ছায়া বাজেট এনসিপির

ফ্যামিলি কার্ডের অর্থসংস্থান কীভাবে, প্রশ্ন হাসনাতের

স্ট্রিম প্রতিবেদক
স্ট্রিম প্রতিবেদক
ঢাকা

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০২৬, ২১: ৩০
এনসিপির ছায়া বাজেট উপস্থাপনে বক্তৃতা করেন দলের দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। ছবি: সংগৃহীত

আগামী বাজেটে বরাদ্দ প্রতিটি পয়সা জনগণের কাজে ব্যয় হচ্ছে কিনা, তা নজরদারি করা হবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। ফ্যামিলি কার্ডের অর্থসংস্থান কীভাবে হবে– সে প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে জাতীয় যুবশক্তির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। এনসিপির ছায়া বাজেট ২০২৬–২৭ উপস্থাপন উপলক্ষে ‘সংস্কার, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের মাধ্যমে টেকসই প্রবৃদ্ধি’ শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলন হয়।

অনুষ্ঠানে এনসিপির ৭১ দফা বাজেট–ভাবনা তুলে ধরেন দলের ছায়া বাজেট কমিটির প্রধান ও সংসদ সদস্য আতিক মুজাহিদ। উপস্থিত ছিলেন এনসিপির ছায়া বাজেট কমিটির উপপ্রধান আবদুল্লাহ আল ফয়সাল, এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দিন মোহাম্মদ ও জয়নাল আবেদীন শিশির।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরা নজরদারিতে রাখব, আগামী বাজেটের যে অর্থ বরাদ্দ হবে, প্রতিটি পয়সা যেন জনগণের কাজেই ব্যবহৃত হয়। পরিসংখ্যাননির্ভর নামসর্বস্ব কোনো বাজেট আর আমরা দেখতে চাই না।’

তিনি বলেন, কর্মসংস্থান কেমন হওয়া উচিত, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কেমন হওয়া উচিত, ব্যাংক খাতকে পরিবারকেন্দ্রিক, লুটপাট ও নির্দিষ্ট শ্রেণিকে উপকারভোগী করা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে কীভাবে জনগণের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া যায় এবং একটি ব্যবসানির্ভর ও স্বনির্ভর ব্যাংক খাত করা যায়, সেটির একটি রূপরেখা, একটি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হলো এনসিপির ছায়া বাজেট।

হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে যে প্রক্রিয়ায় একজন গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেটি দেশের অর্থনীতি পরবর্তী সময় কোন দিকে যাবে, সে বিষয়ে আশঙ্কাজনক একটি পরিস্থিতি উদ্বেগের সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংকের যে বিষয়গুলো নজরে পড়ছে, সেটিও অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক নয়।

তিনি বলেন, ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষকে স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ডধারী বলা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে প্রতিবছর ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা লাগবে। এই অর্থ কি অন্যান্য সোশ্যাল সেফটি নেটস (সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি) থেকে কাটা হবে কি না? যদি কাটা না হয়, তাহলে আগের সোশ্যাল সেফটি নেটসের আওতা বিদ্যমান রেখে কীভাবে এই অর্থ প্রতিবছর সোর্সিং (সংস্থান) করা হবে, সেই প্রশ্নগুলো কিন্তু আমাদের সামনে আসছে।

এনসিপি সমতাভিত্তিক অর্থনীতি নিশ্চিত করবে অঙ্গীকার করে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের যে একটি অঙ্গীকারের সম্পর্ক, সে অঙ্গীকারের সম্পর্কটি আমরা নিশ্চিত করব। দায় ও দরদের ভিত্তিতে ভোক্তাদের স্বার্থ যেমন সংরক্ষণ করার আমরা অঙ্গীকার করছি। একইসঙ্গে যারা উৎপাদক রয়েছেন, তাদের স্বার্থও সংরক্ষণ করতে আমরা অঙ্গীকারবদ্ধ।

সংবাদ সম্মেলনে ৮ লাখ ৫২ হাজার ১৫৭ কোটি টাকার ছায়া বাজেট তুলে ধরেন আতিক মুজাহিদ। বাজেটে জিডিপির ৩ দশমিক ০৯ শতাংশের মধ্যে ঘাটতি সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একইসঙ্গে মূল্যস্ফীতি বর্তমান ৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে আগামী অর্থবছরে ৮ শতাংশ এবং পরের বছর ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যের কথা জানানো হয়েছে।

এনসিপি রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বর্তমান ৬ দশমিক ৭ থেকে বাড়িয়ে প্রথম বছরেই ৯ দশমিক ৩২ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব দিয়েছে। এ লক্ষ্যে বিদ্যুৎ সংযোগের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক, টিআইএন-এনআইডি-ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস সংযুক্তিকরণ, সম্পদ কর চালু, বন্দর ডিজিটালাইজেশন এবং অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি বাতিলের মতো উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ থেকে অতিরিক্ত প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে বলে মনে করে এনসিপি।

ছায়া বাজেটে সাধারণ করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা, নারী ও প্রবীণদের জন্য ৪ লাখ ৭৫ হাজার এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫ লাখ টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি করপোরেট কর ২৭ দশমিক ৫ থেকে কমিয়ে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা, জাকাতকে আয়কর রিবেট হিসেবে স্বীকৃতি এবং উত্তরাধিকার কর চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যখাতে ২৫ শতাংশ বাজেট বৃদ্ধি করে ৫২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর আওতায় জাতীয় স্বাস্থ্য বিমা চালু, দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসায় ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি, ময়মনসিংহ ও বরিশালে আন্তর্জাতিক মানের সুপার-স্পেশালিটি হাসপাতাল স্থাপন এবং ৫০০ নতুন জিপিএস-ট্র্যাকড অ্যাম্বুলেন্স চালুর পরিকল্পনার কথা বলেছে এনসিপি।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ‘সোলার এনার্জি সোভারেনটি অ্যাক্ট’ প্রণয়নের প্রস্তাব করেছে এনসিপি। এর আওতায় সৌর পণ্যের ওপর আগামী পাঁচ বছর শূন্য শতাংশ কর নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া ছায়া বাজেটে ৬ হাজার কোটি টাকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্মসূচির মাধ্যমে এক বছরে ২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, ৩ হাজার অফ-গ্রিড গ্রামে সৌর মিনি-গ্রিড স্থাপন এবং ৫০ হাজার ডিজেলচালিত সেচপাম্পকে সৌরশক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।

ব্যাংক খাত সংস্কারে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রণয়ন, রাষ্ট্রীয় ‘ব্যাড ব্যাংক’ গঠন, সব তফসিলি ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থার প্রতিবেদন প্রকাশ এবং পুঁজিবাজারের আকার জিডিপির ৪০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি, দেশীয় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়ন, সরকারি ব্যয়ের রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং পোর্টাল চালু, গোপন সম্পদের ওপর বিশেষ কর এবং একটি স্বাধীন বাজেট অফিস প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব ছায়া বাজেটে রেখেছে এনসিপি।

দলটির নেতারা জানিয়েছেন, তাদের ৭১ দফা সংস্কার প্রস্তাব কেবল একটি বিকল্প বাজেট নয় বরং দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যহীন ও বিনিয়োগবান্ধব ‘বাংলাদেশ ২.০’ গঠনের একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ।

সম্পর্কিত