ডায়াবেটিক সেবা দিবস/ইনসুলিনের বদলে কোষ: টাইপ-১ ডায়াবেটিস কি নিয়ন্ত্রণের পথে

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ০৫
ইনসুলিন নিচ্ছেন একজন ডায়াবেটিক রোগী। ছবি: সংগৃহীত
ইনসুলিন নিচ্ছেন একজন ডায়াবেটিক রোগী। ছবি: সংগৃহীত

সেদিন সম্ভবত খুব বেশি দূরে নয় যেদিন টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষকে আর প্রতিদিন ইনসুলিনের ইনজেকশন নিতে হবে না। শরীরের ভেতরেই তৈরি হয়ে যাবে নতুন কোষ, যা নিজে থেকেই রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করবে। শোনাতে বিজ্ঞান-কল্পকাহিনির মতো মনে হলেও, সুইডেনের দুই খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই স্বপ্নকে বাস্তবের অনেকটাই কাছাকাছি নিয়ে এসেছেন।

ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট এবং কেটিএইচ রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির একদল গবেষক মানুষের স্টেম সেল থেকে ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ তৈরির একটি নতুন ও উন্নত পদ্ধতি খুঁজে বের করেছেন। তাঁদের এই গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল ‘স্টেম সেল রিপোর্টস’-এ। গবেষণায় দেখা গেছে, তৈরি করা এই কোষগুলো ল্যাবরেটরির পরীক্ষায় রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে সফল হয়েছে, আর ইঁদুরের শরীরে প্রয়োগ করার পর তা ডায়াবেটিস নিরাময় করতেও সক্ষম হয়েছে।

টাইপ-১ ডায়াবেটিস কেন হয়

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের পেছনের গল্পটা আসলে শরীরের নিজের বিরুদ্ধেই এক ধরনের যুদ্ধ। মানুষের অগ্ন্যাশয়ে ইনসুলিন তৈরি করে এমন কিছু বিশেষ কোষ থাকে। কোনো এক কারণে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম নিজেই এই কোষগুলোকে শত্রু ভেবে ধ্বংস করে ফেলে। ফলে, শরীর আর রক্ত থেকে গ্লুকোজ শোষণ করতে পারে না। শর্করার মাত্রাও নিয়ন্ত্রণে থাকে না। এর একটি সম্ভাব্য সমাধান হলো, ধ্বংস হয়ে যাওয়া কোষগুলোর জায়গায় নতুন কোষ প্রতিস্থাপন করা। তবে সমস্যা হলো, স্টেম সেল থেকে এমন কোষ তৈরির আগের পদ্ধতিগুলোতে প্রায়ই ফলাফল ছিল অনিশ্চিত। কখনো কাজ হতো, কখনো হতো না।

ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ডিপার্টমেন্ট বফ মলিকিউলার মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারির অধ্যাপক এবং স্পাইবার টেকনোলজিস এবি-র গবেষক সিকিন উ-র সঙ্গে যৌথভাবে গবেষণাপত্রটির করেসপন্ডিং লেখক পার-ওলোফ বারগ্রেন বলেন, তাঁরা এমন একটি পদ্ধতি তৈরি করেছেন যা নির্ভরযোগ্যভাবে একাধিক হিউম্যান স্টেম সেল লাইন থেকে উচ্চমানের ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ তৈরি করতে পারে। এটি ভবিষ্যতে রোগী-ভিত্তিক সেল থেরাপির নতুন দ্বার খুলে দিতে পারে, যেখানে ইমিউন রিজেকশন বা শরীরের প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি অনেকটাই কমে আসবে।

কীভাবে উন্নত হলো কোষ উৎপাদন প্রক্রিয়া

নতুন এই পদ্ধতিতে আগের তুলনায় আরও পরিণত এবং বিশুদ্ধ ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ পাওয়া গেছে। ল্যাবরেটরি পরিবেশে এই কোষগুলো ইনসুলিন নিঃসরণ করতে সক্ষম হয়েছে এবং গ্লুকোজের প্রতি চমৎকারভাবে সাড়া দিয়েছে।

গবেষকরা যখন এই কোষগুলো ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ইঁদুরের শরীরে প্রতিস্থাপন করেন, তখন প্রাণিগুলো ধীরে ধীরে নিজেদের রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ফিরে পায়। এই প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াটি করা হয়েছিল চোখের সামনের প্রকোষ্ঠে। এই কৌশলের মাধ্যমে গবেষকরা ন্যূনতম কাটাছেঁড়া করেই দীর্ঘ সময় ধরে কোষের বৃদ্ধি ও কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করতে পেরেছেন।

পার-ওলোফ বারগ্রেন এ বিষয়ে বলেন, তাঁরা লক্ষ্য করেছেন প্রতিস্থাপনের পর কোষগুলো ধীরে ধীরে পরিণত হয়ে উঠেছে এবং কয়েক মাস ধরে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা ধরে রেখেছে। এটি ভবিষ্যতের চিকিৎসায় এই পদ্ধতির অপার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়।

আগের পদ্ধতির চ্যালেঞ্জগুলো

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের জন্য স্টেম সেল থেরাপি ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। কিন্তু আগের পদ্ধতিগুলোর সামনে ছিল দুটি বড় বাধা।

প্রথমত, স্টেম সেলগুলো প্রায়ই কাঙ্ক্ষিত কোষের পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত কোষেও পরিণত হয়ে যেত, যা শরীরে নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিত।

দ্বিতীয়ত, তৈরি হওয়া ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষগুলো প্রায়ই যথেষ্ট পরিণত হতো না, ফলে সেগুলো গ্লুকোজের প্রতি ভালোভাবে সাড়া দিতে পারত না।

যেভাবে সমাধান হলো এই সমস্যা

গবেষকদের মতে, কোষ কালচার বা চাষের ধাপগুলোতে কিছু পরিবর্তন এনে এবং কোষগুলোকে নিজেরাই ত্রি-মাত্রিক গুচ্ছ বা থ্রিডি ক্লাস্টার তৈরি করার সুযোগ দিয়ে তাঁরা অনেক অবাঞ্ছিত কোষ দূর করতে সক্ষম হয়েছেন। এর ফলে কোষগুলো গ্লুকোজের প্রতি সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রেও আরও উন্নত ক্ষমতা অর্জন করেছে।

গবেষণাপত্রটির আরেক লেখক এবং ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের ডিপার্টমেন্ট অব ক্লিনিক্যাল সায়েন্স, ইন্টারভেনশন অ্যান্ড টেকনোলজির অধ্যাপক ফ্রেডরিক ল্যানার বলেন, আগে টাইপ-১ ডায়াবেটিসের জন্য স্টেম সেলভিত্তিক চিকিৎসার উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়ানো বেশ কয়েকটি সমস্যার সমাধান দিতে পারে এই নতুন পদ্ধতি। তাঁর ভাষায়, এর ওপর ভিত্তি করে তারা এখন টাইপ ১ ডায়াবেটিসের চিকিৎসার লক্ষ্যে এটিকে ক্লিনিক্যাল প্রয়োগের দিকে নিয়ে যাওয়ার কাজ করবেন।

এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট এবং কেটিএইচ রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে। গবেষণাটিতে অর্থায়ন করেছে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান—সুইডিশ রিসার্চ কাউন্সিল, স্টিন্ট, ক্নুট অ্যান্ড অ্যালিস ওয়ালেনবার্গ ফাউন্ডেশন, নভো নরডিস্ক ফাউন্ডেশন, ইউরোপিয়ান রিসার্চ কাউন্সিলের অ্যাডভান্সড গ্রান্ট, এরলিং-পারসন ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন, জোনাস অ্যান্ড ক্রিস্টিনা আফ জোকনিক ফাউন্ডেশন, সুইডিশ ডায়াবেটিস অ্যাসোসিয়েশন, ভিনোভা এবং ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ প্রোগ্রাম ইন ডায়াবেটিস।

তথ্যসূত্র: স্টেম সেল রিপোর্টস, ১৬ এপ্রিল ২০২৬-এ প্রকাশিত

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত