জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬

ও গণভোট

ক্লিক করুন

কেমন ছিল নবীজির (সা.) সেহরি ও ইফতার

‎ওলিউর রহমান
‎ওলিউর রহমান

ছবি: সংগৃহীত

‎সূর্যাস্তের পূর্ব মুহূর্ত। সামনে কয়েকটি কাঁচা-পাকা খেজুর, পাশে এক পেয়ালা পানি। দস্তরখানে বসে আছেন নবীজি (সা.)। সূর্যটা ডুবে গেলেই ইফতার করবেন। ক্ষুধা পেটে অপেক্ষার সময়টুকুতে মুখে উচ্চারিত হচ্ছে ক্ষমা ও করুণার দোয়া—‘হে ক্ষমাশীল প্রভু, আমাদের ক্ষমা করুন।’

‎আর আমাদের ইফতারের আগের মুহূর্ত? খাবার পরিবেশন ব্যস্ততায় কেটে যায় বরকতপূর্ণ সময়টুকু। পেয়াজু সব এল তো? বেগুনি বাদ পড়ল না তো? এইসব সামলাতে সামলাতেই মুয়াজ্জিনের কণ্ঠে মাগরিবের আজান ভেসে আসে। বাড়ির নারীরা অনেক সময় হেঁশেলেই দাঁড়িয়ে এক চুমুক পানি খেয়ে ভাজাভুজির কাজ শেষ করেন।

‎প্রতিদিন রোজা শুরু ও শেষের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত—সেহরি ও ইফতার। এ দুটি স্বতন্ত্র ফজিলতপূর্ণ আমলও। কিন্তু আমাদের সেহরি ও ইফতারে আমলের চেয়ে খাবারের ব্যাপারটাই যেন মূখ্য হয়ে ওঠে। অথচ নবীজির (সা.) রীতি ও অভ্যাস ছিল এর বিপরীত৷‎

নবীজীর (সা.) ইফতার

‎রাসূল (সা.) ইফতারের কিছুক্ষণ আগে দস্তরখান পেতে বসে সূর্যাস্তের অপেক্ষা করতেন। ইফতারের আগ মুহূর্ত সম্ভাব্য দোয়া কবুলের সময়। তাই এ সময় তিনি দোয়া করতেন। ‎

‎সূর্য ডুবে গেলে তিনি বিলম্ব করতেন না। দ্রুত ইফতার করা তাঁর সুন্নত। সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত—‎‘মানুষ ততদিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতদিন তারা ইফতার তাড়াতাড়ি করবে।’ (তিরমিযি: ৬৯৯; বুখারী)

‎খাদ্যতালিকা ছিল খুবই সাধারণ। সাহাবি আনাস (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) সাধারণত তাজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। তা না থাকলে শুকনা খেজুর। আর সেটিও না থাকলে কয়েক ঢোক পানি পান করেই রোজা ভাঙতেন।

‎কখনো পানিতে ভেজানো ছাতু দিয়ে ইফতার সেরে নিতেন নবীজী (সা.)। কখনো দুধ, কখনো যবের রুটিও থাকত—কিন্তু কোথাও আড়ম্বর ছিল না। (সহীহ মুসলিম: ১১০১)‎

নবীজীর (সা.) সেহরি

‎রাসূল (সা.) তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করে রাতের শেষ প্রহরে সেহরি গ্রহণ করতেন এবং যথাসম্ভব বিলম্ব করে সেহরি করতে উৎসাহ দিতেন। হাদিসে এসেছে, ‘মানুষ ততদিন কল্যাণে থাকবে, যতদিন তারা দ্রুত ইফতার ও বিলম্বে সেহরি করবে।’ (বুখারী, মুসলিম)‎

‎সেহরি গ্রহণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। শেষ রাতে সেহেরি গ্রহণকারীদের জন্য ফেরেশতারা বরকতের দোয়া করেন। ( মুসনাদে আহমদ)‎

‎অপর হাদিসে এসেছে, ‘তোমরা সেহেরি করো, কারণ সেহেরিতে বরকত রয়েছে।’ (বুখারী: ১৯২৩)

‎সেহরিতেও ছিল সরলতা—খেজুর, পানি, কখনো ছাতু বা সামান্য খাদ্য। আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন—‘সর্বোত্তম সেহরি হলো খেজুর।’ (আবু দাউদ: ২৩৪৫)‎

‎সরলতার শিক্ষা

‎নবীজীর (সা.) সেহরি ও ইফতার ছিল অল্প, কিন্তু বরকতময়। স্বাভাবিক সময়েও তিনি আড়ম্বরতা পছন্দ করতেন না; রমজানে তাঁর জীবন হয়ে উঠত আরও সংযমী।

‎কখনো মাসের পর মাস তাঁর ঘরে চুলা জ্বলত না। দীর্ঘ সময় কেটে যেত সেদ্ধ খাবার ছাড়াই। খেজুর ও পানি দিয়েই দিন পার হতো। তবু ছিল না অভিযোগ—ছিল কৃতজ্ঞতা। রমজানে তিনি প্রচুর সদকা করতেন৷ নিজের পানাহার নিয়ে বিচলিত ছিলেন না।‎

‎রমজান আমাদের টেবিলের বৈচিত্র্য বাড়ানোর মাস নয়; এটি ত্যাগ ও সংযমের মাস। আমরা কি নবীজীর সরলতার শিক্ষা অনুসরণ করছি, নাকি সেহরি, ইফতারকে সামাজিক প্রদর্শনীতে রূপ দিচ্ছি?

‎রকমারি খাবার দিয়ে আহার গ্রহণ ইফতার ও সেহেরির মুখ্য উদ্দেশ্য হতে পারে না। সেহেরি ও ইফতারের মুখ্য উদ্দেশ্য হলো—বরকত লাভ করা এবং আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করা। কেন না খেজুরের সরলতায় যে প্রশান্তি, তা শত পদে সাজানো টেবিলেও সবসময় পাওয়া যায় না।

  • মাওলানা ওলিউর রহমান: শিক্ষক, মাদরাসাতুল মুত্তাকীন, উত্তরা, ঢাকা‎

সম্পর্কিত