মুডিসের পূর্বাভাসে স্বস্তি, তবে আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই

ড. এম এ রাজ্জাক
ড. এম এ রাজ্জাক

স্ট্রিম গ্রাফিক্স
স্ট্রিম গ্রাফিক্স

সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় মুডিস এর মতো আন্তর্জাতিক ঋণমান যাচাইকারী সংস্থার পজিটিভ রেটিং নিঃসন্দেহে ইতিবাচক বার্তা। যদিও আমাদের মূল ঋণমান ‘বি২’ অপরিবর্তিত রয়েছে, তবে এই পূর্বাভাস পরিবর্তনের অর্থ হলো, আমাদের সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা হলেও স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে শুরু করেছে।

একসময় আমাদের অর্থনীতিতে বড় মাত্রায় রিজার্ভ সংকটের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপ তো রয়েছেই। তবে সেই শঙ্কার জায়গা থেকে বাংলাদেশ এখন অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে বড় স্বস্তির জায়গা হলো, আমরা কোনো বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হইনি। মুডিসের মতো সংস্থা রেটিং করার ক্ষেত্রে অনেকগুলো সূচক বা ইন্ডিকেটর ব্যবহার করে। এর মধ্যে ব্যালেন্স অব পেমেন্টসের বাধ্যবাধকতাগুলো সময়মতো মেটাতে পারা গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়া আমাদের রিজার্ভ আগের তুলনায় বেড়েছে এবং প্রবাসী আয়েও (রেমিট্যান্স) ঊর্ধ্বমুখী ধারা পরিলক্ষিত। মূলত এসব কারণেই মুডিস বাংলাদেশের ঋণমানের পূর্বাভাসকে স্থিতিশীল বলেছে।

রেটিং ভালো হলে দুটি বড় সুবিধা পাওয়া যায়। প্রথমত, বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই আসার পথ সুগম হয়। দ্বিতীয়ত, সরকার বা বেসরকারি খাত যখন বিদেশ থেকে ঋণ নেয়, তখন রেটিং ভালো থাকলে কম সুদে ঋণ পাওয়া যায়।

মুডিসের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার রেটিং যেকোনো দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে ইচ্ছুক বিদেশি ব্যাংকগুলো সবার আগে এই রেটিংগুলোর দিকে নজর দেয়। শুধু বাংলাদেশ নয়; আমেরিকা বা যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশগুলোও তাদের রেটিং ধরে রাখতে সচেষ্ট থাকে। কারণ ভালো রেটিং মানেই বিনিয়োগকারীদের বাড়তি আত্মবিশ্বাস।

রেটিং ভালো হলে দুটি বড় সুবিধা পাওয়া যায়। প্রথমত, বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই আসার পথ সুগম হয়। দ্বিতীয়ত, সরকার বা বেসরকারি খাত যখন বিদেশ থেকে ঋণ নেয়, তখন রেটিং ভালো থাকলে কম সুদে ঋণ পাওয়া যায়। বিপরীতক্রমে, রেটিং খারাপ হলে ঝুঁকি বেশি বিবেচনা করে বিদেশি ঋণদাতারা উচ্চ হারে সুদ দাবি করে। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কাছেও দেশের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে।

পূর্বাভাস স্থিতিশীল হলেও আমাদের মূল ঋণমান এখনো ‘বি২’-তে আটকে আছে। এই মানের উন্নতি করতে হলে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা আরও মজবুত করতে হবে। মুডিস আমাদের মূল্যস্ফীতির হার, খেলাপি ঋণ, ব্যাংকগুলোর সার্বিক স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে নজর রাখছে। এই সূচকগুলোয় উন্নতি ছাড়া মূল রেটিংয়ের উত্তরণ সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, বর্তমানে রিজার্ভ ও প্রবাসী আয়ের যে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে শুধু রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল হলে চলবে না। টেকসই রিজার্ভের জন্য রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এবং এফডিআই বৃদ্ধি অপরিহার্য।

মুডিসের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার রেটিং যেকোনো দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে ইচ্ছুক বিদেশি ব্যাংকগুলো সবার আগে এই রেটিংগুলোর দিকে নজর দেয়।

মুডিসের প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগের যে জায়গাটি উঠে এসেছে, তা হলো আমাদের ব্যাংক খাতের মূলধন ঘাটতি মেটাতে জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ অর্থের প্রয়োজন হতে পারে। সরকারের বর্তমান রাজস্ব সংকটের প্রেক্ষাপটে এটি বিশাল চাপ। এই চাপ সামলানোর জন্য ব্যাংকগুলোকে নিজেদেরই উদ্যোগী হতে হবে। তাদের খেলাপি ঋণ বা ব্যাড অ্যাসেটগুলোর যথাযথ ব্যবস্থাপনা করতে হবে। ব্যাংকগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি নতুন ও আকর্ষণীয় সেবার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। ব্যাংকগুলো ব্যর্থ হলে সাধারণ মানুষের আমানতের সুরক্ষায় সরকারকে বাধ্য হয়েই হস্তক্ষেপ করতে হবে, যা সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

রাতারাতি এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়; দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে।

সর্বোপরি মুডিসের ‘স্থিতিশীল’ পূর্বাভাস আমাদের জন্য একটি পজিটিভ সিগন্যাল। এটি প্রমাণ করে আমরা খাদের কিনার থেকে ঘুরে দাঁড়াচ্ছি। তবে এখনই আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। ব্যাংক খাতের সংস্কার, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো কাঠামোগত চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারলেই আমাদের ঋণমানের প্রকৃত উন্নতি ঘটবে।

  • ড. এম এ রাজ্জাক: রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড) এর চেয়ারম্যান।
Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত