মুডিসের রেটিং পূর্বাভাস ‘স্থিতিশীল’: নজর দিতে হবে কাঠামোগত সংস্কারে

শাহ মো. আহসান হাবিব
শাহ মো. আহসান হাবিব

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

আন্তর্জাতিক ঋণমান যাচাইকারী সংস্থা মুডিস রেটিংস সম্প্রতি বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাস বা আউটলুক ‘নেতিবাচক’ থেকে ‘স্থিতিশীল’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে। অনেকেই এটিকে অর্থনীতির একটি বড় সুখবর হিসেবে দেখছেন। তবে সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টিকে একটু ভিন্নভাবে এবং গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

প্রথমেই যে বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া দরকার তা হলো, মুডিস আমাদের মূল রেটিংয়ের কোনো উন্নতি করেনি। বাংলাদেশের রেটিং আগে যেমন ‘বি-টু’ ছিল, এখনো তা-ই আছে। পরিবর্তন এসেছে কেবল পূর্বাভাসে। একটি দেশের রেটিং আউটলুক সাধারণত তিনটি হয়—পজিটিভ, স্ট্যাবল এবং নেগেটিভ। আমরা নেগেটিভ থেকে স্ট্যাবলে এসেছি। এর সহজ অর্থ হলো—আমাদের অর্থনীতির যে ধারাবাহিক অবনতি হচ্ছিল, আপাতত তা থেমেছে। পরিস্থিতি আর খারাপের দিকে যাচ্ছে না, তবে ভালোও হয়ে যায়নি। ভালো হলে রেটিংয়ের সূচক বাড়তো।

পূর্বাভাস স্থিতিশীল হওয়ার পেছনে কিছু ইতিবাচক কারণ রয়েছে। আগের তুলনায় আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কিছুটা সম্মানজনক ও স্থিতিশীল আকারের দিকে যাচ্ছে। বাণিজ্য ঘাটতির চিত্র কিছুটা উন্নতি হয়েছে, রেমিট্যান্স প্রবাহও ইতিবাচক। এছাড়া আইএমএফ-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে আমাদের আলোচনা এবং নীতিগত বোঝাপড়া ভালো থাকায় দেশের অর্থনীতি এখন যেকোনো আকস্মিক ধাক্কা সামলাতে আগের চেয়ে কিছুটা বেশি প্রস্তুত। রাজনৈতিক অঙ্গনে আগে যে চরম অনিশ্চয়তা ছিল, নতুন সরকার আসার পর তা অনেকটা কমে এসেছে। এই কারণগুলোতেই মূলত আউটলুক স্থিতিশীল হয়েছে।

আমরা নেগেটিভ থেকে স্ট্যাবলে এসেছি। এর সহজ অর্থ হলো—আমাদের অর্থনীতির যে ধারাবাহিক অবনতি হচ্ছিল, আপাতত তা থেমেছে। পরিস্থিতি আর খারাপের দিকে যাচ্ছে না, তবে ভালোও হয়ে যায়নি।

তবে মূল রেটিং যে ‘বি-টু’ রয়ে গেছে, সেটি আমাদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। ‘বি-টু’ কোনোভাবেই বিনিয়োগযোগ্য গ্রেড নয়। এটি নির্দেশ করে যে, এই দেশে বিনিয়োগ করা এখনো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। আমাদের অর্থনীতিতে বেশ কিছু মৌলিক দুর্বলতা রয়ে গেছে। ব্যাংকিং খাতে চরম তারল্য সংকট ও খেলাপি ঋণের আধিক্য, রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি খাতের ভঙ্গুরতা এবং রপ্তানিতে বৈচিত্র্যের অভাব—এই চ্যালেঞ্জগুলো এখনো প্রকট। এগুলো সমাধান করতে না পারলে রেটিংয়ের মূল সূচকে কোনো উন্নতি আসবে না।

অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হলো বিনিয়োগ। দেশি ও বিদেশি উভয় বিনিয়োগই বর্তমানে স্থবির হয়ে আছে। নির্বাচন বা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিনিয়োগ বাড়বে বলে যে আশা করা হয়েছিল, তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মূলত তিনটি বিষয়ের নিশ্চয়তা চান— সম্পত্তির নিরাপত্তা, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও অবকাঠামো সুবিধা এবং মুনাফা নিজ দেশে ফেরত নেওয়ার আইনি ও পদ্ধতিগত নিশ্চয়তা।

আমাদের দেশে সস্তা শ্রম আছে, কর অবকাশসহ পলিসিগত সুবিধাও যথেষ্ট ভালো। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা যদি ভয় পান যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা আন্দোলনের কারণে তাদের কারখানায় ভাঙচুর হবে, কিংবা তারা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পাবেন না, তবে কেবল কর সুবিধার জন্য তারা এখানে আসবেন না। তাই বিদেশিদের মনে এই নিরাপত্তাবোধ ও আস্থার সঞ্চার করা এখন সবচেয়ে বেশি জরুরি।

আরেকটি বড় চিন্তার বিষয় হলো সরকারের রাজস্ব আয় এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা। বর্তমানে আমাদের মোট রাজস্বের প্রায় ৩০ শতাংশই চলে যাচ্ছে ঋণের সুদ পরিশোধ করতে। আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন। এর একটি কারণ হতে পারে অতীতে জিডিপির আকার ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে দেখানো হয়েছিল, যার ফলে অনুপাতটি আরও খারাপ দেখাচ্ছে। সুদ পরিশোধের এই বিশাল চাপ সহসা কমানো সম্ভব নয়। কারণ, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে হলে সরকারকে এখন বাধ্য হয়েই কিছু খাতে ব্যয় বাড়াতে হবে।

বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতের যে দুরবস্থা, সেখানে সাধারণ আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা সরকারকে করতেই হবে। আমানতকারীদের পথে বসিয়ে ব্যাংকিং খাতকে দাঁড় করানো যাবে না। আর এই ক্ষতিপূরণ বা তারল্য সহায়তা দিতে গেলে সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণ বাড়বে, সেই সঙ্গে বাড়বে সুদের ব্যয়ও।

আমাদের দেশে সস্তা শ্রম আছে, কর অবকাশসহ পলিসিগত সুবিধাও যথেষ্ট ভালো। কিন্তু বিনিয়োগকারীরা যদি ভয় পান যে, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা আন্দোলনের কারণে তাদের কারখানায় ভাঙচুর হবে, কিংবা তারা নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ পাবেন না, তবে কেবল কর সুবিধার জন্য তারা এখানে আসবেন না।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজস্ব আয় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে যারা নিয়মিত কর দেন, তাদের ওপর নতুন করে করের বোঝা না চাপিয়ে ট্যাক্স নেট বাড়াতে হবে। দেশের একটি বিশাল গোষ্ঠী এখনো কর জালের বাইরে রয়ে গেছে। এছাড়া অপ্রদর্শিত বা কালো টাকার যে বিশাল অর্থনীতি রয়েছে, সেগুলোকে নিয়মের মধ্যে এনে রাজস্ব আদায়ের পরিধি বাড়াতে হবে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে টেকসইভাবে গতিশীল করতে হলে আমি দুটি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলব। প্রথমটি হলো—জ্বালানি নিরাপত্তা এবং দ্বিতীয়টি—ব্যাংকিং খাতের সংস্কার।

জ্বালানি ছাড়া কোনো কারখানাই চলবে না, বিনিয়োগও আসবে না। তাই যেকোনো মূল্যে শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, ব্যাংকিং খাত হলো অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ। ব্যাংক ছাড়া অর্থায়নের বিকল্প কোনো শক্তিশালী উৎস আমাদের নেই। ব্যাংকিং খাতকে বাঁচাতে হলে খেলাপি ঋণের লাগাম কঠোর হাতে টেনে ধরতে হবে। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের টাকা লুটপাটের পর আর ফেরত দিচ্ছেন না, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে বাজারে একটি শক্ত বার্তা দিতে হবে। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিচার না হলে ব্যাংকিং খাতের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরবে না। আর ব্যাংকিং খাত ঘুরে না দাঁড়ালে অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত গতিশীলতাও অধরাই থেকে যাবে।

মুডিসের স্থিতিশীল পূর্বাভাসকে আমাদের একটি 'ব্রেদিং স্পেস' বা শ্বাস নেওয়ার সুযোগ হিসেবে দেখতে হবে। আত্মতুষ্টিতে না ভুগে এখনই সময় কাঠামোগত সংস্কারের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়ার। তবেই ভবিষ্যতে আমাদের রেটিং ‘বি-টু’ থেকে ইনভেস্টমেন্ট গ্রেডে উন্নীত হবে এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনা বাড়বে।

  • শাহ মো. আহসান হাবিব: অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এবং চেয়ারম্যান, ডিনেট

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত