নেপালে আকস্মিক বন্যায় অস্বাভাবিক গরমকেও দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

প্রকাশ : ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৯: ৫৪
নেপালে আকস্মিক বন্যার কারণ হিসেবে হিমবাহ ধসকে দায়ী করা হচ্ছে, এই ধসের কারণ হতে পারে সাম্প্রতিক তীব্র গরম। ছবি: সংগৃহীত।
নেপালে আকস্মিক বন্যার কারণ হিসেবে হিমবাহ ধসকে দায়ী করা হচ্ছে, এই ধসের কারণ হতে পারে সাম্প্রতিক তীব্র গরম। ছবি: সংগৃহীত।

নেপাল-তিব্বতে আকস্মিক বন্যার সঙ্গে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্পর্ক থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জলবায়ু সংকট বরফাবৃত পর্বত এবং মেরু অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলছে এবং লাখো মানুষের জীবনকে ফেলছে ঝুঁকিতে।

স্যাটেলাইটে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, হিমবাহ ধসে বরফ, পানি ও কাদার তীব্র স্রোতে প্রলয়ঙ্করী রূপ নিয়েছিল ভোতেকোশি নদী। হিমবাহের এই ধসের পেছনে এ বছরের তীব্র গরম প্রভাব রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যদিও কেন এই বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়ে গবেষণা শুরু হয়েছে। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, তীব্র গরমে পর্বতের গায়ে আটকে থাকা হিমবাহের সংযোগ আলগা হয়ে সেটি ধসে পড়েছে। ধসের সময় বর্ষায় নরম হয়ে আসা পর্বতের মাটিও কাদা হয়ে ঢলের সঙ্গে তীব্র গতিতে নেমে এসেছিল। এই ঢলকে আরও বিধ্বংসী করেছিল নেমে আসা ছোট-বড় পাথর।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমবাহের প্রাচীর থেকে একটি বিশালাকার অংশ খসে পড়ার এই ঘটনাটি ঘটেছে অস্বাভাবিক গরমের মধ্যে। ধারণা করা হচ্ছে, তীব্র গরমের কারণে সেখানকার বরফ গলে গিয়েছিল। এতে পাথর ও বরফের ফাটলগুলোর মধ্যে পানি জমে এদের গাঁথুনি আলগা করে দেয়।

যুক্তরাজ্যের ব্রিটিশ অ্যান্টার্কটিক সার্ভের হিমবাহ বিশেষজ্ঞ ড. হ্যামিশ প্রিটচার্ড জানান, এই বিপর্যয় ঘটার দুই দিন আগেই সেখানকার ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বিগত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। দুর্ঘটনাস্থল থেকে মাত্র ৬ মাইল (১০ কিলোমিটার) দূরে তাঁর গবেষক দলের বসানো সেন্সর থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।

তিনি আরও জানান, বছরের শুরু থেকেই এ অঞ্চলজুড়ে একাধিক তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। এর মধ্যেই বর্ষা মৌসুম। বর্ষায় এখানকার মাটি অতিরিক্ত পানি শুষে নেয় এবং নদীগুলোও উপচে পড়ে।

নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে বৈশ্বিক উষ্ণতা তীব্রতর হওয়ায় হিমবাহ এবং দীর্ঘদিনের তুষারাবৃত পার্বত্য ঢালের বরফ গলছে। জীবাশ্ম জ্বালানি যেমন তেল-গ্যাস এবং কয়লা পুড়িয়ে শক্তি উৎপাদন চলতে থাকায় পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে দ্রুত গতিতে। যার প্রভাব প্রকট হচ্ছে প্রকৃতিতে।

ফলে নেপালে আকস্মিক বন্যা বিপর্যয় ডেকে আনবে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। ২০২৩ সালে জাতিসংঘের শীর্ষ বৈজ্ঞানিক পরামর্শক সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছিলে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্থায়ী বরফাচ্ছন্ন এলাকা, পুরনো তুষারে আচ্ছাদিত তুন্দ্রা অঞ্চল থেকে শুরু করে পার্বত্য হিমবাহগুলো ক্রমশ আরও অস্থিতিশীল হয়ে উঠবে।

স্যাটেলাইট ছবিতে লাংতাংয়ের উত্তর দিকে হিমবাহ ধসে পড়ার দৃশ্য বিশ্লেষণ
স্যাটেলাইট ছবিতে লাংতাংয়ের উত্তর দিকে হিমবাহ ধসে পড়ার দৃশ্য বিশ্লেষণ

ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের এক প্রতিবেদনে আগেই বলা হয়েছিল, ‘বৈশ্বিক উষ্ণায়নে তাপমাত্রা আর অল্প বাড়লেও প্রভাব হবে মারাত্মক। বিশেষ করে গত কয়েক বছরের তীব্র গরম বরফে ঢাকা অঞ্চলের ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও বিপর্যয়ের মাত্রা দু’টোই বাড়িয়ে দিয়েছে। হিমবাহের সংকোচন এবং বরফ গলে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট বন্যা, ভূমিধস ও সুপেয় পানির সংকট বিশ্বজুড়ে পার্বত্য অঞ্চলগুলোর জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

যুক্তরাজ্যের কিল ইউনিভার্সিটির ফিজিক্যাল জিওগ্রাফির জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. রিচার্ড ওয়ালার বলেন, ‘উঁচু পর্বতগুলোর হিমশীতল ঢাল আসলে বহুদিনের জমাট বরফ, তুষারস্তর এবং হিমবাহের জোড়াতালির মাধ্যমে গঠিত। এই বরফ জমা জোড়াতালিগুলো যখন গলে যায়, ঠিক তখনই নেপাল-তিব্বতের মতো ভয়াবহ বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়।'

বরফ গলে যাওয়ার এই প্রক্রিয়াটি এ অঞ্চলের চিরচেনা রূপ ও ভৌগলিক স্থায়িত্ব বদলে দিচ্ছে। হিমবাহ গলিয়ে নতুন হ্রদ তৈরি করছে অথবা বিস্তার ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে বহু নদীর উৎপত্তি এবং ভাটি অঞ্চলের বিপুল জনগোষ্ঠীর খাওয়ার পানির সরবরাহকে হুমকির মুখে ফেলছে। বিশেষ করে এশিয়ার বড় অংশে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো হিমবাহ থেকে নেমে আসা নদীগুলোর ওপর শত কোটি মানুষ প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল।

বিজ্ঞানীরা বেশ নিশ্চিতভাবেই বলছেন, মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণেই হিমবাহগুলো গলছে। যার প্রভাবে আল্পস থেকে আন্দিজ পর্বতমালা পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে হিমবাহে ধস নেমেছে। এমনকি একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নেপালের লাংটাং অববাহিকা এলাকায় ১৯৬৪ সালের পর থেকে হিমবাহ গলে যাওয়ার হার চার গুণেরও বেশি বেড়েছে।

এতে করে হিমালয় কোলের নেপালে বার বার বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে, বিপুল প্রাণহানি ঘটছে। ২০২৫ সালেও ভোতেকোশিতে বন্যা হয়েছিল। ২০১৫ সালে লাংতাং লিরুং পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিকম্পের পর তুষারধসে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল লাংতাং গ্রাম।

বুধবারের বিপর্যয়কারী বন্যার পর উদ্ধারকারীরা এখন জীবিত-মৃতদের উদ্ধারে ব্যস্ত। এরই মধ্যে শঙ্কা জাগছে, এরকম বিপর্যয় আরও নেমে আসতে পারে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

Ad 300x250
লেটেস্ট
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত