leadT1ad

নতুন গবেষণা

কৃষিজমিতে বাড়ছে ভারী ধাতু, ক্যানসারের ঝুঁকিতে শিশুরা

প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০২৬, ২০: ২৮
স্ট্রিম গ্রাফিক

কৃষিজমি বিষাক্ত হয়ে উঠছে। অপরিকল্পিত ব্যাটারি রিসাইক্লিং (পুনর্ব্যবহার) কারখানা এবং শিল্পবর্জ্যের কারণে মাটিতে মিশছে সিসা, আর্সেনিক, দস্তা, ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতু। এতে মাটির স্বাভাবিক গুণাগুণ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি উৎপাদিত ফসল ও পরিবেশ চরম ক্ষতির মুখে পড়ছে। সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে শিশুরা। তাদের ক্যানসারসহ মারাত্মক সব স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা বাড়ছে।

সম্প্রতি ‘এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ’ শীর্ষক গবেষণা প্রবন্ধে বাংলাদেশের কৃষিজমির ভয়াবহ এই চিত্র উঠে এসেছে। দূষণের প্রকৃত মাত্রা ও ধরন বুঝতে গবেষক দলটি দেশের তিনটি ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের এলাকা থেকে ধানী জমির মাটি সংগ্রহ করে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা (আইপিএস-ওইএস, এক্সআরডি এবং এসইএম–ইডিএস) করে।

এলাকা তিনটি হলো— নরসিংদীর পলাশের ফুলবাড়িয়া গ্রাম, যেখানে ২০১৮ সাল থেকে চলছে বড় ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানা। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, যা দেশের অন্যতম বৃহৎ টেক্সটাইল ও শিল্প এলাকা। আর রাজশাহীর দুর্গাপুর, যেখানে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই নিয়মে কৃষিকাজ করা হয়। এই গবেষণায় তুলনামূলক নিরাপদ ও আদর্শ এলাকা বলা হয়েছে দুর্গাপুরকে।

গবেষণা দলের সদস্য বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া স্ট্রিমকে বলেন, মাটিতে ভারী ধাতু মিশে গেলে তা ফসলের উৎপাদন ব্যাহত করে। এটি সহজাত ব্যাপার। কিন্তু ভয়ংকর হলো– এসব ভারী ধাতু উৎপাদনের সময় খাদ্যশস্যে মিশে যায়। তারপর এসব খাবার মানুষ গ্রহণ করে। খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে মিশে যাওয়া ধাতুগুলো ধীরে ধীরে ক্যানসারসহ নানা রোগ সৃষ্টি করে।

ভয়াবহ সিসা দূষণে নরসিংদী

গবেষণার ফলাফলে সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে নরসিংদীর পলাশে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, কৃষিজমির মাটিতে সিসার নিরাপদ বা অনুমোদিত মাত্রা প্রতিকেজিতে সর্বোচ্চ ১০০ মিলিগ্রাম। কিন্তু পলাশের ব্যাটারি কারখানা সংলগ্ন ধানের জমিতে এই মাত্রা পাওয়া গেছে ১ লাখ ২৩ হাজার ৪৫৯ মিলিগ্রাম পর্যন্ত! অর্থাৎ, অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে প্রায় ১২০০ গুণের বেশি সিসা মিশে আছে মাটিতে।

কারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি খালের পানি ও কৃষিজমিতে ফেলার কারণে এখানকার মাটির রাসায়নিক গঠন বদলে গেছে। স্বাভাবিক মাটির পিএইচ মাত্রা নিরপেক্ষ থাকার কথা থাকলেও পলাশের মাটি মারাত্মক অম্লীয় বা অ্যাসিডিক (গড় পিএইচ ৩ দশমিক ৬০) হয়ে পড়েছে। খনিজ পরীক্ষায় দেখা গেছে, সেখানে ‘অ্যাঙ্গেলসাইট’ নামের একটি বিষাক্ত সিসাযুক্ত খনিজ স্তর তৈরি হয়েছে, যা মাটির উর্বরতা নষ্ট করে দিচ্ছে।

মোহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া বলেন, সবচেয় উদ্বেগের হলো– একবার এই ভারী ধাতু বা সিসা মাটিতে মিশে গেলে তা আর সরানো সম্ভব নয়। এটি একবার মাটিতে প্রবেশ করলে পুরো ইকোসিস্টেমে ঢুকে যায়। এমনকি বৃষ্টির পানির সঙ্গে বা সেচের মাধ্যমে এটি চুইয়ে ভূগর্ভস্থ পানিতেও মিশে যেতে পারে।

রূপগঞ্জে ক্রোমিয়াম, দুর্গাপুরে আর্সেনিক

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের মতো শিল্প এলাকায় কারখানাগুলোতে বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) সঠিকভাবে ব্যবহার না করায় অপরিশোধিত বিষাক্ত পানি সরাসরি খালে গিয়ে পড়ছে। খালের পানি কৃষকরা ধানের জমিতে সেচের কাজে ব্যবহার করছেন। ফলে রূপগঞ্জের কৃষিজমিতে দস্তা (জিংক), তামা (কপার), নিকেল ও ক্রোমিয়ামের বিপজ্জনক দূষণ দেখা গেছে।

শিল্পকারখানা না থাকায় রাজশাহীর দুর্গাপুরের কৃষি এলাকার মাটি ভারী ধাতুর দূষণ থেকে অনেকটাই মুক্ত। তবে, সেখানে সেচের জন্য দীর্ঘমেয়াদে অগভীর নলকূপ বা ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের কারণে মাটি এবং উৎপাদিত ধানে কিছুটা আর্সেনিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা।

সবচেয়ে ঝুঁকিতে শিশুরা

দূষিত এই মাটিতে উৎপাদিত ফসল গ্রহণ, ত্বকের সংস্পর্শ বা বাতাস থেকে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে বিষাক্ত ধাতুগুলো মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। গবেষকেরা স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করে দেখেছেন, বয়স্কদের তুলনায় শিশুরা এই দূষণের সবচেয়ে বড় শিকার।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার (ইউএসইপিএ) গাইডলাইন অনুযায়ী, স্বাস্থ্যঝুঁকির সূচক বা হ্যাজার্ড ইনডেক্স (এইচআই) ১-এর নিচে থাকা নিরাপদ। কিন্তু নরসিংদীর ব্যাটারি এলাকার শিশুদের ক্ষেত্রে এই সূচকের মান পাওয়া গেছে ১৪ দশমিক ০৪। অর্থাৎ নিরাপদ মাত্রার চেয়ে ১৪ গুণ বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তারা। এর পেছনে ৯৮ শতাংশের বেশি অবদান সিসার। এই সিসার কারণে শিশুদের মেধা বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়াসহ স্নায়ুতন্ত্রের স্থায়ী ক্ষতি হতে পারে।

এছাড়া, ক্যানসার সৃষ্টির ঝুঁকির ক্ষেত্রেও শিশুরা চরম বিপদে রয়েছে। গবেষণার তিনটি এলাকাতেই শিশুদের ক্যানসারের ঝুঁকি আন্তর্জাতিক নিরাপদ সীমার (প্রতি ১০ হাজারে ১ জনের কম) চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পলাশে ক্যানসারের জন্য মূলত সিসা, রূপগঞ্জে ক্রোমিয়াম এবং দুর্গাপুরে আর্সেনিক দায়ী বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

জমি ও প্রজন্ম রক্ষায় যা করতে হবে

অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ব্যাটারি গলানোর কারখানা এবং শিল্প-কারখানার বর্জ্যই এই পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। এই অবস্থা চলতে থাকলে মাটি চিরতরে ফসল ফলানোর অযোগ্য হয়ে পড়বে এবং জনস্বাস্থ্য বিশাল হুমকির মুখে পড়বে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় গবেষকদের দেওয়া প্রধান সুপারিশগুলো হলো— যত্রতত্র গড়ে ওঠা অবৈধ ব্যাটারি রিসাইক্লিং কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা; টেক্সটাইলসহ সব শিল্পকারখানায় বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো; কৃষিকাজে দূষিত খালের পানির বদলে নিরাপদ সেচ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমিয়ে বিকল্প সেচ ব্যবস্থার সন্ধান; মারাত্মক দূষিত এলাকাগুলোর মাটি ও উৎপাদিত ফসলের বিষাক্ততা নিয়মিত পরীক্ষা করে স্থানীয়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জরুরি জনস্বাস্থ্য কর্মসূচি হাতে নেওয়া।

গোলাম কিবরিয়া বলেন, ভয়াবহ দূষণ রোধে শিল্পাঞ্চল ও ব্যাটারি রিসাইক্লিং এলাকার বর্জ্যগুলো যথাযথ পরিবেশগত নীতিমালার মাধ্যমে একটি আবদ্ধ বা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সংস্থান করতে হবে। আমরা প্রায় দেখি পুরোনো ব্যাটারি বা এর বিষাক্ত পানি যত্রতত্র ফেলে দেওয়া হচ্ছে। কারখানার বর্জ্য এবং পুরোনো ব্যাটারি যদি সঠিকভাবে বা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে নিষ্কাশন করা না হয়, তবে তা আমাদের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে।

Ad 300x250

সম্পর্কিত