প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ করবে?
আইসিএনএল
Act_ICNL-6a89c9-480x270.webp)
বাংলাদেশ সরকার আগের ‘সাইবার সুরক্ষা আইন’ বাতিল করে ‘সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ (সিপিএ) এর খসড়া প্রস্তাব করেছে। আইসিটি বিভাগ গত ১৩ সেপ্টেম্বর এটি প্রকাশ করে এবং মাত্র ১০ দিনের মধ্যে (২৩ সেপ্টেম্বর) মতামত জমা দিতে বলে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর নট-ফর-প্রফিট ল (আইসিএনএল) উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, এই খসড়ায় এমন কিছু বিধান রয়েছে যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ করে এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তি আইসিসিপিআর-এর পরিপন্থী। আইসিএনএল-এর মূল্যায়নে দেখা গেছে, সুশীল সমাজ এবং আইসিএনএল আগের আইনের যে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছিল, তার অনেকগুলোই খসড়া প্রস্তাবিত সিপিএ-তে রয়ে গেছে।
এই সারসংক্ষেপ বিশ্লেষণে প্রথমে একটি পদ্ধতিগত সমস্যা—অর্থপূর্ণ আলোচনার অভাব—এবং তারপর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
অর্থপূর্ণ আলোচনার অভাব
জাতিসংঘের নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো নতুন আইন বা নীতি তৈরির সময় জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে পর্যাপ্ত সময় দিতে হয়। লিখিত ও সশরীরে মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকতে হয়, যা সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়ায়।
কিন্তু সরকার সিপিএ-এর প্রাথমিক খসড়া তৈরিতে জনগণের কোনো মতামত নেয়নি। বরং একটি সম্পূর্ণ প্রস্তুত খসড়া প্রকাশ করে মাত্র ১০ দিন সময় দিয়েছে, যা একেবারেই অপর্যাপ্ত। শুধু লিখিত মতামতের সুযোগ দেওয়ায় তৃণমূল সংগঠন ও ছোট সংবাদমাধ্যমগুলো এই প্রক্রিয়া থেকে বাদ পড়তে পারে। মতামতের সুযোগ সীমিত করা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী।
আইসিএনএল-এর সুপারিশ: জাতিসংঘের নির্দেশিকা মেনে মতামতের জন্য আরও বেশি সময় দেওয়া হোক এবং সারা দেশে সশরীরে টাউনহল সভার মতো অন্তর্ভুক্তিমূলক সুযোগ তৈরি করা হোক।
ওয়েবসাইট ও কনটেন্ট ব্লক করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সীমিত করে
খসড়া আইনের ৮ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, তথ্য মন্ত্রণালয় বা বিটিআরসি কোনো আদালতের অনুমোদন ছাড়াই যেকোনো ওয়েবসাইট বা কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণ করতে পারবে। যদি তাদের মনে হয় যে কোনো তথ্য, ভুল তথ্য বা গুজব: (ক) দেশের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে পারে; (খ) ধর্মীয় বা জাতিগত ঘৃণা ছড়াতে পারে; (গ) অপরাধে উসকানি দেয়; বা (ঘ) কোনো ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের মানহানি করে।
কনটেন্ট অপসারণের এই ভিত্তিগুলো অত্যন্ত অস্পষ্ট, যা কর্তৃপক্ষকে ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের ব্যাপক ক্ষমতা দেয়। আইসিসিপিআর-এর ১৯ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর যেকোনো বিধিনিষেধ সুনির্দিষ্ট, বৈধ উদ্দেশ্যে এবং সবচেয়ে কম-সীমাবদ্ধ উপায়ে হতে হবে। কিন্তু খসড়া আইনে ‘রাষ্ট্রের অবমাননা’ বা ‘ঘৃণার ঝুঁকি’-এর মতো অস্পষ্ট শব্দের ব্যবহার যে কাউকে সরকারের বা নীতির সমালোচনা করতে বাধা দিতে পারে।
এর ফলে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের কণ্ঠরোধ হবে, জনমনে ভয়ের সৃষ্টি হবে এবং সরকারের জবাবদিহিতা কমবে। আদালতের পূর্বানুমোদন ছাড়া কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণে অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে।
আইসিএনএল-এর সুপারিশ: কনটেন্ট বা ওয়েবসাইট ব্লক করার আগে স্বাধীন বিচারিক সংস্থার অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হোক এবং নিষিদ্ধ কনটেন্টের সংজ্ঞা সুস্পষ্ট ও বৈধ উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হোক।
মতপ্রকাশকে অপরাধীকরণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘন করে
খসড়া আইনের ২৫ ও ২৬(ক) অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের নতুন কিছু ধরনকে অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।
২৫ নং অনুচ্ছেদে ‘মানহানিকর, অবমাননাকর বা ভীতিকর (বুলিং)’ বক্তব্য (অডিও-ছবিসহ) প্রকাশকে অপরাধ বলা হয়েছে।
এখানে ‘মানহানিকর’ সংজ্ঞায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা সম্পাদিত ‘মিথ্যা’ বা ‘ক্ষতিকারক’ তথ্যকেও যুক্ত করা হয়েছে, যা শিল্প বা ব্যঙ্গাত্মক মতপ্রকাশকেও অপরাধী বানাতে পারে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, মানহানিকে ফৌজদারি অপরাধ (কারাদণ্ড) না করে দেওয়ানি জরিমানা বা ক্ষতিপূরণের আওতায় আনা উচিত। কারণ কারাদণ্ড মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে একটি অসামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি। এর ভয়ে মানুষ সমালোচনা করতে ভয় পাবে। এছাড়াও, জনস্বার্থে সৎ উদ্দেশ্যে করা প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ আইনে থাকা উচিত।
‘অবমাননাকর’ ও ‘ভীতিকর (বুলিং)’ শব্দের সংজ্ঞাও অত্যন্ত অস্পষ্ট এবং ব্যক্তিনির্ভর। বক্তার উদ্দেশ্য না থাকলেও কারও ‘সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলে’ তাকে অপরাধী করা হতে পারে। এমনকি কোনো সাংবাদিক ঘুষ নেওয়ার সত্য ভিডিও প্রকাশ করলেও এই আইনে ফেঁসে যেতে পারেন। ‘বুলিং’-এর অস্পষ্ট সংজ্ঞার কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা ভিন্নমতাবলম্বীদের কঠোর সমালোচনাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করার সুযোগ তৈরি হবে, যা গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর। সাইবার বুলিং ঠেকাতে শাস্তির বদলে সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ বাড়ানো বেশি কার্যকর।
২৬(ক) অনুচ্ছেদে ‘গুজব’ এবং ‘ভুল তথ্য’ ছড়ানোকে অপরাধ বলা হয়েছে।
‘গুজব’-কে এমন অসমর্থিত তথ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে যা বিভ্রান্তি বা অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। এর ফলে যেকোনো ব্রেকিং নিউজ প্রচারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
‘ভুল তথ্য’-এর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, মিথ্যা বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ব্যক্তি বা রাষ্ট্রের ক্ষতি করার চেষ্টা। আন্তর্জাতিক আইনে ‘মিথ্যা’ কনটেন্টকে অপরাধ বানানো মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থী, কারণ এর সংজ্ঞা স্পষ্ট নয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো অর্থনীতিবিদ যদি বলেন আগামী বছর জিডিপি ৫% বাড়বে, কিন্তু সরকারের হিসাবে তা ৭% হয়, তবে সরকার ওই অর্থনীতিবিদকে ‘রাষ্ট্রের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য’ ছড়ানোর দায়ে অভিযুক্ত করতে পারে। এই অনুচ্ছেদগুলো স্বাধীন সাংবাদিকতা, গবেষণা ও সুশীল সমাজের ওপর কণ্ঠরোধকারী প্রভাব ফেলবে।
আইসিএনএল-এর সুপারিশ: ২৫(১) এবং ২৬(ক) অনুচ্ছেদ সম্পূর্ণ বাতিল করা হোক।
অন্যান্য উদ্বেগ
আমলযোগ্য অপরাধ: ৪৬ নং অনুচ্ছেদে ২৫ নং অনুচ্ছেদের (মানহানি/বুলিং) অপরাধগুলোকে আমলযোগ্য করা হয়েছে। এর মানে হলো, কোনো পুলিশ কর্মকর্তা নিজের বিবেচনাতেই আদালতের পরোয়ানা ছাড়া যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারবেন। মতপ্রকাশের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এমন ঢালাও ক্ষমতা দিলে সারা দেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হবে। মতপ্রকাশ ফৌজদারি অপরাধ কি না, তা নির্ধারণের যোগ্যতা কেবল বিচারকদেরই আছে।
সুপারিশ: যদি ২৫ নং অনুচ্ছেদ রাখতেই হয়, তবে এই অপরাধগুলোকে অ-আমলযোগ্য করতে হবে এবং গ্রেফতারের জন্য বিচারিক পরোয়ানা বাধ্যতামূলক করতে হবে।
অসামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি ও নিবন্ধন বাতিল: ২৯ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ হলে, তার সব মালিক, পরিচালক বা কর্মীকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে, যদি না তারা প্রমাণ করতে পারেন যে তারা বিষয়টি জানতেন না। এখানে নির্দোষ প্রমাণের দায়ভার উল্টো কর্মীদের ওপরই চাপানো হয়েছে, যা সুশীল সমাজ ও এনজিওগুলোর জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ২৯(৩) অনুচ্ছেদ আদালতকে প্রতিষ্ঠান বা সমিতির নিবন্ধন বাতিল করার ক্ষমতা দেয়। আন্তর্জাতিক আইনে কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হলো একেবারে শেষ অস্ত্র, যা কেবল চরম অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায়। অথচ এই খসড়া আইনে, কোনো একজন কর্মী অনলাইনে একটি অস্পষ্ট বিধিনিষেধ লঙ্ঘনমূলক পোস্ট দিলেও পুরো সংবাদমাধ্যম বা এনজিও বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। এটি মতপ্রকাশের অপরাধের তুলনায় অত্যন্ত কঠোর ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি। প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরকারের যেকোনো পদক্ষেপ অবশ্যই আনুপাতিক ও যুক্তিসঙ্গত হতে হবে।
(সংক্ষেপিত অনুবাদ)
.png)








