মাহজাবিন নাফিসা
-a0f295-720x405.webp)
নাজমা আক্তারের (ছদ্ম নাম) সকাল শুরু হয় পানির খোঁজে। একটু নিরাপদ ও কম লবণাক্ত পানির আশায় তাঁকে হাঁটতে হয় অনেকটা দূর। সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে সূর্য চড়ে বসে মাথার ওপর। তারপর রান্না, সন্তান, সংসার, কখনো মাঠের কাজ। কিন্তু প্রতিদিনের এই চেনা লড়াইয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় আরেক সংগ্রাম—‘প্রজনন স্বাস্থ্য’।
সমুদ্রের পানি উপকূলের দিকে এগিয়ে এলে নদী ও পুকুরের পানি তো নোনা হয়ই, সঙ্গে বদলে যায় মানুষের প্রতিদিনের জীবনও। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের অনেক এলাকায় নিরাপদ মিঠাপানি পাওয়া এখন বছরের নির্দিষ্ট সময়ের ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা বাড়ে, আর তখন খাবার পানি থেকে গোসল, কাপড় ধোয়া ও মাসিকের পরিচ্ছন্নতা—সবকিছুর জন্যই নারীদের বাড়তি ঝুঁকি নিতে হয়। এই দীর্ঘস্থায়ী পানিসংকটের সবচেয়ে কম আলোচিত প্রভাবগুলোর একটি পড়ছে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে।
এই সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে লবণাক্ততা। সমুদ্রের পানি লোকালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, শুষ্ক মৌসুমে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং কিছু এলাকায় মানুষের পানি ব্যবস্থাপনার ধরন—সব মিলিয়ে উপকূলের পুকুর, নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎসে লবণ বাড়ছে। ব্র্যাক এনজিওর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের প্রায় ২০ শতাংশ ভূমি উপকূলীয় এলাকার মধ্যে পড়ে এবং এই এলাকার অর্ধেকের বেশি জমি কোনো না কোনো মাত্রায় লবণাক্ততার প্রভাবে রয়েছে।
উপকূলীয় এলাকার অর্ধেকেরও বেশি কোনো না কোনো মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। সাধারণত বর্ষাকালে, জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে, লবণাক্ততা তুলনামূলক কম থাকে। বিপরীতে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের সঙ্গে উপকূলের মিঠাপানির উৎসে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে।

কিছু এলাকায় পরিস্থিতি এতটাই তীব্র যে গভীর নলকূপের পানিও লবণাক্ত। ব্র্যাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপকূলের কিছু গ্রামে ৫০০ থেকে ৭৫০ ফুট গভীর নলকূপ থেকেও লবণাক্ত পানি উঠছে। ফলে পানি পাওয়া গেলেও সেটি সবসময় নিরাপদ বা ব্যবহারযোগ্য মিঠাপানি নয়।
ফলে, খাবার পানি বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে নারীরা নিজেদের শরীরের পরিচ্ছন্নতার জন্য লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হন।
উপকূলীয় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের সঙ্গে লবণাক্ত পানির সম্পর্ক সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় মাসিকের সময়।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপির বাংলাদেশ কার্যালয় উপকূলীয় নারীদের সঙ্গে কাজ করে দেখেছে, অনেক নারী মাসিকের সময় কাপড় ব্যবহার করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত মিঠাপানি না থাকায় লবণাক্ত পানি দিয়েই তা পরিষ্কার করতে হয়। এটি স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জার্নাল ‘পাবমেড’ এর ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও বাংলাদেশের উপকূলীয় নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য ও লবণাক্ত পানির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের ৯৫ দশমিক ৭ শতাংশ দৈনন্দিন কাজে লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভর করতেন। তাদের ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ মাসিকজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার কথা জানিয়েছেন। গবেষণায় লবণাক্ত পানির সংস্পর্শ এবং মাসিকের স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
‘ওয়াইলি অনলাইন লাইব্রেরি’তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, লবণাক্ত পানি দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করলে যৌন ও প্রজনন অঙ্গের সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালা, চুলকানি ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় উপকূলীয় নারীদের ক্ষেত্রে র্যাশ, ছত্রাকের সংক্রমণ এবং মূত্রনালির সংক্রমণের মতো সমস্যার কথা উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ ত্বকে জ্বালাপোড়ার কথা জানিয়েছেন। একই গবেষণায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ চুল পড়ার সমস্যার কথাও বলেছেন।
গবেষকরা লবণাক্ত পানির সংস্পর্শের সঙ্গে শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পেয়েছেন।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—লবণাক্ত পানির কারণে নারীদের সব ধরনের প্রজনন সমস্যা সরাসরি হয়, এমন দাবি গবেষণাগুলো করে না। কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্কটি সরাসরি, আবার কিছু ক্ষেত্রে লবণাক্ততা নিরাপদ পানির সংকট, অপর্যাপ্ত মাসিক পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসাসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে ঝুঁকি বাড়ায়। তাই লবণাক্ততাকে একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়, একমাত্র কারণ হিসেবে নয়।
লবণাক্ত পানির আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো গর্ভাবস্থা। পিএমসিতে সংরক্ষিত গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের উপকূলীয় দাকোপ এলাকায় করা গবেষণায় পানিতে লবণের পরিমাণ এবং গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় দেখা যায়, শুষ্ক মৌসুমে পানীয় পানির মাধ্যমে নারীদের শরীরে সোডিয়াম গ্রহণ বর্ষাকালের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। একই এলাকায় গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের হাসপাতালভিত্তিক হারও শুষ্ক মৌসুমে বেশি ছিল—১২ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে বর্ষাকালে তা ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ।

আরেকটি কেস-কন্ট্রোল গবেষণায় দেখা যায়, পানীয় জলের সোডিয়ামের মাত্রা যত বাড়ছে, গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকিও তত বেড়েছে। ৩০০ মিলিগ্রাম/লিটারের কম সোডিয়ামের পানির তুলনায় ৯০০ মিলিগ্রাম/লিটারের বেশি সোডিয়ামযুক্ত পানি পানকারীদের ক্ষেত্রে এই দুই সমস্যার সম্মিলিত ঝুঁকি প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল।
এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ মা ও শিশুর জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে উপকূলের পানি সংকটকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে এর স্বাস্থ্যগত দিকটি বাদ পড়ে যায়।
উপকূলীয় নারীদের সমস্যা শুধু তারা কী পানি ব্যবহার করছেন সেটি নয়, নিরাপদ পানি পেতে তাদের কতটা পরিশ্রম করতে হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ইউএনডিপির তথ্য অনুযায়ী, উপকূলের অনেক নারী প্রতিদিন দূরের জায়গা থেকে পানি সংগ্রহ করেন। এর জন্য তাদের দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয় এবং ভারী পানির পাত্র বহন করতে হয়।
ইউএনডিপি আরও জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ভারী পানির পাত্র বহনের সঙ্গে নারীদের জরায়ু নেমে যাওয়ার বা জরায়ু স্থানচ্যুতির সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে বলে স্থানীয় নারীরা জানিয়েছেন। অর্থাৎ এখানে লবণাক্ততা একটি বড় শিকড়ের মতো কাজ করছে—নিরাপদ পানি কমে যাওয়ায় পানি সংগ্রহের চাপ বাড়ছে, আর সেই চাপ আবার নারীর শরীরের ওপর আলাদা বোঝা তৈরি করছে।
প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা হলে চিকিৎসা নেওয়াটাও চ্যালেঞ্জ। কারণ যেসব এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা বেশি, সেসব জায়গায় নিরাপদ পানির সংকটের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় পৌঁছানোও কঠিন হতে পারে।
ব্র্যাকের একটি প্রতিবেদনে এমন উপকূলীয় নারীদের কথা উঠে এসেছে, যাদের চিকিৎসা নিতে ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভ্রমণ করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা বা বাগেরহাটে যেতে হয়, যা স্থানীয় পরিবারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা।
ফলে একজন নারী মাসিকের সমস্যা, সংক্রমণ বা অন্য কোনো প্রজনন স্বাস্থ্য জটিলতায় পড়লেও সময়মতো চিকিৎসা নাও পেতে পারেন। সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সেটি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।
পানির সংকট নারীদের জীবনের অন্য ক্ষেত্রগুলোকেও প্রভাবিত করছে। ইউএনডিপির সঙ্গে কথা বলা উপকূলীয় নারীরা জানিয়েছেন, পানি সংগ্রহে দিনের অনেকটা সময় চলে যায়। এতে শিক্ষা, আয়মূলক কাজ এবং পরিবারের অন্যান্য কাজের জন্য সময় কমে যায়।

মাসিক সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কেউ কেউ মাসিক পিছিয়ে দিতে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি ব্যবহার করেন বলেও ইউএনডিপি ও ব্র্যাকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ব্র্যাকের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, নিরাপদ পানির সংকটে কিছু তরুণী মাসিক বন্ধ বা পিছিয়ে দিতে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি ব্যবহার করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এখানে আবারও মূল সমস্যাটি লবণাক্ততা থেকে তৈরি পানিসংকট। অর্থাৎ পরিবেশগত একটি পরিবর্তন ধীরে ধীরে নারীর শরীর, দৈনন্দিন জীবন এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ—তিন জায়গাতেই চাপ তৈরি করছে।
এই কারণে উপকূলীয় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষার সমাধান শুধু হাসপাতাল বা ওষুধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। নিরাপদ মিঠাপানির ব্যবস্থা করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইউএনডিপি বাংলাদেশ জেন্ডার-রেসপনসিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন এবং স্থানীয় সরকার উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কাজ করছে। এর মধ্যে বাড়ির কাছাকাছি নিরাপদ পানির ব্যবস্থা তৈরি করাও রয়েছে, যাতে নারীদের দূরে গিয়ে পানি সংগ্রহ করতে না হয়।
বাংলাদেশের উপকূলের নারীদের জন্য তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নটি শুধু নদী ভাঙবে কি না, জমি নষ্ট হবে কি না বা কত মানুষ ঘর হারাবে—এতটুকুতে থেমে থাকে না। নিরাপদ পানি না থাকলে তার প্রভাব সরাসরি পৌঁছে যায় নারীর শরীর পর্যন্ত। আর সেই আঘাত অনেক সময় এত ধীরে আসে যে, সংকটটি বোঝা যায় তখনই, যখন তা আর শুধু পানির সমস্যা থাকে না—পরিণত হয় প্রজনন স্বাস্থ্যের সমস্যায়।
তথ্যসূত্র:
• উপকূলীয় বাংলাদেশে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশে নারীদের শারীরিক ও মাসিকস্বাস্থ্যজনিত সমস্যার প্রভাব—হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস, ওয়াইলি, ২০২৬।
• জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় নারীরা যেসব পাঁচটি পানি-সংকটের মুখোমুখি হন।
• ব্র্যাক, জলবায়ু সংকটে বাংলাদেশের উপকূলীয় নারীরা হারাচ্ছেন তাঁদের প্রজনন স্বাস্থ্য।
• উপকূলীয় নারীদের ওপর লবণাক্ততার ধীর ও নীরব সহিংসতা।
-a0f295-480x270.webp)
নাজমা আক্তারের (ছদ্ম নাম) সকাল শুরু হয় পানির খোঁজে। একটু নিরাপদ ও কম লবণাক্ত পানির আশায় তাঁকে হাঁটতে হয় অনেকটা দূর। সেখান থেকে ফিরতে ফিরতে সূর্য চড়ে বসে মাথার ওপর। তারপর রান্না, সন্তান, সংসার, কখনো মাঠের কাজ। কিন্তু প্রতিদিনের এই চেনা লড়াইয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় আরেক সংগ্রাম—‘প্রজনন স্বাস্থ্য’।
সমুদ্রের পানি উপকূলের দিকে এগিয়ে এলে নদী ও পুকুরের পানি তো নোনা হয়ই, সঙ্গে বদলে যায় মানুষের প্রতিদিনের জীবনও। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের অনেক এলাকায় নিরাপদ মিঠাপানি পাওয়া এখন বছরের নির্দিষ্ট সময়ের ওপর নির্ভরশীল। শুষ্ক মৌসুমে লবণাক্ততা বাড়ে, আর তখন খাবার পানি থেকে গোসল, কাপড় ধোয়া ও মাসিকের পরিচ্ছন্নতা—সবকিছুর জন্যই নারীদের বাড়তি ঝুঁকি নিতে হয়। এই দীর্ঘস্থায়ী পানিসংকটের সবচেয়ে কম আলোচিত প্রভাবগুলোর একটি পড়ছে নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে।
