স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই ২০২৬

স্ট্রিম গ্রাফিক
স্ট্রিম গ্রাফিক

আমি অমন করে মরতে চাই না। চাই না যে আমাকে পিটিয়ে হত্যা করা হোক। আমি চাই না আমার বিকৃত দেহটা দেখে কাঁদুক আমার স্বজন। আমি চাই না আততায়ীর গুলি বিদ্ধ করুক আমাকে কোনো অসতর্ক মুহূর্তে। চাই না যে আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা থানা পুলিশ করুক আমার জন্য। আমি চাই না নিরুদ্দেশের তালিকায় ভিড় জমাতে।

দিনের পর দিন হত্যা-রাহাজানির খবর পাওয়া যায়। অথচ এদের কারোর শাস্তি হয় না! এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে কী করে? সরকারের নাকের ডগায় ছিনতাই-রাহাজানি তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

এ প্রশ্ন সকলের মনে। এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে না কেউ। মানুষ তেল-চাল-ডাল-নুন নিয়ে শুধু স্বাভাবিক জীবনযাপন করার কথা ভাবে না। আশঙ্কায় থাকে যে রাস্তায় জনতার আক্রোশে পৈত্রিক প্রাণটা কখন বিপর্যস্ত হয়। কখন আততায়ীর গুলি ছিন্নভিন্ন করে দেয়। মানুষ শুধু জীবনের প্রতিশ্রুতি নয়, চায় স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি।’

কুমিল্লায় ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যা, খুলনা শহরে চুরির অভিযোগে মো. আজমল হোসেন নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে হত্যা, মহেশখালীতে চোর সন্দেহে যুবককে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা, সাভারের আশুলিয়ায় কার্টনবক্স থেকে অজ্ঞাত নারীর মস্তকহীন খণ্ডিত লাশ উদ্ধার, আদাবরে খাল থেকে নারীর খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার—সাম্প্রতিক এসব ঘটনা মানুষের নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতিকে আরও তীব্র করেছে।

কিন্তু এই লাইনগুলো শুধু এখনকার নয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির প্রেক্ষাপটে ১৯৭৩ সালে লিখেছিলেন দেশবরেণ্য সাংবাদিক নির্মল সেন। দৈনিক বাংলায় ১৬ মার্চ ১৯৭৩ প্রকাশিত সেই সংবাদভাষ্যের শিরোনাম ছিল ‘আমি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’। ৫৩ বছর আগে লেখা সেই লাইনগুলো এক নির্মম বাস্তবতা হয়ে ২০২৬ সালে বাংলাদেশের সমাজে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। মানুষ এখন অসহায়ের মতো খুঁজছে নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি।

গণতান্ত্রিক সরকারের ছয় মাস পরেও জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ কাটেনি। দিন দিন ভীতিকর, গা হিম করা সব ঘটনা ঘটছে। পুরো দেশেই নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। যদিও সরকারের তেমন কোনো হেলদোল আছে বলে মনে হয় না।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী যেকোনো দেশে আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতির পুনর্গঠন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও কঠিন কাজ। ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মব সন্ত্রাস ও আইন-শৃঙ্খলার শিথিলতার বিষয়টি অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল। তখন অনেকেই প্রত্যাশা করেছিলেন নির্বাচিত সরকারের সময় পরিস্থিতির উন্নতি হবে। এ বিষয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতিও ছিল পরিষ্কার। কিন্তু নতুন গণতান্ত্রিক সরকারের ছয় মাস পরেও জননিরাপত্তা নিয়ে মানুষের উদ্বেগ কাটেনি। দিন দিন ভীতিকর, গা হিম করা সব ঘটনা ঘটছে। পুরো দেশেই নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি হয়েছে। যদিও সরকারের তেমন কোনো হেলদোল আছে বলে মনে হয় না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রায় ক্রমাগত আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি যথাযথ আছে বলে দাবি করে আসছেন। ৩ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে তিনি বলেছেন, ‘পুলিশ সদর দপ্তর এবং জেলা পর্যায় থেকে সংগৃহীত সমন্বিত ও কেন্দ্রীয়ভাবে আপডেট করা তথ্যের ভিত্তিতে দেশের অপরাধচিত্র আগের চেয়ে অনেক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ২০২৫ সালের তুলনায় বর্তমানে খুন, অপহরণ, ধর্ষণ, অস্ত্র মামলা ও নারী নির্যাতনের মতো প্রধান অপরাধের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে বলে যোগ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।’ (৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ঢাকা পোস্ট)

মনে রাখা প্রয়োজন, পুলিশের হিসেবের বাইরেও মানুষের নিরাপত্তাবোধ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইনশৃঙ্খলা শুধু খুন, ধর্ষণ বা মামলার সংখ্যার বিষয় নয়। মানুষ বিপদে পড়লে পুলিশকে পাশে পাবে কি না, রাস্তায় বের হলে নিরাপদ বোধ করবে কি না, অপরাধীর বিচার হবে কি না—এসবও জননিরাপত্তার অংশ।

সরকারের এই মূল্যায়নের সঙ্গে মানুষের অভিজ্ঞতা ও উদ্বেগের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদিও পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যেও উঠে আসছে কিছু উদ্বেগজনক চিত্র।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি-জুলাইয়ে সারা দেশে খুনের ঘটনায় ১ হাজার ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১ হাজার ৭৮০টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ১১ হাজার ১৬৫টি। আগের ছয় মাসে হয়েছিল ১০ হাজার ৯০টি। এই শ্রেণিতে মামলা বেড়েছে ১ হাজার ৭৫টি। (প্রথম আলো, ১৯ আগস্ট ২০২৬)

অবশ্য মামলার সংখ্যা পুরো অপরাধচিত্রের সমান নয়। আবার মামলা বাড়া বা কমার পেছনে অভিযোগ গ্রহণ ও রিপোর্ট করার প্রবণতাও ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক অপরাধের ঘটনা মামলা পর্যন্ত গড়ায় না। আবার অপরাধের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের সম্পর্ক বরাবরই নিবিড়। মনে রাখা প্রয়োজন, পুলিশের হিসেবের বাইরেও মানুষের নিরাপত্তাবোধ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আইনশৃঙ্খলা শুধু খুন, ধর্ষণ বা মামলার সংখ্যার বিষয় নয়। মানুষ বিপদে পড়লে পুলিশকে পাশে পাবে কি না, রাস্তায় বের হলে নিরাপদ বোধ করবে কি না, অপরাধীর বিচার হবে কি না—এসবও জননিরাপত্তার অংশ। সরকার যতই পরিসংখ্যানের দিকে তাকিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগে, মানুষের নিরাপত্তাবোধ যদি কমতে থাকে। সেই সংকেত উপেক্ষা করা বিপজ্জনক। সেখান থেকে মানুষ মুক্তি চায়।

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নির্মম হত্যাকাণ্ড সারাদেশের মানুষের মধ্যে আরও ভীতি ছড়িয়েছে। এই ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে জীবনযাপনের জন্য বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্ব দেয়নি। নিরাপদে বাঁচার পরিবর্তে মানুষ যখন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নিয়ে চিন্তিত হয়, তখন বুঝতে হবে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

সরকারের প্রতি আহ্বান, লোক দেখানো জনতুষ্টিবাদ ও পরিসংখ্যানগত আত্মতুষ্টিতে ভোগা বাদ দিয়ে বাস্তব জননিরাপত্তায় নজর দিন। মব সহিংসতা ও গণপিটুনি বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, অপরাধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, থানায় সাধারণ মানুষের অভিযোগ গ্রহণ নিশ্চিত করা এবং অপরাধের ঘটনায় দৃশ্যমান জবাবদিহি—এসব বিষয়ে দ্রুত মনোযোগ দেওয়া জরুরি। দিনে দুপুরে হত্যা, খুন, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, মানুষকে পুড়িয়ে হত্যার হুমকি, শিশু নিখোঁজ—সব মিলিয়ে নিরাপত্তাহীনতার এই পরিবেশ চলতে থাকলে মানুষ তাদের নেওয়া সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দিহান হবে।

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের নির্মম হত্যাকাণ্ড সারাদেশের মানুষের মধ্যে আরও ভীতি ছড়িয়েছে। এই ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে জীবনযাপনের জন্য বাংলাদেশের মানুষ আপনাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় দায়িত্ব দেয়নি। নিরাপদে বাঁচার পরিবর্তে মানুষ যখন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নিয়ে চিন্তিত হয়, তখন বুঝতে হবে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই অবস্থার অবসান জরুরি। রাষ্ট্রের কাছে নাগরিকের চাওয়া খুব বেশি নয়—সে যেন নিরাপদে বাঁচতে পারে, আইনের আশ্রয় পেতে পারে এবং স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা নিয়ে জীবন কাটাতে পারে। ৫৩ বছর আগে নির্মল সেন যে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি’ চেয়েছিলেন, ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশের মানুষকে যেন আবার সেই একই দাবি করতে না হয়।

রাহাত মিনহাজ: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত