা পানি চুক্তি ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা

ঢাকার অন্যতম প্রধান চাওয়া হলো ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি চুক্তির নবায়ন, যার মেয়াদ চলতি ডিসেম্বরেই শেষ হতে যাচ্ছে। ফারাক্কা পয়েন্টে হুগলি ও পদ্মা নদীর মধ্যে ৫০:৫০ অনুপাতে পানি বণ্টনের এই ঐতিহাসিক চুক্তি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা ও কারিগরি তথ্য আদান-প্রদান শুরু হয়েছে। তবে মনোহর পারিক্কর ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো উত্তম সিনহা মনে করেন, হিমালয়ের হিমবাহ গলনের ফলে গঙ্গার পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় পানির নিশ্চয়তা দেওয়া দিল্লির জন্য কঠিন হবে। ফলে আপাতত চুক্তি এক বছরের জন্য সম্প্রসারিত হতে পারে।

অন্যদিকে, সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অভিবাসন ও জঙ্গি অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় ভারত কিছুটা কঠোর হলেও সাধারণ পর্যটক, রোগী ও শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজ করার পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর উপস্থিতিতে দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কের পরিণত ও ভারসাম্যপূর্ণ অধ্যায় শুরু করবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।

সম্পর্কিত