ধেয়ে আসছে হাজার বছরের ‘শক্তিশালী’ এল নিনো, ২০২৭ সালে পুড়বে বিশ্ব

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

স্মরণকালের শক্তিশালী এল নিনো আসছে। ছবি: সংগৃহীত
স্মরণকালের শক্তিশালী এল নিনো আসছে। ছবি: সংগৃহীত

প্রশান্ত মহাসাগরে ঘনিয়ে আসা ‘এল নিনো’ স্মরণকালের শক্তিশালী রূপ নিচ্ছে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস। ফলে ২০২৭ সাল হতে যাচ্ছে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উষ্ণ বছর।

মেট অফিসের বার্তায় বলা হয়, ক্রমশ দাপট বাড়তে থাকা এল নিনোর প্রভাবে আসছে বছরে আবহাওয়ার চরম বিরূপ দেখা যেতে পারে। ইতোমধ্যে বিশ্বে আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ভারতে এবার মৌসুমের স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হয়নি। আটলান্টিকের স্বাভাবিক হারিকেন প্রবণতাও হচ্ছে না।

যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাসংস্থা বার্কলে আর্থের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. জিক হাউসফাদার বলেছেন, ‘এই পূর্বাভাস সত্যি হলে বলাই যায়– এটি হয়তো ৫০০ এমনকি এক হাজার বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো হতে যাচ্ছে।’

এল নিনো নিরক্ষরেখা, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল এবং অয়ন বায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্নের ফলে তৈরি হয়। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট প্রশান্ত মহাসাগরের স্বাভাবিক আবহাওয়ার বিপরীতের এই পরিস্থিতির প্রভাবে প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ায় বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়।

সাগরের বর্তমান তাপ পরিমাপে দেখা যাচ্ছে যে, তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশ ওপরে রয়েছে। যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, বছরের শেষের দিকে এল নিনো তার চূড়ান্ত রূপের কাছাকাছি পৌঁছানোর সাথে সাথে এই উষ্ণতা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে।

নিরক্ষরেখা পৃথিবীকে উত্তর ও দক্ষিণ গোলার্ধে ভাগ করেছে। এর দুই পাশের ২৩.৫ ডিগ্রি অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত প্রশান্ত মহাসাগরের অংশটি হলো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চল, যার পূর্বে দক্ষিণ আমেরিকা এবং পশ্চিমে অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। এই অঞ্চলের ওপর দিয়ে সাধারণত পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে অর্থাৎ আমেরিকা থেকে অস্ট্রেলিয়ার দিকে নিয়মিত শক্তিশালী অয়ন বায়ু প্রবাহিত হয়।

স্বাভাবিক অবস্থায় এই বায়ুর ধাক্কায় আমেরিকার উপকূলের গরম পানি অস্ট্রেলিয়ার দিকে চলে যায় এবং সমুদ্রের তলদেশ থেকে ঠান্ডা পানি ওপরে উঠে এসে আবহাওয়ায় ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু কোনো প্রচলিত নিয়ম ছাড়াই যখন এই অয়ন বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন গরম পানি পশ্চিমে যেতে পারে না এবং পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে আটকে থেকে পানির তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এই ঘটনা এল নিনো নামে পরিচিত।

প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘমেয়াদী স্বাভাবিক গড়ের তুলনায় ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি ওপরে থাকলে বিজ্ঞানীরা তাকে এল নিনো ঘোষণা করেন। এল নিনোর ফলে বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত তাপ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ঘটায়। অতিরিক্ত তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে খরা, বন্যার মতো আবহাওয়াজনিত চরম বিপর্যয় ডেকে আনে।

মেট অফিসের দীর্ঘমেয়াদী আবহাওয়ার বার্তা বিশেষজ্ঞদের প্রধান অধ্যাপক অ্যাডাম স্কেইফে বলেছেন, ‘এটি নজিরবিহীন। আগের কোনো পূর্বাভাসে আমি এল নিনোর এত তীব্র সংকেত দেখিনি।’

সাগরের বর্তমান তাপ পরিমাপে দেখা যাচ্ছে, স্বাভাবিকের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশ ওপরে তাপমাত্রা। যুক্তরাজ্যের মেট অফিসের সর্বশেষ পূর্বাভাস, বছরের শেষ দিকে এল নিনো চূড়ান্ত রূপের কাছাকাছি পৌঁছালে উষ্ণতা ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যেতে পারে।

জলবায়ু বিজ্ঞানী জিক হাউসফাদার বলেছেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে এল নিনোটি ঘনীভূত হতে দেখছি। এজন্য আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলছি, এটি রেকর্ড সৃষ্টিকারী এল নিনো হতে যাচ্ছে।’

মেট অফিসের বাইরে আরও কয়েকটি দেশের আবহাওয়া অফিস প্রায় একই সতর্কবার্তা দিয়েছে। কেউ কেউ সাগরের উষ্ণতা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে যাওয়ার আভাস দিয়েছে।

তবে এল নিনো তীব্র হয়ে ওঠার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি কোনো প্রভাব আছে কিনা, নিশ্চিত নন আবহাওয়াবিদেরা। বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশন (ডব্লিউএমও) বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তন এল নিনো পরিস্থিতি বার বার ঘটায় অথবা তীব্রতা বৃদ্ধি করে– এমন কোনো প্রমাণ নেই। অর্থাৎ বিষয়টি নিয়ে আরও নিবিড় পর্যবেক্ষণ, তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং বিস্তর বৈজ্ঞানিক গবেষণা দরকার।

এল নিনোর প্রভাবে এবার দক্ষিণ এশিয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু কম বৃষ্টিপাত ঘটাতে পারে। দেখা যাচ্ছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যভাগে বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় কমে গেছে।

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত

ধেয়ে আসছে হাজার বছরের ‘শক্তিশালী’ এল নিনো, ২০২৭ সালে পুড়বে বিশ্ব