নিয়াজ মোরশেদের সাক্ষাৎকার

‘দাবাকে সঠিক ট্র্যাকে ফেরানোই আমার লক্ষ্য’

প্রকাশ : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ৪০
স্ট্রিম গ্রাফিক

১৯৮৭ সাল বাংলাদেশের দাবার ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকা একটি বছর। সে বছরই মাত্র ২১ বছর বয়সে নিয়াজ মোরশেদ বাংলাদেশের প্রথম গ্রান্ডমাস্টার হন। তাঁর হাত ধরে বিশ্বদাবার মানচিত্রে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। এরপর আরও চারজন বাংলাদেশি গ্র্যান্ডমাস্টার হয়েছেন, কিন্তু ২০০৮ সালে এনামুল হোসেন রাজীবের পর সেই তালিকায় আর যোগ হয়নি নতুন কোনো নাম।

ফাহাদ রহমান গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার দ্বারপ্রান্তে, মনন রেজা নীড় তাঁর অসাধারণ সম্ভাবনার ছাপ দেখিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের পেছনে আছে আরও একদল তরুণ দাবাড়ু। কিন্তু বিগত কয়েক বছর পর্যাপ্ত কোচিং, অর্থায়নের অভাব, দুর্বল অবকাঠামো এবং সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতা বারবার আটকে দিচ্ছিল বাংলাদেশের দাবার অগ্রযাত্রা।

একসময় যিনি দেশের দাবার সাফল্যের প্রতীক, সেই নিয়াজ মোরশেদ এবার তাকাচ্ছেন দাবার ভবিষ্যতের দিকে। বাংলাদেশের দাবার সোনালি অতীত, দীর্ঘ গ্র্যান্ডমাস্টার-খরা, বর্তমানের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে স্ট্রিমের মুখোমুখি হয়েছেন নিয়াজ মোরশেদ।

স্ট্রিম: দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার হিসেবে ১৯৮৭ সালের সেই ঐতিহাসিক অর্জনকে আজ কীভাবে দেখেন?

নিয়াজ মোরশেদ: অনেক আগের কথা, সব স্মৃতি হয়তো স্পষ্টভাবে এখন মনেও নেই। তবে অনুভূতির জায়গা থেকে সত্যিই ভালো লাগে। কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটি তালিকা দেখছিলাম যে কোন দেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার কে হয়েছেন। সেখানে খেয়াল করলাম, ফ্রান্স, চীন কিংবা ভারতের মতো দেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার আমার পরে এসেছে। যেটি দেশের জন্য নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক অর্জন ছিল। তবে আফসোস, সেই অপ্রত্যাশিত সূচনা ও সাফল্যকে পরবর্তী সময়ে আমরা ধরে রাখতে পারিনি।

স্ট্রিম: তখনকার খেলোয়াড় নিয়াজ মোরশেদ আর আজকের নিয়াজ মোরশেদের মধ্যে প্রধান পার্থক্য কী?

নিয়াজ মোরশেদ: তখন আমার মধ্যে প্রবল আবেগ ও নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল, যার পেছনে ছুটতাম। এখন বয়স হয়েছে, খেলোয়াড় হিসেবে নতুন কিছু করার সুযোগ আর নেই। তবে এখন বড় পার্থক্য হলো, পরবর্তী প্রজন্ম যাতে পথ খুঁজে পায় সেই চেষ্টা করা। সত্যি বলতে, খেলোয়াড় হিসেবে আগের সময়টাই ভালো ছিল।

স্ট্রিম: খেলোয়াড় থেকে এবার সাধারণ সম্পাদকের নতুন দায়িত্ব। এই ভূমিকায় আপনার প্রধান লক্ষ্য কী?

নিয়াজ মোরশেদ: আমি পেশাদার বা দীর্ঘমেয়াদী অর্গানাইজার হিসেবে এখানে আসিনি; তিন-চার মাসের একটি স্বল্প মেয়াদী দায়িত্ব নিয়ে এসেছি। এখানে এসে যেটা দেখলাম, সব জায়গায় চরম স্থবিরতা এবং বেশ নাজুক পরিস্থিতি। গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার সম্ভাবনা যেসব উদীয়মান খেলোয়াড় ও শিশুদের রয়েছে তারা সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পাচ্ছে না। তাই আমার মূল লক্ষ্য হলো এই স্বল্প সময়ে কীভাবে সবকিছুকে রাইট ট্র্যাকে আনতে হয়, তার একটি সঠিক উদাহরণ স্থাপন করে যাওয়া। আমি লং টার্ম অর্গানাইজিংয়ে আগ্রহী নই, তবে বাচ্চাদের কোচিং করাতে আমি খুব আগ্রহী। কারণ এখন যে অবস্থা দেখছি, আমি ধরে সঠিক দিশা না দিলে সামনে আরও কঠিন পরিস্থিতি হবে।

স্ট্রিম: বাংলাদেশের দাবার ক্ষেত্রে আপনার চোখে প্রধান শক্তি ও দুর্বলতাগুলো কী?

নিয়াজ মোরশেদ: আমাদের মূল শক্তি হলো ঐতিহ্য; আমরা শূন্য থেকে শুরু করছি না। প্রত্যাশার আগে যেমন আমরা গ্র্যান্ডমাস্টার পেয়েছি, ঠিক তেমনি পরেও আমাদের গ্র্যান্ডমাস্টার এসেছে। আর দুর্বলতা হলো সাংগঠনিক দক্ষতা ও অর্থের অভাব, পাশাপাশি সমন্বয়ের ঘাটতি। সময়ের সঙ্গে দাবায় যে আধুনিক পরিবর্তন এসেছে, সেটির সঙ্গে আমরা এখনো মানিয়ে নিতে পারিনি।

স্ট্রিম: ২০০৮ সালের পর দীর্ঘ ১৮ বছর নতুন কোনো গ্র্যান্ডমাস্টার না আসাটা কী পূর্বের সংগঠকদের গাফিলতির অভাব?

নিয়াজ মোরশেদ: একে ঠিক গাফিলতি বলব না, মূল অভাবটা ছিল রিয়ালাইজেশনের (অনুধাবনের)। বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করতে ঠিক কী ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন, সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণার অভাব ছিল। আমাদের ভাবনার চেয়েও বাস্তব ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি এবং সুপরিকল্পিত কাজ করা দরকার ছিল।

স্ট্রিম: ফাহাদ ও নীড়ের মতো আন্তর্জাতিক মাস্টারদের গ্র্যান্ডমাস্টার হওয়ার সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?

নিয়াজ মোরশেদ: ফাহাদ এখন সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময়, কারণ তাঁর আর মাত্র একটি নর্ম দরকার। তাঁকে বারবার মানসম্পন্ন ওপেন টুর্নামেন্টে খেলাতে হবে। অন্যদিকে নীড় বয়সের তুলনায় খুবই দক্ষ। সে মাঝেমধ্যেই গ্র্যান্ডমাস্টার নর্মের কাছাকাছি পৌঁছাচ্ছে। এই দুজনের জন্যই নিয়মিত কোয়ালিটি টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া এবং ফ্যাসিলিটি দেওয়াটা এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এদের ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে কোচিংয়ের চেয়ে আন্তর্জাতিক এক্সপোজারটাই মূল। এ ছাড়া সাকলাইন, সুব্রত কিংবা তাহসিনের মতো তরুণদের প্রতি নজর দেওয়া প্রয়োজন।

স্ট্রিম: ফাহাদ বা নীড়ের বাইরে নতুন করে আর কাকে সম্ভাবনাময় মনে হয়?

নিয়াজ মোরশেদ: বয়সের দিক থেকে এখন পর্যন্ত রিমার্কেবল কাউকে চোখে পড়ছে না। নতুন প্রতিভা খুঁজে আনতে হবে, বিশেষ করে আন্ডার-১০ থেকে। আবরার, আজানদের মতো ছোট বয়স থেকেই খেলোয়াড় তুলে এনে গড়ে তুলতে হবে।

স্ট্রিম: তাদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রধান বাধা ও সীমাবদ্ধতা কী?

নিয়াজ মোরশেদ: প্রথম বড় বাধা হলো কোয়ালিটি টুর্নামেন্ট না পাওয়া ও এর উচ্চ ব্যয়। দ্বিতীয়ত, নিষ্ঠার অভাব। যেমন তাহসিন পড়াশোনা ও দাবা দুটো একসঙ্গে সামলাচ্ছে, যা কঠিন। শুধু এই দু-একজনের ওপর নির্ভর না করে ১০ বছরের নিচের বয়সশ্রেণি থেকে আবরার ও আজানদের মতো খেলোয়াড় তুলে আনতে হবে।

স্ট্রিম: খেলোয়াড় তুলে আনার ক্ষেত্রে ফেডারেশনের সঠিক ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত?

নিয়াজ মোরশেদ: পুরুষ বা ওপেন ক্যাটাগরির প্রতিষ্ঠিত প্লেয়ারদের বেশি বেশি আন্তর্জাতিক এক্সপোজার দিতে হবে। তবে নারী এবং জুনিয়র দাবাড়ুদের ক্ষেত্রে কোচিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন ১০ বছর বয়সী ওয়ারিসা হায়দার ইতিমধ্যেই ১৮০০ রেটিং স্পর্শ করেছে; আমাদের তাঁকে সঠিক কোচিং সুবিধা দিতে হবে।

স্ট্রিম: জেলা বা স্কুল পর্যায় থেকে তরুণ প্রতিভা অন্বেষণ ও পরিচর্যা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?

