এক্সপ্লেইনার

জুলাই সনদ অনুযায়ী নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে কি

স্ট্রিম ডেস্ক
স্ট্রিম ডেস্ক

কে হবেন নতুন রাষ্ট্রপতি? প্রতীকী ছবি: এআই দিয়ে তৈরি

গত কয়েক দিন ধরে চলা জল্পনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে রাষ্ট্রপতির চেয়ার ছেড়ে দিলেন মো. সাহাবুদ্দিন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) বিকেলে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠান তিনি।

পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জাতির সামনে তুলে ধরে এরই মধ্যে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেছেন স্পিকার। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, নতুন কেউ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদই।

স্বাভাবিকভাবেই এখন সবার মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রক্রিয়াটা আসলে কেমন হবে।

সংবিধান কী বলছে

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর এখন কী হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে স্পিকার জানিয়েছেন, আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদকে একজন নতুন রাষ্ট্রপতি বেছে নিতে হবে। সংবিধানে এটাই পজিশন।

রাষ্ট্রপতির শূন্য আসনের দায়িত্ব কি তাহলে স্পিকারের ঘাড়েই বর্তায়—এমন প্রশ্নেও তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এটা একরকম সাংবিধানিক রীতি। সংবিধানে লেখা আছে, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন, তবে প্রকৃত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কাজটা করবে জাতীয় সংসদ, আর তা করতে হবে তিন মাসের মধ্যে। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জমা দিতে হয় সংসদের স্পিকারের কাছেই—এটাও সংবিধানের একটা স্পষ্ট নির্দেশনা।

জুলাই সনদে কী বলা আছে

জনগণের ভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদে একটা নতুন প্রস্তাব রাখা হয়েছে—রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন সংসদের দুই কক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটের মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমানে চালু ব্যবস্থায় চিত্রটা ভিন্ন। এখনো ৩৫০ জন সংসদ সদস্যই রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করেন, আর সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের বাধ্যবাধকতার কারণে কোনো এমপি চাইলেও নিজের দলের প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন না—তা করলে তাঁর সংসদ সদস্য পদই বাতিল হয়ে যাবে।

এই নিয়মের ফলে বাস্তবে যা ঘটে তা হলো, যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের মনোনীত প্রার্থীই রাষ্ট্রপতি হয়ে যান—প্রায় নিশ্চিতভাবে। বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়েছে মাত্র একবার, ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর। সেবার বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস ১৭২ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছিলেন, আর জামায়াতে ইসলামীর ১৮ জন সংসদ সদস্য তাঁকে ভোট দিয়েছিলেন। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট। এরপর থেকে টানা সাতটি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীই, কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই।

ঠিক এই ধরনের একতরফা নির্বাচন ঠেকাতেই জুলাই সনদে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, এমপিরা যেন গোপন ব্যালটে ভোট দিয়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে পারেন। মোট ৩০টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে এমন কিছু আছে যেগুলোতে কোনো রাজনৈতিক দলেরই আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্ট ছিল না—এই প্রস্তাবটি তার একটি। তবে বাস্তবতা হলো, এখনো সংবিধান সংশোধন না হওয়ায় এই নিয়ম কার্যকর হয়নি। সংসদের উচ্চকক্ষও এখনো গঠিত হয়নি, কারণ সেটার জন্যও প্রয়োজন সংবিধান সংশোধনের।

উল্লেখ্য, বিএনপির নিজস্ব রাষ্ট্র সংস্কার প্রস্তাবের ৩১ দফাতেও ৭০ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনের কথা বলা আছে, যাতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এমপিদের নিজ দলের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া যায়।

ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিতর্ক

প্রধানমন্ত্রী আর রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতার একটা ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে জুলাই সনদে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব রাখা হয়েছে। সেটি হচ্ছে, ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হোক রাষ্ট্রপতিকে। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর কোনো পরামর্শ ছাড়াই মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন রাষ্ট্রপতি নিজেই। তবে এই প্রস্তাবের একটা অংশে দ্বিমত জানিয়েছে বিএনপি। বিশেষত বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিতে রাজি নয় দলটি। গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে মোট নয়টি প্রস্তাবে বিভিন্ন দলের নোট অব ডিসেন্ট বা আপত্তি নথিভুক্ত আছে, এই প্রস্তাবটি তার একটি।

তাড়াহুড়া নেই বিএনপির

দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন রাষ্ট্রপতি মনোনয়নের ক্ষেত্রে বিএনপি এখনই তাড়াহুড়ো করতে রাজি নয়। কারণ সংবিধান অনুযায়ী তাদের হাতে এখনো পুরো ৯০ দিন সময় রয়েছে। এই সময়টাতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যাবেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।

Ad 300x250
সর্বাধিক পঠিত

সম্পর্কিত