এই সমস্যার কেন্দ্রে রয়েছে লবণাক্ততা। সমুদ্রের পানি লোকালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়া, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, শুষ্ক মৌসুমে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং কিছু এলাকায় মানুষের পানি ব্যবস্থাপনার ধরন—সব মিলিয়ে উপকূলের পুকুর, নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎসে লবণ বাড়ছে। ব্র্যাক এনজিওর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বাংলাদেশের প্রায় ২০ শতাংশ ভূমি উপকূলীয় এলাকার মধ্যে পড়ে এবং এই এলাকার অর্ধেকের বেশি জমি কোনো না কোনো মাত্রায় লবণাক্ততার প্রভাবে রয়েছে।
উপকূলীয় এলাকার অর্ধেকেরও বেশি কোনো না কোনো মাত্রার লবণাক্ততায় আক্রান্ত। সাধারণত বর্ষাকালে, জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে, লবণাক্ততা তুলনামূলক কম থাকে। বিপরীতে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে তা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত পরিবর্তনের সঙ্গে উপকূলের মিঠাপানির উৎসে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ছে।

কিছু এলাকায় পরিস্থিতি এতটাই তীব্র যে গভীর নলকূপের পানিও লবণাক্ত। ব্র্যাকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উপকূলের কিছু গ্রামে ৫০০ থেকে ৭৫০ ফুট গভীর নলকূপ থেকেও লবণাক্ত পানি উঠছে। ফলে পানি পাওয়া গেলেও সেটি সবসময় নিরাপদ বা ব্যবহারযোগ্য মিঠাপানি নয়।
ফলে, খাবার পানি বাঁচিয়ে রাখতে গিয়ে নারীরা নিজেদের শরীরের পরিচ্ছন্নতার জন্য লবণাক্ত পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হন।
উপকূলীয় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের সঙ্গে লবণাক্ত পানির সম্পর্ক সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায় মাসিকের সময়।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি বা ইউএনডিপির বাংলাদেশ কার্যালয় উপকূলীয় নারীদের সঙ্গে কাজ করে দেখেছে, অনেক নারী মাসিকের সময় কাপড় ব্যবহার করেন। কিন্তু পর্যাপ্ত মিঠাপানি না থাকায় লবণাক্ত পানি দিয়েই তা পরিষ্কার করতে হয়। এটি স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জার্নাল ‘পাবমেড’ এর ২০২৬ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাতেও বাংলাদেশের উপকূলীয় নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য ও লবণাক্ত পানির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের ৯৫ দশমিক ৭ শতাংশ দৈনন্দিন কাজে লবণাক্ত পানির ওপর নির্ভর করতেন। তাদের ৪৪ দশমিক ৩ শতাংশ মাসিকজনিত স্বাস্থ্য সমস্যার কথা জানিয়েছেন। গবেষণায় লবণাক্ত পানির সংস্পর্শ এবং মাসিকের স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সম্পর্কও পাওয়া গেছে।
‘ওয়াইলি অনলাইন লাইব্রেরি’তে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, লবণাক্ত পানি দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করলে যৌন ও প্রজনন অঙ্গের সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালা, চুলকানি ও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় উপকূলীয় নারীদের ক্ষেত্রে র্যাশ, ছত্রাকের সংক্রমণ এবং মূত্রনালির সংক্রমণের মতো সমস্যার কথা উঠে এসেছে।
২০২৬ সালের গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীদের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ ত্বকে জ্বালাপোড়ার কথা জানিয়েছেন। একই গবেষণায় ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ চুল পড়ার সমস্যার কথাও বলেছেন।
গবেষকরা লবণাক্ত পানির সংস্পর্শের সঙ্গে শারীরিক স্বাস্থ্য সমস্যার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পেয়েছেন।
তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি—লবণাক্ত পানির কারণে নারীদের সব ধরনের প্রজনন সমস্যা সরাসরি হয়, এমন দাবি গবেষণাগুলো করে না। কিছু ক্ষেত্রে সম্পর্কটি সরাসরি, আবার কিছু ক্ষেত্রে লবণাক্ততা নিরাপদ পানির সংকট, অপর্যাপ্ত মাসিক পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসাসেবায় সীমিত প্রবেশাধিকারের মাধ্যমে ঝুঁকি বাড়ায়। তাই লবণাক্ততাকে একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হয়, একমাত্র কারণ হিসেবে নয়।
লবণাক্ত পানির আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো গর্ভাবস্থা। পিএমসিতে সংরক্ষিত গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের উপকূলীয় দাকোপ এলাকায় করা গবেষণায় পানিতে লবণের পরিমাণ এবং গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে। একটি গবেষণায় দেখা যায়, শুষ্ক মৌসুমে পানীয় পানির মাধ্যমে নারীদের শরীরে সোডিয়াম গ্রহণ বর্ষাকালের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। একই এলাকায় গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপের হাসপাতালভিত্তিক হারও শুষ্ক মৌসুমে বেশি ছিল—১২ দশমিক ২ শতাংশ, যেখানে বর্ষাকালে তা ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ।

আরেকটি কেস-কন্ট্রোল গবেষণায় দেখা যায়, পানীয় জলের সোডিয়ামের মাত্রা যত বাড়ছে, গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ এবং প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়ার ঝুঁকিও তত বেড়েছে। ৩০০ মিলিগ্রাম/লিটারের কম সোডিয়ামের পানির তুলনায় ৯০০ মিলিগ্রাম/লিটারের বেশি সোডিয়ামযুক্ত পানি পানকারীদের ক্ষেত্রে এই দুই সমস্যার সম্মিলিত ঝুঁকি প্রায় সাড়ে পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল।
এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ মা ও শিশুর জন্য গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে উপকূলের পানি সংকটকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে এর স্বাস্থ্যগত দিকটি বাদ পড়ে যায়।
উপকূলীয় নারীদের সমস্যা শুধু তারা কী পানি ব্যবহার করছেন সেটি নয়, নিরাপদ পানি পেতে তাদের কতটা পরিশ্রম করতে হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ইউএনডিপির তথ্য অনুযায়ী, উপকূলের অনেক নারী প্রতিদিন দূরের জায়গা থেকে পানি সংগ্রহ করেন। এর জন্য তাদের দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয় এবং ভারী পানির পাত্র বহন করতে হয়।
ইউএনডিপি আরও জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ভারী পানির পাত্র বহনের সঙ্গে নারীদের জরায়ু নেমে যাওয়ার বা জরায়ু স্থানচ্যুতির সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে বলে স্থানীয় নারীরা জানিয়েছেন। অর্থাৎ এখানে লবণাক্ততা একটি বড় শিকড়ের মতো কাজ করছে—নিরাপদ পানি কমে যাওয়ায় পানি সংগ্রহের চাপ বাড়ছে, আর সেই চাপ আবার নারীর শরীরের ওপর আলাদা বোঝা তৈরি করছে।
প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা হলে চিকিৎসা নেওয়াটাও চ্যালেঞ্জ। কারণ যেসব এলাকায় লবণাক্ততার সমস্যা বেশি, সেসব জায়গায় নিরাপদ পানির সংকটের পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবায় পৌঁছানোও কঠিন হতে পারে।
ব্র্যাকের একটি প্রতিবেদনে এমন উপকূলীয় নারীদের কথা উঠে এসেছে, যাদের চিকিৎসা নিতে ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পর্যন্ত ভ্রমণ করতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনা বা বাগেরহাটে যেতে হয়, যা স্থানীয় পরিবারের জন্য বড় আর্থিক বোঝা।
ফলে একজন নারী মাসিকের সমস্যা, সংক্রমণ বা অন্য কোনো প্রজনন স্বাস্থ্য জটিলতায় পড়লেও সময়মতো চিকিৎসা নাও পেতে পারেন। সমস্যা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে সেটি আরও জটিল হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে।
পানির সংকট নারীদের জীবনের অন্য ক্ষেত্রগুলোকেও প্রভাবিত করছে। ইউএনডিপির সঙ্গে কথা বলা উপকূলীয় নারীরা জানিয়েছেন, পানি সংগ্রহে দিনের অনেকটা সময় চলে যায়। এতে শিক্ষা, আয়মূলক কাজ এবং পরিবারের অন্যান্য কাজের জন্য সময় কমে যায়।

মাসিক সামলানোর জন্য পর্যাপ্ত পানি না থাকায় কেউ কেউ মাসিক পিছিয়ে দিতে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি ব্যবহার করেন বলেও ইউএনডিপি ও ব্র্যাকের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ব্র্যাকের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, নিরাপদ পানির সংকটে কিছু তরুণী মাসিক বন্ধ বা পিছিয়ে দিতে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি ব্যবহার করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদি প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
এখানে আবারও মূল সমস্যাটি লবণাক্ততা থেকে তৈরি পানিসংকট। অর্থাৎ পরিবেশগত একটি পরিবর্তন ধীরে ধীরে নারীর শরীর, দৈনন্দিন জীবন এবং স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ—তিন জায়গাতেই চাপ তৈরি করছে।
এই কারণে উপকূলীয় নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্য রক্ষার সমাধান শুধু হাসপাতাল বা ওষুধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। নিরাপদ মিঠাপানির ব্যবস্থা করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ইউএনডিপি বাংলাদেশ জেন্ডার-রেসপনসিভ কোস্টাল অ্যাডাপটেশন এবং স্থানীয় সরকার উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কাজ করছে। এর মধ্যে বাড়ির কাছাকাছি নিরাপদ পানির ব্যবস্থা তৈরি করাও রয়েছে, যাতে নারীদের দূরে গিয়ে পানি সংগ্রহ করতে না হয়।
বাংলাদেশের উপকূলের নারীদের জন্য তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নটি শুধু নদী ভাঙবে কি না, জমি নষ্ট হবে কি না বা কত মানুষ ঘর হারাবে—এতটুকুতে থেমে থাকে না। নিরাপদ পানি না থাকলে তার প্রভাব সরাসরি পৌঁছে যায় নারীর শরীর পর্যন্ত। আর সেই আঘাত অনেক সময় এত ধীরে আসে যে, সংকটটি বোঝা যায় তখনই, যখন তা আর শুধু পানির সমস্যা থাকে না—পরিণত হয় প্রজনন স্বাস্থ্যের সমস্যায়।
তথ্যসূত্র:
• উপকূলীয় বাংলাদেশে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশে নারীদের শারীরিক ও মাসিকস্বাস্থ্যজনিত সমস্যার প্রভাব—হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস, ওয়াইলি, ২০২৬।
• জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি), জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় নারীরা যেসব পাঁচটি পানি-সংকটের মুখোমুখি হন।
• ব্র্যাক, জলবায়ু সংকটে বাংলাদেশের উপকূলীয় নারীরা হারাচ্ছেন তাঁদের প্রজনন স্বাস্থ্য।
• উপকূলীয় নারীদের ওপর লবণাক্ততার ধীর ও নীরব সহিংসতা।
.png)

প্রশান্ত মহাসাগরে ঘনিয়ে আসা ‘এল নিনো’ স্মরণকালের শক্তিশালী রূপ নিচ্ছে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া অফিস। ফলে ২০২৭ সাল হতে যাচ্ছে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে উষ্ণ বছর।
২১ আগস্ট ২০২৬
সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে দেশজুড়ে মাঝারি থেকে ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। একই সঙ্গে বায়ুচাপের পার্থক্যের কারণে দেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল রাখা হয়েছে। আজ (মঙ্গলবার) সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর স
১৮ আগস্ট ২০২৬
হাতিকে বাঁচাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে বাঁশবাগান সৃজন, জলাধার নির্মাণসহ বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। একইসঙ্গে বাড়ানো হয়েছে হাতির হামলায় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা।
১২ আগস্ট ২০২৬
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে প্রজাপতির আবাসস্থলে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কোথাও তারা নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে, আবার কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে পুরোনো আবাস থেকে। গবেষকদের দাবি, এই পরিবর্তন শুধু প্রজাপতির নয়, বরং পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্য সতর্কবার্তা।
০৬ আগস্ট ২০২৬