নিয়াজ মোরশেদ: দেশে স্কুল টুর্নামেন্ট বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম যথেষ্ট আছে। সমস্যাটা হলো একবার প্রতিভা আইডেন্টিফাই করার পর আমরা তাদের কীভাবে নার্সারিং করব, সেই দীর্ঘমেয়াদি প্ল্যানটা আমাদের নেই। তাই সরকারি-বেসরকারি সাপোর্ট নিয়ে সেই পরিচর্যার একটি স্থায়ী প্ল্যান তৈরির চেষ্টা করছি।

স্ট্রিম: নারী দাবাড়ুদের বিকাশে কী ধরনের পদক্ষেপ দরকার?

নিয়াজ মোরশেদ: নারী দাবায় দুটি সমস্যা দেখা যায়–প্রথমত, তরুণ ট্যালেন্টের ঘাটতি। দ্বিতীয়ত, যারা জাতীয় দলে আছে তারা একটি পর্যায়ে আটকে গিয়ে আর এগোতে পারছে না। নারী দাবাড়ুদের পুরোটাই নিবিড় কোচিং এবং রিইনফোর্সমেন্টের মাধ্যমে টেনে তুলতে হবে। পুরুষ দাবার চেয়ে নারী দাবায় কোচিংয়ের ভূমিকা অনেক বেশি কার্যকর।

কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটি তালিকা দেখছিলাম যে কোন দেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার কে হয়েছেন। সেখানে খেয়াল করলাম, ফ্রান্স, চীন কিংবা ভারতের মতো দেশের প্রথম গ্র্যান্ডমাস্টার আমার পরে এসেছে। যেটি দেশের জন্য নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক অর্জন ছিল। তবে আফসোস, সেই অপ্রত্যাশিত সূচনা ও সাফল্যকে পরবর্তী সময়ে আমরা ধরে রাখতে পারিনি।

স্ট্রিম: যেসব অভিভাবক ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তার কারণে সন্তানদের দাবায় রাখতে চান না, তাদের উদ্দেশে কী বলবেন?

নিয়াজ মোরশেদ: অভিভাবকদের জোর করে বোঝানো আসলে সম্ভব নয়। আমাদের প্রধান কাজ হলো দাবার সার্বিক পরিবেশের উন্নতি ঘটিয়ে রোল মডেল হিসেবে তৈরি করা, যাতে তাঁরা নিজেরাই তাদের সন্তানদের দাবায় যুক্ত করতে উৎসাহিত হন।

স্ট্রিম: বর্তমান সরকার ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে কেমন সহায়তা পাচ্ছেন?

নিয়াজ মোরশেদ: অত্যন্ত ভালো সহযোগিতা পাচ্ছি। খেলোয়াড়দের ১ লাখ টাকা করে ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্তটি তাঁদের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক শক্তি অনেক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। নতুন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের আন্তরিকতার কারণেই এগুলো সম্ভব হচ্ছে। উনি স্কুলে দাবা চালুসহ আর্থিক সাপোর্ট বাড়াতে কাজ করছেন।

স্ট্রিম: কর্পোরেট বা বেসরকারি খাতের সাড়া কেমন?

নিয়াজ মোরশেদ: বেসরকারি খাত থেকে আমরা বেশ ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি। একাধিক ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান আসন্ন অলিম্পিয়াডসহ ভবিষ্যৎ টুর্নামেন্টে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

স্ট্রিম: আপনার এই স্বল্প মেয়াদে ভবিষ্যৎ দাবার জন্য কী রোল মডেল বা পরিবর্তন রেখে যেতে চান?

নিয়াজ মোরশেদ: আমি মূলত চারটি বড় লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। প্রথমত দাবার অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্পন্ন করা। দ্বিতীয়ত ফাহাদকে প্রয়োজনীয় টুর্নামেন্ট খেলিয়ে দ্রুত দীর্ঘদিনের গ্র্যান্ডমাস্টার খরা দূর করা। তৃতীয়ত, পিছিয়ে পড়া নারী দাবাড়ুদের জন্য আধুনিক কোচিং নিশ্চিত করা। চতুর্থত, শিশুদের জন্য নিবিড় ও দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ প্রোগ্রাম চালু করা, যাতে সম্প্রতি চীনে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের মতো হতাশাজনক পারফরম্যান্স আর দেখতে না হয়।

স্ট্রিম: ভবিষ্যতে যারা নির্বাচনের মাধ্যমে প্যানেলে আসবেন, তাদের জন্য আপনার কোনো পরামর্শ থাকবে কি?

নিয়াজ মোরশেদ: আগে নতুন প্যানেল নির্বাচিত হয়ে আসুক, সময় হলেই পরামর্শ দেওয়া যাবে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত