
বিদ্যুতের দাম বাড়ছে, জ্বালানি আমদানির চাপও কমছে না। এমন পরিস্থিতিতে বাড়ি, কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের ছাদকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্র বানাতে নতুন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে সরকার। ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত প্রতি ইউনিটের জন্য ১০ টাকা ৫০ পয়সা মূল্য পাবেন গ্রাহকরা।
শুধু বিদ্যুৎ বিল কমানো নয়, সরকারের নতুন উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে, দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ বাড়ানো এবং একই সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা। ১ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই প্রণোদনা ব্যবস্থার আওতায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সোলার সিস্টেম স্থাপন করবে সরকার।
হঠাৎ কেন ছাদে সৌরবিদ্যুৎ আলোচনায়
দেশে সৌরবিদ্যুৎ নতুন কিছু নয়। তবে এত দিন বড় আকারে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে জমির সংকট, বিনিয়োগ ব্যয় এবং গ্রিডে সংযোগসহ নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সেই সমস্যার একটি বিকল্প পথ।
শহরের বাড়ি, কারখানা, অফিস, মার্কেট কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ছাদে প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরাসরি ব্যবহার করা যায়। ব্যাটারি থাকলে উৎপাদিত বিদ্যুতের একটি অংশ সংরক্ষণ করে পরে ব্যবহার করাও সম্ভব। আর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হলে সেটি গ্রিডে দেওয়া যাবে। নতুন প্রণোদনা মূলত এই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের বিষয়টিকেই আরও আকর্ষণীয় করেছে।
১০ টাকা ৫০ পয়সা কীভাবে পাবেন গ্রাহকেরা
সরকার ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সর্বোচ্চ ব্যয় প্রতি ইউনিট ৮ টাকা ধরে হিসাব করেছে। বর্তমান বাজারদর এবং বিদ্যুৎ বিভাগের পাওয়া বিভিন্ন দরপত্রের মূল্য বিবেচনায় এই ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এর সঙ্গে ২০ শতাংশ মুনাফা এবং ১১ দশমিক ২৫ শতাংশ প্রিমিয়াম যোগ করে গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ টাকা ৫০ পয়সা। অর্থাৎ, এটি সরাসরি ‘সোলার প্যানেল বসালেই সরকার টাকা দেবে’ এমন কোনো নগদ ভর্তুকি নয়। এটি নিজের প্রয়োজন মেটানোর পর অতিরিক্ত সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করলে নির্ধারিত হারে অর্থ পাওয়ার ব্যবস্থা।
প্রণোদনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো সময়সীমা। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭-এর মধ্যে ব্যাটারিসহ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। এরপর উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করলে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা হারে মূল্য পাওয়া যাবে।
এই সুবিধা চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০৩০ পর্যন্ত। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিস্টেম স্থাপন করা গ্রাহকরা প্রায় তিন বছর এই নির্ধারিত হারে অতিরিক্ত বিদ্যুতের মূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ এরপর স্থাপিত সিস্টেম এই বিশেষ প্রণোদনার আওতায় আসবে না। ফলে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সময়সীমাটি গুরুত্বপূর্ণ।
এ ব্যবস্থায় কাজ করবে নেট মিটারিং। সহজভাবে বললে, গ্রাহক প্রথমে নিজের প্রয়োজনের জন্য সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করবেন। উৎপাদন প্রয়োজনের চেয়ে বেশি হলে অতিরিক্ত অংশ গ্রিডে যাবে। আবার যখন সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন কম থাকবে, তখন গ্রিড থেকে বিদ্যুৎ নেওয়া যাবে। ফলে গ্রাহকের জন্য সৌরবিদ্যুৎ শুধু বিকল্প বিদ্যুতের উৎস নয়, একই সঙ্গে একটি আয় তৈরির ব্যবস্থাও হতে পারে। নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ এর আওতায় বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রাহকের কাছ থেকে গ্রিডে কত বিদ্যুৎ গেল এবং গ্রিড থেকে কত বিদ্যুৎ নেওয়া হলো তার হিসাব রাখবে।
খরচ কমাতে পারলে বাড়তি লাভও গ্রাহকের
সরকার ৮ টাকা প্রতি ইউনিটকে সর্বোচ্চ উৎপাদন ব্যয় হিসেবে ধরেছে। কোনো গ্রাহক বা উদ্যোক্তা এর চেয়েও কম খরচে সিস্টেম স্থাপন ও পরিচালনা করতে পারলে সেই সাশ্রয়কে গ্রাহকের ‘ডিভিডেন্ড’ বা বাড়তি লাভ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। এতে একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার তৈরি হওয়ার সুযোগ আছে। অর্থাৎ, কম খরচে ভালো প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে বিনিয়োগকারীর লাভের সুযোগ বাড়বে।
তবে প্রণোদনার অর্থ নগদে দেওয়া হবে না। বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো গ্রাহকের হিসাব সংরক্ষণ করবে এবং নির্ধারিত অর্থ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা মোবাইল আর্থিক সেবা (এমএফএস) এর মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে। এতে লেনদেনের একটি আনুষ্ঠানিক রেকর্ড থাকবে এবং গ্রিডে সরবরাহ করা বিদ্যুতের পরিমাণের সঙ্গে অর্থ পরিশোধের হিসাব মিলিয়ে দেখা সহজ হবে।
সব প্যানেল কি ব্যাটারি দিয়ে হবে
সরকারের প্রণোদনা পেতে ব্যবহৃত সরঞ্জামেও মানদণ্ড মানতে হবে। সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, ইনভার্টার, মিটারসহ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতিকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এসআরইডিএ) নির্ধারিত কারিগরি মান পূরণ করতে হবে। অর্থাৎ সস্তা বা নিম্নমানের সরঞ্জাম বসালে প্রণোদনা পাওয়া যাবে না।
এটি শুধু কয়েকটি বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসানোর প্রকল্প নয়। সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী কয়েক বছরে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য সরকারের। নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের বৃহত্তর লক্ষ্যও সামনে রয়েছে।
তাহলে চ্যালেঞ্জ কোথায়
প্রণোদনা ঘোষণা করলেই ছাদে ছাদে সোলার প্যানেল বসবে এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রথম বাধা হলো প্রাথমিক বিনিয়োগ। ভালো মানের প্যানেলের সঙ্গে ব্যাটারি যোগ হলে প্রকল্পের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। দ্বিতীয়ত, গ্রিডে বিপুল পরিমাণ ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করতে হলে বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, গ্রাহককে সঠিক মানের যন্ত্রপাতি, দক্ষ ইনস্টলার এবং নির্ভরযোগ্য রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা দিতে হবে।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সহায়তার ব্যবস্থা রাখছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টারের পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর স্থানীয় কার্যালয় থেকেও নীতিগত ও কারিগরি সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় এত দিন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ছিল মূলত বিদ্যুৎ বিল কমানোর একটি উপায়। নতুন প্রণোদনা সেটিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে ছোট আকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আয়ের উৎসে পরিণত করতে চাইছে। তবে এই উদ্যোগের আসল পরীক্ষা হবে বাস্তবায়নে। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৭ এই সময়সীমা, বিনিয়োগের খরচ, মানসম্মত যন্ত্রপাতি এবং গ্রিডের সক্ষমতা এই চার জায়গায় সাফল্য মিললেই ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
.png)






-f85749.jpeg)
